ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা : ১১২
সম্পাদক : স্বাগতা পাণ্ডে
চিত্র গ্রাহক: ডঃ প্রবোধ পঞ্চাধ্যায়ী
সম্পাদকীয়
প্রিয় বন্ধুরা,
কেমন আছো সবাই? বর্ষা কাল চলে এসেছে রুমঝুম নুপুর বাজিয়ে। বর্ষা কাল কম বেশি সবারই প্রিয় ঋতু। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, ঘরের মধ্যে গায়ে হালকা চাদর চাপিয়ে খিচুড়ি, ইলিশ মাছ, ডিম ভাজা খেয়ে শুয়ে শুয়ে ভূতের গল্প বা গোয়েন্দা কাহিনী পড়ার মজাটাই আলাদা। আমাদের ছোটবেলায় ঘোর বর্ষায় প্রায়ই রেনিডে হয়ে স্কুল ছুটি হয়ে যেত, তখন আনন্দে লাফাতে লাফাতে আর বৃষ্টি তে ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফেরার মজা টাই আলাদা ছিলো। এখন আর তেমন রেনিডে হয়না স্কুলে, আর তাছাড়া বর্ষার জন্য স্কুল কামাই করার কথা ভাবাই যায় না পড়াশোনার চাপে। তবু ও বলবো বর্ষা ঋতুর আনন্দ টা একেবারে অন্যরকম। আকাশ জুড়ে কালো মেঘের যাওয়া আসা মন ভালো করে দেয়। আচ্ছা, মনের কথায় আমার মনে পড়লো, আমি তোমাদের কথা দিয়েছিলাম যে মনের কথা বলার আর শোনার জন্য কোনো মনের মতো বন্ধু পেলে তোমাদের সাথেও পরিচয় করিয়ে দেব। হ্যাঁ সেরকম বন্ধু পেয়েছি, তোমরা তাকে 'মন দি' বলে ডাকতে পারো। তোমাদের কিছু বলার থাকলে মন দি কে বলতে পারো। এই সপ্তাহ থেকেই শুরু হলো মনদি র মনের পাঠশালা। আর হ্যাঁ ডাক্তার বাবুকে ও কিছু জিজ্ঞেস করার থাকলে অবশ্যই জানাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা গত সপ্তাহে কিন্তু আমি তোমাদের কারো কোনো আঁকা ছবি পাইনি। এ সপ্তাহে অবশ্যই ছবি পাঠাতে ভুলো না কিন্তু। সবাই ভালো থাকো, বাড়ির সবাইকে নিয়ে আনন্দে থাকো।
ইতি তোমাদের স্বাগতা দি।
গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ সাতাশ
রতনতনু ঘাটী
দেবকী দত্তদের বাড়ির গেটের সামনের পলাশ গাছটায় পলাশ ফুটেছে খুব। লালে লাল হয়ে আছে গোটা রাস্তাটা। দেবকীবাবু পলাশ ফোটার সময় হলে সকলকে ডেকে-ডেকে বলতেন , ‘এই পলাশ গাছের চারাটা আমার বাবা তেমোহানি নদীর পাড় থেকে তুলে এনে লাগিয়ে ছিলেন। সে আজ পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেছে! দ্যাখো, তবু গাছটার ফুল ফোটানোর যেন ক্লান্তি নেই।’
গগনজ্যোতি স্কুল থেকে কয়েকটা গ্রামের ওপাশে যে গ্রাম, তার নাম প্রতিমাগড়। স্কুলের নাম প্রতিমাগড় হাই স্কুল। দীন-দুঃখী গ্রাম। তার একটা ছোট হাই স্কুল। ছাত্রসংখ্যা বড্ড কম। সেই স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত ক্লাসে সংস্কৃত পড়ানো হত। ছাত্রছাত্রীরা খুব অনিচ্ছা নিয়ে সংস্কৃত পড়ত। কারণ, এইট পাশ করলে আর সংস্কৃত পড়তে হত না। বিকল্প সাবজেক্ট শুরু হয়েছিল স্কুলে, বুককিপিং। দেবকীবাবু সেই স্কুলে সংস্কৃত পড়াতেন। পরে স্কুল থেকে সংস্কৃত উঠিয়ে দেওয়া হল। একসময় দেবকীস্যার স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে প্রতিমাগড় গ্রামে বিনে পয়সায় ছাত্রদের সংস্কৃত পড়াতেন। রাস্তঘাটে যাকে পেতেন, ধরে-ধরে সংস্কৃত বোঝাতেন।
দেবকীবাবু ছাত্রদের ডেকে-ডেকে বলতেন, ‘জানিস কি, সংস্কৃত ভাষায় পলাশ ফুলের নাম হল ‘কিংশুক’। আর মণিপুরী ভাষায় পলাশকে বলা হয় ‘পাঙ গোঙ’। পলাশ ফুলের সংস্কৃত নাম না হয় জেনে রাখলে কখনও কোনও কাজে লাগবে হয়তো, কিন্তু মণিপুরী ভাষায় পলাশফুলের নাম কী কাজে লাগবে? এসব জেনে ছোটদের লাভই বা কতটুকু?
