জ্বলদর্চি

এক মায়ের কথা/পূর্ণিমা দাস

এক মায়ের কথা

পূর্ণিমা দাস


‘মা' এই কথাটির মধ্যে জড়িয়ে রয়েছে কত মায়া, কত মমতা, কত আদর, কত ভালোবাসা। মা কথাটি সামান্য একটি শব্দ বলে মনে হলেও, এই শব্দের মধ্যে যে কতটা মধুরতা ও কোমলতা রয়েছে তা কেবল তারাই জানে যারা মাকে মন থেকে ডাকে। মা হল সব সমস্যার সমাধান। সে ছোটো বড়ো যেকোনো সমস্যাই হোক না কেন। এই মা দশ মাস দশ দিন তার গর্ভে ধারণ করে রাখে এক প্রাণকে। যেমন সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করেন। তেমনি এক মাও নতুন প্রাণ সৃষ্টি করে থাকে। 

যেমন প্রকৃতি মা আমাদের ধারণ করে রেখেছে তার কোলে। ধীরে ধীরে আমরা তার কোলে বেড়ে উঠি। তেমনি এক রক্ত মাংসের মায়ের গর্ভেও ওই প্রাণ সৃষ্টি হচ্ছে আর ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সেই মায়ের সান্নিধ্যেই বেড়ে উঠছে। নানা বাধা বিপত্তি পেরিয়ে তাকে সমাজের একজন যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছে এই মা। সন্তান জন্ম হওয়ার পর চিনছে একমাত্র তার মাকেই। আর সেই মা-ই তাকে চিনিয়ে দিচ্ছে এই সমাজে কে তার আপনজন আর কে তার পর। সে চিনছে তার বাবাকে, তার ভাইকে, তার বোন, দাদা, দাদু-ঠাকুমা, কাকা-কাকিমা ও সমাজের অন্যান্য মানুষদেরকে। এমনকি এই বিশ্বকে। তাইতো সবাই বলে, মা-ই হলো আমাদের প্রধান শিক্ষক। যে কিনা প্রথম তার সন্তানকে কথা বলা শেখায়, মানুষ চিনতে শেখায়। আর শেখায় এই সমাজের সঙ্গে কীভাবে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। 

নিজের সমস্ত কিছু বিসর্জন দিয়ে যদি কেউ বিনাস্বার্থে সন্তানকে ভালোবাসতে পারে সে হলো কেবলমাত্র এক মা। সে যেই মা হোক না কেন।  কারণ আমরা জানি শুধু জন্ম দিলেই যে মা হওয়া যায় তা নয়, যে পালন করে সেও মা হতে পারে। তার সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ হল নন্দরানী মা যশোদা। যিনি কিনা কৃষ্ণকে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসতেন। কৃষ্ণ তাঁর গর্ভজাত সন্তান নয় এই কথা জানার পরেও কৃষ্ণের প্রতি তার ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা একটুও কমেনি। 

এই হল সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা। সন্তান হয়তো কোনো কোনো সময় মায়ের ভালোবাসা ভুলে যেতে পারে, কিন্তু মা কখনো তা পারে না। তাই তো কথায় আছে-“কুপুত্র যদি বা হয় কুমাতা কখনো নয়।" সন্তান খারাপ হলেও মা কখনো সেই সন্তানের প্রতি তার স্নেহ, মায়া, মমতা ত্যাগ করতে পারে না। সন্তানের জন্য সে সবার সঙ্গে লড়াই করতে পারে। নিজে কষ্ট পেলেও কখনো সন্তানকে কষ্ট পেতে দেয় না। 
🍂
এমনই এক মা হল কলির মা ওরফে প্রতিমা। যে কিনা ছোট থেকে বহু কষ্ট পেয়েছে। সে চায়নি তার মেয়ে কলিও তার মত সেই একই কষ্ট পাক। তাই সে লড়াই করে গেছে নিজের সঙ্গে এবং সমাজের সঙ্গে। এই মা একদিন অবসরে ভাবতে বসেছে যে সে কীভাবে প্রতিমা থেকে দুই যোগ্য সন্তানের মা হয়ে উঠেছে।

