জ্বলদর্চি

মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধে বিশ্ব দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধে বিশ্ব দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ১৭ই জুন, মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধে বিশ্ব দিবস। মরুকরন ও খরা বলতে কি বুঝি, এর প্রতিরোধে বিশ্ব দিবসে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, আসুন সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।

মরুকরণ, এটি এমন একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে উর্বর বা উৎপাদনশীল ভূমি ধীরে, ধীরে অনুর্বর হয়ে মরুভূমির মতো পরিবেশে পরিণত হয়,এটি সাধারণত শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক অঞ্চলে ঘটে থাকে এবং বনভূমি ধ্বংস, অতিরিক্ত চারণ বা ভুল চাষাবাদের মতো মানবসৃষ্ট কারণে এটি ত্বরান্বিত হয়।

খরা,এটি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি বা অস্বাভাবিক শুষ্ক আবহাওয়া, এটি সাময়িক। খরা যেকোনো জলবায়ু অঞ্চলে ঘটতে পারে এবং বৃষ্টিপাত শুরু হলে তা কেটে যায়।
🍂
প্রতি বছর ১৭ই জুন বিশ্বব্যাপী ‘মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধে বিশ্ব দিবস’ পালন করা হয়। পরিবেশ সংরক্ষণ, ভূমির সুষ্ঠু ব্যবহার এবং খরার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই দিবসের সূচনা করা হয়। ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এই দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করে আসছে।
মরুকরণ করা খরা পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত এবং উভয়ই মানবজীবন, কৃষি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।
বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মরুকরণ ও খরার প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের বহু অঞ্চলে কৃষিজমি উর্বরতা হারাচ্ছে এবং জলের সংকট তীব্রতর হচ্ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ আবাদযোগ্য জমি মরুকরণের শিকার হচ্ছে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো এই সমস্যার কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া দেশগুলো মরুকরণ ও খরার প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুর অঞ্চলে প্রায়ই খরা দেখা যায়। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জলের উত্তোলন, বনাঞ্চল ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব অঞ্চলে জলের সংকট বাড়ছে। ফলে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে নদী, খাল ও জলাশয়ের জল কমে যাওয়ায়, জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মরুকরণ ও খরার ফলে শুধু কৃষি নয়, সামগ্রিক অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষকরা ফসল উৎপাদনে ব্যর্থ হলে, তাদের আয় কমে যায় এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়। অনেক মানুষ জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হয়, ফলে নগরায়ণের চাপ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া জলের অভাব স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় এবং সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই এই সমস্যাকে কেবল পরিবেশগত নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত,ব্যাপক বৃক্ষরোপণ এবং বন সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। গাছ মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং ভূমিক্ষয় রোধ করে। দ্বিতীয়ত, টেকসই কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে, যাতে মাটির উর্বরতা বজায় থাকে। তৃতীয়ত, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জলের অপচয় রোধের মাধ্যমে জলসম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন।
এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে সচেতন করা যে ভূমি ও জল আমাদের অমূল্য সম্পদ। এগুলোর সঠিক ব্যবহার না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় সংকট সৃষ্টি হবে। তাই সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তিগত পর্যায়েও দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।
 মরুকরণ ও খরা আজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যা। এই সমস্যা মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। ‘মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধে বিশ্ব দিবস’ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা মানবজাতির টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য। একটি সবুজ, নিরাপদ ও ভবিষ্যৎ গড়তে সবাইকে পরিবেশ সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে হবে।

Post a Comment

0 Comments