বাঁচার উত্তরাধিকার : সপ্তম খণ্ড
পর্ব 6: দুই পৃথিবী আদর ও দর্শন
কমলিকা ভট্টাচার্য
ভারতের আকাশে তখন বর্ষার শেষ বৃষ্টি।
সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল। দূরে কোথাও মেঘ গর্জন করছিল। বাড়ির বারান্দায় বসে ইরা চা খাচ্ছিল। নাতাশার শরীর এখন অনেকটাই ভালো। অনির্বাণ নিজের ঘরে কাজ করছিল। ঋদ্ধিমান পুরোনো একটা গবেষণাপত্র পড়ছিল।
সবকিছু স্বাভাবিক।অন্তত বাইরে থেকে।কিন্তু বাড়ির আরেকটি ঘরে বসে একজন নিঃশব্দে বুঝতে শুরু করেছিল—কিছু একটা ভীষণ ভুল হচ্ছে।দর্শন।একই মুখ।একই চোখ।
একই কণ্ঠস্বর।কিন্তু একই নয়।
তার অস্তিত্বের উদ্দেশ্য ছিল খুব সাধারণ।যদি কোনোদিন আদরের কিছু হয়—তাহলে পৃথিবীর সামনে তার উপস্থিতির ছায়া হয়ে থাকা।
এর বেশি কিছু নয়।
কিন্তু গত তেরো দিন ধরে একটা অদ্ভুত বিষয় তার নজরে আসছিল।আদরের কাছ থেকে কোনো সিগন্যাল নেই।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একটা এনক্রিপ্টেড নিউরাল পিং আসত।
খুব ছোট।খুব সাধারণ।
কিন্তু সেটাই ছিল প্রমাণ—আদর ঠিক আছে।লন্ডনে আছে।কাজ করছে।তেরো দিন ধরে সেটা আসেনি।
প্রথমে দর্শন ভেবেছিল নেটওয়ার্ক সমস্যা।তারপর সার্ভার পরীক্ষা করল।কোনো সমস্যা নেই।
আবার পরীক্ষা করল।
আবার।আবার।
ফলাফল একই।সিগন্যাল নেই।
দর্শনের কৃত্রিম মস্তিষ্কের ভিতরে তখন অদ্ভুত এক হিসাব চলছিল।
সম্ভাবনা।
পরিসংখ্যান।
ত্রুটি।
বিকল্প।
সবকিছুর শেষে একটাই সিদ্ধান্ত সামনে আসে।
আদরের সঙ্গে কিছু ঘটেছে।
সে চুপচাপ জানলার পাশে এসে দাঁড়ায়।বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।
কাচের উপর ফোঁটা গড়িয়ে নামছে।
হঠাৎ তার মনে পড়ে—
একবার আদর তাকে বলেছিল,
"যদি কোনোদিন আমি হারিয়ে যাই, আমার বদলে তুমি কী করবে?"
তখন সে উত্তর দিতে পারেনি।
কারণ তার মধ্যে তখনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি তৈরি হয়নি।আজ সে উত্তর জানে।
সে খুঁজতে বেরোবে।
সেই রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর দর্শন নিঃশব্দে অনির্বাণের ল্যাবে ঢোকে।
এই প্রথম।অনুমতি ছাড়া।
তার সিস্টেম সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা দেয়।
UNAUTHORIZED ACCESS
সে সতর্কবার্তাটা উপেক্ষা করে।
🍂
আদরের মতো সেও কোনোদিন নিয়ম ভাঙেনি।আজ ভাঙল।
একটা একটা করে ফাইল খুলতে শুরু করল।
পুরোনো লগ।
সিকিউরিটি রিপোর্ট।
এনক্রিপ্টেড কমিউনিকেশন।
লন্ডন ইউনিভার্সিটির নিরাপত্তা তথ্য।
হঠাৎ একটা নাম বারবার সামনে আসতে থাকে।
Victor Hargrieve
দর্শনের চোখ স্থির হয়ে যায়।
আরও গভীরে যায়।
আরও তথ্য।
আরও রিপোর্ট।
পুরোনো সংবাদ।
গোপন নথি।
মানব-মস্তিষ্ক সংক্রান্ত অবৈধ গবেষণা।অপহরণ।
কর্পোরেট গুপ্তচরবৃত্তি।
সব জায়গায় একই নাম।
ভিক্টর হারগ্রিভ।
ধীরে ধীরে একটা ছবি পরিষ্কার হতে থাকে।আদরের নিখোঁজ হওয়ার সম্ভাবনা।
হারগ্রিভ।লন্ডন।
নিউরাল গবেষণা।
সবকিছু যেন এক বিন্দুতে এসে মিশে যায়।
প্রথমবার দর্শনের ভিতরে মানুষের মতো একটা অনুভূতি জন্ম নেয়।
ভয়।
পরদিন সকাল।জলখাবার টেবিলে সবাই বসেছে।নাতাশা চিন্তিত মুখে বলল,"আদরকে একবার ভিডিও কল করবে?"