কলির মা ওরফে প্রতিমার যেমনই নাম তেমনই তার মুখের গড়ন এবং তার স্বভাব। যেন সাক্ষাৎ দেবী প্রতিমা। শুধুমাত্র দেখতে সুন্দর বা স্বভাব ভালো হলেই হয় না ভাগ্যকেও সুন্দর হতে হয়। কিন্তু কলির মা ওরফে প্রতিমার ভাগ্য সুন্দর ছিল না। একান্নবর্তী পরিবারে তার জন্ম হয়। আর এই মেয়ে হয়ে জন্মানোই তার কাল হয়ে ওঠে। প্রথম সন্তান মেয়ে হতেই তার বাবার মনে অন্ধকার নেমে আসে। কারণ বাবার বাকি ভাইদের সবারই ছেলে রয়েছে কিন্তু তার কোন ছেলে নেই। বাবা ভেবেছিল প্রথম সন্তান যদি ছেলে হত তাহলে দ্বিতীয় সন্তান মেয়ে হলেও কোন সমস্যা ছিল না। কারণ তাতে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিলেও ছেলে তো থাকত। কিন্তু প্রথম সন্তান মেয়ে হলো দ্বিতীয় সন্তানও যদি মেয়ে হয় তাহলে? এই ভাবনা তাকে ভাবিয়ে তুলল। কিন্তু ভাগ্যবিধাতা হয়তো তার ভাগ্যে ছেলে সন্তানের সুখ লেখেনি। তাই দ্বিতীয় সন্তানও তার মেয়ে হলো। এতে করে প্রতিমার বাবা আরও ভেঙে পরল। 

প্রতিমার ঠাকুমা প্রতিমার মাকে কথা শোনাতে লাগল। সে বললো-“কী জানি, আমার এই বউ আগের জন্মে কোন পাপ করেছে কিনা? যে এই জন্মে তার ফল পাচ্ছে। আমার ছেলেকে একটা ছেলের মুখ দেখাতে পারল না। খোকা রে, তোর বউ তোর বংশকে ডোবালো, হায় হায় হায়।"

ঠাকুমার এই কথা শুনে বাবাও মার উপর অনেক রাগ করেছিল। বাবাও ঠাকুমার কথা বিশ্বাস করে নিল। আর সেই থেকে শুরু হলো প্রতিমা, তার বোন শ্রীতমা ও তার মায়ের উপর মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার। দুটো মেয়ে হওয়ায় প্রতিমার ঠাকুমা তাদেরকে সবার থেকে আলাদা করে দিল। তাদের বাবাও তাদের পাশে থাকল না, থাকল শুধু তাদের মা। প্রতিমাও ছোট থেকে পেল না বাবার ভালোবাসা। মা তাদের অনেক কষ্ট করে মানুষ করতে থাকল। না খেয়ে না দেয়ে মেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিল। প্রতিমা ও শ্রীতমা দেখতে লাগল তার মা কীভাবে তাদের মানুষ করছে। সারাদিন ঘরের সব কাজ করত, সবার সব কথা মুখ বুজে সহ্য করত। শুধুমাত্র তার মেয়েরা যাতে বাবার ভালোবাসা পায়। মায়ের এত কষ্ট সহ্য করতে না পেরে প্রতিমাও মায়ের সঙ্গে কাজ করত। বোনকে মায়ের মতন আগলে রাখত। আর সেই থেকে প্রতিমাও এক মায়ের ভূমিকা পালন করতে থাকল। 

আমি আগেই বলেছি জন্ম দিলেই যে শুধু মা হওয়া যায় তা নয়, মা নানাদিক থেকে হওয়া যায়, যেমন প্রতিমা। মা বাড়ির কাজের জন্য বোনকে ভালোভাবে দেখাশুনা করতে পারত না বলে প্রতিমা বোনের দেখাশোনা করত। বোনকে খাওয়ানো, স্নান করানো থেকে শুরু করে তার যাবতীয় সব কাজই করত। অতি ছোট বয়সেই সে অনেক বড় হয়ে গেল। আর এক মায়ের আসন দখল করে নিল। 

এভাবেই তাদের দিন কাটছিল একদিন ঘটলো এক ঘটনা। প্রতিমা স্কুল থেকে ফিরে এসে হঠাৎই দেখল তার বাবা মাকে মারছে। মাকে মারতে দেখে শ্রীতমা কাঁদছে। প্রতিমা কিছু বুঝতে পারল না। দেখল পাশে ঠাকুমা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবই দেখছে কিন্তু কিছু বলছে না। প্রতিমা আর সহ্য করতে না পেরে বাবাকে আটকাতে গেল, আর এই আটকাতে গিয়েই মা’র সঙ্গে সঙ্গে প্রতিমাও মার খেল। পরে জানতে পারল তার মাকে বাবা কী জন্য মারছে। কারন তার মা নাকি তার বাড়ির গরুগুলোকে ঠিকসময়ে খেতে না দিয়ে শ্রীতমাকে খাওয়াচ্ছিল। এইটা নাকি তার দোষ। এই সামান্য ব্যাপারে মাকে এইভাবে মার খেতে দেখে বাবার উপর প্রতিমার অনেক রাগ হল। কিন্তু কিছু বলতে পারল না। 

