জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার: ষষ্ঠ খণ্ড /পর্ব ৬ /কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার: ষষ্ঠ খণ্ড 
পর্ব ৬ 
কমলিকা ভট্টাচার্য 

কৃত্রিম আলোর ভিতরে

লন্ডনের শীত আরও ঘন হয়ে এসেছে।
রাত নামলেই শহরটার গায়ে যেন নীলচে কুয়াশার আস্তরণ পড়ে।
টেমসের জল কালো কাঁচের মতো স্থির হয়ে থাকে।
রাস্তার দু’পাশে ক্রিসমাস লাইট ঝুলছে, আর ভিজে পাথরের রাস্তায় সেই আলো পড়ে রঙিন ছায়া তৈরি করছে।
কিন্তু এই সুন্দর শহরের মাঝেও আদরের রাতগুলো এখন অন্যরকম।
সে আর ঠিকমতো ঘুমোয় না।
দিনে কলেজ।
বিকেলে দৃষ্টিদের বাড়ি।
আর গভীর রাতে—ল্যাব।
ইউনিভার্সিটি রিসার্চ ল্যাবের এক কোণে এখন প্রায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে আদর।
টেবিল জুড়ে সার্কিট বোর্ড, নিউরাল সেন্সর, পলিমার টিস্যু স্যাম্পল, থ্রিডি প্রিন্টেড স্কেলেটাল ফ্রেম, অসংখ্য স্কেচ।
কখনও মনিটরের আলোয় তার মুখ নীল হয়ে থাকে।
কখনও জানলার পাশে দাঁড়িয়ে সে নোটবুকে অ্যানাটমি আঁকে।
কখনও রাত তিনটেয় কফি মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাঙ্ক হয়ে যায়।
কারণ এখন তার মাথার ভিতরে একটা কথাই ঘুরছে—
“মানুষের শরীর কি আবার নতুন করে জন্ম নিতে পারে?”
লিয়ামের মুখটা তার মাথা থেকে সরছিল না।
হুইলচেয়ারে বসে থাকা সেই ছেলেটা সবসময় হাসত।
কিন্তু আদর লক্ষ্য করেছিল—অন্য বাচ্চারা দৌড়ালে লিয়াম চুপ করে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকে।
একদিন আদর খুব স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞেস করেছিল,
“তুমি যদি একটা জিনিস চেঞ্জ করতে পারতে… কী করতে?”
🍂
লিয়াম একটু চুপ করে থেকে বলেছিল,
“আই জাস্ট ওয়ান্ট টু রান ওয়ান্স।”
সেই রাতেই আদর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
সে লিয়ামের জন্য আর্টিফিশিয়াল লেগ তৈরি করবে।
তবে সাধারণ প্রস্থেটিক নয়।
এমন কিছু—যেটা শরীরের অংশ হয়ে যাবে ধীরে ধীরে।
পরের কয়েক সপ্তাহ আদর যেন পুরো পৃথিবী ভুলে যায়।
সে বায়োমেকানিক্স ল্যাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়।
প্রফেসর হ্যারিসন একদিন গভীর রাতে এসে দেখে আদর এখনও কাজ করছে।
টেবিলের উপর ছড়িয়ে আছে নিউরাল কন্ডাক্টিভিটি গ্রাফ।
প্রফেসর অবাক হয়ে বলেন,
“আদর্শ… ডু ইউ ইভেন স্লিপ?”
আদর মনিটর থেকে চোখ না সরিয়েই বলে,
“স্লিপ ওয়েস্টস প্রসেসিং টাইম, স্যার।”
প্রফেসর হেসে ফেললেও তার চোখে বিস্ময় ছিল।
কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন—এই ছেলেটার মাথা সাধারণ নয়।
আদরের তৈরি ডিজাইনটা রেভলিউশনারি ছিল।
সাধারণ আর্টিফিশিয়াল লিম্ব শুধু মেকানিক্যাল মুভমেন্ট দেয়।
কিন্তু আদরের মডেল সেন্সরি অ্যাডাপটিভ।
এতে ন্যানো-নিউরাল মেশ ব্যবহার করা হয়েছে, যা ধীরে ধীরে বডি নার্ভ-এর সঙ্গে সিনক্রোনাইজ করবে।
প্রথমে আর্টিফিশিয়াল হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা শরীরের স্বাভাবিক অঙ্গের মতো বিহেভ করবে।
পেইন রেসপন্স।
ব্যালেন্স কারেকশন।
মাসল মেমোরি অ্যাডাপটেশন।
সবকিছু।
প্রফেসর হ্যারিসন ব্লুপ্রিন্ট দেখে অনেকক্ষণ চুপ ছিলেন।
তারপর ধীরে বলেছিলেন,
“দিস… দিস ইজ ডিকেডস অ্যাহেড।”
আদর শুধু বলেছিল,
“আই ডোন্ট ওয়ান্ট পারফেকশন, স্যার।
আই জাস্ট ওয়ান্ট লিয়াম টু ওয়াক।”
এদিকে দৃষ্টি বুঝতে পারছিল আদর বদলে যাচ্ছে।
আগে সে ভায়োলিন নিয়ে কথা বলত বেশি।
এখন সায়েন্স নিয়ে কথা বলে।
আগে আকাশ দেখত।
এখন মানুষের শরীরের ভিতরের নেটওয়ার্ক নিয়ে ভাবে।
এক সন্ধ্যায় দৃষ্টি খুব আস্তে বলেছিল,
“তুমি নিজেকে খুব বেশি ক্লান্ত করে ফেলছ।”
আদর হেসেছিল।
“কিছু জিনিস আছে যেগুলো না করলে শান্তি পাওয়া যায় না।”
দৃষ্টি চুপ করে তার মুখ আদরের বুকে ছুঁয়ে বলেছিল,
“তুমি যখন সায়েন্স-এর কথা বলো… তোমার হার্টবিট বদলে যায়।”
আদর অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
দৃষ্টি হেসে বলেছিল,
“আই ক্যান হিয়ার পিপল ডিফারেন্টলি।”
সেদিন হালকা বৃষ্টি পড়ছিল।
দু’জনে একটা পুরোনো ব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।
দৃষ্টি ভায়োলিন বাজাচ্ছিল খুব আস্তে।
আর আদর নোটবুকে আর্টিফিশিয়াল জয়েন্ট স্ট্রাকচার আঁকছিল।
দৃষ্টি হেসে বলেছিল,
“তুমি রোম্যান্টিক না সায়েন্টিস্ট, বুঝতে পারি না।”
আদর বলেছিল,
“হয়তো দুটোরই একটু ব্রোকেন ভার্সন।”
দৃষ্টি অনেকক্ষণ হেসেছিল।

