পর্ব- ৮
কমলিকা ভট্টাচার্য
দুই আদর্শের ছায়া
লন্ডনের সেই ঘটনার পর থেকে আদরের চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ বদলে গেল।
আগে যে রাস্তা দিয়ে সে নিশ্চিন্তে হাঁটত, এখন সেখানে হাঁটার সময় বারবার পিছনে তাকায়।
ক্যাফের কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখলেও তার মনে হয় কেউ যেন নজর রাখছে।
রাতের বৃষ্টিভেজা রাস্তায় কোনো কালো গাড়ি ধীরে গেলে বুকের ভিতর কেমন ঠান্ডা হয়ে আসে।
কিন্তু আশ্চর্যভাবে—নিজের জন্য তার ভয় লাগছিল না।
তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল।
নোয়া কথা বলেছে।
সত্যিই বলেছে।
সেই অসম্পূর্ণ, কাঁপা উচ্চারণ যেন তার গবেষণার সমস্ত ব্যর্থতাকে এক মুহূর্তে অর্থ দিয়ে দিয়েছে।
সেদিন গভীর রাতে সে ভিডিও কলে অনির্বাণদের সব ঘটনা জানায়।
দেশের বাড়িতে তখন ভোর।
জানলার বাইরে হালকা আলো ফুটছে।
ঋদ্ধিমান খুব চুপচাপ শুনছিল।
নাতাশার মুখে উদ্বেগ।
ইরা বারবার আঁচল মুঠো করে ধরছিল।
সব শুনে অনির্বাণের মুখ শক্ত হয়ে যায়।
“তোর উপর গুলি চলেছে আর তুই এতক্ষণ পরে বলছিস?”
আদর একটু হেসে বলল,
“গুলিটা তো লাগেনি।”
“লাগতে পারত!” — ইরার গলা কেঁপে উঠল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঋদ্ধিমান ধীরে বলল,
“তুই দেশে ফিরে আয়, আদর।”
ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
আদর অনেকক্ষণ কিছু বলে না।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলে,
“আমি এখন ফিরতে পারব না আংকেল।”
অনির্বাণ অবাক হয়ে তাকায়।
“কেন?”
আদর জানলার দিকে তাকিয়ে ছিল। বাইরে কুয়াশার ভিতর লন্ডনের আলো ঝাপসা।
“কারণ এখানে আমার কাজ শেষ হয়নি।”
তার গলায় এবার অদ্ভুত দৃঢ়তা।
“পিলোকে আমি বাঁচাতে পারিনি। কিন্তু বাকিদের জন্য আমি থামতে পারব না। নোয়া এখন কথা বলতে শিখছে। লিয়াম হাঁটছে। আমি যদি এখন ফিরে যাই, সব থেমে যাবে।”
🍂
ইরা কাঁপা গলায় বলল,
“তোর জীবনটার দাম নেই?”
আদর মৃদু হেসে বলল,
“আমার জীবনটাই তো এই কাজ, যশোদা মা।”
ঋদ্ধিমান গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।
“ঠিক আছে। তুই ওখানেই থাক।”
সবাই অবাক হয়ে তাকায়।
ঋদ্ধিমান এবার সামনে ঝুঁকে বলে,
“আরেক ‘তুই’ এখানে থাকবে।”
আদর প্রথমে বুঝতে পারে না।
“মানে?”
অনির্বাণ আর নাতাশা একে অপরের দিকে তাকায়।
অনেকদিন ধরে লুকিয়ে রাখা একটা সত্যি আজ বলার সময় এসেছে।
ঋদ্ধিমান খুব ধীরে বলে,
“তোর একটা প্রোটোটাইপ আছে, আদর।”
কথাটা শুনে আদর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে।
তারপর চোখ বড় হয়ে যায়।
“কি??”
নাতাশা হেসে ফেলল।
“তুই যখন ছোট ছিলি, তখন থেকেই অনির্বাণ আর ঋদ্ধিমান একটা ব্যাকআপ হিউম্যানয়েড তৈরি করছিল।”
অনির্বাণ এবার বলল,
“পুরোপুরি রোবট না। বায়ো-সিন্থেটিক নিউরাল স্ট্রাকচার। তোর মুখের গঠন, হাঁটার ভঙ্গি, কিছু ব্যবহার—সব দিয়ে।”
আদর হতভম্ব।
“মানে… আমার মতো দেখতে একটা… আমি আছে?”