তবু পলাশ ফুল নিয়ে দেবকী দত্তর গর্বের সীমা ছিল না। উনি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা থেকে পলাশের বর্ণনা মুখস্ত করে জনে-জনে বলতেন, ‘ফাল্গুন মাস আসিয়া পড়িল। বনের গাছের পাতা ঝরিয়া গিয়াছে, কিন্তু পলাশ ও শিমুল গাছগুলো আগুন লাগাইয়া যেন ফুটিয়াছে।’ গগনজ্যোতি স্কুলের সেভেন-এইটের ছাত্রছাত্রীদের এই কথাগুলো ঠোঁটস্থ হয়ে গিয়েছিল।
সেদিন মুকুলকৃষ্ণবাবু একগুচ্ছ পলাশ ফুল নিয়ে হেডস্যারের রুমে হাজির হলেন। হেডস্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার মুকুলকৃষ্ণবাবু, হঠাৎ পলাশ ফুল এনেছেন যে?’
‘এখনই তো আমরা ডি এম সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যাব ওঁর অফিসে? মনে নেই? আমাদের স্কুলের জন্যে ডোনেশনটা কনফার্ম করে নিতে হবে না? তাই ভাবলাম, ডি এম সাহেবের জন্যে বসন্তের সমারোহের একটুখানি সঙ্গে নিয়ে যাই।’
হেডস্যার তারিফ করার গলায় বললেন, ‘আপনি বুঝি কোনও এক সময় কবিতাও লিখতেন বলে মনে হয়? বাঃ! আপনার মধ্যে বেশ একটা কবি-কবি ব্যাপার ঘুমিয়ে থাকে। দেখলে ভাল লাগে! চলুন, তা হলে রওনা হওয়া যাক!’
মুকুলকৃষ্ণবাবু এবং নবনীতস্যার চললেন ডি এম সাহেবের অফিসে। ডি এম সাহেবের সঙ্গে কাদের যেন মিটিং চলছিল। মুকুলবাবুকে দেখে কর্ণার্জুন পাল বেয়ারাকে বললেন, ‘এখনই আমরা আজকেই এই মিটিংটা শেষ করে দিচ্ছি! মুকুলকৃষ্ণবাবু এবং নবনীতস্যারকে ভিতরে আসতে বলো!’
ওঁরা ডি এম সাহেবের চেম্বারে ঢুকতেই গলা তুলে সাহেব বললেন, ‘আসুন, আসুন! আপনাদের জন্যেই তো অপেক্ষা করছি! আজ ফার্স্ট হাফে নবান্ন থেকে দুটো সুখবর পেয়েছি। আপনাদের জানাবার জন্যে কখন থেকে ছটফট করছি!’
মুকুলকৃষ্ণবাবু জানার জন্যে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন, ‘বলুন, কর্ণার্জুনবাবু, আমাদের জন্যে কী সুখবর এসেছে?’
কর্ণার্জুনবাবু বললেন, ‘প্রথমে আপনাদের স্কুলের সুখবরটা দিই? আপনাদের প্রপোজালটা, মানে স্কুলের খেলার মাঠের মাথার উপর শেড তৈরির জন্যে নবান্ন দু’ লক্ষ টাকা সাংশান করে দিয়েছে। এতে হয়তো সব খরচ কুলোবে না। কিন্তু যেটুকু হল, তাই বা কম কী, বলুন?’
