জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার: ষষ্ঠ খণ্ড/পর্ব ১/ কমলিকা ভট্টাচার্য


বাঁচার উত্তরাধিকার: ষষ্ঠ খণ্ড
পর্ব ১ 
কমলিকা ভট্টাচার্য 

স্বাভাবিক থাকার অস্বাভাবিকতা

দশ বছর সময় কখন যে সরে গেছে, কেউ টের পায়নি।
যে শিশুটিকে একদিন ঘিরে ছিল আতঙ্ক, সুরক্ষা, লুকিয়ে রাখা সত্য—সে আজ আঠারো বছরের তরুণ।
আদর্শ মানে আদর।
সকালের আলো ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছিল বড় জানালাগুলো দিয়ে।
বাড়িটার দেয়ালে এখন আর আগের মতো ভয়ের ছায়া নেই, নেই মাঝরাতে ফিসফিসিয়ে কথা বলার অভ্যাস।
তবু কোথাও যেন একটা অদৃশ্য সতর্কতা রয়ে গেছে—যেন বাড়িটার প্রতিটি কোণ আজও কাউকে পাহারা দেয়।
দশ বছর আগে যে বাড়িটা গোপনতা আর আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটিয়েছে, আজ সেখানে এক ধরনের অভ্যস্ত শান্তি।
বারান্দার মানিপ্ল্যান্টগুলো হাওয়ায় দুলছে, রান্নাঘর থেকে কফির গন্ধ আসছে, দেওয়ালে ঝোলানো পুরোনো ছবিগুলোতে জমে আছে সময়ের ধুলো।
সবকিছুই স্বাভাবিক।
🍂
অথচ এই স্বাভাবিকতার ভিতরেই যেন লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত অস্বাভাবিকতা।
এই দশ বছরে তাকে খুব যত্ন করে “সাধারণ” করে তোলা হয়েছে।
কেউ তাকে আলাদা চোখে দেখেনি।
কেউ তাকে মনে করিয়ে দেয়নি যে সে একদিন অসাধারণ কিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
সে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে খেলেছে, সাইকেল চড়েছে, বৃষ্টির জলে ভিজে ফুটবল খেলেছে, দৌড়ে হেরেছে, জিতেছে, বন্ধুর বাড়ি গিয়ে রাত কাটিয়েছে, টিফিনে ভাগ করে খেয়েছে।
স্কুলে তার পরিচয়—ভালো আঁকে, দারুণ ভায়োলিন বাজায়, খেলাধুলায় সেরা, পড়াশোনায় মোটামুটি।
এই “মোটামুটি” শব্দটার জন্যই সবাই যেন গোপনে স্বস্তি পেয়েছে এতদিন।
আজ সেই নিশ্চিন্ততার ভিতরে হালকা কম্পন।
আজ বোর্ড পরীক্ষার ফল বেরোবে।
সকাল থেকেই বাড়িতে অদ্ভুত টানটান ভাব।
ঘড়ির কাঁটা যেন আজ একটু বেশি শব্দ করছে।
জানলার বাইরে কোকিল ডাকছে, দূরে কোনো গাড়ির হর্ন শোনা যাচ্ছে, কিন্তু ঘরের ভিতরের নীরবতা সব শব্দকে ঢেকে দিচ্ছে।
ইরা বারবার ঘড়ি দেখছে।
তার হাতের আঙুলে অস্থিরতা জমে আছে।
নাতাশা কফির কাপ হাতে নিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে, কিন্তু সে কিছুই দেখছে না।
রোদের আলো এসে পড়েছে তার মুখে, তবু চোখের নিচের ক্লান্তি ঢাকা পড়ছে না।
অনির্বাণ এদিক-ওদিক হাঁটছে, নিজের অজান্তেই আঙুলের গাঁট ভাঙছে।
তার ভেতরের উৎকণ্ঠা যেন ঘরের বাতাসেও ছড়িয়ে পড়ছে।
শুধু দু’জন অস্বাভাবিক রকম নিশ্চিন্ত—
ঋদ্ধিমান আর আদর।
