জয়িতা চট্টোপাধ্যায়
প্রতিদিনের মতো নাইট ডিউটি সেরে ইঁদুরটি (নন্তু)খাওয়ার-দাওয়ার নিয়ে যখন বাড়ি ফিরছে, তখনই দূর থেকে সে দেখলো— তাদের গর্তের সামনে বেশ কয়েকজন পুলিশ-ইঁদুর দাঁড়িয়ে, বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো নন্তুর!
কাছে যেতেই সে এক ভয়ানক দৃশ্য—
নন্তু আর নোটের একটি মাত্র ছেলে পুটকি চিৎ-পটাং হয়ে শুয়ে আছে, মুখ দিয়ে কস্ বেড়োচ্ছে, গায়ে হাত দিতেই নন্তুর শরীর গুলিয়ে উঠলো, পুটকির গা ঠাণ্ডা বরফ, বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না, যে ও আর নেই।
ক্ষণে ক্ষণে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে নোটে...
মা বলে কথা!
আন-ন্যচেরাল ডেথ বলে পুলিশ পুটকির বডি ফরেন্সিকে পাঠিয়ে দিল, নন্তু-নোটের যারা প্রতিবেশী ছিল তারা বেশ সাপোর্টিভ, নন্তুকে আগামী কদিন নাইট ডিউটি করতে দিল না।
ইঁদুর মহলে মর্নিং ডিউটি তো হয়না, নাইট ডিউটি করেই ওদের আর্নিং, যখন মানুষ গভীর নিদ্রামগ্ন থাকে তখনই ওনাদের অ্যাক্টিভ থাকতে হয়—
খাদ্য সংগ্রহ, বাসস্হান সিকিওর, ইত্যাদি ও অনেককিছুর জন্য।
🍂
যাইহোক প্রতিবেশীরা খুবই ভালো ওদের খাওয়ার- দাওয়ার ও দিচ্ছে যত্ন করছে কিন্তু নন্তুর গলা দিয়ে সেই খাওয়ার নামলেও পুটকির শোকে নোটের গলা দিয়ে কিছুই নামছে না।
একমাত্র সন্তানের বিয়োগ ব্যথা তা তো কম যন্ত্রণার নয়! এভাবে কেটে গেল কটা দিন...
তিনদিন পর—
হঠাৎ একজন কন্সটেবল এসে জানালো—
পুটকির পেটে নাকি বিষ পাওয়া গেছে।
এখন বিষয় হলো পুটকির তো বয়স খুব কম, খাওয়ার বলতে যা খায় সবটাই বাবা বা মায়ের দেওয়া, বাইরেও পুটকি বেড়োইনি, তাহলে বিষ এলো কি করে?
শুরু হলো জোড়দার তদন্ত।
মান্না পাড়ার যে বড় বাবু সে নাকি খুব স্ট্রিক্ট, নতুন বদলি হয়ে এসেছে,রায় পাড়া থেকে,নোটেও নাছোড়বান্দা ছেলের খুনিকে ধরতে হবেই,হত্যে দিয়ে পড়ে আছে পুলিশ স্টেশনে।
এখানকার বড় বাবুকে দেখতে—
যেমন তাগড়াই,লোমশ,চকচকে গড়ন তেমন বাজখাই তার গলা।সে যাইহোক তদন্ত শুরু হল, একে একে জেড়া করা হল নন্তু-নোটে,ওদের সব পরিচিত ইঁদুর গ্যাং যারা ছিল সকলকেই, কিন্তু বন্ধু বা প্রতিবেশীদের তেমন কোনো মোটিভ চোখে পড়লো না বড় বাবুর। তো যথারীতি তারা বাতিল হলো সন্দেহের তালিকা থেকে। এভাবেই গড়িয়ে গেল আরও দু দিন কিছুই তেমন জানা গেলো না।
এমন সময় ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের ডক্টর লালু ফোন করে জানালো—
পুটকির পেটে যে বিষ পাওয়া গেছে সেটি নাকি এক ধরনের স্লো পয়জেন বিষ, আর পুটকির মৃত্যুর দুইদিন আগে তাকে দেওয়া হয়েছে, সে কথা শুনে তো মাথায় হাত বড়বাবুর, তাড়াতাড়ি খবর দেওয়া হলো নোটেকে, নোটের কথাগুলো শুনে হঠাৎ মনে পড়ে গেলো—
সে তো পুটকি মারা যাওয়ার দুদিন আগে বাপের বাড়ি গেছিল, নন্তুর কাছে পুটকি কে রেখে!
গলার কাছটা দলা পাকিয়ে উঠলো নোটের; তাহলে কি....
