জ্বলদর্চি

আই.সি.ইউ/শুভদীপ মাইতি

আই.সি.ইউ
শুভদীপ মাইতি 

১.
অবচেতনে শুয়ে আছেন আপনজন।
শ্বাস, প্রশ্বাস অনুবাদ হচ্ছে মেশিনে

মনিটরের সবুজ রেখা,
মফস্বলের রাস্তা ছাড়িয়ে হারিয়ে যায়;
নদী, পাহাড়, অন্তবর্তী বৃষ্টিতে।

কাচের ওপারে ঢেউ ভাঙছে।
এপারে আছাড় খায় উৎকন্ঠার হৃৎপিণ্ড 

সাদা পায়রার মতো হেঁটে যায় নার্স।
স্যালাইনের প্রতিটি ফোঁটায় দুলে ওঠে,
বিগত জন্মের অদৃশ্য নৌকো।

ঈশ্বর ও যমের প্রতিনিধি হয়ে ডাক্তার আসেন।
তার স্টেথোস্কোপে আনন্দ এবং অশ্রু।
ভিজিটিং আওয়ার শেষের অপেক্ষায়;
মোচড় মারে ঘরের ভেতর ঘর।


২.
সবুজ নদীরা বয়ে যাচ্ছে ভেতরে

সময় এখানে ভীষণ চঞ্চল।
ধীরে ধীরে ঘুমের গভীরে নামে শরীর

রোগীর আত্মীয় স্বজনের ছায়া দেয়ালে লেগে,
হঠাৎ শৈশবের প্রাইমারি স্কুলের দিন হয়ে যায়।

ভেতরে জীবনরেখারা অনবরত পাহাড় আঁকে,
কখনো সমতল।
ভিনগ্রহের মহাকাশজানের মতো
আওয়াজ করে মেশিনেরা

স্মৃতিরা দীর্ঘ হলে,
কেউ কেউ নীরব হয়ে যান মূহুর্তে।

হাপিত্যেশে জেগে থাকে হারিয়ে ফেলার ভাঙন


৩.
ভেজা মাটিতে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মহাকাল।
কাচের জানালায় জমে ওঠা কুয়াশায়,
বিদ্যুৎ চমকালে স্পষ্ট হয়, অদৃশ্য চিঠির বার্তা।

চেয়ারে অপেক্ষায় থাকা ছায়ারা,
পাথর হয়ে গেলে,
শেষ আশাটুকু ভেঙে পড়ে সদ্যজাত কান্নায়।

যারা চলে যায়, তাদের শূন্যতার ধার,
জিরানকাটের মতো কেটে ফেলে দাগ

আসলে প্রতিটি সেলাই অচেতন নিদ্রার ভেতর,
ভেসে যেতে যেতে কখন যেন আলগা হয়ে যায়।


৪.
রাত এখানে ধীরে ধীরে জমে উঠলে,
অক্সিজেনের নরম স্রোতে ভাসে অদৃশ্য প্রার্থনা।

ঘড়ির কাঁটা শব্দ না করেও
বুকের ভেতর টিকটিক করে।
প্রতিটি সেকেন্ড যেন ধারালো অপেক্ষা

বিছানা চাদরে যখন লেগে থাকে,
অসমাপ্ত কথোপকথনের গল্প;
অস্পষ্ট গ্রহের মতো ঘুরতে থাকে অনিশ্চয়তার ফেরিঘাট।

দূরে কোথাও ভোরের আভাস ফুটলে
একফোঁটা আলো এসে পড়ে কপালে—
মনে হয়, এখনও কিছু বাকি আছে স্পন্দন 

জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে,
মায়া চরাচরময় জেগে থাকে একটি কক্ষপথ।

ক্রমশঃ সম্পর্কের চোরাবালিতে ডুবে যায় সমগ্র শরীর


৫.
কেউ কেউ ফিরে আসে।

যারা এখনো ফেরেনি,
তাদের ছড়িয়ে থাকা শ্বাসমূলে,
আছাড় খায় মানতের থান।

হরিদ্রাভ আমলকি কুড়িয়ে জড়ো করছেন যে লোকটি,
তিনি খানিক বাদেই ফিরে যাবেন অনন্তের পথে।

কেউ কেউ থেকে যায় নিঃশ্বাসের ওপারে।
মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ 

ভালোবাসা আঁকড়ে, স্মৃতি আঁকড়ে, নীরবতা...
এখানে প্রতিটি শরীরই এক একটি অস্থায়ী আশ্রয়।


৬.
এখানে সময়কে ছিঁড়ে দেয় দীর্ঘ প্রতীক্ষা 

প্রতিটি স্পন্দনে ধরা থাকে আলো ছায়া ভূমিজ শেকড়।

মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে শোক, তাপ,
নিদ্রাহীন, কষ্টাতীত খেদ।

সব যন্ত্র, সব রেখা, হিসেবের বাইরে চলে গেলে,
একটি অদৃশ্য সেতু হাত বাড়িয়ে ধরে রাখে পরস্পর।

ভেতরে যখন অবাঞ্ছিত বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে,
দরজার ওপারে জন্ম নেয় নতুন বিদায়ের সুর।


৭.
শুকিয়ে যাওয়া পুঁইলতার মতো,
নড়বড়ে গোড়া।
মৃত্যুর সামনে যেন ষষ্ঠাঙ্গে শুয়ে আছে

হিরণ্যজল ঢুকছে শিরায়।
যে সুর বাজে অন্তরালে,
তার একান্ন পিঠে ডুবে যাচ্ছে সূর্যাস্তের হাট।

বাহানা বানানোর দূপুরে পারাপার বন্ধ হলে রসুলপুরের ঘাটে,
পৃথিবী ছাপিয়ে এক পক্ষ বিষাদ আঁকে এই মার্চ মাস।


৮.
এখানে ঝলমলে রোদ থাকার বিস্তারিত সরঞ্জাম নেই।
স্মৃতির হেঁশেল থেকে ধানসিঁড়িটির পাড়ে,
পদচিহ্ন রেখে গেছেন আউল বাউল অনন্ত ফকির 

যৌথযাপন ছেড়ে পথভ্রষ্ট অক্ষরলতা।
যেদিকে দু'চোখ মেলে অপাপবিদ্ধ তৃতীয় পুরুষ।

সারিবদ্ধ শোক জেগে ওঠে।
অন্নজল ছুঁয়ে দেখেনি কেউ।
অনিবার্য ভাঙচুর ঠেলে,
সংক্রামক আয়ু জ্যোতিরেখা।

🍂

Post a Comment

0 Comments