কিন্তু এর মধ্যেই অন্য কিছু ঘটছিল।
অনির্বাণ আর ঋদ্ধিমান লুকিয়ে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।
অনেকদিন হিউম্যানয়েড প্রজেক্ট বন্ধ ছিল।
কিন্তু এখন তারা আবার সিক্রেটলি কাজ শুরু করেছে।
কারণ তারা জানত—আদর যত বড় হচ্ছে, তত বিপদও বাড়ছে।
হিউম্যানয়েড আদরের নতুন ভার্সন তৈরি হচ্ছিল।
আগের চেয়ে অনেক বেশি অ্যাডভান্সড।
তার ওয়াকিং প্যাটার্ন, ভয়েস মডুলেশন, আই মুভমেন্ট—সব রিয়েল আদরের মতো।
নাতাশা একদিন মনিটর দেখে ধীরে বলেছিল,
“এটা ডেঞ্জারাস হয়ে যাচ্ছে।”
ঋদ্ধিমান শান্ত গলায় বলেছিল,
“ডেঞ্জার অলরেডি এক্সিস্টস।”
তবে আরও অদ্ভুত কিছু ঘটছিল।
বাড়ির আশেপাশের নেটওয়ার্ক মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক বিহেভ করছিল।
সিসিটিভি হঠাৎ গ্লিচ করছে।
সার্ভার সিগন্যাল কয়েক সেকেন্ডের জন্য ডিসঅ্যাপিয়ার করছে।
আননোন পিং আসছে এনক্রিপ্টেড চ্যানেল থেকে।
অনির্বাণ প্রথমে বিষয়টা ইগনোর করেছিল।
কিন্তু একদিন রাত দুটোয় পুরো হাউস অটোমেশন সিস্টেম একসঙ্গে ফ্লিকার করে ওঠে।
আর স্ক্রিনে মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য একটা সিম্বল ভেসে ওঠে।
অনির্বাণের বুক ঠান্ডা হয়ে যায়।
ঋদ্ধিমান অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
তারপর খুব আস্তে বলেছিল,
“দে আর সার্চিং এগেইন।”