হেডস্যার হাত বাড়িয়ে দিলেন ডি এম সাহেবের দিকে। হ্যান্ডশেক করে বললেন, ‘কী বলে যে আমরা আপনাকে ধন্যবাদ জানাব, সে ভাষা আমার জানা নেই! গগনজ্যোতি স্কুলের আজ বড় আনন্দের দিন! আপনাকে আমি একটা সুখবর দিই তা হলে?’
কর্ণার্জুন সাহেব বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। বলুন, বলুন! আজ তা হলে সুখবরেরই দিন!’
🍂
নবনীতস্যার একবার মুকুলকৃষ্ণবাবুর মুখের দিকে তাকালেন। তারপর ডি এম সাহেবকে বললেন, ‘জানেন তো স্যার, আমরা কখনও ভাবিইনি যে, আমাদের স্কুলের মাঠের মাথায় শেড তৈরি করতে পারব। আমাদের স্বপ্ন দেখতে শেখালেন তো মুকুলকৃষ্ণস্যার। ওঁর পৈতৃক বাড়ি আমাদের শাঁখাপোতা গ্রামে। পুকুর, কয়েক বিঘে জলজমি নিয়ে মস্ত একটা বাড়ি। কুসুম নদীর এতদম তীরে। আপনি শুনলে অবাক হবেন, মুকুলবাবু সেই ভিটেমাটি গগনজ্যোতি স্কুলের জন্যে বিক্রি করে দিয়েছেন। সে টাকার পুরোটাই গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠের শেড তৈরিতে খরচ করবেন। এই প্রতিশ্রুতি উনি দিয়ে রেখেছিলেন। এখন তা সত্যি হল।’
‘বাঃ! এটা তো খুব বড় ব্যাপার! তা হলে এবার কাজ শুরু করে দিন নবনীতবাবু? প্রাথমিক ভাবে টাকার উপায় তো হয়ে গেল?’ একটু থেমে থেকে বললেন, ‘এবার আর-একটা বড় খবর দিই? আমাদের জেলায় কোনও স্টেডিয়াম নেই। তাই রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রীর কাছে প্রোপোজাল পাঠিয়েছিলাম। যদি আমাদের নবীনগঞ্জ জেলায় একটা স্টেডিয়াম তৈরি করা হয়। বিধানসভার চলতি অধিবেশনে আমার জেলা একটি কুড়ি হাজার দর্শক-আসনের স্টেডিয়াম পাচ্ছে! খুব তাড়াতাড়ি কাজ শুরু হয়ে যাবে। আমি আমাদের জেলার স্কুলের ছেলেদের এবং মেয়েদের আন্তঃস্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু করতে চাই এবছরই, স্টেডিয়ামের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর-পরই। টুর্নামেন্ট হবে বয়সভিত্তিক—অনূর্ধ্ব-১৪, অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-১৯ ক্যাটিগরিতে। তবে আমরা প্রথমবার অনূর্ধ-১৪ টিমের খেলার আয়োজন করব শুধু। মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েই যাতে ছেলেমেয়েরা খেলায় অংশ নিতে পারে, সেভাবে টিম এন্ট্রি নেওয়া হবে।’
এর পর ডি এম সাহেব বললেন, ‘আমরা ‘নবীনগঞ্জ জেলা আন্তঃস্কুল ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটা কমিটি তৈরি করব বলে ঠিক করেছি। মুকুলবাবু, আপনাকে সেই অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি করব বলে ভেবেছি! না করতে পারবেন না কিন্তু!’
মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘ক্রিকেট নিয়ে কিছু হবে, আর সেই কর্মকাণ্ডে আমার সায় থাকবে না, তা তো হতে পারে না স্যার! আমি এক কথায় রাজি! স্কুল ক্রিকেটে আমাদের জেলায় কিন্তু পথপ্রদর্শক গগনজ্যোতি স্কুলের নবনীতস্যারই। উনি ওঁর স্কুলের ক্লাস এইটের ছেলেমেয়েদের নিয়েই তো প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ শুরু করেছেন!’
