বাঁচার উত্তরাধিকার : সপ্তম খণ্ড
পর্ব : ৪ : অদৃশ্য
কমলিকা ভট্টাচার্য
এরপরের কয়েকটা সপ্তাহ আদর দৃষ্টিদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ রাখে, জেনিভার সাথে নোয়া পরীক্ষার জন্য ল্যাবে আসলে,লুকিয়ে তার কাছ থেকেই সব খবর নেয়।এইভাবেই ভয়ের স্থিতিটা একটু কম হচ্ছিল,সব কিছু আগের মত স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
লন্ডনের আকাশটা সেদিন সকাল থেকেই মেঘলা ছিল।
মেঘগুলো যেন শহরের উপর ঝুঁকে নেমে এসেছে। টেমসের জল কালচে ধূসর। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। রাস্তার মানুষজন দ্রুত হাঁটছিল, যেন সবাই ঝড় আসার আগেই কোথাও পৌঁছে যেতে চায়।
কিন্তু আদরের দিনটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল।
সকাল থেকে সে ল্যাবে।
নোয়ার ভোকাল রেজোন্যান্স সিস্টেমের নতুন আপডেট নিয়ে কাজ প্রায় শেষ। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নোয়ার উচ্চারণ অনেক পরিষ্কার হয়েছে। এখন সে ছোট ছোট বাক্যও বলতে পারে।
দুপুরে নোয়া এসে বলেছিল,
— “আ...দর্শ... আমি... গান... শিখব।”
আদর হেসে বলেছিল,
— “অবশ্যই শিখবে।”
— “দৃষ্টি... দিদির... মতো?”
— “তার চেয়েও ভালো।”
নোয়া হেসে উঠেছিল।
সেই হাসিটা দেখে আদরের বুকটা হালকা হয়ে গিয়েছিল।
অনেকদিন পর তার মনে হচ্ছিল—হয়তো সত্যিই সে কিছু মানুষকে বাঁচাতে পারছে।
হয়তো পিলোকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
কিন্তু নোয়া এগোচ্ছে।
লিয়াম হাঁটছে।
আর সেটাই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
সন্ধ্যার দিকে প্রফেসর হ্যারিসন ল্যাবে এলেন।
মুখে সেই পরিচিত গাম্ভীর্য।
— “আজ তাড়াতাড়ি ফিরবে।”
আদর অবাক হয়ে তাকাল।
— “কেন?”
— “আবহাওয়া খারাপ হচ্ছে।”
— “শুধু এজন্য?”
হ্যারিসন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— “আমার মন বলছে আজ বাইরে বেশি সময় থাকা উচিত নয়।”
আদর হেসে ফেলল।
— “আপনিও এখন ঋদ্ধিমান আংকেলের মতো কথা বলছেন।”
কিন্তু হ্যারিসন হাসলেন না।
— “আমি সিরিয়াস।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর তিনি খুব আস্তে বললেন,
— “আদর্শ, নোয়ার ভোকাল সিস্টেম ঠিক করে কাজ করছে,নতুন কিছু এখন আপডেট করার নেই, তুমি এখন কিছুদিন হোস্টেলে রেস্ট নাও,তোমার অনেক পেইন্টিং পড়ে আছে সেগুলো শেষ করো।আমি তোমাকে এখানের সব খবর পাঠাবো। যদি কখনও মনে হয় কিছু অস্বাভাবিক, সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ফোন করবে।”
আদরের বুকের ভিতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি জেগে উঠল।
তবু সে মাথা নাড়ল।
— “ওকে।”
রাত আটটার পর বৃষ্টি শুরু হয়।
প্রথমে হালকা।
তারপর ধীরে ধীরে ঝমঝমিয়ে।
রাস্তার আলো ঝাপসা হয়ে যায়।
কাঁচের উপর বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়তে থাকে।
আদর তখনও ল্যাবে ছিল।
কাজ শেষ হতে হতে রাত সাড়ে নয়টা।
সে ব্যাগ কাঁধে তুলে বেরিয়ে আসে।
বাইরে ঠান্ডা বাতাস।
রাস্তায় মানুষ খুব কম।
দূরে কোথাও সাইরেনের শব্দ ভেসে আসছে।
সে হুড টেনে মাথা ঢেকে হাঁটতে শুরু করে।
তার হোস্টেল খুব দূরে নয়।
দশ মিনিটের পথ।
কিন্তু আজ রাস্তাটা কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল।
অস্বাভাবিক নীরব।
অস্বাভাবিক ফাঁকা।
বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।
আদর একবার পিছনে তাকাল।
কেউ নেই।
🍂
আবার হাঁটতে শুরু করল।
ঠিক তখনই—
একটা সাদা ভ্যান ধীরে ধীরে রাস্তার পাশে এসে থামে।
আদর প্রথমে গুরুত্ব দেয় না।
এমন ভ্যান প্রায়ই দেখা যায়।
সে হাঁটতেই থাকে।
পরের মুহূর্তে—
ভ্যানের দরজা খুলে যায়।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগই পায় না।
পিছন থেকে একটা শক্ত হাত তার মুখ চেপে ধরে।
আরেকজন তার বাহু শক্ত করে ধরে ফেলে।
আদর লড়াই করার চেষ্টা করে।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার ঘাড়ে কিছু একটা ফুটে ওঠে।
একটা সূচ।
সেডেটিভ।
তার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন মুহূর্তের মধ্যে গলে যেতে থাকে।
চোখ ঝাপসা হয়ে যায়।
বৃষ্টির আলো মিশে যায় অন্ধকারে।
শেষবার সে শুধু দেখতে পায়—
ভ্যানের দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
তারপর...
