দূর দেশের লোকগল্প— ২৯২
কাঠবিড়ালিরা একলা থাকে
নেপাল (এশিয়া)
চিন্ময় দাশ
দুনিয়া শুদ্দু সব্বাই জানে, কাঠবিড়ালি হোল বেশ চটপটে। সব সময় লেজ নাচিয়ে তিড়িং-বিড়িং করে এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। আর, মুখে কিচ-কিচ আওয়াজ তো লেগেই আছে তাদের।
এক বনে একটা কাঠবিড়ালি ছিল। স্বভাবে ভারি অলস। আর, তেমনি ভয়ানক পাজি। নিজে কুটোটিও নাড়বে না। গতর খাটাতে হবে, এ কথাটা ভাবতেও চায় না কখনও। শুয়ে-বসে দিন কাটাতে পারলেই, বেশি খুশি সে। দুনিয়ায় মাত্র দুটো কাজই তার পছন্দ— পেট ভরে খাওয়া, আর আরাম করে পড়ে পড়ে ঘুমানো।
কিন্তু পেট তো আর বাতাস খেয়ে ভরবে না। তার জন্য বাসা ছেড়ে বেরোতে হবে। খাবারের খোঁজ করতে হবে। তবে না পেট ভরবে। কিন্তু খাবারের জন্য, ছোটাছুটি করতে হবে, ভাবলেই মহা মুশকিলে পড়ে যায় সে।
বেশি সমস্যা হয় শীত পড়লে। ঘর থেকে বের হওয়াই মুশকিল। আরও বেশি মুশকিল খাবারের হদিশ পাওয়া। চার দিক যে তখন বরফে চাপা পড়ে থাকে! খাবার-দাবারের কোনও চিহ্নই চোখে পড়ে না কোত্থাওই।
শীতের দিনগুলোতেই আসল চেহ্রাটা ধরা পড়ে কাঠবিড়ালিটার। অলস লোক। শীতের জন্য খাবার জমিয়ে রাখার কাজ করেই না কখনও। তক্কে-তক্কে থাকে। এর-ওর বাসা থেকে খাবার চুরি করে আনে। তাতেই কাটিয়ে দেয় শীতের দিনগুলো।
সে বছর শীতটা এক্টু বেশিই পড়েছে। জব্বর ঠাণ্ডা। বাইরে বেরোনই দায়। হয়েছে কী, পাশের গাছেই থাকে একটা মা-কাঠবিড়া্লি। বাপটা নাই। দুটো বাচ্চা নিয়ে, মা একা থাকে। খাবার-দাবার জমা করে রাখে, শীত পড়বার আগে থেকেই।
কাঠবিড়ালি ঠিক করে নিয়েছে, ঐ বাসা থেকেই খাবার জোগাড় করে নেবে এ বছর। মা-কাঠবিড়ালির একটা অভ্যাস আছে। শীতের দিনগুলোতে বনের সবাই নিজের নিজের বাসায় বন্দী হয়েই দিন কাটিয়ে দেয়। বাইরে বেরোয় না। মা-কাঠবিড়ালি করে কী, একটা গাছের ডাল ভেঙে নিয়ে, নদীর পাড়ে চলে যায়। বরফের ঢাল বেয়ে ছোটাছুটি (স্কেটিং-এর মতো) করতে ভারি মজা লাগে তার।
কাঠবিড়ালি এটারই অপেক্ষায় ছিল। সেদিন মা-কাঠবিড়ালি বেরিয়ে গেছে নদীর দিকে। এদিকেই চোখ রেখে বসেছিল কাঠবিড়ালি। দেখেই তার মন নেচে উঠল। বাসা ছেড়ে বেরিয়ে, পাশের গাছটায় গিয়ে উঠে পড়েছে।
অন্যের বাসা। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরোটা একবার দেখে নিল। এক দিকে দুটো বাচ্চা। অন্য দিকে এক কোণে এক কাঁড়ি বাদাম জমিয়ে রাখা। আনন্দে লেজ নেচে উঠল তার। চটপট কয়েকটা বাদাম পেটে পুরে দিল। তার পর দুটো বাদাম তুলে নিয়ে, নেমে এলো গাছ থেকে।
পর দিন আর বেরোলো না বাসা থেকে। দুটো বাদাম খেয়েই কাটিয়ে দিল।
তার পরদিন। সেই সকাল থেকেই পেট চুঁই-চুঁই করতে লেগেছে। পাশের বাসার দিকে চোখ রেখে বসে রইল কাঠবিড়ালি।
সেদিনও মা-কাঠবিড়ালিটা বেরিয়েছে বরফে দৌড় করতে। আবার সেই বাসায় গিয়ে বাদাম তুলে নিয়ে এলো সে।