এদিকে লন্ডনে আদরের প্রজেক্ট শেষের দিকে।
লিয়ামের জন্য তৈরি আর্টিফিশিয়াল লেগ এখন ফাইনাল টেস্টিং ফেজ-এ।
ল্যাবের সবাই উত্তেজিত।
টেস্টিং ডে-র সকালে বাইরে হালকা স্নো পড়ছিল।
ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল উইং-এর একটা ছোট রুম প্রস্তুত করা হয়েছে।
গ্লাস ওয়ালের বাইরে রিসার্চাররা দাঁড়িয়ে।
প্রফেসর হ্যারিসন নার্ভাস হয়ে হাঁটছেন।
আর ভিতরে লিয়াম বসে আছে শান্ত মুখে।
তার ছোট্ট হাতটা শক্ত করে ধরে আছে দৃষ্টি।
আদর ইকুইপমেন্ট চেক করছে।
তার চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
দৃষ্টি ধীরে বলে,
“ আর ইউ ওকে?”
আদর ছোট্ট করে মাথা নাড়ে।
কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার হাত কাঁপছিল।
কারণ সে জানত—আজ ফেল করলে শুধু এক্সপেরিমেন্ট ফেল করবে না।
একটা শিশুর বিশ্বাস ভেঙে যাবে।
প্রসিডিউর শুরু হয়।
ন্যানো-নিউরাল কানেক্টর অ্যাটাচ করা হয়।
মনিটরে নার্ভ সিগন্যাল উঠতে শুরু করে।
সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে।
প্রথমে কিছু হয় না।
তারপর—
লিয়ামের আঙুল নড়ে।
প্রফেসর হ্যারিসন এগিয়ে আসেন।
আর কয়েক সেকেন্ড পরে—
লিয়ামের পা ধীরে মেঝে স্পর্শ করে।
সে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।
দৃষ্টি কান্না চেপে রাখছে।
আদরের বুক ধুকপুক করছে।
আর তারপর—
লিয়াম দাঁড়িয়ে যায়।
নিজের পায়ে।
ঘরের ভিতর মুহূর্তের জন্য কেউ কথা বলতে পারে না।
লিয়াম নিজেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
সে এক পা ফেলে।
তারপর আরেক পা।
তারপর হঠাৎ দৌড়ে আদরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে।
“আই’ম ওয়াকিং… আই’ম ওয়াকিং…”
প্রফেসর হ্যারিসন চুপচাপ চশমা খুলে ফেলেন।
কারণ তার নিজের চোখও ভিজে গেছে।
পরের কয়েকদিন ইউনিভার্সিটিতে তোলপাড় পড়ে যায়।
সবাই জানতে চায় এই ইনভেনশন কার।
কিন্তু আদর সরাসরি প্রফেসরকে বলে দেয়—
“প্লিজ স্যার… আমার নাম যেন কোথাও না থাকে।”
প্রফেসর বিস্মিত।
“হোয়াই? ডু ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট দিস ক্যান চেঞ্জ?”
আদর খুব শান্ত গলায় বলে,
“সাম ডিসকভারিজ নিড প্রোটেকশন বিফোর রিকগনিশন।”
প্রফেসর অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
তারপর ধীরে মাথা নাড়েন।
তিনি বুঝেছিলেন—এই ছেলেটার ভিতরে শুধু প্রতিভা নেই।
কোনো গভীর ভয়ও আছে।

সেই রাতে দৃষ্টি আর আদর টেমসের ধারে বসেছিল।
লন্ডনের আলো নদীর জলে ভেঙে পড়ছে।
দৃষ্টি আস্তে জিজ্ঞেস করল,
“আজ তুমি হ্যাপি?”
আদর অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“আজ মনে হচ্ছে… সায়েন্স প্রথমবার আমার হাত ধরে হাঁটল।”
দৃষ্টি হেসে মাথা তার কাঁধে রাখে।
দূরে বিগ বেন-এর ঘণ্টা বাজছিল।
আর সেই মুহূর্তে আদর জানত না—
ঠিক তখনই পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে কেউ তার নাম আবার খুঁজতে শুরু করেছে।

Post a Comment

0 Comments