কর্ণার্জুনস্যার বললেন, ‘সে কথা আমরা ভুলিনি। ওঁকে আমাদের জেলা আন্তঃস্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্টের সভাপতি করব বলে ঠিকই করে ফেলেছি!’
নবনীতস্যার কাঁচুমাচু মুখে বললেন, ‘আমি আমার স্কুলের পাহাড়প্রমাণ কাজ করে আর কি সময় বের করতে পারব ডি এম স্যার?’
ডি এম সাহেব বললেন, ‘ওসব কোনও ওজরআপত্তি শুনব না নবনীতস্যার! আপনার মতো মানুষকে দিয়েই তো কাজটার সূচনা হোক, এটাই আমি চাই।’ তারপর মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতির মুখের উপর চোখ রেখে বললেন, ‘আপনি টুর্নামেন্টের নিয়মকানুন তৈরি করে ফেলুন। আমি তদ্বির করে দেখছি, কত তাড়াতাড়ি নবান্ন থেকে ফান্ডটা আমার জেলায় এসে পৌঁছয়। কলকাতায় আমার এক স্কুলের বন্ধু এখন বেশ বড় সিভিল কন্ট্রাক্টর। ওর এমন ছোটখাটো স্টেডিয়াম তৈরির অভিজ্ঞতা আছে। ওর সঙ্গে পোনে কতা বলেছি। ও একদিন এসে লোকেশনটা দেখে যেতে চাইছে।’
মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি জানতে চাইলেন, ‘স্টেডিয়ামটা কোনখানে করবেন বলে ভেবেছেন?’
কর্ণার্জুনসাহেব বললেন, ‘এখনও পাকাপাকিভাবে জায়গা ঠিক করিনি। আমার অফিসের কয়েকজন ডিপার্টমেন্টাল হেডদের নিয়ে সাইট দেখতে যাব। আপনাদের দু’জনকে সেদিন উপস্থিত থাকতে হবে। আমি প্রাথমিক ভাবে ভেবেছি নবীনগঞ্জ জেলা ফুটবল গ্রাউন্ডের জায়গায় স্টেডিয়ামটা তৈরি হোক। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধে হবে। কারণ জায়গাটা বাসরাস্তার লাগোয়া। ছোটখাটো ফুটবল ম্যাচ হলে সাধারণ মানুষের ভিড় হয়। মানে আমি বলতে চাইছি, মানুষের ওই মাঠে যাতায়াতের অভ্যাস আছে। ওখানে কয়েক একর জায়গা অধিগ্রহণ করতে হবে। ওই ফুটবল মাঠের জায়গায় তো আর স্টেডিয়াম কুলোবে না? ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টকে বলেছি, ফুটবল মাঠের গায়ে আমার দশ একর জায়গা চাই। আমাদের রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রীর সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়েছি নবান্নের দপ্তরে। যেদিন আমার বন্ধুটি আসবেন, সেদিন যদি ক্রীড়ামন্ত্রীর সময় হয়, তা হলে তাঁকেও চাইব।’
‘আপনার বন্ধুকে বলে দিন দশ একর জায়গার উপর একটা স্টেডিয়ামের নকশা করে আনতে। যদি বলেন, আমারও ক্রিকেট জগতের কিছু মানুষের সঙ্গে চেনাজানা আছে। কথা বলে দেখব, তাঁদের হাতে এরকম স্টেডিয়াম তৈরি করার মতো অভিজ্ঞ লোক আছেন কিনা।’ বলে মুকুলকৃষ্ণবাবু থামলেন।
‘ইতিমধ্যে আমার স্কুলের মাঠের মাপ নিয়ে কনট্রাক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে দিচ্ছি খেলার দেবোপমস্যারকে। দেবোপমের অনেক যোগাযোগ আছে। এসব কাজে দেবোপমের উৎসাহ আছে।’ নবনীতস্যার বললেন।
মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি বললেন, ‘তা হলে কর্ণার্জুনসাহেব, নবনীতস্যার স্কুলের মাঠের মাথায় শেড করার কাজ শুরু করে দিন? শেডের কাজ শুরু হলে মাঠের পুব দিকে কর্পূর গাছের ওধারে ততদিন ক্রিকেট কোচিং চলুক, কী বলেন নবনীতস্যার? আর যাঁরা শেড তৈরির ফান্ডে স্বেচ্ছায় টাকা দিতে সম্মত হয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করতে শুরু করে দিই? আপনি হেডস্যার, পাথরকুসমা গ্রামীণ ব্যাঙ্কে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলুন স্কুলের নামে। আমাদের সংগৃহীত টাকা সেই অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে। আর শাঁখাপোতার জমি বিক্রির টাকা আমার স্ত্রী মন্দাকিনীর স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে গেছে। সেখান থেকে টাকা আমি পাথরকুসমা গ্রামীণ ব্যাঙ্কের স্কুলের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দেব। ঝমঝম করে কাজ শুরু হয়ে যাবে, কী বলেন নবনীতস্যার?’
