জ্বলদর্চি

কেন লিখি/মৌমিতা চ্যাটার্জী

কেন লিখি
মৌমিতা চ্যাটার্জী

কেন লিখি!
গভীর প্রশ্ন। পৃথিবীজোড়া এত কাজ থাকতে কেন এই কলম নিয়ে বসে গজগজ, খসখস!
পাতার পর পাতা হিজিবিজি কাটার কাজটার বেলাতেই ভিতরঘরে ঢেউ তোলপাড় হল! 
বেশ কঠিন প্রশ্ন। একটু একটু করে উত্তরপর্বে আসি। আমার লেখার ক্ষেত্রে বেশ কিছু কারণ আছে।

আসলে বয়সের ঘড়ি যত দ্রুত ক্ষয়ের দিকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলেছে , অনুভব করছি ফেলে আসা অতীতের উপকূলে তত যেন একটার পর একটা সুনামি উঠছে। যখন সেই সুনামির ধাক্কা আর সামলাতে পারি না, বুঝি হৃৎপিন্ডটা এবার ছিঁড়েফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে কোনো এক অজানা যন্ত্রণায় কিংবা অবাধ্য আবেগের হুরোপাটিতে, তখনই লিখে ফেলি সেই  সব অব্যক্ত চপলতার পীড়াকে চেনা অচেনা ছন্দে। ব্যস আমার একান্ত ব্যক্তিগত সাদা দুনিয়ার মাটিতে ওরা মুখ থুবড়ে পড়ে । দুছত্র কাটাকুটির পর কত শোক মিলিয়ে যায়। সঙ্গে  বুকের পাথরচাপা ভাবটাও। পরিবর্তে কল্পনারা কবিতার আল্পনা হয়ে ফুটে ওঠে। 
    একটা গাছ শক্তপোক্ত ভাবে দাঁড়াতে গেলে দরকার হয় একটা শক্ত শিকড়। লেখার সময় কিংবা আগে পরে আমার ভীষণ মনে হয় সেই শিকড়ের কথা-  মায়ের কথা।
🍂
আজ যেটুকু দুচারটে শব্দ, অক্ষর এদিক ওদিক করি তা মায়েরই বদান্যতায়।
ছোটো থেকেই দেখেছি মা বাড়িতে একটা সাহিত্যের আবহাওয়া তৈরি করে রাখত সবসময়ই। সেই আবহের স্নেহআঁচলের ছত্রছায়ায় আমার সাহিত্যানুরাগ একটু একটু করে বেড়ে ওঠে। ছয় কী সাতবছর বয়সের পর থেকে প্রত্যেকটা জন্মদিনে মা হাতে তুলে দিত কখনও রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায় সুকুমার রায়, বিভূতিভূষণ, হেমেন্দ্রকুমার রায়, নীহাররঞ্জন গুপ্ত  তো আবার কখনও কোনো বিশেষ অমনিবাস। তখন অত বুঝবার মত বোধগম্যতা তৈরিই হয়নি। মা পড়ত আমি শুনতাম। মনে পড়ে, ঘনঘোর বর্ষা, রবীন্দ্রজয়ন্তীতে মায়ের রিনরিনে গলায় দেবতার গ্রাস, আফ্রিকা, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ, শেষের কবিতার ঝরণা ঝরত। 
      শুনতে শুনতে তারপর একদিন মনের ভিতর একটা আন্দোলন উঠল। তখন আমি শৈশব আর কৈশোরের মাঝামাঝি চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। কিছু কথা ও  অনুভূতি পাতায় পাতায় সারিবদ্ধভাবে জন্ম দিয়েছিল কিছু এলোমেলো ভাবের। সেই থেকেই শুরু হল পথচলা। সেই সূর্যোদয়ের ক্ষণ থেকে আজ মধ্যগগনের এই বিস্তীর্ণ যাত্রাপথে অক্ষরবিন্যাসকে কতটা গোছাতে পেরেছি জানিনা, তবে চেষ্টা করি একটা গোটা আকাশকে বাঁধার। তারপর সেখানে কিছু অনুভবকে শব্দের রেশমসুতোয় বুনে পৌঁছে দিতে সেইসব সৃজনশীল মানুষের দরবারে , যারা নিঃস্বার্থ শর্তে রোজ স্বপ্ন উপহার দিতে চায়। 
     আমার কাছে একটা লেখার খাতা মানে একজন নির্ভরযোগ্য সঙ্গী, যে রোজ আমাকে অতীত ভাবায়, বর্তমান শেখায় ও ভবিষ্যতের আয়না দেখায়। লেখার তাগিদে পড়া আবার পড়ার শেষে লেখা…এই আবর্তিত চক্রে প্রবেশের পরই মনের আঁধার কেটে যায় প্রজ্ঞার আলোকে। 
   লেখার খাতাখানা আমার সেই বিশ্বস্ত সুহৃদ যার কাছে আভ্যন্তরীণ ক্ষত, বিমর্ষ বিষাদ, আনন্দ বা যে কোনো অতীত মহাকাব্যকে সযত্নে সংরক্ষণ করে রাখতে পারি অনায়াসেই। নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাব বলেই হয়ত রোজ দুচার কলম লেখার মধ্যে বারবার হারাই। 
      
আমাকে ছুঁয়ে গেছে  কলম।
তাইতো, একটু একটু করে চলার পর, থমকে দাঁড়াই।
চোখ খোঁজে ইতিউতি।
চৌরাস্তার মোড়, বুড়োশিবতলা, অলিগলি,
অজানা অবসর।


মনখারাপের বিকেলে, আমি ভর করে তোমার কবিতার ডানায়,
পৌঁছে যাই নীলপদ্মের দেশে।
দেখতে পাই, মায়াবতী মেঘে, কেমন তোমার গভীর দৃষ্টি ফুটে ওঠে!


নিশ্ছিদ্র ঘুমে তুমি হাতড়ে খোঁজো আধপোড়া মায়াবী স্বপ্ন?  
কিছুটা কি এখন‌ও বেঁচে আছে ব্যবধানে?
উষ্ণ অথচ মোলায়েম উদ্বেগের স্রোতে ভিজে যায় তোমার হৃদয়ের চারণভূমি?
তুমি জেগে ওঠো আনমনে?
তারপর, হাতে তুলে নাও বিদায়ী অতীত?
অধরা বন্ধন ছদ্মবেশে আজ‌ও ঝরে পড়ে উদাসীন অক্ষরে?
তুমি লিখে চলো অনন্তের কাব্যকথা?
আমি তো নিবিড় শূন্যতায় আচ্ছন্ন তখন।
প্রতি রাতের, প্রতি প্রহরের প্রতিজ্ঞায়,
প্রতি আঁধারের ইশারায়,
তোমার সহিষ্ণু কলম, আমায় ছুঁয়ে যায়।
       
আশা রাখি,  কলমের উষ্ণতাই আমার মধ্যে আমৃত্যু বাঁচিয়ে রাখবে পুরোনো সেইসব স্মৃতির দস্তাবেজ যাতে মিশে আছে আমার আংশিক সত্তা।

Post a Comment

0 Comments