জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার : সপ্তম খণ্ড/পর্ব ২ : ছায়ার ভেতর ছায়া/কমলিকা ভট্টাচার্য


বাঁচার উত্তরাধিকার : সপ্তম খণ্ড
পর্ব ২ : ছায়ার ভেতর ছায়া

কমলিকা ভট্টাচার্য

দিনের বেশিরভাগ সময় আদর এখন ল্যাবেই কাটায়। নোয়ার নতুন ভোকাল সিস্টেম নিয়ে কাজ চলছে। ছেলেটা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি শব্দ উচ্চারণ করতে পারে। প্রতিটা নতুন শব্দ শুনলে আদরের মনে হয়, পিলোর কাছে সে সামান্য হলেও নিজের ব্যর্থতার প্রায়শ্চিত্ত করছে।
সেদিন নোয়া ধীরে ধীরে বলেছিল—
— “সি...ক্রে...ট...”
শব্দটা স্পষ্ট ছিল না। তবু শব্দটা ছিল। আর সেটাই যথেষ্ট।
আদর হেসে বলেছিল—
— “একদম টপ সিক্রেট ,কেউ যেন আমার কথা জানতে না পারে, আই নো ইউ আর ভেরি স্মার্ট।”
নোয়া গর্বিত মুখে হেসেছিল।