সেই দিন প্রতিমা ও তার মা কিছু খেল না, তার বাবাও খোঁজ নিতে এলো না তারা কেমন আছে। প্রতিমা কাঁদতে কাঁদতে শুধু ভগবান কে ডাকতে লাগল আর বলতে লাগল-“হে ভগবান, আমি আর পারছি না। তুমি কেন আমাদের এত কষ্ট দিচ্ছ? আমার বাবাকে ভালো করে দাও ভগবান, ভালো করে দাও।"

সেদিন হয়তো প্রতিমার এই ডাক ভগবান শুনেছিল। তাই কিছুদিনের মধ্যেই সে এবং তার বোন ও তার মা বাবার ভালোবাসা পেল। সেই দিনটা হল তা ঠাকুমা মারা যাবার পর। ঠাকুমা মারা যাওয়ার পর বাবা বুঝতে পারল যে সে কী ভুল করেছে। যে মেয়েদেরকে সে দূরে ঠেলে দিয়েছিল সেই মেয়েদেরকে আবার সে কাছে টেনে নিল। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে গেল। প্রতিমা ও ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল, তার বিয়ের বয়স হয়ে গেল। আর খুব ধুমধাম করেই তার বিয়ে হল।

প্রতিমা এবার ভাবল-“বাপের বাড়িতে সে যে আদর যত্ন পায়নি। স্বামীর বাড়িতে হয়তো সেই আদর যত্ন পাবে?"

কিন্তু ভাগ্যবিধাতা তো তার ভাগ্যে আলাদা কিছুই লিখেছিল। প্রতিমা যে আশা করেছিল সেই আশা তার পূর্ণ হলো না। হয়তো ভাগ্যবিধাতা তার মায়ের ভাগ্য ও তার ভাগ্য একই রকম লিখেছিল। প্রতিমারও বিয়ে হল একান্নবর্তী পরিবারে। শশুর, শাশুড়ি, স্বামী, দেবর, ননদ সবাইকে নিয়ে তার ভরা সংসার। কিন্তু ভাগ্য যে অন্য কথা বলেছে। প্রতিমা সহজ সরল হওয়ায় কাউকে কিছু বলতে পারত না। আর তার সেই সরলতার সুযোগ বাড়ির সবাই নিত। বাড়ির সবাই যা করতে বলত সেও তাই তাই করত। সবার ফাই ফরমাস পূরণ করত। কিন্তু তাতেও সে সবার মন জয় করতে পারত না। প্রতিমার ভালো খারাপ কেউ বুঝত না। এমনকি তার স্বামীও না। কারণ তার স্বামীর কাছে মায়ের কথাই ছিল শেষ কথা। 

প্রতিমা শাশুড়ি প্রতিমাকে নানাভাবে অত্যাচার করত। ঠিকমতো খেতে দিত না, কিছু পরতে দিত না, কোথাও বেরোতে দিত না। এছাড়া ননদও বিয়ে হয়ে গেলেও সপ্তাহের দু-তিনবার করে বাপের বাড়ি আসত। আর ভাইয়ের বউয়ের উপর অর্থাৎ প্রতিমার উপর মানসিক অত্যাচার করত। প্রতিমা এই সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করত। যদিও বা স্বামীকে কিছু বলতে যেত তাহলে শাশুড়ি, ননদ ঘরের বাইরে কান পেতে সব শুনত। আর ছেলে বাড়ি থেকে বেরোনোর পরেই শুরু হত প্রতিমার উপর মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার। তাকে দিয়ে বাড়ির সব কাজ করাত। কিন্তু ঠিকমতো খেতে দিত না। 

এইভাবে নানা কষ্ট সহ্য করে প্রতিমার দিন কাটতে লাগল। বাপের বাড়িতেও সে কিছু বলতে পারত না। মুখ বুজে সব সহ্য করে নিত। বেশি কিছু বললে শাশুড়ি তাকে খোঁটা দিত ও তার অতীত নিয়ে কথা বলত। 