দিন তিনেক এভাবে চলবার পর, মা-কাঠবিড়ালির নজর পড়ল। তার বাদাম যেন কমে যাচ্ছে। তাহলে নিশ্চয়ই কেউ তার বাদাম চুরি করে নিচ্ছে।
অনেক ভেবেও, কোন উপায় খুঁজে পেল না বেচারি। কী করে চোর ধরা যাবে? আর, হাতে-নাতে না ধরে, কাউকে তো আর দোষ দেওয়া যায় না।
সোজা খরগোশের বাসায় গিয়ে হাজির হয়েছে মা-কাঠবিড়ালি। খরগোশ হল এই বনজঙ্গলের সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব। বেশ ঠান্ডা মাথা। কারো সাতে-পাঁচে থাকে না। কিন্তু দরকার পড়লে, সকলকেই সাহায্য করে সে। আসলে, খরগোশের মাথাটা খুব ভালো। অনেক বুদ্ধি খেলে তার মাথায়। সেকারণে, বনজঙ্গলের সকলেই তাকে মানে। চেহারায় একেবারে পুঁচকেটি হলে কী হবে, মোড়লের মতো সবাই মান্য করে থাকে খরগোশকে।
মা-কাঠবিড়ালীকে ঘরের সামনে দেখে, খরগোশ মস্করা করে, বলল—কী, গিন্নিমা! কী সংবাদ? হঠাৎ আমার এখানে কেন আপনি?
মা-কাঠবেড়ালি বলল-- মজার কথা নয়, মোড়লমশাই। ভারি বিপদ আমার।
খরগোশ বলল—বিপদ? তোমার আবার কী বিপদ হল?
--কেউ আমার বাসায় ঢুকে, খাবার চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এখন এই শীতের দিন। ঘরে দু’-দুটো ছোট বাচ্চা আমার। খাবার যদি ফুরিয়ে যায়, তাদের মুখে কী দেবো আমি? তুমি কিছু একটা বিহিত করো এর। আমার মাথায় তো কিছুই আসছে না।
খরগোশ এবার মোড়লের গলায় বলল-- কিন্তু এখন তো শীতের দিন। বাইরে তো কেউই বেরোয়ই না এ সময়। তোমারও তো ঘরেই থাকার কথা। তাহলে চুরি হচ্ছে কী করে?
কাঠবিড়ালি বলল-- না গো, আমার একটা বদ অভ্যাস আছে। শীতের দিনে আমি একটু বরফের উপর গা গরম করতে যাই। সেই সুযোগে কেউ ঘরে এসে, আমার বাদাম তুলে নিয়ে চলে যায়। কিন্তু কে নিচ্ছে, সেটা আমি টের পাই না।
অনেকক্ষণ থম মেরে বসে রইল খরগোশ। দুটো লম্বা কান আছে তার। কান দুটোকে এদিক ওদিক নাচিয়ে, খরগোশ বলল-- তুমি এক্টুখানি বোস। আমি ফিরে আসছি।
মা-কাঠবিড়ালিকে বসিয়ে রেখে, বেরিয়ে গেল খরগোশ। খানিক বাদে ফিরেও এলো। বলল-- এই জিনিসটা নিয়ে যাও। এটা হল রাবার গাছের আঠা। ভয়ানক জিনিষ। একবার লাগলে ছাড়িয়ে ফেলা কঠিন কাজ। কয়েকটা বাদামে হালকা করে মাখিয়ে রাখবে এটা। তারপরে দেখো, সব খেল খতম হয়ে যাবে চোর বাবাজির।
যেমন কথা, তেমন কাজ। ঘরে ফিরে এসে, কয়েকটা বাদামে আঠা লাগিয়ে রাখল মা-কাঠবিড়ালি।
এবার ঘর থেকে বের হল মা-কাঠবিড়ালি। সেদিন বেরোবার সময় একটু সাড়া-শব্দ করল কিচ-কিচ করে। একটু নেচেও নিল ঘরের সামনেটায়। যাতে সকলের চোখে পড়ে, যে সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
পাশের একটা গাছেই বসে আছে কাঠবিড়ালি। সে তক্কে তক্কে ছিল। ঠিক দেখে নিয়েছে মা-কাঠবিড়ালি বেরিয়ে গেল। সাথেসাথেই গিয়ে ঢুকে পড়েছে মা-কাঠবিড়ালির বাসায়। সামনের বাদামটা তুলে কামড় বসিয়েছে, তার পরেই ফ্যাসাদ।
বাদামে কামড় বসিয়েছে, এটুকুই যা। তার পর, দাঁত তো নড়েই না। কিন্তু মুখও যে আর নড়ে না!