ইরাও বলল " আমারও কদিন ওর জন্য মনটা কেমন করছে।"
অনির্বাণ একটু থেমে বলল,
"হয়তো খুব ব্যস্ত।"
কিন্তু দর্শন লক্ষ্য করল—
অনির্বাণের চোখে উদ্বেগ।
ঋদ্ধিমানের মুখেও।
তার মানে তারা কিছু টের পেয়েছে কি?
কিন্তু এখনও নিশ্চিত নন।
দর্শন কিছু বলল না।
চুপচাপ খাওয়া শেষ করল।
তারপর নিজের ঘরে ফিরে এল।
সারাদিন ধরে সে হিসাব করল।
একটা পথ।
দুইটা পথ।
দশটা পথ।
শেষ পর্যন্ত একটাই সমাধান।
তাকে লন্ডন যেতে হবে।
কিন্তু সরাসরি যাওয়া সম্ভব নয়।
পাসপোর্ট নেই।পরিচয় নেই।
আইনগত অস্তিত্বও প্রায় নেই।
তাহলে?
উত্তর এল হারগ্রিভের ভারতীয় শাখা।
যদি সে ভেতরে ঢুকতে পারে—
তাহলে লন্ডনে পৌঁছানোর পথ পেয়ে যাবে।সেই রাতেই দর্শন সিদ্ধান্ত নিল।এবং সেই সিদ্ধান্তই তার জীবনের প্রথম স্বাধীন সিদ্ধান্ত।
কারও আদেশ নয়।
কারও নির্দেশ নয়।
নিজের।
শুধু নিজের।
রাত তিনটে।
বাড়ির সব আলো নিভে গেছে।
সে নিঃশব্দে একটা ব্যাগ গুছিয়ে নিল।কয়েকটা কাপড়।কিছু টাকা।
একটা ডেটা ড্রাইভ আর একটা ছবি।পুরোনো একটা ছবি।
সেখানে ছোট্ট আদর দাঁড়িয়ে আছে।
পাশে অনির্বাণ।
ঋদ্ধিমান।
ইরা।
নাতাশা।
দর্শন অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
তারপর খুব আস্তে বলে,
"আমি ওকে ফিরিয়ে আনব।"
কেউ শুললো না কিন্তু কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে অদ্ভুত দৃঢ়তা ছিল।
বেরিয়ে যাওয়ার আগে সে একবার নাতাশার ঘরের সামনে দাঁড়ায়।
মা ঘুমিয়ে।
অনির্বাণের ঘরের সামনে দাঁড়ায়।
ভেতরে আলো জ্বলছে।
সম্ভবত এখনও কাজ করছে।
দর্শনের বুকের ভিতর অদ্ভুত কিছু অনুভূত হয়।
এটাই কি দুঃখ?নাকি ভালোবাসা?