শাশুড়ি বলত-“উমমম, বাপের বাড়িতে যেন রাজরানী হয়ে থাকত। তাই এখানেও চাইছে রাজরানী হয়ে থাকতে। বাপের বাড়িতে ঠিকমতো খেতে পেত না। এখানে যাইহোক খেতে পাচ্ছে তবুও তার দেমাগ দেখো, হুম্।"

এইসব কথা প্রতিমা মুখ বুজে সহ্য করে নিত। আরও একটা কথা তাকে শুনতে হত, তাদের বিয়ের কয়েক বছর হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তাদের কোন সন্তান হচ্ছিল না। এ নিয়েও তাকে কথা শুনতে হত। সন্তান না হওয়া সবাই তাকেই দোষ দিত। প্রতিমাও মনে মনে ভাবতে হয়তো সবই তার ভাগ্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও সন্তান লাভের জন্য সে কোনো খামতি রাখেনি। এখানে তার স্বামীও তার পাশে ছিল। ডাক্তার, কবিরাজ, বদ্যি, দেবদেবী কোনো কিছুতেই তারা খামতি রাখেনি। বহু কষ্টের পর বাবা মহাদেবের দয়ায় প্রতিমা গর্ভবতী হলো। 

কিন্তু তা সত্ত্বেও শাশুড়ির মন গললো না। শাশুড়ি বলে দিল তার নাতি চাই, তা না হলে প্রতিমার ভাগ্যে দুঃখ আছে। বৌমা সন্তানসম্ভবা হওয়া সত্ত্বেও তাকে দিয়ে বাড়ির সব কাজ করাত। ছেলে কিছু বললে শাশুড়ি বলত-“এই সময় কাজ করা ভালো, তুই এইসব বুঝবি না। আমাদের সময় আমরা যেন কিছু করিনি? যতসব আদিখ্যেতা, হুম্।"

এইভাবে সময় কেটে যেতে লাগল। প্রতিমার সন্তান জন্মগ্ৰহণের দিন চলে এল। আর এখানেই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। প্রতিমা ছেলে নয় মেয়ে সন্তানের জন্ম দিল। আর তাই দেখে শাশুড়ি, ননদ ও স্বামীর মুখ শুকিয়ে গেল। 

শাশুড়ি বলল-“কী অপয়া বউ আমার, একটা নাতির মুখ দেখাতে পারল না। আমার ছেলে এই অপয়ার পেছনে এত এত টাকা নষ্ট করল। তবুও কিনা আমার ছেলেকে একটা ছেলের মুখ দেখাতে পারল না। ছি ছি ছি।"

প্রতিমা দেখল মেয়ে হতে স্বামীর মুখটাও শুকিয়ে গেছে। মুখোমুখি কিছু বলতে না পারলেও মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে সে খুশি হয়নি। 

এইসব দেখে প্রতিমা আর চুপ রইল না। সে এবার ঘুরে দাঁড়াল। সে মনে মনে বলল-“না! অনেক হয়েছে আর নয়। আমার মতো আমি আমার মেয়েকেও সেই একই কষ্ট পেতে দেব না। আমার মেয়েকে আমি মানুষের মতো মানুষ করে তুলব। তাকে প্রতিষ্ঠিত করে সবাইকে দেখিয়ে দেব যে মেয়ে মানেই শুধু বোঝা নয়।"

এরপর থেকে প্রতিমার লড়াই শুরু হল। ভালোবেসে প্রতিমা মেয়ের নাম রাখল-‘কলি।' কলি যাতে মায়ের সাথে সাথে বাবার ভালোবাসাও পেতে পারে সেই চেষ্টা করতে লাগল প্রতিমা। কিন্তু ঠাকুমা কলিকে একবারেই সহ্য করতে পারত না। সব সময় কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে তাকে কথা শোনাত। ভালো খাবার খেতে দিত না। কিন্তু প্রতিমাও ছেড়ে কথা বলত না। শাশুড়ির মুখের ওপর সেও জবাব দিয়ে দিত। এইভাবে সবার সঙ্গে লড়াই করে প্রতিমা কলিকে বড়ো করে তুলল। কলির যখন নয় বছর বয়স তখন প্রতিমা আবার মা হল। এবার সে আর তার মায়ের মতো মেয়ে নয় ছেলে সন্তানের জন্ম দিল। আর এই দেখে বাড়ির সবাই খুব খুশি হলো। 

