পাকুড়
ভাস্করব্রত পতি
"এই চরে ওই হালটার কোনে বিঘে দুই ক্ষেত ভরি
বট ও পাকুড়ে দোঁহে ঘিরে ঘিরে করি আছে জড়াজড়ি।
গায়ের লোকেরা নতুন কাপড় তেল ও সিঁদুর দিয়া
ঢাক ঢোল পিটি গাছ দুইটির দিয়ে গেছে নাকি বিয়া।"
-- ময়নামতীর চর, বন্দে আলী মিঞা
আসলে গ্রামীণ লোকবিশ্বাস অনুযায়ী গ্রাম বাংলার বুকে একসময় বট এবং পাকুড় গাছকে দম্পতি তথা স্বামী স্ত্রী হিসেবে কল্পনা করে প্রতীকী বিয়ে দেওয়া হতো একসাথে। এ এক প্রাচীন রীতি। কবি বন্দে আলী মিঞা সেই লোকবিশ্বাসটিকেই তুলে ধরেছেন কবিতায়।
গেরস্থের বাড়ির সামনে অযত্নে জন্মেছে পাকুড়
গ্রামাঞ্চলে বেশি দেখতে পাওয়া যায় পাকুড়কে। অশ্বত্থ, বট গাছের সহোদর এই পাকুড় গাছকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ রীতি মেনে চলেন এই বাংলার বাসিন্দারা। সন্ধ্যেবেলায় পাকুড় গাছের তলায় সন্ধ্যা দেখানোর চল দেখা যায় অনেক হিন্দু পরিবারের মধ্যে। এটি একটি বৃক্ষ আরাধনার নিদর্শন বৈকি। যদিও ক্রমশঃ কমছে এই পাকুড় গাছের (বিজ্ঞানসম্মত নাম -- Ficus rumphi) সংখ্যা। এছাড়াও আরও যেসব প্রজাতি রয়েছে, তা হল --
Ficus infectoria
Ficus cordifolium (Roxb.)
Ficus populnea
Ficus populiformis
Ficus cordifolia (Roxb.)
Ficus conciliorum
Ficus damit
Urostigma rumphii
জীবন সায়াহ্ণে উপস্থিত পাকুড় গাছ।
মােরেসী (Moraceae) গােত্রভুক্ত পাকুড়কে প্লবগ, গর্দভাণ্ড, কপীতক, সুপার্শ্ব, শক্ষীরী, কপীতন নিজেও চেনা যায়। পাকুড়কে সংস্কৃতে প্লক্ষ, শৃঙ্গী, পর্কটী, তামিলে পেপরি, তেলুগুতে পসারি, হিন্দিতে পাকরি বলা হয়। শ্লোকে আছে 'পক্ষিকীটৈঃ প্লক্ষতে = ভুজ্যতে', অর্থাৎ যার ছোট গুটিযুক্ত ফল পক্ষী এবং কীটের দল ভক্ষণ করে। এছাড়া এর অভ্যন্তরে বসবাসও করে। তাই এর নাম 'প্লক্ষ'। পাকুড়ের আদি বাসস্থান ভারত সহ দক্ষিণ চিন, ইন্দো চিন, মালয়েশিয়া সহ বিভিন্ন দেশ। পাকুড়ের নামে সৃষ্ট অনেকগুলি 'পাকুড়িয়া', 'পাকুড়তলা' গ্রামনাম পাওয়া যাবে এরাজ্যে। পৃথিবীব্রতের ছড়াতে পাই এই পাকুড়ের কথা --
"বট আছেন, পাকুড় আছেন,
তুলসী আছেন পাটে।।
বসুধারা ব্রত করলাম তিন বৃক্ষের মাঝে।
মায়ের কুলে ফুল, বাপের কুলে ফল,
শ্বশুরের কুলে তারা।
তিন কুলে পড়বে জলগঙ্গার ধারা।
পৃথিবী জলে ভাসবে,
অষ্টদিকে ঝাঁপুই খেলবে।"
পাকুড়ের লম্বাটে পাতা
বেদব্যাসের রচনাতেও পাকুড়ের কথা পাই। তিনি মহাভারতের বনপর্বের ৬৩।৫ শ্লোকে কলিগ্রস্ত নিষধরাজ নল যখন বিদর্ভের রাজকন্যা দময়ন্তীকে ব্রাজিল মধ্যে একাকী নির্জনে ঘুমন্ত অবস্থায় ফেলে পালিয়ে গিয়েছিলেন যখন, তখন সেই বনরাজির মধ্যে আলোচিত হয়েছে পাকুড়ের নাম। এছাড়া সুশ্রুত, বাগ্ভট, চরকের লেখাতেও প্লক্ষ বা পাকুড়ের কথা পাই। রাজনিঘন্টু গ্রন্থে পাকুড়ের ২২ টি পর্যায় মেলে। পাকুড়ের সমার্থক 'প্লক্ষ' নামটি মেলে অথর্ববেদের বৈদ্যককল্পের ৬২।৭২।৭৯ নং সুক্তে --