মাথায় তো আকাশ ভেঙ্গে পড়ল কাঠবিড়ালির। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে বেচারা। এমন বিপদ তো জীবনে কখনো হয়নি। কারণটা কী? অনেক চেষ্টা করেও, মুখ হাঁ করতে পারছে না। বাদামটা তার নিজের মুখে। কিন্তু না পারছে খেতে, না পারছে জিনিসটা ফেলে দিতে। ভয়ে ভাবনায় মাথা ঘুরছে বনবন করে। কিন্তু উপায় কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না।
হঠাৎই মনে হল, এখানে এভাবে আটকে থাকলে, যদি ঘরের মালকিন পৌঁছে যায়! তাহলে তো হাতে-নাতে ধরা পড়ে যেতে হবে। সরে পড়াই ভালো। মুখের বাদাম মুখেই আটকে রইল। ওই অবস্থাতেই পালিয়ে এল সেখান থেকে।
পালিয়ে গেলেও, নিজেকে পুরো আড়াল করতে পারল না সে। একটা গিরগিটি ছিল গাছের ডালে, তার চোখে পড়ে গেল কাঠবিড়ালিটা। মুখে একটা বাদাম ধরা। অন্য একটা গাছ থেকে বেরিয়ে আসতে দেখলো তাকে।
এদিকে, মা-কাঠবিড়ালি ঘরে ফিরে দেখল, আঠা লাগানো বাদামের একটা বাদাম নাই।
ভারি আনন্দ হল মনে। নিশ্চয়ই কেউ ঘরে ঢুকেছিল। সে গিয়ে মোড়লের ঘরে হাজির।
সব কথা শুনে খরগোশ বললো-- কী গিন্নীমা, বুদ্ধিটা কেমন দিয়েছিলাম? বললাম না, চোর ধরা পড়বে।
মা-কাঠবেড়ালি বলল-- আমার বাদাম খোয়া গেছে। কিন্তু চোর তো ধরা পড়েনি। কী আর উপকার হলো আমার তাতে?
খরগোশের মুখ জোড়া হাসি-- ব্যস্ত হয়ো না, বাছা। ধৈর্য ধরো। সবুর করো একটু। ধরা তো পড়েই গেছে চোর। শুধু সাজা দেওয়াটাই যা বাকি।
অবাক গলায় মা-কাঠবিড়ালি বলল—চোর আবার কখন ধরা পড়ল?