নাতিকে পেয়ে ঠাকুমা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল। কিন্তু কলিকে আর কেউ ভালোবাসল না। তাকে সবাই অবহেলা করতে লাগল। কিন্তু প্রতিমা  আর সহ্য করলো না। স্বামী ও শাশুড়িকে বোঝালো যে মেয়ে মানে শুধু বোঝা নয়, একজন মেয়েও সবার ভালোবাসা পেতে চায়। যদি সে সবার ভালবাসা পায় তাহলে সেই মেয়েই একদিন সবার মুখ উজ্জ্বল করবে।

স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ এবং সমাজের সবার সঙ্গে লড়াই করে প্রতিমা ধীরে ধীরে মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করে তুলল এবং সবাইকে বুঝিয়ে দিল যে একটি মেয়েও পারে একটা ছেলের মতন কাজ করতে। 

কলি এখন একজন শিক্ষক। যে বাবা একদিন মেয়ে হয়েছে দেখে মুখ শুকিয়ে দিয়েছিল সেও মেয়ের এই সাফল্য দেখে খুশি হল। সবার মুখে মুখে নিজের মেয়ের প্রশংসা শুনে তার বুক গর্বে ফুলে উঠল। সবাই যখন বলল-“কী রে তোর মেয়ে তো মাস্টার হয়ে গেল। এবার আর তোর কোনো চিন্তা নেই।"

প্রতিমাও তার স্বামীকে বলল-“কী গো যে মেয়ে হতে তুমি কষ্ট পেয়েছিলে আর সেই মেয়েই তোমার মান রাখল বলো?"

শাশুড়িও নিজের ভুল বুঝতে পারল। মেয়ের সাফল্য দেখে প্রতিমার চোখেও জল চলে এল। সে নিজের মনে মনে ভাবল-“হে ভগবান তুমি আছ, তুমি আছ ভগবান। যেটা আমি পাইনি আমার মেয়েকে তা আমি দিতে পেরেছি। হে ভগবান, আমি পেরেছি, আমি পেরেছি একজন মা একজন প্রকৃত মা হতে পেরেছি ভগবান আমি পেরেছি। যে কষ্ট আমি পেয়েছি সেই কষ্ট আমি আমার মেয়েকে পেতে দিইনি, আমি তাকে মানুষের মতো মানুষ করে তুলেছি।" এইবলে সে কাঁদতে লাগল।

বহু কষ্ট, বহু দুঃখ, বহু অপমান, লাঞ্ছনা সহ্য করে প্রতিমা মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে, যেটা তার মা করতে পারেনি। আজ যদি প্রতিমার মাও এভাবে ঘুরে দাঁড়াত তাহলে হয়তো প্রতিমাকে এত কষ্ট সহ্য করতে হত না। সেও হয়তো কলির মত প্রতিষ্ঠিত হতে পারত। কিন্তু তাই বলে সে নিজে পায়নি বলে মেয়েও সেই একই কষ্ট পাবে প্রতিমা তা চায়নি। তাই সবার সঙ্গে লড়াই করে প্রতিমা মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করে তুলেছে। যাতে কেউ তাকে অপমান করতে না পারে। প্রতিমা নিজে বাবার ভালোবাসা না পেলেও তার মেয়েকে সে বাবার আদর, স্নেহ, ভালবাসা পাইয়ে দিয়েছে। সে যথার্থই কলির একজন যোগ্য মা হয়ে উঠতে পেরেছে। সে সমাজের সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে মেয়ে মানেই শুধুমাত্র যে বাবার বোঝা বা সমাজের বোঝা তা নয়। একটা মেয়েও পারে বাবার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সব সামলাতে। আজ প্রতিমা এত কষ্ট, এত লাঞ্ছনা, এত দুঃখ সহ্য করেও পেরেছে ছেলে মেয়ে দুজনকেই প্রতিষ্ঠিত করতে। স্বামীকেও বুঝিয়ে দিয়েছে যে মেয়ে মানেই শুধু বোঝা নয় সেই মেয়েও পারে বাবার মুখ উজ্জ্বল করতে।

অতীতের এইসব কথা ভাবতে ভাবতে প্রতিমার চোখে জল চলে এল। মা নামক শব্দের মধ্যে যে কোমলতা, যে সরলতা এবং যে মাধুর্য আছে তা আজ প্রতিমার চোখের জলের মধ্যে ফুটে উঠল। কিন্তু আজ তার এই চোখের জল কষ্টের নয়, এত বছর ধরে সে যে কষ্ট পেয়েছিল সেই কষ্ট আজ আনন্দের অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ছে। আজ প্রতিমা সত্যিই খুব আনন্দে আছে।

Post a Comment

0 Comments