কেন লিখি
গৌতম বাড়ই
ধুলোটে সময় আর তামার মতন আকাশ। এই যে লিখে ফেললাম তো! কেন লিখলাম? এটাই আমার স্বাধীনতা। আমার মনে হল সময়ের মুখের ওপর যেন ধুলোর আস্তরণ পড়েছে, ওটা পরিষ্কার করা উচিত বা আকাশের নীলরঙে এখন মন ভিজিয়ে সবুজ করা নয়, তামাটে বর্ণের অনিশ্চয়তা।ওখানেও অশনি সংকেত!
মনটা তো ছিল। সেই আবহমান কাল ধরে অনেকটা এগিয়ে সেই গুহামানবের যুগ থেকেই ধরি- মা শোনাচ্ছেন গল্প তার বেবিদের ( শিশু বললাম না, এই শব্দটি ভারী মিষ্টি লাগে আমার, একটা ভাষায় চলতি সব শব্দ ঢুকিয়ে দিলেই তো ভাষা আরও আধুনিক হয়ে ওঠে, বেঁচে থাকে) বাচ্চারা শুনছে। মা তার কথা বলছেন ছন্দে ছন্দে। শিশুরা হাততালি দিচ্ছে। উল্লাস করছে। মা অসুস্থ হচ্ছেন, কথা বলতে পারছেন না।পাশে মা গোছের হয়ত অন্য কেউ কিছুটা শুনেছেন, তাই বলছেন নিজস্ব ঢং বা নিজের কিছু কাল্পনিক শব্দ দিয়ে। অথচ দেখবার বিষয়, সবাই কিন্তু ভালো গল্পকার বা ইচ্ছে করলেও কল্পনাবিলাসী হতে পারে না। এ যেন এক সহজাত ব্যাপার! সবাই তো আর সবকিছু হয় না। এই হওয়ার পেছনেও একাধিক কারণ থাকে। যেমন কারণ থাকে একজন অপরাধীর,অপরাধকে ভালোবেসে অপরাধী হওয়ার। গড ফাদার বা মাদার গোছের কিছু তো থাকে উৎসের পেছনে! তেমনি সাহিত্য সংস্কৃতি সবকিছুতেই।
এই কথা হারিয়ে যাওয়া থেকে হয়ত মানুষ কথা সংরক্ষণ করতে লিপির আবিষ্কার বা প্রচলন শুরু করল। সে গুহাচিত্র, হায়ারোগ্লিফিক আমরা সবাই কিছু কিছু জানি। সবাই পড়ে না, তবে কেউ কেউ তো সাহিত্য সংস্কৃতির খবর রাখে এবং পড়েও। তেমনি সবাই লেখে না, কেউ কেউ তো লেখে। সবাই খেলে, তারমধ্যে কেউ কেউ তো বড় খেলোয়াড় হয়। প্রসঙ্গের পর প্রসঙ্গ আসবে, উদাহরণের পর উদাহরণ। তাই আমি কেন লিখি? বলছি একজন মুখ্যুসুখ্যু হয়ে।
ভালো লাগে তাই লিখি। এ জিনিস কারোরই হঠাৎ করে একদিন শুরু হয়ে যায়নি। পড়তে পড়তেই মনে হয়, আরে আমার মনের অন্দরেও তো কত কথা জমে থাকে সে বাস্তব, অবাস্তব, জানা, অজানা, দূর সীমানা ছাড়িয়ে, চাওয়া-পাওয়ার বাইরে , শোক দুঃখের গাথা অথবা আনন্দোৎসব কতকিছু। আমিও তো লিখে ফেলতে পারি তা, অন্যরা পড়ুক। হয়ত দেখা যাবে তাদের সাথে আমার চেতনার গভীরে অদৃশ্য সেই সব ঘটনার কত কত মিল! সত্যি কথা বলতে কী স্বপন কুমারের বারো আনার ( ৭৫ পয়সা) বই ছিল আমার কৈশোরে মনের গোগ্রাসে গেলা খাদ্য এবং আমার লেখার প্রথম উৎস। বিশ্বাস হচ্ছে না তো! বিশ্বাস করুন এটাই সত্যি। ডিটেকটিভ সিরিজের সেই বইগুলোর ওপরে লেখা থাকত, কলেজ স্টুডেন্টদের জন্য। আর যাবতীয় আকর্ষণ ছিল ওটাই। শুধুমাত্র একটা বাক্যবন্ধ। একটা বাক্যসরণীর ধাপ। পড়ার বইয়ের ভেতর ওই চটি বই লুকিয়ে রাত গভীরে পড়া।
