মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি
ঝোপে-জঙ্গলে, বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায় ছেলেটি। মনের সুখে ছাগল চরায় সমবয়সী বন্ধুদের সাথে। কখনো আবার একপাল গরু নিয়ে চলে যায় মাঠে-বনের ধারে। শ্রাবণ-ভাদ্রে বাড়িতে বড়ো টান। তালের আঁটি চুষে কেটে যায় একবেলা। প্রয়োজনে দু'বেলাও।
বাড়ির একপাশ দিয়ে বয়ে গেছে শিলাবতী নদী, অন্যদিকে তারই বিধ্বংসী খাল। বর্ষায় সে নদী এবং খাল দুই-ই ফুলে-ফেঁপে উঠে। জল ছুটতে থাকে কানায় কানায়। ছিপ্ হাতে ছেলেটি বেরিয়ে পড়ে মাছ ধরতে। টোপ বানাতে চাই কালো বিছে। সে বিছের খোঁজে বাঁশঝাড়ের গোড়া তোলপাড় করে। নিঃশব্দে খায় ঝাঁক ঝাঁক মশার কামড়। সাড়ে ছ’বছরের ছেলেটি ভরা শিলাবতীর খালে দশ বছরের দাদার সঙ্গে নৌকা পার হচ্ছিল। গরুর খাবারের জন্য ঘাস কেটে আনতে হবে। হাতে ধরা একটা কাস্তে। নৌকা বাইছিল দাদা, ছেলেটি ধরেছিল হাল। খালের মাঝখানে এসে নৌকার মাথা গেল ঘুরে। পিছনে হালের উপর প্রচণ্ড একটা চাপ পড়ল। আলতো করে ধরে রাখা হালধরা ছেলেটি কিছু বুঝে উঠার আগেই পড়ে গেল জলের গভীর স্রোতে, প্রচণ্ড এক ঘূর্ণির মধ্যে। পিছন ফিরে দাদা দেখে ভাই নৌকায় নেই। ওদিকে ওদের মা খালের অন্য পাড়ে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতন দেখছেন তার এক সন্তান জলে তলিয়ে যাচ্ছে, আর এক সন্তান নৌকার পাটাতনের উপর বাঁশ হাতে দাঁড়িয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে দেখছে ভাই কোথায়। জলের ঘূর্ণির মধ্যে হঠাত্-ই দেখে আলতো কালো মাথার অংশ। মুহূর্তকাল সময় নষ্ট করেনি দাদা। নৌকা ভেসে যায় যাক, নৌকার বাঁশ ভেসে যায় যাক-আগে ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে হবে। নিজের জীবন বিপন্ন করে ভাইকে বাঁচাতে খালের সেই ভয়ঙ্কর স্রোতে দেয় ঝাঁপ। ভাইকে ধরে দশ বছরের দাদার জলের সঙ্গে চলে যুদ্ধ। অবশেষে জল হার মানে দাদার দুরন্ত লড়াইয়ের কাছে। ভাইকে টানতে টানতে খালের কিনারে নিয়ে আসে। একেবারে মৃত্যুপুরী থেকে ভাইকে ফিরিয়ে আনে দাদা। দশ বছরের দাদার এই দু:সাহসিকতার খবর নদী-খাল পরিবেষ্টিত নিজের গ্রাম ছাড়া আর কোথাও পৌঁছায় না। এই খবর কে পৌঁছে দেবে? সেই খবরদারি করার লোকজনই তো নেই তখন এই গ্রাম বা তার আশেপাশের গ্রামে। থাকলেও এই পাণ্ডববর্জিত ডোবা-নালা-খানাখন্দে ভর্তি এই এলাকায় কেই বা আসতে চায়?