'প্লক্ষ স্তং গ্রামে যদরণ্যে সভায়াং যদিন্দ্রিয়ে।
বয়মিদং অবযজামহে মরুতশ্চ রিশাদসঃ।'
এটি একটি বৃহদাকার বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ। বট, অশ্বত্থের মতোই এটি ক্ষীরীবৃক্ষ নামেও পরিচিত। এর কচি কান্ড ও পাতা ভাঙলে সাদা আভাযুক্ত রস বের হয়। পাকুড় হল ছায়াতরু। ছায়া প্রদানকারী উদ্ভিদ। 'হাট' কবিতায় যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত লিখেছেন পাকুড়গাছের শাখার কথা --
'নিশা নামে দূরে শ্রেণীহারা এক ক্লান্ত বকের পাখে,
মদীর বাতাস ছাড়ে প্রশ্বাস পার্শ্বে পাকুড় শাখে।
হাটের দোচালা মুদিল নয়ান,
কারো তরে তার নাহি আহ্বান,
বাজে বায়ু আসি বিদ্রুপ বাঁশি জীর্ণ বাঁশের ফাঁকে,
নির্জন হাটে রাত্রি নামিল একক কাকের ডাকে।'
পাকুড়ের পাতার অবয়ব অনেকটা অশ্বত্থের পাতার মতো। তবে অশ্বত্থের পাতা তাম্বুলাকার বা পান পাতার মতো। এদের পাতায় লেজ থাকে। যা অন্য গাছে দেখা যায় না। অশ্বত্থের পাতা চওড়া এবং লম্বা নয়। আর পাকুড়ের পাতা চওড়ায় কম, কিন্তু লম্বাটে। লেজ থাকে না। পাকুড়ের পাতার বোঁটা ২ - ৩ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। এই পাতার মধ্যে থাকে নাইট্রোজেন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, প্রোটিন ইত্যাদি। কবি বিনয় মজুমদার লিখেছেন --
'এখন পাকুড়গাছে সম্পূর্ণ নূতন পাতা,
তার সঙ্গে বিবাহিত এই
বটগাছে লাল লাল ফল ফলে আছে।
চারিদিকে চিরকাল আকাশ থাকার কথা,
আছে কিনা আমি দেখে নিই।'
-- এখন পাকুড় গাছে সম্পূর্ণ নতুন পাতা
অশ্বত্থ গাছে ঝুরি হয়না। কিন্তু পাকুড়ের হয়। অশ্বত্থের ফল পাকলে গাঢ় বেগুনি রঙের হলেও পাকুড়ের পাকা ফল কমলা রঙের হয়। এভাবেই অশ্বত্থের সঙ্গে পাকুড়ের পার্থক্য করা যায়। পাকুড় গাছের ফল গোলাকার এবং প্রায় বোঁটাবিহীন। এদের অন্তঃপুষ্প দেখা যায় ঠিক বর্ষার পরে। এবং তা পাকে শীতের শুরুতে।
বাগানের মধ্যে অনাদরে অবহেলায় পাকুড়ের বেড়ে ওঠা.....
পাকুড় গাছের বংশবিস্তার পদ্ধতি নির্ভর করে অন্য কীটপতঙ্গের ওপর। ফুলের পরাগসংযোগ প্রক্রিয়াও বিশেষ কীটপতঙ্গ করে থাকে। পাখিরা এদের ফল খেয়ে মলত্যাগের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেয়। ফলে বাড়ির কার্নিসে, ছাদে, দেওয়ালের ফাটলে, গাছের কোটরে, বাগানে ছড়িয়ে পড়ে বীজ। সেখানে থেকে অঙ্কুরিত হয়ে জন্মায় নতুন চারাগাছ।
আয়ুর্বেদ অনুসারে পাকুড়ের ছাল হল অত্যন্ত গুণকারী ভেষজ। জ্বর বিকারে প্রলাপ বকা, ভ্রম রোগে, শ্বেত প্রদর, রক্ত পিত্ত, পোড়া ঘা, মূর্ছা রোগের উপশমকারী হিসেবে পাকুড়ের ছাল, পাতা ব্যবহার করা হয়।
🍂
0 Comments