পরের দিন রাতে বড় বাবু ও তার দলবল বাথরুমের পাইপ কেটে ঢুকে পড়লো নন্তুর ডিউটির বাড়িতে, যেহেতু নন্তু রান্নাঘরের পাইপ কেটে যাতায়াত করে তাই, সে জানতেই পারে না বড় বাবু ও তার দলের উপস্থিতি। যাইহোক সমস্ত কিছু সার্ভে করে বড়বাবুরা ফিরে আসেন রাতের মধ্যেই পুলিশ স্টেশনে।
পরের দিন...
নন্তু আ্যারেস্টেড হয়, তারপর তাকে তুলে আনা হয় ইন্টারোগেশন রুমে, নন্তু প্রথমে তো নিজের মুখে কিচ্ছু স্বীকার করতে চায়নি, একেবারে কুলুপ এঁটে ছিল , বড় বাবুর থ্রার্ড ডিগ্রি পড়তেই!
সে এক ভয়ঙ্কর থার্ড ডিগ্রি—
চিৎ করে শুইয়ে ল্যাজের ডগা পুড়িয়ে দেওয়া, গোঁফের চুল কুচ কুচ করে কেটে নেওয়া,
এই সব কিছুর পর, অবশেষে জানা গেলো পুটকিকে সেই বিষ দিয়েছে,
কিভাবে ও কেন বড়বাবু জিজ্ঞেস করায়, সে বিস্তারিত বলতে শুরু করল—
যার বাড়িতে নন্তু ডিউটি করতো সেই মানুষ দুটো রোজই বিষ মেশানো কেক রাখতো নন্তুকে মারার জন্য, সেটা একদিন বেডরুমের দরজায় কান পেতে সে শুনেও নিয়েছিল, তাই সে ফাঁদ পেতে রাখা কেক খেতো না।ভালোই যাচ্ছিল সব।
কিন্তু একদিন—
বৃষ্টির রাতে নোটেকে বাপের বাড়ি থেকে আনতে গিয়ে সে দেখে নোটে ও অন্য একজন পুরুষ-ইঁদুর একই ছাতার নিচে হাঁটছে, রাগে তো গা জ্বলে ওঠে নন্তুর, আসলে নন্তু তথাকথিত সুন্দর নয়—
বেঁটে, গায়ের রং খয়েরি, একটু মোটা গোছের, কিন্তু যাকে সে সেদিন রাতে দেখেছিল—
তার গায়ের রং বেশ পরিস্কার, লম্বা, বড়-বড় গোঁফ, বেশ মোটা ল্যাজ, সন্দেহ দানা বেঁধেছিল মনে সে দিন থেকেই।নোটে কে কিছু বলেনি।
কিন্তু পুটকিকে দেখে তার মাঝে-মাঝে ভয় লাগতো, যখন বড় হচ্ছিল পুটকি, তখন যেন সে সুপুরুষটি হয়ে উঠছিল, সে দিনের এক ঝলক দেখা দেব-ইঁদুরটির মতো, একদিন নন্তু হঠাৎ খেয়াল করে নাকের পাশে পুটকির তিল, সে ভাবে তার বা নোটের তো নেই এমন কোনো দাগ তাহলে কি, সে যেটা সন্দেহ করছে সেটাই?
সহ্য করতে না পেরে নোটের অনুপস্থিতে, বিষ মাখানো কেকটা খাইয়ে দেয় পুটকিকে। তারপর আর কি সব শেষ।
অবশেষে, এই সমস্ত কথা নোটেকে জানানো হয়।
তারপর—
নোটে, বড়বাবুর কাছে এসে একটাই আর্জি করে পুটকির ডি-এন-এ টেস্টের, যেহেতু খুনের সুরাহা হয়নি এতো দিনেও, তাই বডি ল্যাবেই ছিল।টেস্ট করতে তেমন অসুবিধা কিছু হল না, পুটকির সামনের একটি দাঁত নিয়ে ডি-এন-এ টেস্ট করা হল—
সেখানে প্রমান হলো পুটকি নন্তুরই ছেলে।
পরের দিন নোটে এলো কাস্টারিতে নন্তুর সাথে দেখা করতে—
সেদিনই রাতে দুর্ভাগ্য বশত নন্তু গায়ে আগুন দিল জেলের ভেতর!
দেশলাই, কেরোসিন জেলের ভেতর কি করে এল! এই রহস্যও নন্তুর সাথেই চলে গেল।
তার কিছুদিন পর—
নোটে চলে যায় তলপি-তলপা নিয়ে নন্দী পাড়া ওর বাপের বাড়ি, ওর ভেতর আজও জ্বলে যায় একটিই যন্ত্রনায়—
যে নন্তুকে সে ভালোবেসে বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছিল বাড়ির অমতে; সেই ওর জীবন এভাবে তছ-নছ করে দিল।সেদিন যাকে রাতে নন্তু দেখেছিল—
সে ছিল, নোটের পাঠশালার মাস্টার,জিকো দাদা।
তারপর থেকে অনেক মাস কেটে গেছে—
0 Comments