কর্ণার্জুন পাল হাহা করে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘আপনার মতো মানুষ আছেন বলেই তো আমি আন্তঃস্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্টের কথা ভাবতে শুরু করেছি।’
তখনই নিজের ভুলে যাওয়া কথা মনে পড়ে গেল। মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘আরও একটা জরুরি কথা স্যার আপনাকে তো বলতে ভুলে গেছি! আমার বাড়ির ঠিকানায় গত কাল সচিন তেন্ডুকরের সেক্রেটারি মিঃ ফার্নান্ডেজের কাছ থেকে একটা চিঠি এসেছে।’
ডি এম সাহেব কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাঃ! কী লিখেছেন? আপনি বুঝি ওঁকে চিঠি লিখেছিলেন?’
‘গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠের উপরের শেড তৈরির কথা জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমাদের তো গ্রামের স্কুল! আমাদের স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটা ক্রিকেট ম্যাচের প্রস্তুতি চলছে। তার জন্যে ক্লাস এইটের চারটে সেকশানের ক্রিকেটারদের নিয়ে তৈরি করা হয়েছে চারটে টিম। সে তো আপনি সব জানেন। আপনি তো একদিন আমাদের ক্রিকেট কোচিং দেখতে এসেও ছিলেন। এখন সপ্তাহে দু’দিন বিকেলে স্কুলের মাঠের এই কোচিং এক-একদিন বৃষ্টির জন্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি শুনেছিলাম, সচিন এরকম অনেক স্কুলের অভাব-অনটনের কথা শুনলে আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। আমরা সাহায্যের আবেদন করেছিলাম।’
ডি এম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী লিখেছেন?’
মুকুলকৃষ্ণস্যার বললেন, ‘একদম নিরাশ করেননি বটে। তবে এক্ষুনি ফাইনাল কিছু লেকেননি। পরে জানাবেন বলে জানিয়েছেন।’
নবনীতস্যার মুকুলকৃষ্ণবাবুর কথার পিঠে বললেন, ‘দেখাই যাক না স্যার। অপেক্ষা করতে দোষ কী? এ ছাড়া আপনি তো আছেনই, মুকুলবাবুর চেষ্টা আছে আমাদের সঙ্গে। জানেন তো স্যার, আপনি শুনলে খুশি হবেন, ইতিমধ্যে মুকুলবাবু আমাদের স্কুলের স্যার এবং ম্যামদের কাছ থেকে সাহায্য চেয়ে দারুণ সফল হয়েছেন। কেউই ওঁকে নিরাশ করেননি। এ ছাড়া আশপাশের গ্রাম থেকেও স্কুলের এই কাজের জন্যে সাহায্য চেয়ে বেড়াচ্ছেন মুকুলবাবু। আমরা এবার কাজ শুরু করে দিতেই পারি।’
‘ভাল ইঞ্জিয়ারকে দিয়ে প্ল্যান করান। আমি নবান্নের অনুদান যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আনানোর ব্যাবস্থা করছি। একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘হাত গুটিয়ে বসে থাকলে হয় না। কাজে নেমে পড়তে হয়। যেমন আমি আমার জেলায় স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট করার কথা আপনাদের স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচের সূচনা দেখেই তো ভেবেছিলাম। দেখলাম আমাদের সরকার এবং ক্রীড়ামন্ত্রী হস্ত উপুড় করে সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন। আপনারা এগিয়ে চলুন নবনীতস্যার। আমি আপনাদের সঙ্গে আছি!’