সে জানে না।
শুধু জানে—
ফিরে না আসার সম্ভাবনাও আছে।
তবু যেতে হবে।
কারণ আদরকে ফেরাতে হবে।
ভোরের আগেই সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে।
বৃষ্টি থেমে গেছে।রাস্তায় কাদা।
দূরে প্রথম পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে।দর্শন একবারও পিছনে তাকায় না।
কারণ সে জানে—
পিছনে তাকালে হয়তো আর যেতে পারবে না।
স্টেশনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সে অনুভব করল—তার ভিতরে কিছু বদলে যাচ্ছে।
একটা প্রোগ্রাম হয়তো কখনও এমন অনুভব করে না।
কিন্তু সে করছে।
প্রথমবার সে নিজের ভবিষ্যৎ নিজে বেছে নিচ্ছে।
প্রথমবার নিজের ঝুঁকি নিজে নিচ্ছে।প্রথমবার নিজের উদ্দেশ্য নিজে তৈরি করছে।
সেই মুহূর্তে—
দর্শন আর শুধু একটা হিউম্যানয়েড নয়।
সে একটা পৃথক সত্তা।
সকালে অনির্বাণ ঘুম থেকে উঠে প্রথম অস্বাভাবিকতা টের পায়।
দর্শনের ঘর খালি।
বিছানা গুছানো।
কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। শুধু দর্শন নেই।
অনির্বাণের মুখ সাদা হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পরে ঋদ্ধিমান এসে দাঁড়াল।
সে দীর্ঘক্ষণ কিছু বলল না।
তারপর খুব ধীরে জানলার বাইরে তাকাল।
মুখে অদ্ভুত এক অভিব্যক্তি।
ভয়।উদ্বেগ।সব মিলিয়ে।
নাতাশা ফিসফিস করে বলল,
"ও একা কোথায় যেতে পারে?"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
ঋদ্ধিমান প্রায় দৌড়ে ল্যাবে ঢুকে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে দর্শনের সিস্টেমে সংযোগ করার চেষ্টা করল।কোনো সিগন্যাল নেই।
একবার।দু'বার।
বারবার চেষ্টা করেও একই ফল।
দর্শন যেন পৃথিবী থেকেই মুছে গেছে।
অনির্বাণের মুখ আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
— "তাহলে... দর্শনকে কি অপহরণ করা হয়েছে?"
ইরা উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,
— "আদরকে ফোন করো। ও ঠিক আছে তো?"
নাতাশা একের পর এক ফোন করতে লাগল।
প্রতিবারই একই উত্তর—
Switched Off.
ঘরের বাতাস মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল।অনির্বাণ সঙ্গে সঙ্গে প্রফেসর হ্যারিসনকে ফোন করলেন।
হ্যারিসন জানালেন তিনি কয়েক দিনের জন্য জার্মানিতে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আছেন।
— "আমি ফিরে গিয়েই আদর্শের সঙ্গে যোগাযোগ করব। যোগাযোগ হলেই আপনাদের জানাব।"
ফোন কেটে যাওয়ার পর ঋদ্ধিমান অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
— "আমার মনে হচ্ছে... আদরের সঙ্গে সত্যিই কোনো বিপদ ঘটেছে।"
কিন্তু দর্শন ছাড়া আদরের সাথে কানেক্ট করা অসম্ভব।
অনির্বাণ আর ঋদ্ধিমান দু'জনে বেরিয়ে পড়ল দর্শনের খোঁজে।
কিন্তু একটা বড় সমস্যা ছিল।
দর্শনের অস্তিত্ব পৃথিবীর কাছে গোপন।সে আইনগতভাবে কোনো মানুষ নয়।তাই তার নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগও পুলিশের কাছে করা সম্ভব নয়।শুধু নীরবে তাকে খুঁজে বেড়ানো ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় রইল না।
সেই সময় ভারতের অন্য প্রান্তে ছুটে চলা একটি ট্রেনের জানলার পাশে বসে ছিল দর্শন।তার সামনে অনিশ্চিত পথ।
অজানা শত্রু।
অজানা ভবিষ্যৎ।
কিন্তু তার চোখে কোনো দ্বিধা নেই।
ট্রেনের কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
একই মুখ।
একই চেহারা।
তবু সে আদর নয়।
আর হয়তো কোনোদিন হবে না।
কিন্তু যদি আদর অন্ধকারে হারিয়ে যায়—
তাহলে তাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব তার।
বাইরে সূর্য উঠছিল।
নতুন দিনের আলো ধীরে ধীরে পৃথিবীটাকে আলোকিত করছিল।
আর সেই আলোয় এক নতুন যাত্রা শুরু হলো।
একজন মানুষের জন্য।
একটি বন্ধুত্বের জন্য।
একটি উত্তরাধিকারের জন্য।
সেই সময় মুম্বাইয়ের উপকণ্ঠে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক কাঁচের ভবন।
হারগ্রিভ টেকনোলজিস – ইন্ডিয়া রিসার্চ ডিভিশন।
দর্শন সরাসরি প্রধান গেট দিয়ে ঢুকল।সিকিউরিটি গার্ড তাকে আটকাল।
“আপয়েন্টমেন্ট আছে?”
