জ্বলদর্চি

শরগাছ/ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১২৮
শরগাছ

ভাস্করব্রত পতি

'পঞ্চশরে বিন্ধ ক'রে ক'রেছ একি সন্ন্যাসী, বিশ্বময় দিয়েছো তারে ছড়ায়ে!'
  -- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তবে এই 'শর' (অর্থাৎ বাণ) আমাদের আলোচিত 'শর' (শরগাছ) নয়। বরং অথর্ববেদে উল্লিখিত শ্লোকে শরগাছের বিবরণে পাই --
'সুপর্ণং দ অস্য সন্নদ্ধঃ প্রসূতঃ পততিশরঃ।
নরঃ তত্রাস্মভ্যং ইযবঃ শর্ম দধাতি গোভিঃ ভ্রান্তিম্।।' (অথর্ববেদ / বৈদ্যককল্প /১৬/৪২/১৭৩) 
আবার চরকের বিমানস্থানের অষ্টম অধ্যায়ের ১৬০ গুচ্ছে শরগাছকে মধুর রসপ্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি 'আস্থাপন' কাজের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। চরকের সূত্রস্থানে এই প্রসঙ্গে বলা হয়েছে --
'শরীরাং আস্থাপয়ন্তি দোষসংশোধনেন স্থিরং কুর্বন্তি যানিদ্রদ্র্যব্যানি।'
অর্থাৎ যে দ্রব্য শরীরের দোষ বা বিকার দূর করে এবং শরীরকে শুদ্ধ করে, তাকেই 'আস্থাপন' বলে। আস্থাপন হল একপ্রকার বাতব্যাধি। আর শরগাছ সেই আস্থাপনের অন্যতম উপযোগী। তেমনি সূশ্রুতের সূত্রস্থানের ৩৮ তম অধ্যায়েও এই শরগাছকে বাতবিকার দূরীকরণে খুবই উপযোগী বলে জানানো হয়েছে। 

মোটামুটি ২-৩ ফুট (০.৬১ - ০.৯১ মিটার) উচ্চতার হয়। মূলতঃ ভারতীয় গণ্ডার এবং পিগমি হগের প্রিয় খাদ্য। এদের কাণ্ডে অনেক পর্ব থাকে। পাতাগুলি ৩ - ৪ ফুট লম্বা ও ১.৫ ইঞ্চি পর্যন্ত চওড়া হয়। লিকলিকে পাতার অগ্রভাগ ক্রমশঃ সরু হয়। দেহের বলবর্ধনে, তৃষ্ণা রোগে, প্রস্রাবের কষ্টে, মন্দাগ্নিতে, বিস্মৃতি রোগের উপশমকারী হিসেবে ব্যবহৃত হয় এই শরগাছ। 

শরগাছ হল খড়ি বা বেনা জাতীয় গাছ। এই শরকাঠি অবশ্য এদের মতাে ততটা সহজলভ্য নয়। খড়িগাছের মতােই দেখতে শরগাছ। ক্ষুরিকাপত্র, পােটগল, মৃদুপত্র, কীচক, মৃদুপঠ, নাড়ী, শতপর্বা, নালবংশ, তৃণধ্বজ, সায়ক, ইক্ষুর, ইক্ষু, বিশিখ, উৎকট, বাণ, বংশপত্র নামেও পরিচিত শরগাছ। তেলুগুতে গুন্দ্র, সংস্কৃতে বাণ, শর, ইক্ষুর, মারাঠিতে সারন এবং হিন্দিতে কাঁড়া বলে। Poaceae পরিবারের অন্তর্গত শর বা খাগড়ার বিজ্ঞানসম্মত নাম Saccharum bengalense। এছাড়াও এই গাছের অন্যান্য যেসব প্রজাতির দেখা মেলে, সেগুলি হল --
Erianthus bengalensis 
Erianthus ciliaris 
Erianthus elegans 
Erianthus munja 
Erianthus sara 
Imperata sara 
Ripidium bengalense 
Saccharum sara
Saccharum munja
Saccharum bengalense 
Saccharum ciliare 
Saccharum elegans  
Tripidium bengalense

নদীর ধারে বা পতিত জমিতে জন্মায়। কাশফুলের মতো দেখতে এদের সাদা সাদা ফুল ফোটে। শরের মতো আরেকটি গাছ আছে। তাকে খড়ি (Saccharum fuscum) বলে। ব্রাহ্মণদের পৈতের সময় শরের পাতা দরকার হয়। নদীর ধারে এবং পতিত জমিতে জন্মায়। বিভিন্ন পূজাদিতে শরকাঠি ব্যবহার করেন ব্রাহ্মণগণ। এই শরগাছের নামেই সৃষ্ট গ্রামনাম সরবেড়িয়া, শরপাল ইত্যাদি।
শর + বেড়িয়া > শরবেড়িয়া > সরবেড়িয়া 
শর + পাল > শরপাল।

🍂

Post a Comment

0 Comments