জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার:ষষ্ঠ খণ্ড /পর্ব ৫ /কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার:ষষ্ঠ খণ্ড 
পর্ব ৫ 
কমলিকা ভট্টাচার্য 

আলোছায়ার শহরে

দৃষ্টির বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর আদরের ভিতরে যেন অদ্ভুত একটা পরিবর্তন শুরু হলো।
লন্ডনের রাতটা সেদিন খুব ঠান্ডা।
হোস্টেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে দূরের আলো ঝলমলে শহরটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
নিচে ভিজে রাস্তার উপর আলো পড়ে যেন রঙিন কাঁচের মতো ঝিলমিল করছিল। দূরে টেমসের ওপরে সেতুগুলোর আলো জ্বলছে। কালো আকাশের নিচে শহরটা যেন একইসাথে সুন্দর আর ভীষণ একা।কিন্তু আদরের মাথার ভিতরে বারবার ভেসে উঠছিল অন্য একটা দৃশ্য।
ছোট্ট ঘর।হুইলচেয়ারে বসে থাকা ছেলেটা।কথা বলতে না পারা বাচ্চাটা।দৃষ্টির হাসি।
আর সেই অদ্ভুত উষ্ণতা।
সারা জীবন সে ভেবেছিল বিজ্ঞান মানে আবিষ্কার।সাফল্য।ক্ষমতা।
কিন্তু সেদিন প্রথমবার তার মনে হলো—
বিজ্ঞান যদি মানুষের ভাঙা শরীর, ভাঙা জীবন একটু জোড়া লাগাতে না পারে, তাহলে তার মূল্য কোথায়?
সেই রাতেই সে নিজের স্কেচবুক খুলে লিখেছিল—
“আর্টিফিশিয়াল অর্গান ইজ়ন্ট টেকনোলজি এনিমোর।
ইট ইজ় অ্যানাদার চান্স অ্যাট লাইফ।”
তারপর থেকে যেন সব বদলে যেতে শুরু করল।
কলেজে আগের মতো এলোমেলো থাকত না আদর।
ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাসে এখন সে সত্যিই মন দিচ্ছে।
বিশেষ করে বায়োমেকানিক্স, নিউরাল ইন্টারফেস, প্রস্থেটিক আর্কিটেকচার—এই বিষয়গুলোতে তার অদ্ভুত আগ্রহ জন্মায়।
🍂
প্রফেসররা প্রথমে অবাক হয়ে যায়।কারণ এতদিন যে ছেলেটা ক্লাসের ফাঁকে ভায়োলিন নোটেশন লিখত, সেই ছেলেই এখন রাত জেগে রিসার্চ পেপার পড়ছে।
একদিন প্রফেসর হ্যারিসন মজা করে বলেছিলেন,
“মিস্টার আদর্শ, ডিড লন্ডন ফাইনালি চেঞ্জ ইউ?”
আদর একটু হেসে বলেছিল,
“নো স্যার… মেবি লন্ডন শোড মি সামথিং।”
তবে পড়াশোনার থেকেও বেশি বদলাচ্ছিল তার বিকেলগুলো।
প্রতিদিন ক্লাস শেষে সে চলে যেত সেই পুরোনো রাস্তার মোড়ে।
দৃষ্টি তখন ভায়োলিন বাজাত।
এখন crowd-এর মধ্যেও দৃষ্টি বুঝে যেত আদর এসেছে।
কারণ আদর কাছে দাঁড়ালেই সে melody বদলে ফেলত।
একটা বিশেষ সুর।
শুধু তাদের দু’জনের।
ধীরে ধীরে সেই রাস্তার ছোট্ট জায়গাটা আদরের কাছে বাড়ির মতো হয়ে ওঠে।
রাস্তার ওপরে পুরোনো ইয়েলো স্ট্রিটল্যাম্প।পাশে ছোট কফিশপ।
শীতের কুয়াশার ভিতর ভায়োলিনের সুর।
লোকজনের ব্যস্ত পায়ের শব্দ।
গরম চেস্টনাটের গন্ধ।
লন্ডন শহরটাকে সে নতুনভাবে চিনতে শুরু করে।
দিনের লন্ডন আর রাতের লন্ডন যেন আলাদা দুটো মানুষ।
দিনে কর্পোরেট crowd, দ্রুত চলা মানুষ, আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের rush।
আর রাতে—
পুরোনো পাথরের রাস্তা, পাব-এর আলো, দূরে স্যাক্সোফোনের সুর, নদীর ধারে বসে থাকা একাকী মানুষ।
এই শহর একা মানুষদের খুব quietly আশ্রয় দেয়—আদরের এমন মনে হতে লাগল।
দৃষ্টির সঙ্গে তার বন্ধুত্বও ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছিল।
তবে সেই বন্ধুত্বে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না।
দৃষ্টি কম কথা বলত।
কিন্তু যখন বলত, মনে হতো শব্দগুলো খুব ভেবেচিন্তে বেছে আনে।
একদিন টেমসের ধারে বসে দৃষ্টি হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল,
“তুমি মানুষকে এত অবজ়ার্ভ করো কেন?”
আদর একটু ভেবে বলেছিল,
“কারণ ছোটবেলা থেকে সবাই আমাকে অবজ়ার্ভ করেছে।”
দৃষ্টি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।
তারপর আস্তে বলেছিল,
“তাহলে তুমি জানো… কেমন লাগে।”