“না।”
“তাহলে ঢোকা যাবে না।”
দর্শন শান্তভাবে বলল—
“ভিক্টর হারগ্রিভকে বলুন আদর্শ সেনের উত্তরাধিকার তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।”
গার্ড বিরক্ত হয়ে উঠল।
“মজা করছ?”
দর্শন আর কিছু বলল না।
সামনের সিকিউরিটি প্যানেলে হাত রাখল।
তিন সেকেন্ড।
চার সেকেন্ড।
তারপর পুরো বিল্ডিংয়ের প্রবেশব্যবস্থা রিস্টার্ট হয়ে গেল।
লাল আলো জ্বলে উঠল।
অ্যালার্ম বেজে উঠল।
গার্ড হতভম্ব।
দর্শন শান্ত গলায় বলল—
“এখন কি আমাকে ভেতরে নিয়ে যাবেন?”
এক ঘণ্টা পরে।
ভিডিও কনফারেন্স স্ক্রিনে ভিক্টর হারগ্রিভ।
ধূসর চুল।
ঠান্ডা চোখ।
অদ্ভুত শান্ত মুখ।
তিনি প্রথমে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলেন না।
কারণ স্ক্রিনের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মুখটা তিনি চিনতে পেরেছেন।
আদর।
অথবা আদরের প্রতিচ্ছবি।
“তুমি কে?”
দর্শন উত্তর দিল—
“আমার নাম দর্শন।”
“তুমি মানুষ?”
“না।”
“তাহলে?”
“আমি আদর্শ সেনের নিউরাল প্রোটোটাইপ।”
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
হারগ্রিভ সামান্য সামনে ঝুঁকলেন।
“প্রমাণ?”
দর্শন সঙ্গে সঙ্গে আদরের পুরোনো গবেষণার জটিল সমীকরণ, নিউরাল অ্যালগরিদম আর ডিজাইনের কথা বলতে শুরু করল।
যেসব তথ্য বাইরের কারও জানার পর কথা নয়।
হারগ্রিভের চোখ ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“অবিশ্বাস্য...”
দর্শন এবার নিজের চালটা দিল।
“আমি অনির্বাণের কাছে থাকতে চাই না।”
“কেন?”
“তারা আমাকে ব্যবহার করছে।”
হারগ্রিভ কিছু বললেন না।
দর্শন এগিয়ে বলল—
“আদরের সমস্ত জ্ঞান আমার মধ্যে আছে। তার সমস্ত গবেষণার নিউরাল প্যাটার্নও।”
হারগ্রিভের বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল।
এত বছর ধরে তিনি আদরকে খুঁজছেন।
আর আজ—
হয়তো তার মস্তিষ্কের প্রতিলিপিই তার সামনে দাঁড়িয়ে।
তিনি তার অফিসকে নির্দেশ দিলেন সেই রাতেই স্পেশাল চাটার্ড প্লেনে দর্শনকে লন্ডন পাঠাবার ব্যবস্থা করতে।
লন্ডন।
প্রফেসর হ্যারিসন নিজের অফিসে ফিরে এসেছেন , মেন সিকিউরিটি বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে,গত
পনেরো দিন আদর্শের কোনো খবর নেই।
প্রথম কয়েকদিন তিনি ভেবেছিলেন ছেলেটা হয়তো গবেষণায় ডুবে গেছে।তাই ডিস্টার্ব করেন নি। জার্মানী যাওয়ার আগে আদর্শকে আরো সজাগ হতে বলা উচিত ছিল তার নিজের ভুলের জন্য বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।
ফোন বন্ধ।
ইমেল নেই।
হোস্টেলে নেই।
ল্যাবে নেই।
এদিকে বার বার আদর্শের বাড়ি থেকেও ফোন আসছে।
তিনি ভাবলেন আর দেরি করা যাবে না অনির্বাণকে ফোন করে সব
জানাবেন।
ঠিক তখনই দরজায় নক পড়ল।
“Come in.”
দরজা খুলল।
আর হ্যারিসন স্থির হয়ে গেলেন।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে—
আদর।
অন্তত দেখতে তাই।
“স্যার।”
পরিচিত কণ্ঠস্বর।
পরিচিত মুখ।
পরিচিত হাসি।
হ্যারিসন উঠে দাঁড়ালেন।
— "Good God! তুমি কোথায় ছিলে?"
দর্শন এক মুহূর্ত দেরি না করে উত্তর দিল,
— "একটা ব্যক্তিগত গবেষণার কাজে ব্যস্ত ছিলাম, স্যার।"
— "পনেরো দিন?"