শরতের শিলাবতী ভারি সুন্দর। দু'পাশে মাথা দোলায় সাদা কাশফুলের গুচ্ছ। তার ছায়া দোলে জলে। অফুরন্ত সৌন্দর্যরাশি প্রকৃতির বুকে সূচনা করে এক অপূর্ব দৃশ্যের। সে দিকে চেয়ে কত কি ভাবতে থাকে ছেলেটি। মুগ্ধ দু'চোখে লাগে খুশির মাতন। শীতের ভোরে আঁচলে মুড়ি ভরে বাবার সঙ্গে মাঠে যায়। কুড়োয় খসে পড়া সোনালি ধানের শিস্। হাড় হিম করা ঠাণ্ডায় শরীর কাঁপতে থাকে। কেঁচো মাটিতে ঠোক্কর লাগে। পা ফেটে রক্ত ঝরে। তবু কি এক নেশায় আচ্ছন্ন হয় সে। আদিগন্ত খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে তন্ময় হয়ে সকালে দেখে সূর্যোদয়, বিকালে সূর্যাস্ত। আশ্চর্য সব অভিজ্ঞতা নিয়ে কেটে যায় সারাটা দিন। শুধু দিনের বেলা নয় অঘ্রান-পৌষ মাসের এই সময়টা মাসের বেশির ভাগ সন্ধে-রাতগুলোও কেটে যায় মাঠে দাঁড়িয়ে। মাঠে মাঠে তখন পাকা সোনার ধান। দিনের বেলায় কাস্তে দিয়ে কেটে রেখে আসা হত এই ধান। সন্ধে থেকে রাত দশটা–এগারোটা অবধি চলে সেই ধান আঁটানো। বাবা, দাদা কাকারা সেই ধানের আঁটি বাঁধে। ছেলেটির কাজ ছিল সেই আঁটিগুলি জড়ো করা। স্থানীয় ভাষায় যাকে বলে ‘জাঙি’ দেওয়া। দু’দিকে মুখ করে এই আঁটি জড়ো করে। আড়াই পণ আড়াই পণ করে পাঁচপণ, কিংবা তিনপণ তিনপণ করে ছ’পণ ধান দু’দিকে রাখে। একখানা গরুগড়ি যাতে মাঝে ঢুকতে পারে সেই ফাঁকটুকু রাখে। পরের দিন গরুর গাড়ি করে চাপিয়ে ওই জড়ো করা ধানের আঁটি নিয়ে আসা হয় খামারে। পল্লীবাংলার বুকে সন্ধের যে সময়টাতে বেজে উঠত শাঁখ সে সময়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে ছেলেটি ধানের আঁটি জড়ো করতে। সন্ধ্যা শেষে ধীরে ধীরে নেমে আসে শীতের রাত। সে এক অপূর্ব মায়াঘন ছবি! ধানের আঁটি জড়ো করতে করতে অনবদ্য রঙিন ছবি দেখে অভিভূত হয়ে যায় সে। অমাবস্যার পর আসে প্রতিপদ। খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে শীতের রাতে দেখে প্রতিপদের চাঁদ, দেখে দ্বিতীয়ার চাঁদ। তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, সপ্তমী, একাদশী পেরিয়ে একসময় আসে পূর্ণিমা। সেই পূর্ণিমাতে শীতের রাতের অপার মহিমা চাক্ষুস করে ছেলেটি। অবর্ণনীয় সে রূপ, সে রঙ! গায়ে ভালো পোশাক নেই, হাড় হিম করা ঠাণ্ডায় শরীরে কাঁপন লাগছে। পায়ে জুতো নেই, কেঁচো মাটিতে পায়ে ঠোক্কর লাগে, ধানের আঁটিতে আঘাত লেগে হাতের আঙুল ব্যথা করে তবু যেন কি এক ভালো লাগায় বিভোর হয় ছেলেটি। কি মহিমময়, সুন্দর শীতের রাত! ধানের আঁটি হাতে ধরে বিহ্বল হয়ে পড়ে সে, থমকে দাঁড়িয়ে যায় শীতের রাতের অপরূপ শোভা দেখে। তখন বিদ্যুতের আলো গ্রাস করেনি গ্রামগুলিকে। দূরের গ্রামগুলিতে জ্বলে উঠে লন্ঠন, হ্যারিকেনের আলো। ধান সেদ্ধ করা উনুন থেকেও বেরিয়ে আসে আলোর শিখা। শীতের মায়াবী রাত আরো বেশি যেন মায়াচ্ছন্ন। তার চোখের সামনে হাজির হয় এক রূপকথার জগত। স্বপ্নিল আনন্দে পুলকিত হয় সে।
