ব্রহ্মসূত্র : শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি
পর্ব ১৯
প্রীতম সেনগুপ্ত
সজ্জন-গৃহীত না হলে ভারতে কোনও মতবাদ আদৃত হয় না। তবে এটাও স্বীকার করা যেতে পারে যে, এই মত গুপ্তভাবে চলে আসছিল, নিম্বার্ক একে প্রকট করলেন। ভারতের দার্শনিক মতবাদের কোনও শৃঙ্খলা নেই। উপনিষদের দার্শনিক মতও কোনও শৃঙ্খলার উপর রচিত হয় নি। শৃঙ্খলার ফলে মতবাদ সঙ্কীর্ণ হয়। পাশ্চাত্যে এই শৃঙ্খলার বড়ই আদর। কিন্তু শৃঙ্খলা অবাধ ও অপ্রতিহত চিন্তাগতি রুদ্ধ করে --- মৌলিকতার বীজ নষ্ট হয়। ইউরোপের মতে আগে দ্বৈতভাব, পরে বিশিষ্টাদ্বৈত, তারপর দ্বৈতাদ্বৈত, তারপরে অদ্বৈত মতের প্রকাশ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ভারতে প্রথম জন্মগ্রহণ করলেন শঙ্করাচার্য, মধ্ব তার অনেক পরে। এইভাবে তথাকথিত চিন্তার ক্রমবিকাশকে ধরে নিয়ে পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা বেদের ঐতিহাসিকতা নির্ণয় করতে গিয়ে বারবার ভুলের ফাঁদে পড়েন। তার ফলে তাঁরা বলেন, আগে বেদে প্রকৃতি- উপাসনা ছিল পরে ব্রহ্মোপাসনা এসেছে। এবং সেই অনুযায়ী আগে শঙ্করের জন্ম না হয়ে আগে মধ্বের জন্ম হওয়া উচিত ছিল।
একাদশ শতাব্দীতে নিম্বার্ক তাঁর দ্বৈতাদ্বৈতবাদ প্রচার করেন। নিম্বার্ক শিষ্য আচার্য শ্রীনিবাস ‘বেদান্ত-কৌস্তুভ’ নামে এক ভাষ্য ব্যাখ্যা প্রণয়ন করেন। শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাস গুরু কেশবভারতীও এই ভাষ্যের উপর ব্যাখ্যা প্রণয়ন করেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে দেবাচার্য, ভাষ্যের চতুঃসূত্রীর উপর সিদ্ধান্তজাহ্নবী নামে এক বৃত্তি রচনা করেন।
নিম্বার্কের ভাষ্য আলোচনা প্রসঙ্গে এটা লক্ষ্যণীয় যে, ব্রহ্মের কারণত্ব এই সূত্রগুলিতে তিনি ভেদাভেদবাদ প্রতিষ্ঠা করার জন্যই তাঁর যুক্তির প্রয়োগ করেছেন। একটি সূত্রে তিনি প্রথমে শঙ্করের মতোই ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু অপর সূত্রে তিনি ‘অনন্যত্বম’ এই শব্দটিকে ‘ন তু অত্যন্ত ভিন্নত্বম্’ --- সম্পূর্ণ ভিন্ন, অন্যপ্রকার নয় --- এইরকম ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ, কার্যকারণ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক নয়; ব্রহ্ম ব্যতিরেকে এর কোনও পৃথক অস্তিত্ব নেই। এইভাবে অপর আর একটি সূত্র থেকে পাওয়া যায় --- ব্রহ্ম এবং জীব ভিন্ন, আরও কিছু সূত্রে পাওয়া যাচ্ছে, ব্রহ্ম থেকে এদের কোনও পৃথক সত্তা নেই। এই সূত্রার্থগুলি থেকে নিম্বার্ক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, জড় এবং চেতন জগতের সঙ্গে ব্রহ্মের ‘ভেদ’ ও ‘অভেদ’ উভয় সম্বন্ধই আছে। কিন্তু এক এবং অভিন্ন আধারের বস্তুতে এইরূপ ঘটনা সম্ভব নয়। ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে যে, একমাত্র মৃত্তিকাই সত্য, মৃত্তিকা দ্বারা নির্মিত বস্তুগুলি সত্য নয়; কারণ, তারা নাম মাত্র, তাই অসৎ। একটি মৃৎপাত্রের দৃষ্টান্ত গ্রহণ করা যাক। যদিও মৃত্তিকা এবং ঘট মূলত একই সত্তার অন্তর্ভুক্ত, তবু যখন আমরা একে ঘট আকারে দেখি তখন তার মৃন্ময়ত্ব আমাদের জ্ঞানের বিষয়ীভূত হয় না, আবার যখন একে মৃত্তিকারূপে দেখি, তখন আমরা ঘটকে পাই না। সুতরাং আমাদের এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে হয় যে, এর স্বরূপ মায়া, কারণ একে আমরা এর যথার্থরূপে জানতে পারি না। যা অন্যবস্তু থেকে অভিন্ন, অথচ যাকে ভিন্ন বলে মনে হয় এবং যার অস্তিত্ব অভেদত্বের উপরই নির্ভরশীল তাকে মায়া ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। সুতরাং ঘট এবং মৃত্তিকার মধ্যে মৃত্তিকাই সত্য, ঘট সত্য নয়। ব্রহ্ম এবং জগতের মধ্যেও এইরূপই সম্পর্ক। একমাত্র ব্রহ্মই সত্য, জগৎ মিথ্যা। বৃহদারণ্যক উপনিষদে আছে ---“ এই সবই যখন একমাত্র আত্মা তখন অন্য কিছুকে দেখা কিরূপে সম্ভব?” আবার ছান্দোগ্য উপনিষদে আছে ---“যে নানাত্ব দেখে, সে ভ্রান্ত; যে একত্ব দেখে সে-ই যথার্থ দ্রষ্টা।”কিন্তু যারা অজ্ঞানে নিমগ্ন, তাদের কাছে ভেদত্ব ও অভেদত্ব উভয়কেই সত্য বলে মনে হয়। কেননা শাস্ত্র থেকে অভেদত্বের জ্ঞান জন্মায়, আর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ভেদত্বই অনুভূত হয়। এটা হল আপেক্ষিক বা ব্যবহারিক অনুভব। অভেদত্বই সত্য। সুতরাং নিম্বার্কের মতবাদ অভ্রান্ত হতে পারে না।
(সহায়তা: ব্রহ্মসূত্র -- স্বামী বীরেশ্বরানন্দ)
(ক্রমশ)
0 Comments