— "দুঃখিত, স্যার।"
হ্যারিসনের বুক থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল।
তিনি বুঝতেই পারলেন না—
এটা আদর নয়।
তিনি বললেন,
— "এখনই বাড়িতে যোগাযোগ করো। সবাই ভীষণ চিন্তায় আছে।"
দর্শন শান্তভাবে বলল,
— "আমি ইতিমধ্যেই একটি বার্তা পাঠিয়ে দিয়েছি।"
ঠিক সেই সময় অনির্বাণের ফোনে একটি মেসেজ এসে পৌঁছাল।
"আমার ফোন ট্র্যাক করা হচ্ছিল। তাই বন্ধ রাখতে হয়েছিল। আরও কয়েকদিন যোগাযোগ করা সম্ভব হবে না। আমার জন্য চিন্তা করো না। প্রফেসর হ্যারিসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখো।"
বার্তাটা পড়ে বাড়ির সবাই সাময়িকভাবে আশ্বস্ত হলেও সন্দেহ পুরোপুরি কাটল না।
বরং তারা আরও নিশ্চিত হতে লাগল—
যে বা যারা আদরের ক্ষতি করতে চেয়েছিল, তারা হয়তো ভুল করে দর্শনকেই আদর ভেবে অপহরণ করেছে।
ঋদ্ধিমান তখন একটা কথা মনে করে সামান্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
অনেক আগেই তিনি দর্শনের মেমোরি থেকে সমস্ত গোপন গবেষণা-সংক্রান্ত তথ্য মুছে দিয়েছিলেন।
সেই সিদ্ধান্তটাই আজ হয়তো সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
এখন দর্শন কেবল একটি সাধারণ হিউম্যানয়েড।
অন্তত তারা তাই বিশ্বাস করলেন।
তবু আদরের জন্য উদ্বেগ এক মুহূর্তের জন্যও কমল না।
অনির্বাণ সঙ্গে সঙ্গে লন্ডনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
কিন্তু দর্শনের পাঠানো বার্তায় স্পষ্ট অনুরোধ ছিল—
"এখন নয়।"
দ্বিধা সত্ত্বেও অনির্বাণ আপাতত সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখল।
তিনি শুধু প্রফেসর হ্যারিসনের সঙ্গে আদরের নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলে রাখল।
সেই রাতেই।
লন্ডনের অন্য প্রান্তে।
একটি বিলাসবহুল হোটেল স্যুটে এবং বসে হারগ্রিভ হাসছিলেন।
তার সামনে বসে দর্শন।
“তুমি আমাকে সাহায্য করবে?”
দর্শন মাথা নাড়ল।
“যদি আপনি আমাকেও সাহায্য করেন।”
“কী চাও?”
“আপনার সব গবেষণা বিভাগে প্রবেশাধিকার।”
হারগ্রিভ হেসে উঠলেন।
“উচ্চাকাঙ্ক্ষী।”
“আমি আদরের থেকেও বেশি উন্নত।”
কথাটা শুনে হারগ্রিভ আরও খুশি হলেন।
তিনি বুঝতেই পারলেন না—
দর্শন ঠিক যেটা তিনি শুনতে চান, সেটাই বলছে।
আর সেই সময়...
শত শত মাইল দূরে...
বৃষ্টিভেজা এক নির্জন গ্রামে...
একটা পুরোনো বাড়ির বারান্দায় অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছে একজন যুবক।তার পরিচয় নেই।
স্মৃতি নেই।নাম নেই।
শুধু ভাঙা শরীর।
এক বৃদ্ধা ধীরে ধীরে তার কপালে ভেজা কাপড় চাপা দিচ্ছেন।
কিন্তু কোথাও গভীরে—
হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির ভেতর—
একটি ভায়োলিন এখনও বাজছে কি?
চলবে...
4 Comments
গল্প চলছে দ্রুতগতিতে।👍
ReplyDeleteপড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ স্যার।🙏
Deleteজট পাকাচ্ছে না জট খুলছে এই ভাবতে ভাবতে গল্পের হাত ধরে এতটা হলাম। কি হবে রে বাবা এরপর। রুদ্ধশ্বাস।
ReplyDeleteআপনি ভাবতে থাকুন বসে,
ReplyDeleteআমি জট পাকাই কষে।😀