ঋদ্ধিমান সোফায় হেলান দিয়ে খবরের কাগজ উল্টে দেখছে।
মাঝে মাঝে চশমার উপর দিয়ে বাকিদের দিকে তাকাচ্ছে, যেন সব বুঝেও কিছু বলছে না।
আদর মেঝেতে বসে স্কেচবুকে কিছু আঁকছে।
সাদা পাতার উপর দ্রুত পেন্সিল চলছে।
অর্ধেক আঁকা ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক লম্বা রাস্তা—দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে কুয়াশার মধ্যে।
অনির্বাণ হঠাৎ বলে ওঠে,
“তোর কোনো টেনশন হচ্ছে না?”
আদর মাথা না তুলেই বলে,
“পাশ করলেই তো হবে। তোমরা এমন করছ যেন আমি আইপিএস হবার পরীক্ষা দিয়েছি।”
ঋদ্ধিমান হেসে ফেলে,
“যা হবে, দেখা যাবে।”
অনির্বাণ বিরক্ত গলায় বলে,
“এত বড় Sun Robotics কে দেখবে ভবিষ্যতে, সেটা নিয়ে ভাবছিস?”
আদর এবার মাথা তুলে তাকায়।
তার চোখে শিশুসুলভ স্বচ্ছতা।
“তুমি তো আছো, আংকেল আছে! আর আমি একটা একদম নতুন কিছু করব। যদিও এখনো ভাবিনি কী।
তোমরা জোর করলে তাই সায়েন্স নিলাম। না হলে ফাইন আর্টস বা মিউজিক নিয়েই পড়তাম।”
নাতাশা চুপচাপ ছেলেকে দেখে।
তার মনে হয়—এই সরল কথাগুলোর ভিতরেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
যে ছেলে নিজের অসাধারণত্ব সম্পর্কে সচেতন নয়, সে-ই সবচেয়ে নিরাপদ।
ঠিক তখনই ফোন।
ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎ মোবাইলের শব্দটা যেন অস্বাভাবিক জোরে বাজে।
আদর ফোনটা কানে দিতেই ওপার থেকে বন্ধুর চিৎকার—
“তুই কোথায়? তুই স্কুলে ফার্স্ট হয়েছিস! শুধু স্কুলে নয়, বোর্ডেও! টিভিটা খুলে দেখ!”
আদর ভ্রু কুঁচকে বলে,
“ধুর, মজা করিস না।”
অনির্বাণ দ্রুত ফোন নিয়ে নিজে দেখে।
ইরা এগিয়ে আসে।
নাতাশা টিভির স্ক্রিনে চোখ রাখে।
সব সত্যি।
স্ক্রিনে আদরের ছবি।
নিচে বড় অক্ষরে নাম।
চারদিকে উত্তেজিত সংবাদপাঠকের গলা।
আদর শুধু পাশ করেনি।
সে প্রথম।
ঘরে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধতা।
এমন নিস্তব্ধতা, যেখানে কারও নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যায়।
তারপর ইরা এগিয়ে এসে আদরকে জড়িয়ে ধরে।
অনির্বাণের মুখে অবিশ্বাস আর গর্ব মেশানো হাসি।
নাতাশা নিঃশব্দে সোফায় বসে পড়ে, যেন হঠাৎ শরীরের ভর ধরে রাখতে পারছে না।
আদর মাথা চুলকে বলে,
“আমি তো চেষ্টা করেছিলাম খারাপ করতে… কিন্তু প্রশ্ন এত সহজ ছিল, ভুল করতে পারিনি!”
সে একে একে সবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে,
তারপর ইরাকে জড়িয়ে ধরে বলে—
“যশোদা মা, I tried my best not to do well… but I couldn’t answer wrong.”
ইরার চোখ ভিজে যায়।
তার বুকের ভিতর হঠাৎ একসঙ্গে আনন্দ আর ভয় ধাক্কা খায়।
ঋদ্ধিমান দূর থেকে তাকিয়ে থাকে।
তার চোখে হাসি নেই।