অন্ধকার।
কতক্ষণ কেটে গেছে সে জানে না।
মিনিট?
ঘণ্টা?
নাকি দিন?
হঠাৎ তার মনে হলো কেউ যেন মাথার ভিতর হাতুড়ি মারছে।
চোখ খুলতে গিয়ে তীব্র যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত হয়ে গেল।
চারপাশ অন্ধকার।
মৃদু হলুদ আলো।
দেয়াল কংক্রিটের।
কোনো জানালা নেই।
ঘরের গন্ধটা অদ্ভুত।
ওষুধ।
লোহা।
আর স্যাঁতসেঁতে মাটির।
আদর নড়তে গিয়ে বুঝল—
তার দুই হাত ধাতব চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা।
পা-ও।
সে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে উঠল।
মাথা ঝাঁকিয়ে স্মৃতি ফিরে আনার চেষ্টা করল।
বৃষ্টি।
রাস্তা।
ভ্যান।
তারপর...
কিছুই না।
ঠিক তখনই ঘরের দরজা খুলে গেল।
একজন লোক ঢুকল।
কালো স্যুট।
ধূসর চুল।
অদ্ভুত শান্ত মুখ।
আদর লোকটাকে দেখেই বুঝে গেল।
এই মানুষটার ছবি সে আগে দেখেছে।
অনির্বাণের ফাইলগুলোতে।
ঋদ্ধিমানের পুরোনো রিপোর্টে।
বহুবার।
ভিক্টর হারগ্রিভ।
লোকটা ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াল।
কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে রইল।
যেন বহুদিনের হারানো কিছু খুঁজে পেয়েছে।
তারপর হাসল।
খুব আস্তে।
খুব ঠান্ডা ভাবে।
— “অবশেষে দেখা হলো, আদর্শ।”
আদরের বুকের ভিতর বরফ জমে গেল।
তবু গলাটা শক্ত রাখল।
— “আপনি কে?”
হারগ্রিভ হেসে উঠল।
— “তুমি জানো আমি কে।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর সে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল।
— “আমি তোমাকে অনেকদিন ধরে খুঁজছি।”
— “ভুল মানুষকে ধরেছেন।”
— “না।”
হারগ্রিভ মাথা নাড়ল।
— “আমি কখনও ভুল করি না।”
আদর চুপ করে রইল।
সে জানে এখন কথা বলা বিপজ্জনক।
হারগ্রিভ টেবিলের উপর একটা ফাইল রাখল।
ধীরে ধীরে খুলল।
আদরের শৈশবের ছবি।
পুরোনো নিউরাল ডায়াগ্রাম।
রিসার্চ নোট।
আর কিছু নথি।
আদরের চোখ বড় হয়ে গেল।
এগুলো বাইরে থাকার কথা নয়।
হারগ্রিভ তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছিল।
— “দেখছ?”
“তোমাকে নিয়ে আমি যতটা জানি, তুমি নিজেও হয়তো ততটা জানো না।”
আদর দাঁতে দাঁত চেপে রইল।
হারগ্রিভ সামনে ঝুঁকল।
— “আমি শুধু একটা জিনিস চাই।”
— “কি?”
— “তোমার মস্তিষ্ক।”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
বাইরে কোথাও মেশিনের শব্দ।
টিক...
টিক...
টিক...
হারগ্রিভ শান্ত গলায় বলল,
— “মানুষের মস্তিষ্ক আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সীমারেখা তুমি ভেঙে দিয়েছ।”
— “আমি মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি।”
— “মানুষ?”
হারগ্রিভ হেসে ফেলল।
— “মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ নয়, আদর্শ।”
— “তাহলে?”
— “ক্ষমতা।”
দুজনেই কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
দুই আদর্শ।
দুই দর্শন।
দুই পৃথিবী।
একজন বিশ্বাস করে প্রযুক্তি মানুষকে বাঁচাবে।
আরেকজন বিশ্বাস করে প্রযুক্তি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে।
হারগ্রিভ উঠে দাঁড়াল।
— “আমরা ধীরে ধীরে শুরু করব।”
আদরের বুক ধক করে উঠল।
— “কিসের শুরু?”