জবাব না দিয়ে, খরগোশ তাকে বলল-- তুমি এক কাজ কর। সারা বনজঙ্গল ঘুরে সবাইকে বলে দাও, বিকেলবেলা শালতলার মাঠে সভা হবে। সবাই যেন সেখানে হাজির হয়।
দূপুর পর্যন্ত গোটা বন চষে বেড়াল মা-কাঠবিড়ালি। এক একটা পাড়ায় যায়। কিচ-কিচ করে হাঁক পেড়ে বলে—শোন গো সবাই। শোনো গো সবাই। শীতের খাবার চুরি হয়ে যাচ্ছে। মোড়লমশাই ব্যবস্থা নিয়েছে। আজ বিকেলবেলা সবাই শালবনের মাঠে জড়ো হবে। সেখানে সভা ডাকা হয়েছে। যেতে হবে সব্বাইকেই। একজনও যেন বাদ না যায়।
মোড়লের হুকুম বলে কথা। বনের যত জীবজন্তু, পাখপাখালি সবাই হাজির হয়েছে সভায়। মোড়ল সবাইকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। বাদামের চিহ্ন কারুর মুখে নেই। কিন্তু এমনটা তো হতে পারে না। বাদাম তো মুখে ধরা থাকতেই হবে। তখন খোঁজ শুরু হল, কে আসেনি।
গিরগিটিটা এতক্ষণ চুপ করে বসেছিল। মুখ খোলেনি। এবার বলল-- আমাকে হুকুম দাও, মোড়ল। আমি চোর ধরে আনছি।
গোটা সভা অবাক। বলে কী গিরগিটিটা? একেবারে আস্ত চোরকে ধরে নিয়ে আসবে !
খরগোশও খানিক অবাক। বলল-- তুমি চোর ধরে আনতে পারবে? যাও তাহলে।
দু’জন সাগরেদকে সঙ্গে নিয়ে, গিরগিটি গিয়ে হাজির হলো কাঠবিড়ালির ডেরায়।
হঠাৎ তার বাসায় তিনটা গিরগিটিকে দেখে, ভড়কে গেছে বেচারা।
তিন-তিনটা গিরগিটি। চেহারাগুলোও বেশ তাগড়াই তাদের। একেবারে চ্যাংদোলা করে কাঠবিড়ালিটাকে তুলে আনলো। সভার মাঝখানে নামিয়ে দেওয়া হোল যখন, দেখা গেল, একটা বাদাম কামড়ে ধরা আছে কাঠিবিড়ালির মুখে। বুঝতে বাকি রইল না কারও, চুরির কাজটা কে করছে আজ ক’দিন ধরে।
হই-হই করে উঠলো সবাই। অনেকে চিৎকার করতে লাগল—ভারি বদমাস তো। কড়া শাস্তি দাও ওকে, মোড়ল। এমন শাস্তি, কেউ যেন কোনদিন ভুলতে না পারে।
মোড়ল হল খরগোশ! বেশ শান্ত স্বভাবের জীব। সহজে মাথা গরম হয় না তার। ঠান্ডা মাথায় বলল-- চুরি করেছে। ধরাও পড়ে গেছে, হতভাগা। সকলের সামনে মুখ দেখানো ভার হয়েছে ওর। এটা কম বড় শাস্তি নয়। মুখ থেকে বাদামটা খুলে দিচ্ছি। বলে দিচ্ছি, আর কোনদিন কারও ঘরে ঢুকে চুরি না করে।
আবার হই-হই করে উঠল সবাই-- অত সহজে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। শাস্তি দিতেই হবে। আবার কোন দিন কার ঘরে ঢুকে পড়বে, তার কোন ঠিক নেই। এই শীতের দিনে আমরা সবাই সংকটে পড়ে যাব।
খরগোশ বলল-- ও একা দোষী, এটা ভেবো না। কাঠবিড়ালি জাতটার স্বভাবই হল, সারা বন ঘুরে ঘুরে বেড়ানো। কার কোথায় কী আছে, নজর রাখা। আর সুযোগ পেলে, টুক করে তুলে নিয়ে সরে পড়া। আমি হুকুম দিচ্ছি, বনজঙ্গলে সবাই আমরা দল বেঁধে থাকি। আজ থেকে কাঠবিড়ালিরা আর কারো সাথে দল বেঁধে, একসাথে থাকতে পারবে না। এমনকি, ওরা নিজেরাও দল বেঁধে থাকতে পারবে না। একা একাই বাস করবে ওরা। আরও বলে দিচ্ছি, এই নিয়ম কোনদিন অমান্য করবে না কেউ।
সেদিন থেকে সেটাই হয়েছে। মোড়ল খরগোশের দেওয়া বিধান আজও চলে আসছে বনে জঙ্গলে। অন্য সবাই দল বেঁধে বাস করে। কাঠবিড়ালিগুলোই কেবল একসাথে থাকে না। একা একাই জীবন কাটাতে হয় তাদের।
0 Comments