কারণ এই আনন্দের মধ্যেই সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে—
একটা পুরোনো ছায়া ধীরে ধীরে ফিরে আসছে।
নাতাশা খুব আস্তে বলে,
“এই খবর ছড়ালে প্রশ্ন উঠবে। মিডিয়া সব খুঁড়ে বার করবে।”
অনির্বাণ থেমে যায়।
মুহূর্তের মধ্যে ঘরের আবহাওয়া বদলে যায়।
যে আনন্দ একটু আগে আলো হয়ে উঠেছিল, তার উপর যেন হালকা অন্ধকার নেমে আসে।
ইরা বুঝতে পারে কথাটার ওজন।
এতদিন সবাই বিশ্বাস করেছিল—
আদর পুরোপুরি সাধারণ।
আজকের ফলাফল সেই বিশ্বাসে চিড় ফেলল।
ঋদ্ধিমান ধীরে বলে,
“ওকে এখানে রাখা নিরাপদ নয়।”
আদর অবাক হয়ে তাকায়,
“মানে?”
ইরা তার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়, কিন্তু কিছু বলে না।
তার আঙুল কাঁপছে খুব সামান্য।
অনির্বাণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
তার মুখে দ্বিধা, অস্বস্তি, দায়িত্ব—সব মিশে গেছে।
ঋদ্ধিমান এবার স্পষ্ট করে বলে,
“তোমাকে বিদেশে পড়তে যেতে হবে।”
আদর হেসে ফেলে,
“হঠাৎ কেন?”
ঋদ্ধিমান তার কাঁধে হাত রাখে।
জানলার বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো নেমে আসছে।
আকাশে ধীরে ধীরে রঙ বদলাচ্ছে।
“কারণ তোমার পৃথিবীটা বড় হওয়া দরকার।”
বাকিটা সে বলে না।
কারণ সত্যিটা এখনো বলার সময় আসেনি।
বিকেলের শেষ আলো বারান্দায় এসে পড়েছে।
আদর সেখানে দাঁড়িয়ে ভায়োলিন তোলে।
একটা সুর ভেসে ওঠে।
সুরটা শান্ত, গভীর, বিস্তৃত।
যেন অজানা পথে হাঁটার আগে নিজের ভেতরকে গুছিয়ে নেওয়া।
যেন দূরের কোনো পথ তাকে ডাকছে।
হাওয়ায় পর্দা দুলে ওঠে।
নাতাশা চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শোনে।
ইরা রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে স্থির হয়ে।
অনির্বাণের মুখে অদ্ভুত চিন্তার ছায়া।
ঋদ্ধিমান ধীরে বলে,
“স্বাভাবিক থাকার অস্বাভাবিকতাই ওকে সবচেয়ে আলাদা করে তোলে।”
নাতাশা তার দিকে তাকায়।
তারা জানে—
আবার এক নতুন সুরক্ষার অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।
আর আদর?
সে কিছুই জানে না।
সে শুধু ভাবছে—
তার জীবনের নতুন দরজা খুলছে।
কিন্তু বাকিরা জানে—
এই দরজা খুলছে অতীতকে আড়াল করে ভবিষ্যৎকে বাঁচানোর জন্য।

ক্লিক করে শুনে নিন 👇
লেখকের পাঠক সত্তা

Post a Comment

3 Comments

  1. AnonymousJune 01, 2026

    শুভারম্ভ!! আদরের শিল্পী হওয়ার ইচ্ছেটা ভালো লাগল।

    ReplyDelete
  2. কমলিকাJune 01, 2026

    অনেক ধন্যবাদ,আগের পর্বগুলিও আশাকরি ভালো লাগবে।🙏

    ReplyDelete
  3. AnonymousJune 01, 2026

    স্বাভাবিক থাকার অস্বাভাবিকতা... লেখকের ইন্গিতপূর্ণ ভাষা দিন দিন আরো নতুন সোপান আরোহণ করছে । অভিনন্দন

    ReplyDelete