হারগ্রিভ দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে থামল।
পেছনে না তাকিয়েই বলল,
— “তোমাকে ভাঙার। একবার আমাকে ধোঁকা দিয়ে নিজের মেমোরি লুকিয়ে ছিলে এবার দেখি কি করো,তোমার মেমোরিটাই যদি না থাকে।”
আদর খুব ধীরে নিজের মনকে শক্ত করল।
কারণ সে জানত—
এই মানুষটার সামনে দুর্বল হওয়া যাবে না।
একটুও না।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ঘর আবার নীরব।
শুধু দূরে কোথাও জলের ফোঁটা পড়ার শব্দ।
টুপ...
টুপ...
টুপ...
প্রথমবার আদরের মনে হলো— হয়তো সে সত্যিই এমন এক বিপদে পড়েছে, যেখান থেকে ফিরে আসা সহজ নয়।
সে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
মনে পড়ে গেল নোয়ার মুখ। দৃষ্টির ভায়োলিনের সুর। অনির্বাণের হাসি। ঋদ্ধিমানের উপদেশ। ইরার স্নেহভরা কণ্ঠ। নাতাশার উদ্বিগ্ন চোখ। আর দর্শন...
অবচেতনেই তার মাথা একটু নিচু হয়ে এল।
ঠিক তখনই সে অনুভব করল, গলার কাছে ঠান্ডা ধাতব স্পর্শ।
তার গলায় ঝোলানো ছোট্ট লকেটটা।
ধীরে ধীরে আঙুল বাড়িয়ে সেটাকে স্পর্শ করল সে।
লকেটটা খুলতে পারল না। হাত দুটো এখনও শক্ত করে বাঁধা।
তবু আঙুলের ডগা দিয়ে সে বুঝতে পারল— ভেতরে রয়েছে তাদের পরিবারের ছোট্ট একটা ছবি।
মা। ইরা। অনির্বাণ। ঋদ্ধিমান। আর দর্শন।
হঠাৎ কেন যেন তার চোখের সামনে ভেসে উঠল দর্শনের মুখ।
সেই শান্ত, নিষ্পাপ হাসি।
তারপরই মনে পড়ল বহু বছর আগে ইরার বলা একটা কথা।
"মন যদি সত্যিই কাউকে ডাকে, আর সেই ডাকে যদি ভালোবাসা থাকে, দূরে থাকলেও সে কোনো না কোনোভাবে সেটা অনুভব করে।"
ছোটবেলায় আদর হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল কথাটা।
আজ...
এই অন্ধকার ঘরে বসে...
তার কাছে হারানোর মতো আর কিছু নেই।
চোখ বন্ধ করল সে।
নিজেকে বাঁচানোর কোনো উপায় তার হাতে নেই।
কোনো কম্পিউটার নেই।
কোনো গবেষণাগার নেই।
কোনো যন্ত্র নেই।
কোনো যোগাযোগের পথও নেই।
শুধু আছে তার মন।
আর সেই মনটাই যেন সমস্ত শক্তি দিয়ে একটাই নাম উচ্চারণ করতে লাগল—
দর্শন...
দর্শন...
দর্শন...
সে জানত না, এটা প্রার্থনা...
নাকি শেষ চেষ্টা।
সে এটাও জানত না— এভাবে কাউকে ডাকা আদৌ সম্ভব কি না।
তবু সে থামল না।
কারণ আশা হারিয়ে ফেললে মানুষ বেঁচে থাকে না।
আর সেই মুহূর্তে—
হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, অন্য এক দেশে...
একটি ঘরের ভেতর হঠাৎ যেন অকারণেই কারও চোখ খুলে গেল।কিন্তু আদর জানত না—
এই অন্ধকার ঘরের অনেক দূরে, তারই মুখ নিয়ে আরেকজনের অস্তিত্ব ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।
আর সেই জাগরণ একদিন সবকিছু বদলে দেবে।
2 Comments
এত বড় লেখককে সাজেশান দেবার ধৃষ্টতা নেই। তবু পাঠক হিসেবে বলি অনেক ছোট্ট ছোট্ট বাক্য থাকলে মাথায় প্রতিটি আলাদা প্রসেস হয়। তার ফলে গল্পের থেকে পাঠক মাঝে মাঝেই পিছিয়ে পড়ে। এতে কাহিনীর যে প্রভাব তা মার খায়। এই লেখা বাংলায় হ্যারি পটারের সমকক্ষ হবার দাবী রাখে। বরং আরো উন্নত সমকালীন ও বিজ্ঞানভিত্তিক। একটু এ ব্যাপারটা দেখবেন। যদিও এটা একেবারে আমার নিজস্ব পাঠকের মতামত।
ReplyDeleteআপনার মত পাঠকই আমার গুরু,তাই সেই মতকে অগ্রাহ্য করার ধৃষ্টতা যে আমার নেই।আমি বড় লেখক নয়,শুধু পাঠকের ভালোবাসার কাঙাল। 🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
ReplyDelete