আদর সেই প্রথম বুঝেছিল—দৃষ্টি নিজের অন্ধত্ব নিয়ে যতটা না কষ্ট পায়, তার থেকেও বেশি কষ্ট পায় মানুষ তাকে করুণা করলে।
ধীরে ধীরে আদর বাচ্চাগুলোর সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে।
প্রথমে ওরা একটু সংকোচ করত।
তারপর একদিন আদর পিলোকে আঁকা শেখায়।
আর সেখান থেকেই শুরু।
এখন প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে ওদের বাড়িতে যায়।
কখনও ভায়োলিন বাজায়।
কখনও গল্প বলে।
কখনও সবাই মিলে পিৎজা বানায়।
ছোট্ট ঘরটা হাসিতে ভরে ওঠে।
হুইলচেয়ারে বসা লিয়াম chess খেলতে খুব ভালোবাসত।
কথা বলতে না পারা নোয়া চোখ দিয়ে আশ্চর্যভাবে সব বুঝিয়ে দিত।
রাকা সারাক্ষণ আদরের স্কেচবুক নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করত।
একদিন ছোট্ট পিলো হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল,
“আদর্শ… ইফ গড লাভস এভরিওয়ান, দেন হোয়াই আর উই ব্রোকেন?”
ঘরটা মুহূর্তে চুপ হয়ে গিয়েছিল।
আদর উত্তর দিতে পারেনি।
সে শুধু পিলোর মাথায় হাত রেখে বলেছিল,
“মেবি… ব্রোকেন থিংস শাইন ডিফারেন্টলি।”
দৃষ্টি দূর থেকে চুপচাপ শুনছিল।
তার চোখে তখন জল জমেছিল।
এর মধ্যেই লন্ডনে শীত নামতে শুরু করে।
সকালে ঘন কুয়াশা।
রাস্তার দু’পাশে bare tree।
ক্রিসমাস লাইট ধীরে ধীরে জ্বলছে শহর জুড়ে।
এক সন্ধ্যায় দৃষ্টি আর আদর উইন্টার মার্কেটে গিয়েছিল।
চারদিকে আলো।
গরম চকোলেটের গন্ধ।
রাস্তার শিল্পীরা গান গাইছে।
দৃষ্টি হেসে বলেছিল,
“আমি দেখতে পাই না… তবু ক্রিসমাস আমি চিনতে পারি।”
“কীভাবে?”
“মানুষের হাঁটার শব্দ বদলে যায়।”
আদর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল।
সে বুঝতে পারছিল—দৃষ্টি চোখে দেখে না, কিন্তু পৃথিবীকে অনুভব করে।
আর হয়তো সেই কারণেই তার সুর এত গভীর।
এদিকে আদরের ভিতরে নতুন একটা obsession জন্ম নিতে থাকে।
আর্টিফিশিয়াল অর্গান।
সে লাইব্রেরিতে বসে হার্ট ভালভ রিপ্লেসমেন্ট, সিন্থেটিক রেটিনা, নিউরাল প্রস্থেটিক নিয়ে পড়তে থাকে।
রাতে ঘুমানোর আগেও sketch করে।
কখনও আর্টিফিশিয়াল hand।
কখনও optic nerve interface।
কখনও neural signal adaptive chip।
একদিন দৃষ্টি তার স্কেচবুক ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
“এগুলো কি?”
আদর ধীরে বলেছিল,
“আমি চাই… সামডে মানুষ শরীরের কোনো সীমাবদ্ধতার জন্য জীবন হারিয়ে না ফেলুক।”
দৃষ্টি হেসে বলেছিল,
“তুমি ডেঞ্জারাস ধরনের dreamer।”
আদরও হেসেছিল।
কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে জানত—এটা শুধু স্বপ্ন না।
এটা তার নিজের যুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
সেই রাতে হোস্টেলে ফিরে আদর ল্যাপটপ খুলে রিসার্চ প্রোপোজ়াল লিখতে বসে।
বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল।
জানলার কাঁচ বেয়ে জল নেমে আসছিল ধীরে।
দূরে শহরের আলো ঝাপসা।
সে অনেকক্ষণ ধরে লিখল।
তারপর শেষে একটা লাইন যোগ করল—
“টেকনোলজি শুড নট রিপ্লেস হিউম্যানিটি।
ইট শুড রিস্টোর দ্য পার্টস হিউম্যানিটি লস্ট।”
লাইনটা লিখে সে থেমে যায়।
কারণ হঠাৎ তার মনে পড়ে ঋদ্ধিমানকে।
তারপর অনির্বাণকে।
তার নিজের অতীতকে।
সে বুঝতে পারে—
হয়তো এতদিন সে নিজের জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল।
কিন্তু এই শহর, এই মানুষগুলো, এই অসম্পূর্ণ বাচ্চাগুলো তাকে আবার ফিরিয়ে আনছে তাকে আসল পথে।
ঠিক তখনই ফোন ভাইব্রেট করে ওঠে।
স্ক্রিনে লেখা—
রিদ্ধিমান আংকেল কলিং।
আদর ফোন তোলে।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ঋদ্ধিমানের শান্ত গলা—
“তুই বদলাচ্ছিস, তাই না?”
আদর বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।
দূরে লন্ডনের আলো ঝলমল করছে।
সে খুব আস্তে বলে—
“হয়তো… প্রথমবার নিজের মতো হচ্ছি।”

Post a Comment

0 Comments