জীবনের একটা সময় এসে পেছনে তাকালে মনে হয় এই যে এতকিছু ঘটে গেল অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে , সে কী আমার জীবনে? সবকথা মনে পড়ে না। যে স্মৃতি চর্চিত হয় সেটাই বেশি সতেজ থাকে। কতকিছু হাল্কা, ভালো করে মনেই পড়ে না। অথচ এটুকু স্মৃতিতে আছে, আমার সাথে এরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল। স্মৃতি আর বর্তমান দুয়ের মিশেলেই হয়ত আমরা সবাই লিখি। কিছু কল্পনা কবিতা হয়ে যায়, কিছু গল্প বা নাটক। আর একটা কথা মনে পড়ে লেখার উৎস সেই গঙ্গোত্রীকে ধরতে, তখন ষষ্ঠ শ্রেণী, বড়মামার লাইব্রেরি থেকে আনা শরৎচন্দ্রের 'দেবদাস' পড়েই ফেললাম গরমের ছুটির এক অলস দুপুরে। বড়রা ক্লান্ত, শ্রান্ত, বড়মামা অফিসে। শেষ হয়ে গেল দুদ্দাড় করে। চোখে জল বারবার, বুকের ভেতর কষ্ট। এখন ভাবি নর-নারীর এই যে প্রেম বিরহ অবচেতনের টান ,এ এক অমোঘ প্রাকৃতিক টান। এর কোনও বয়সের সীমারেখা নেই। আমিও আমার এক্সারসাইজ খাতায় , সম্ভবত ব্রান্ড ছিল বঙ্গলিপি, লিখলাম একটি প্রেমের গল্প। দিন কয়েকের চেষ্টায়। ঢুকিয়ে রাখলাম বইয়ের শেলফ -এ। বেশকিছু মাস পরে সে খাতা বড়মামার হাতে। আমি তো দেখেই শূন্যবুকে ধড়ফড় করে মরছি, কী হয়! কী হয়! বড়মামা শুধু বললে, এবারে তোর নায়ক কাশীনাথ কে মেরে ফেলতে হবে। দেবদাসের এফেক্ট এটা। তুই যে দেবদাস পড়েছিস বুঝতেই পারছি। দেবদাস তুই এরপরেও আরও অনেকবার পড়বি দেখে নিস। শেষে একদিন বলবি, ধুর এটা আবার গল্প হল বটে! তবে বড়মামা এটুকু বললেন, তুই লিখে যা। না, আমি লিখে যেতে পারিনি টানা সময়কাল ধরে। লিখি একটু আধটু এটুকু সত্যি। ওই যে লেখার প্রতি ভালোবাসা আছে বলে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে আমার এই লেখার ব্যাপারে সর্বাগ্রে মনে পড়ে। ওঁনার সেই অবিস্মরণীয় কথা, লেখা এক মারাত্মক নেশা। যে এই নেশায় ফেঁসেছে, সেই মরেছে।
তাই না লিখে থাকতে পারি না বলে লিখি। কাঁচা লেখাই হয়ত লিখি, পাকা লেখার সন্ধানে থাকি বা আছি । লিখি, কোনদিন যদি হাত পাকিয়ে একটা ভালো লেখা লিখতে পারি। জীবন সায়াহ্নে হলেও চলবে। যে লেখা মানুষকে শুধু আনন্দ নয়, একটা গভীরতা দান করে, চেতনা সৃষ্টি করে , তার সন্ধানে লেখকরা হয়ত আজীবন নিজের বোধিবৃক্ষ তলে বসে থাকেন। যদি বোধিলাভ হয়। আর একথালা পায়েস আধুনিকা সুজাতার হাতে! তবে লেখায় মানুষ জীবন ছুঁয়ে না থাকলে সে লেখা লেখাই নয় মনে করি।
আনন্দ হলে লিখি। দুঃখ হলে লিখি। শারীরিকভাবে অসহায় হলেও আরও আরও লিখতে ইচ্ছে করে। সময় ইতিহাস এই জীবন সবকিছুর জন্যই লিখতে ইচ্ছে করে। একটা গোটা মানুষের ভেতর যে দ্বৈততা, যে নারী-পুরুষের ভাবনা, সেটাও লেখার অন্যতম বিষয়। মানুষের সম্পর্কের জটিলতা, কুটিলতা, সৃষ্টিশীলতা এসবই তো লেখার উপকরণ। সাজিয়ে রেখেছে এ জগত, ছোঁয়া পাই, আমরা কখনও উদগ্রীব হয়ে উঠি এসব নিয়ে , তখনই লিখি। আমি তাই লিখি। এই কেন লিখি।
0 Comments