রাত গভীর হলে ল্যাব থেকে ফিরে আদর মাঝে মাঝে ভায়োলিন হাতে নিত। আঙুলগুলো আপনাআপনি সেই পরিচিত সুরে ভেসে যেত। কিন্তু সুরের মাঝপথেই তার মনে পড়ে যেত দৃষ্টিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি।
"আমি তোমার চোখের আলো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব।"
ভায়োলিনটা ধীরে টেবিলের উপর রেখে সে আবার কম্পিউটারের সামনে বসে পড়ত।
স্ক্রিনে একের পর এক মেডিক্যাল জার্নাল খুলে যেত। রেটিনাল রিজেনারেশন। অপটিক নার্ভ স্টিমুলেশন। কর্টিকাল ভিশন ইন্টারফেস। নিউরাল ইমপ্লান্ট।
প্রতিটি গবেষণাপত্র সে মন দিয়ে পড়ত।
প্রফেসর হ্যারিসন একদিন রাত দুটোয় ল্যাবে এসে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন—
— "এত রাতে এখনও বাড়ি যাওনি?"
আদর স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বলেছিল—
— "একদিন যদি দৃষ্টিহীন মানুষের মস্তিষ্কে আবার আলো পৌঁছে দেওয়া যায়?"
প্রফেসর কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন।
তারপর খুব ধীরে বলেছিলেন—
— "তুমি শুধু বিজ্ঞানী না, আদর্শ। তুমি অসম্ভবকে জেদ করে সম্ভব করতে চাও।"
আদর হালকা হেসেছিল।
— "কিছু প্রতিশ্রুতি না রাখলে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাই, স্যার।"
নোয়া মাঝে মাঝে ল্যাবে টেস্টের জন্য এলে লুকিয়ে দৃষ্টিদের বাড়ির খবরও নিয়ে নিত আদর। সামনে যেতে না পারলেও নোয়ার ছোট ছোট গল্পগুলোই এখন তার ভরসা।
একদিন নোয়া খুব কষ্ট করে বলল—
— "রা...কা...দি...দি...অ...সু..."
আদর তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারল কিছু একটা হয়েছে।
সে নোয়ার হাত ধরে জিজ্ঞেস করল—
— "রাকা অসুস্থ?"
নোয়া মাথা নাড়ল।
সেদিন সন্ধ্যায়ই আদর প্রফেসর হ্যারিসনকে বিষয়টা জানাল।
পরদিন হ্যারিসন খবর নিয়ে এসে বললেন—
— "চিন্তার মতো অবস্থা নয়, তবে রাকার শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে।"
আদর উৎকণ্ঠিত হয়ে তাকাল।
প্রফেসর বললেন—
— "জন্ম থেকেই ওর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা খুব কম। সামান্য ভাইরাল ইনফেকশনও ওর ক্ষেত্রে অনেক জটিল হয়ে যায়। তার উপর দীর্ঘদিনের শ্বাসকষ্টের সমস্যাও আছে। এই শীতে বারবার জ্বর আর বুকে সংক্রমণ হচ্ছে। ডাক্তাররা বিশ্রাম নিতে বলেছেন।"
আদরের মুখটা নিঃশব্দে মলিন হয়ে গেল।
সে খুব আস্তে বলল—
— "একবার... শুধু একবার যদি ওকে দেখতে যেতে পারতাম..."
প্রফেসর হ্যারিসন মাথা নাড়লেন।
— "আমি জানি। কিন্তু এখন তুমি ওদের কাছে গেলে শুধু নিজের নয়, ওদেরও বিপদ বাড়বে।"
আদর আর কিছু বলল না।
তার মনে হচ্ছিল, সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোর এত কাছে থেকেও যেন সে হাজার মাইল দূরে।
তবে লিয়ামের উন্নতি নোয়ার কথা বলতে পারা
এইসব ছোট ছোট মুহূর্তই এখন আদরের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
🍂
কিন্তু আনন্দের আড়ালে একটা চাপা অস্বস্তিও ছিল।
প্রফেসর হ্যারিসন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছেন।
ল্যাবে ঢোকার সময় অতিরিক্ত আইডি যাচাই।
ডাবল সিকিউরিটি স্ক্যান।
এনক্রিপ্টেড সার্ভার।
অনুমতি ছাড়া কোনো ডেটা বাইরে যাচ্ছে না।
মাঝে মাঝে সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীকেও দেখা যায়।
প্রথমে আদর ভেবেছিল এগুলো সাময়িক ব্যবস্থা।
কিন্তু সময় যত এগোচ্ছিল, তার মনে হচ্ছিল—হ্যারিসন এমন কিছু জানেন যা তিনি এখনও কাউকে বলেননি।
একদিন দুপুরে তাকে নিজের অফিসে ডেকে পাঠালেন প্রফেসর।
ঘরে ঢুকেই আদর বুঝতে পারল কিছু একটা হয়েছে।