ঋদ্ধিমান হালকা গলায় বলল,
“হ্যাঁ। আর ও এখন অনেকটাই স্থিতিশীল।”
কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতার পর হঠাৎ আদর চিৎকার করে উঠল—
“গ্রেট আংকেল!”
ইরা চমকে উঠল।
আদর প্রায় হেসে গড়িয়ে পড়ছে।
“এবার সবাই ভাববে আমি দেশে ফিরে গেছি!”
ঋদ্ধিমানও হেসে ফেলল।
“ঠিক তাই।”
তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
“কিন্তু এরপর থেকে বাইরে বেরোনো খুব সাবধানে করতে হবে। ওরা যদি বুঝে যায় আসল আদর এখনও লন্ডনে আছে, তাহলে আরেকবার আক্রমণ হবেই।”
আদরের চোখে এবার একটু চিন্তা ফুটে ওঠে।
“ওরা এতদূর যেতে পারে?”
ঋদ্ধিমান শান্ত স্বরে বলল,
“যারা মানুষের মস্তিষ্ককে অস্ত্র বানাতে চায়, তারা সবকিছু করতে পারে।”
ঘরটা আবার নীরব হয়ে যায়।
পরদিন সন্ধ্যায় আদর দৃষ্টিদের বাড়ির দিকে হাঁটছিল।
শীতের বাতাসে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো কুয়াশার ভিতর ঝাপসা হয়ে ছিল।
কোণের বেকারি থেকে গরম ব্রেডের গন্ধ আসছিল।
রাস্তার পাশে একজন স্যাক্সোফোন বাজাচ্ছিল ধীরে।
আজ আদরের মন অদ্ভুত ভারী।
দৃষ্টি তাকে দরজার শব্দেই চিনে ফেলল।
“আজ তোমার হাঁটার শব্দটা কেমন যেন অন্যরকম।”
আদর হেসে ফেলল।
“তুমি সব বুঝে যাও?”
দৃষ্টি বলল,
“কিছু মানুষকে চোখ ছাড়াও দেখা যায়।”
কথাটা শুনে আদরের বুক কেমন কেঁপে ওঠে।
সে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে।
তারপর ধীরে বলে,
“আমায় হয়তো কিছুদিনের জন্য ইন্ডিয়া ফিরতে হবে।”
দৃষ্টির মুখ থমকে যায়।
হাওয়াটাও যেন একটু থেমে যায়।
“ফিরে যাবে?”
আদর খুব আস্তে মাথা নাড়ে।
“হয়তো। কিন্তু আমি আবার আসব।”
দৃষ্টি কিছু বলে না।
শুধু আঙুল দিয়ে ভায়োলিনের বাক্সটা ছুঁয়ে থাকে।
আদর এবার তার দিকে একটু এগিয়ে এসে বলে,
“আমি যেদিন ফিরব… সেদিন তোমাকে একটা জিনিস দেখাব।”
“কি?”
আদরের গলায় অদ্ভুত কোমলতা নেমে আসে।
“তোমার নিজের চোখে আমার দেওয়া ছবিটা।”
দৃষ্টির ঠোঁট কেঁপে ওঠে।
সে বুঝতে পারে না কেন তার চোখ ভিজে আসছে।
আদর ধীরে বলে,
“আমি তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে আনব।”
কথাটা এত শান্তভাবে বলল ,যে সেটা কোনো স্বপ্ন মনে হয়নি।
মনে হচ্ছিল—এ যেন একটা প্রতিশ্রুতি।
দৃষ্টি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকে।
তারপর খুব আস্তে বলে,
“আমি অপেক্ষা করব।”
এদিকে কয়েকদিন পর অনির্বাণ লন্ডনে পৌঁছায়।
বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল।
পাথরের দেয়াল বেয়ে জল নেমে আসছিল ধীরে।
প্রফেসর হ্যারিসন নিজে দরজায় এসে তাকে অভ্যর্থনা করেন।
অনির্বাণের পরিচয় জানার পর সবাই প্রায় বিস্মিত।
কারণ আধুনিক নিউরাল সায়েন্স-এর জগতে অনির্বাণ সেন নামটা অনেকটাই কিংবদন্তির মতো।
একটা কনফারেন্স রুমে বসে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
লিয়ামের প্রজেক্ট, নোয়ার ভোকাল ডিভাইস, অ্যাডাপটিভ প্রস্থেটিক—সবকিছু নিয়ে।
প্রফেসর হ্যারিসন অবাক হয়ে বলেছিলেন,
“আমরা ভেবেছিলাম আদর্শ শুধু অসাধারণ মেধাবী। এখন বুঝছি ।”
অনির্বাণ চুপচাপ হাসল।
“ওকে কখনও জিনিয়াস ভাববেন না।”
“তাহলে?”