বাবা হেঁটে চলেছেন আগে আগে। আর আট বছরের ছেলেটি ঠিক তার পিছনে। বাবার মাথায় মস্ত বড়ো একটা আটাং গাছের তৈরি ঝাঁকা। আলু, পটল, মুলো, বেগুন করে ঝাঁকা ভর্তি শীতকালীন সবজি। বাড়ি থেকে বারো কিলোমিটারের বেশি পথ হেঁটে গিয়ে কয়াপাটের হাটে এই সবজি বেচবেন। বিক্রি করে যা আয় হবে তা দিয়ে সংসার চালাবেন তিনি। এত বড়ো একটা বোঝা মাথায় নিয়েও তিনি দিব্যি হন হন করে হেঁটে চলেছেন, দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো কষ্ট নেই, ক্লান্তি নেই। দিব্যি হাসিমুখে চলেছেন আর মাঝে মাঝেই পিছন ফিরে ছেলেটিকে বলছেন –‘কইরে আয়, পিছিয়ে পড়ছিস যে? তাড়াতাড়ি আয়। হাটে গিয়ে বসতে যে অনেক বেলা হয়ে যাবে।’
ছেলেটির মাথার বোঝাটা ছোট হলেও সেটা তো একটা বোঝা। ভারী হয়ে যেন মাথায় চেপে বসেছে। শুধু হেঁটে যেতেই কষ্ট হচ্ছে ছেলেটির, তায় আবার একটা বোঝা। তখন মনে ইচ্ছে জাগছে ইস, বাবার মতো কবে বড়ো হব? বড়ো হলে নিশ্চয়ই বাবার মতো সেও হাসিমুখে বোঝা মাথায় হেঁটে যেতে পারবে। হাটে আনাজপতি বিক্রি করে যা আয় হল, বাবা ছেলেটির জন্য বই-খাতা-কলম কিনে দিলেন। ছেলেটির বুকে তখন সমুদ্রসম আনন্দের ঢেউ! ভুলে গেল পথের যাবতীয় ক্লান্তি, কষ্ট। হ্যাঁ, এইভাবে ছেলেটির জীবনের পথ চলা শুরু। বাবার কাছ থেকে এই সময়েই খুব অল্প বয়সেই একটা পরম সত্য উপলব্ধি করল জীবনে কষ্ট করে বড়ো হলে সুখপাখিটা একদিন অবশ্যই ধরা দেবে। একই সঙ্গে এটাও বুঝতে পারে - পথ চলতে হবে সততাকে সামনে রেখে, কারুর প্রতি মনে হিংসা না রেখে, অন্যের সাফল্যে ঈর্ষাকাতর না হয়ে, কোনও সময়েই ধৈর্যহারা না হয়ে। এতে করে সে শান্তিতে থাকবে, অন্যরাও শান্তি পাবে, পথ চলা হবে আনন্দদায়ক।
কাদায় ভরা খানাখন্দ পেরিয়ে, মেঠো আলপথে হোঁচট খেতে খেতে, এবড়ো-খেবড়ো পাথর, কাঁকর, নুড়িতে ভরা ভয়ঙ্কর চমকাইতলার দুরু দুরু বুকে খালি পায়ে হেঁটে যেভাবে ছেলেটি বাবার সঙ্গে হাটে গিয়েছিল সেই একই কষ্ট সয়ে ছেলেটি বাবার সঙ্গেই ঘরে ফিরে আসে। তখন সন্ধে নামছে পৃথিবীতে। দীর্ঘ পথ হেঁটে পা যে বড়ো ব্যথা করছে ছেলেটির। বাবা ভরসা দিলেন-একটুখানি সরষের পায়ে ভালো করে বুলিয়ে নে-দেখবি পা ব্যথা কমে যাবে। ছেলেটি বাবার কথা শুনে তাই করে।
রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে ছেলেটি ভাইবোন এবং পাড়ার কয়েকজন মিলে উনুনের সামনে গোল হয়ে বসে পড়ে। মধ্যমণি সেই বাবা। তিনি গল্প শোনাচ্ছেন। রাক্ষস-খক্কোস, রাজপুত্র-রাজকন্যা, পক্ষীরাজ ঘোড়া, তেপান্তরের মাঠ নিয়ে সে সব কি সুন্দর গল্প। গল্প শুনতে শুনতে কল্পনার জগতে হারিয়ে যায় ছেলেটি আর স্বপ্ন দেখে বাবার মতো বড়ো হয়ে কবে সেও এরকম করে গল্প বলে সবাইকে চমকে দেবে। বাবাকে সামনে দেখে আরও একটা স্বপ্ন জাগে ছেলেটির তা হল বড়ো হয়ে বাবার মতো একজন ভালো মানুষ হবে।
বর্ষাকাল। খালের ওপারে জমিতে ধান রোয়া চলে। ছেলেটির একটি কাজ ভোরবেলা চাষের কাজে বেরিয়ে যাওয়া বাবা-দাদা-কাকাদের মুড়ি খাওয়াতে যাওয়া। মুড়ি নিয়ে গিয়ে একটা বিশেষ ঘটনা ছেলেটির মনের মধ্যে দারুণভাবে দাগ কাটে। ছেলেটির পরিবার একেবারে দারিদ্র্যলাঞ্ছিত। ভাত যেমন জুটে না অনেক সময়, তেমনি মুড়িও জুটে না। শুধু জোয়ারের আটা। তা দিয়ে রুটি বানানো হয়েছে। আগের রাতে বানানো। পরেরদিন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে সে রুটি। সেই শক্ত রুটিকেই মুড়ির বেলার খাবার হিসাবে নিয়ে যায় ছেলেটি। ছপছপে কাদা ভরা আলপথে দাঁড়িয়ে দেখে বাবা বা দাদারা সে রুটি গুলিকে পাশের জমির জলে যে জলটা কিছুটা থিতিয়ে গেছে সেইসব জায়গায় ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। শক্ত রুটিগুলো জমির কাদাজলে ভিজে নরম হয়ে যায়। তারপর সেগুলো একটা একটা করে কুড়িয়ে খেয়ে পেট ভরাট করে বাবা-দাদা-কাকারা। রুটি খাওয়া হয়ে গেলে আঁজলা ভরে ওই কাদা-পচা জমির জলই পান করে। চোখ বড়ো বড়ো করে দেখে শুধু তার বাবা-কাকা না, কম-বেশি সকল চাষিভাইয়েরা একই চিত্র নাট্য রচনা করে। সেই সব দৃশ্যগুলিই একের পর এক্ম জলছবির মতো ভেসে উঠে ছেলেটির মনের পর্দায়। সে সব কথা লিখতে কখন নিজের অজান্তেই তুলে নেয় কলম। নতুন আঙ্গিকে, নতুন ধাঁচে লিখে চলে মনের আনন্দে। অন্যের ভালোলাগা-কি মন্দ লাগা সে সবে তার কিছু এসে যায় না।
1 Comments
ভিড়ের থেকে আলাদা লেখা বা কোনো কাজ আমার সব সময় ভালো লাগে,তাই আপনার লেখাটিও ভালো লাগলো।
ReplyDeleteতবে একটা কথা অন্যের ভালো লাগাটাতে কিছু যায় না আসলে অসুবিধা নেই ,মন্দ লাগাটাকে কিন্তু মূল্য দেওয়া উচিত কারণ তাহলে শেখার অবকাশ থাকে না হলে হয়ত আমরা দাম্ভিক হয়ে উঠব।
এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত।🙏