হ্যারিসন জানলার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
বাইরে তুষার পড়ছে।
অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি বললেন—
“তুমি কি কখনও অনুভব করো কেউ তোমাকে দেখছে?”
আদর ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“সবসময়।”
হ্যারিসন মৃদু হাসলেন।
“ভালো।”
“ভালো?”
“হ্যাঁ। কারণ যে মানুষ সতর্ক থাকে, সে নিজেকে বাঁচাতে পারে।”
আদর এবার গম্ভীর হয়ে গেল।
“কিছু হয়েছে?”
প্রফেসর ধীরে মাথা নাড়লেন।
“হয়তো।”
“হারগ্রিভ?”
নামটা শুনে হ্যারিসন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
“তুমি নামটা জানো?”
“বাবা একবার বলেছিল।”
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল।
প্রফেসর ধীরে বললেন—
“যদি সত্যিই সে হয়ে থাকে, তাহলে সে সহজে হাল ছাড়বে না।”
“সে আসলে কী চায়?”
হ্যারিসন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“ক্ষমতা।”
“আমার কাছে সেটা নেই।”
“তোমার আছে, আদর্শ। তুমি শুধু সেটা বোঝো না।”
আদর কিছু বলল না।
তারপর প্রফেসর ডেস্কের উপর রাখা ফাইল বন্ধ করে বললেন—
“এই কয়েকদিন খুব সাবধানে থাকবে। একা কোথাও যাবে না। আর দৃষ্টিদের বাড়ির আশেপাশে যতটা সম্ভব কম যাবে।”
এই কথাটা শুনে আদরের বুকের ভিতরটা কেমন হালকা ব্যথা করল।
তবু সে মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে।”
কিন্তু সে জানত—এই প্রতিশ্রুতি সে রাখতে পারবে না।
কারণ কিছু টান যুক্তি মানে না।
সেই সন্ধ্যাতেই সে আবার বেরিয়েছিল।
অবশ্য আগের মতো নয়।
অনেক দূরে।
দৃষ্টিদের বাড়ির বিপরীত দিকের একটি ছোট ক্যাফেতে।
জানলার পাশে বসে ছিল সে।
হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ।
রাস্তার ওপারে আলো জ্বলছে।
ভিতরে নোয়া বসে আঁকছে।
লিয়াম নতুন প্রস্থেটিক পা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে।
আর দৃষ্টি...
সে ভায়োলিন বাজাচ্ছিল।
সেই পুরোনো সুর।
যেটা শুনলেই আদরের মনে হয় পৃথিবীতে এখনও কিছু জিনিস নিখাদ সুন্দর আছে।
কয়েক মুহূর্তের জন্য সে সব সতর্কতা ভুলে গেল।
ভুলে গেল গুলি।
ভুলে গেল হুমকি।
ভুলে গেল ভয়।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি মেসেজ আসে।
প্রফেসর হ্যারিসন।
মাত্র দুটি শব্দ।
GO BACK.
আদরের বুক ধক করে ওঠে।
কয়েক সেকেন্ড পর আরেকটা মেসেজ।
IMMEDIATELY.
এইবার সে সতর্ক হয়ে চারপাশে তাকায়।
সবকিছু স্বাভাবিক।
তবু কোথাও যেন কিছু অস্বাভাবিক।
রাস্তার ওপারে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
কাচগুলো সম্পূর্ণ কালো।
ভিতরে কিছু দেখা যাচ্ছে না।
গাড়িটা যেন অনেকক্ষণ ধরেই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
আদরের শরীরের প্রতিটি স্নায়ু এক মুহূর্তে সতর্ক হয়ে ওঠে।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
কফির দাম মিটিয়ে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে যায়।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে—
কালো গাড়িটার ভিতরে বসা একজন লোক দূরবীন নামিয়ে রাখে।
তার কানে ছোট্ট ইয়ারপিস।
সে নিচু গলায় বলে—
“টার্গেট ভিজুয়াল কনফার্মড।”
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর আসে—
“ডু নট এনগেজ।”
লোকটা অবাক হয়।
“স্যার?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর ভেসে আসে ভিক্টর হারগ্রিভের কণ্ঠ।
শান্ত।
ঠান্ডা।
হিসেবি।
“এখন নয়।”
“কেন?”
“কারণ শিকারকে ধরার আগে তার অভ্যাস জানতে হয়।”
লোকটা চুপ করে যায়।