“ও খুব গভীরভাবে মানুষ।”
কথাটা শুনে ঘরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এসেছিল।
এরপর ইউনিভার্সিটি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হয়।
সিকিউর ল্যাব অ্যাক্সেস।
প্রাইভেট থাকার ব্যবস্থা।
মুভমেন্ট মনিটরিং।
সব ব্যবস্থা করা হয়।
কিন্তু অনির্বাণ জানত—এগুলো যথেষ্ট নয়।
কারণ বিপদটা শুধু বাইরে নেই।
বিপদটা মানুষের লোভে।
সেই রাতে হোস্টেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আদর লন্ডনের আলো দেখছিল।
দূরে টেমস নদীর উপর আলো কাঁপছিল।
তার ফোনে একটা ছবি আসে।
তার বাড়ি।
সোফায় বসে আছে—আরেক আদর।
একই মুখ।
একই হাসি।
শুধু চোখদুটো একটু বেশি নিস্তব্ধ।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে আদর অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে।
তারপর ধীরে বলে ওঠে—
“অদ্ভুত না আংকেল… মানুষ নিজেকে লুকোতে গিয়ে নিজের আরেকটা সংস্করণ তৈরি করে ফেলে।”
ঋদ্ধিমান ফোনের ওপার থেকে শান্ত গলায় বলল,
“কখনও কখনও বাঁচতে গেলে ছায়াও দরকার হয়, আদর।”
রাত আরও গভীর হয়।
একই শহরের দুই প্রান্তে তখন দুজন মানুষ জানলার পাশে বসে।
আদর তার ছোট্ট বারান্দায়।
সামনে কুয়াশায় ভেজা লন্ডন।
দৃষ্টি তার ঘরের অন্ধকারে।
জানলার বাইরে হালকা তুষার পড়ছে।
দুজনের হাতেই ভায়োলিন।
কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না।
তবু দুজনেই জানে—অপরজন জেগে আছে।
আদর খুব ধীরে সেই পুরোনো সুরটা তোলে।
যে সুর প্রথম তাকে দৃষ্টির কাছে নিয়ে গিয়েছিল।
কয়েক সেকেন্ড পর দৃষ্টির ঘর থেকেও একই সুর ভেসে ওঠে।
দুই আলাদা রাস্তা।
দুই আলাদা নিঃসঙ্গতা।
তবু সুরগুলো মাঝখানের শহরটাকে পেরিয়ে এক হয়ে যায়।
লন্ডনের কুয়াশা, টেমসের জল, দূরের আলো—সবকিছুর ভিতর দিয়ে সেই সুর ভেসে বেড়াতে থাকে।
হয়তো ভালোবাসা ঠিক এভাবেই জন্মায়।
কোনো প্রতিশ্রুতিতে নয়।
কোনো স্পর্শে নয়।
শুধু এক অদ্ভুত অনুভবে—
যেখানে দুজন মানুষ অনেক দূরে থেকেও একই সুরে বাঁধা পড়ে যায়।
7 Comments
বাহ! সুন্দর এগোচ্ছে গল্প। কল্পবিজ্ঞান ,মানবিকতা হাতে হাত ধরে হাঁটছে লন্ডনে। লন্ডনের ডেটালিং বেশ ভালো। গল্পে গতিও আছে। অপেক্ষায় রইলাম।
ReplyDeleteডিটেলিংহবে, ভুল টাইপের জন্য দুঃখিত।
Deleteএইভাবে উৎসাহ দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।🙏
Deleteবেশ লাগছে গল্পটা
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ।আগের মাসে প্রথম আট দিন নেক্সট খণ্ড পড়ার অনুরোধ রইল। 🙏
Deleteআদর কি মানুষের নাম হয়?
ReplyDeleteকেন হবেনা,ভালোবেসে ডাকলেই হয়।😍
ReplyDelete