লাদাখ : মন ভালো করা এক দেশ
প্রথম পর্ব
কলি সাহু চৌধুরী
অন্যরকম বেড়ানো!সেটা আবার কেমন? লেহ লাদাখ ভ্রমন সেরকমই একটা আয়োজন! আয়োজন শব্দটি কেন প্রযোজ্য সেই কথায় আসি ,আসলে বেড়াতে গিয়ে আরামের সঙ্গে আপস করা যায় না,প্রাত্যহিক জীবনের একঘেয়েমি আর ঘড়ি ধরে ছুটতে ছুটতে মানুষ যখন ক্লান্ত মন-শরীরে বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করে তখনই বেরিয়ে পড়ে,জমিয়ে খাওয়া দাওয়া,ঘোরা আর পূর্ণ আরাম।কিন্তু লেহ- লাদাখ ট্রিপের প্রসঙ্গে মনের মতো হোটেল, হোম স্টে,মাল্টিকুইজিন রেস্তোরাঁ, নানা ওয়েবসাইটে ফোর স্টার,ফাইভ স্টার এর আগেও সবার মাথায় হাই অল্টিটিউড এ,মাইনাস তাপমাত্রা, ঠান্ডার প্রাবল্যে ঘোরাফেরা করতে হবে তাই বেড়াতে যাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি একটা ভয় কাজ করে।এছাড়াও আরও একটি পয়েন্ট সকলের আগে মাথায় আসে ( যারা গিয়েছেন আগে, অথবা নেট মাধ্যমে পড়াশোনা করে) ।
লেহ বিমানবন্দরে নামার পর অনেকেরই শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা উচ্চতার জন্য নানা রকম সমস্যা হয়।তাই লেহ-লাদাখ যাওয়ার কথা ভাবলেই একটু চিন্তা আর মানসিক দোলাচলে ভরা একটি আয়োজন চলতেই থাকে,এই বছরের মার্চ মাসে আমাদের কয়েকজন বন্ধু মিলে লাদাখ যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল,কিন্তু নানা কারণে তাদের আর যাওয়া হলো না।তখন আমার কানপুরে থাকা এক কাজিন আর আমাদের পরিবারের লোকজন ঠিক করলাম,এই সুযোগ ছাড়া যাবে না।অন্য জায়গায় তো পরে ঘোরা যাবে, কিন্তু লাদাখে যাওয়ার ইচ্ছে অনেক দিনের। আর বয়স বাড়লে নানা রকম শারীরিক সমস্যা হতে পারে—এই ভেবেই শেষ পর্যন্ত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।
কারণ পরে অন্য জায়গায় যাওয়া যাবে কিন্তু লাদাখ বয়েস হয়ে গেলে নৈব নৈব চ। ভাগ্যিস যাওয়া বাতিল অথবা পিছিয়ে দেওয়ার রাস্তায় যাইনি।
কেন কি লেহ-লাদাখ,খারদূংলা পাস,নুব্রা ভ্যালিতে ডাবল হাম্পড ক্যামেল রাইড, নুব্রা থেকে প্যাঙগং লেক যাওয়ার রাস্তা,সোমরিরী লেকের ঘন নীল জলরাশির অপার সৌন্দর্যের যে অভিজ্ঞতা এর কোন বিকল্প হয় না নিজের দেশের মধ্যে আলাদা একটা জগত! মনে হবে ভ্রম হচ্ছে না তো!এক জায়গা থেকে আর জায়গায় যেতে যেতে রুক্ষ এবড়ো খেবড়ো লাইমস্টোনের ক্লিফ, কোথাও কোথাও মনে হবে টেলিভিশনে দেখা চাঁদের দেশে বুঝি বা পৌঁছে গিয়েছেন,অথবা হঠাৎ মনে হতে পারে প্রাগৈতিহাসিক যুগে পৌঁছে গিয়েছেন! কত কত জায়গায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাঠের সেতু পেরিয়ে চোখ মেলে তাকালেই দেখতে পাবেন কখনও ডাইনে ,কখনও বাঁয়ে সিন্ধু নদী ও শায়ক নদীর নীল জল আর অনন্ত আকাশ!
Hats off to Indian Army ভাবা যায় না, ওই রকম সব জায়গায় ঠিকমত পানীয় জল ও খাবারের অসুবিধা যেখানে প্রবল, প্রতিকূল পরিবেশে, প্রকৃতি ও টেকনোলজির অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়ে অতন্দ্র প্রহরায় দেশকে রক্ষার দায়িত্ব পালনের সাথে আমাদের ও বেড়ানোর পথ সুগম করে দিয়েছেন।
কোন গাছপালা নাই, নাই কোন লোকালয়, মানুষের চিহ্ন মাত্র !সেখানে থামলে চলবে না,গাড়ী ছুটিয়ে চলে যেতে হবে রাস্তার একেবারে শেষে।চক্ষু চড়কগাছ হবে হলফ করে বলছি।কিন্তু তবুও বলব এরকম একটা উচ্চতায় থাকার অভিজ্ঞতা আর প্রকৃতিকে এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ ছাড়তে মন চায় না।
যদি একটু অভিনব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে চান আর বাজেট নিয়ে চিন্তা না করতে হয় তাহলে শরীর খারাপ হবে ভেবে অথবা বয়সের দোহাই না দিয়ে লাদাখ ট্রিপ এর পরিকল্পনা করতেই পারেন।
🍂
তবে যাওয়ার আগে মনে ও মাথায় কয়েকটি পয়েন্ট গেঁথে নিয়ে যাবেন বিলাসবহুল ট্রাভেল স্টাইল শব্দটি ছেঁটে দিলে স্বাচ্ছন্দ্যর অভাব হবে না।অন্য সব পাহাড়ী জনপদের মতো ড্রাইভার থেকে স্থানীয় অধিবাসীদের সাহায্য পাবেন।
চিন্তায়,চেতনায় মননে যার আনাগোনা সারাক্ষন !! সেই কবি গুরুর ভাষায় 'ওরে সাবধানী পথিক, বারেক পথ ভোলো, পথ ভোলা পথ ভুলে মর ফিরে, ওরে সাবধানী পথিক...
দ্বিধাহীনভাবে সাহস সঞ্চয় করে এক অসহ্য গরমের সকালে,খুব ভোরে,নয়াদিল্লি বিমানবন্দর থেকে লেহগামী বিমানে জানালার ধারের সিটে বসে পড়লাম। রাত জাগার ক্লান্তি তখনও পুরো কাটেনি।কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সব আলস্য উড়ে গেল।
জানলার বাইরে দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যেতে লাগল। নিচে সুদূর বিস্তৃত হিমালয়ের বরফঢাকা পাহাড়শ্রেণী, যেন সাদা চাদরে মোড়া এক স্বপ্নরাজ্য। ঝকঝকে নীল আকাশের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে পালকের মতো সাদা মেঘ। সেই অপরূপ দৃশ্য চোখে নিয়ে বারবার মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির আশ্চর্য শ্রেষ্ঠ রূপটি বুঝি আজ মেলে ধরেছে।
দেখতে দেখতে বিমান নেমে এল লেহর মাটিতে। বুকের ভিতর তখন এক অদ্ভুত শিহরণ—বহুদিনের লালিত স্বপ্ন অবশেষে সত্যি হল। পাহাড়, আকাশ আর অজানা এক নতুন পৃথিবীর আহ্বানে শুরু হল লাদাখ যাত্রার নতুন অধ্যায়।
1 Comments
ভীষন সুন্দর লেখা। অপেক্ষায় আছি পরের পর্বের।
ReplyDelete