“ও কোথায় যায়, কার সঙ্গে দেখা করে, কাদের জন্য ঝুঁকি নেয়—সব জানতে চাই।”
“আন্ডারস্টুড।”
কল শেষ হয়ে যায়।
আর শহরের অন্য প্রান্তে একটি ব্যক্তিগত ক্লাবের নির্জন কক্ষে বসে ছিলেন ভিক্টর হারগ্রিভ।
তার সামনে ছড়িয়ে রয়েছে ডজনখানেক ছবি।
ইউনিভার্সিটির।
ল্যাবের।
ছাত্রদের।
প্রফেসরদের।
আর মাঝখানে একটি ছবি।
দূর থেকে তোলা।
ঝাপসা।
তবু মুখটা স্পষ্ট বোঝা যায়।
আদর।
হারগ্রিভ ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন।
তার চোখে অদ্ভুত এক আবেগ।
যেন তিনি কোনো শত্রুকে নয়, বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া সম্পদকে দেখছেন।
তার পাশে দাঁড়ানো একজন লোক বলল—
“আমরা কোনো সরাসরি প্রমাণ পাইনি, স্যার।”
হারগ্রিভ মৃদু হাসলেন।
“প্রমাণের দরকার নেই।”
“স্যার?”
“আমি ওকে চিনি।”
লোকটা চুপ করে গেল।
হারগ্রিভ ছবির উপর আঙুল বুলিয়ে বললেন—
“এত বছর পরেও বদলায়নি।”
“কী করব এখন?”
হারগ্রিভ উত্তর দিলেন না।
তিনি জানলার বাইরে পড়তে থাকা তুষারের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন—
“অপেক্ষা।”
“অপেক্ষা?”
“হ্যাঁ।”
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা ঠান্ডা হাসি ফুটে উঠল।
“শিকার যখন নিজেই নিজের দুর্বলতার কাছে ফিরে আসে, তখন তাকে ধরতে বেশি কষ্ট হয় না।”
সেই রাতে আদর হোস্টেলের ঘরে ফিরেও অস্বস্তিটা ঝেড়ে ফেলতে পারল না।
কাজে মন বসছিল না।
বারবার মনে হচ্ছিল—
কেউ যেন তাকে দেখছে।
খুব কাছ থেকে।
অন্ধকারের আড়াল থেকে।
তারপরও সে নিজেকে বোঝাল—
হয়তো এটা শুধু ভয়।
হয়তো সে অতিরিক্ত ভাবছে।
কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক অনেক সময় এমন বিপদ টের পায়, যা চোখ দেখতে পায় না।
আর লন্ডনের অন্য প্রান্তে, নিজের বিলাসবহুল স্যুটে বসে ভিক্টর হারগ্রিভ একটি পুরোনো ফাইল খুললেন।
ফাইলের উপর লেখা—
SUBJECT : ADARSH SEN
তিনি ধীরে ধীরে শেষ পাতায় একটি নতুন নির্দেশ যোগ করলেন।
TARGET CONFIRMED
তার নিচে আরেকটি লাইন।
PRIORITY LEVEL : ALPHA
আরও একটি।
CAPTURE PROTOCOL : ACTIVE
হারগ্রিভ ফাইলটা বন্ধ করলেন।
তার আঙুল কয়েক সেকেন্ড ফাইলের উপর স্থির রইল।
তারপর খুব আস্তে বললেন—
“এত বছর ধরে তোমাকে খুঁজছি, আদর্শ।”
“এবার আর তুমি হারিয়ে যেতে পারবে না।”
পাশে দাঁড়ানো লোকটা নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল—
“ক্যাপচার টিম প্রস্তুত করব, স্যার?”
হারগ্রিভ কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।
তারপর মাথা নাড়লেন।
“এখনও না।”
“কিন্তু স্যার—”
“একটা শিকারকে ধরার আগে জানতে হয় সে কীসের জন্য বাঁচে।”
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা নির্মম হাসি ফুটে উঠল।
“আর আমি এখনো তার দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করছি।”
জানলার বাইরে তুষার পড়ছিল।
আর শহরের অন্য প্রান্তে—
কিছু না জেনেই আদর নোয়ার জন্য নতুন ভয়েস মডিউলের কোড লিখছিল।
সে জানত না—
বড় ফাঁদ পেতে।
খুব কাছ থেকে,
খুব ধৈর্য নিয়ে,
শিকারি অপেক্ষা করছে।
চলবে...

Post a Comment

4 Comments

  1. AnonymousJuly 02, 2026

    রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। পরের পর্বের জন্য সাগ্রহে অপেক্ষায়।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাJuly 02, 2026

      ধন্যবাদ🙏

      Delete
  2. AnonymousJuly 02, 2026

    Tomar imagination anabadyo
    Khub unnoti karo
    lekhae

    ReplyDelete
  3. Kamalika BhattacharyaJuly 02, 2026

    ধন্যবাদ🙏

    ReplyDelete