ডি এম সাহেবের কাছ থেকে স্কুলে ফিরে আসছিলেন নবনীতস্যার এবং মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি। একটা পলাশ গাছ মোরাম রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে ডাল ভরে ফুল ফুটিয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে দু’জনেই থমকে দাঁড়ালেন। পলাশ গাছটা যে বছর বছর এত ফুল ফোটায়, এর আগে কারুর চোখেই পড়েনি! মনে-মনে ভাবলেন মুকুলবাবু, কাজটা শুরু করে দিতে হবে এখনই।
ওঁরা শুনলেন, বসন্তের একটা কোকিল কোন একটা গাছের আড়ালে বসে গগনজ্যোতি স্কুলের শুভ কাজের সূচনাগীতি গেয়ে উঠল!
(এর পর ২৮ পর্ব)
বিদ্যালয়ের ঘন্টা
স্মৃতিরেখা পাত্র
বিদ্যালয়ে দিনের শুরু
বাজিয়ে প্রথম ঘন্টা।
প্রার্থনাতে দাঁড়িয়ে পড়ি
স্থির করি ভাই, মনটা।
তাহার পরে লাইন ধরে
যে যার ক্লাসে যাই।
আবার ঘন্টা পড়লে, তবে
স্যারের দেখা পাই।
ক্লাসের শেষে ঘন্টা পড়ে
চারের পরে রিসেস।
ঘন্টা দিয়ে আবার শুরু
ঘন্টায় দিন শেষ।
দ্বিতীয় শ্রেণী, মেদিনীপুর কলেজিয়েট প্রাথমিক স্কুল, মেদিনীপুর
পুতুলের ভাইফোঁটা
চুমকি চট্টোপাধ্যায়
(শেষ পর্ব)
ভাইফোঁটার দিন পুতুলের মা উঠে পড়ল ভোরবেলা। বিমলাপিসির সঙ্গে হাত লাগিয়ে রান্না সেরে ফেলল। পুতুলকে ঘুম থেকে তুলে বলল, ' উঠে পড়ো সোনামা, ব্রাশ করে অল্প কিছু খেয়ে স্নান সেরে নাও। আজ তুমি প্রথম ভাইফোঁটা দেবে। ' পুতুলও চট করে উঠে পড়ল। মায়ের কথামতো অল্প খেয়ে স্নান সেরে নতুন জামা পরল। পুজোতে ওর অনেকগুলো জামা হয়েছে। সব পরা হয়নি। তাই আজকেও নতুন জামা পরল।
বুয়া আর কাকাই এসে গেছে। যারা যারা ফোঁটা নেবে তারা মেঝেতে পাতা আসনে পর পর বসে পড়েছে। পুতুলের মা একটা নতুন থালায় সাদা চন্দন, লাল চন্দন, ঘি, দই, দুব্বো আর ধান রেখেছে। একটা প্রদীপ রাখা আছে আর আছে শাঁখ।
প্রথমে পুতুলের বাবাকে ফোঁটা দিল বুয়া। তারপর পুতুলের মা দিল তার ভাইক্কে ফোঁটা। এইবার পুতুলের পালা। এই সময় ঘটল একটা কাণ্ড! পুতুল কিছুতেই চন্দ, ঘি, দইতে হাত দেবে না। শুকনো আঙুল দিয়ে ফোঁটা দেবে বলে বায়না করতে লাগল। ওর মা প্রথমে বুঝিয়ে বলল কেন সবগুলোতেই আঙুল ঠেকাতে হয়। কিন্তু পুতুল অনড়। সে শুধু কপালে হাত ছোঁয়াবে ব্যস।
পুতুলের মা রেগে গেল। মেয়ের চুলের ঝুঁটি ধরে নাড়িয়ে দিতে বলল, ' প্রথম ফোঁটা দিতে এসে কীরকম অসভ্যতা করছে দেখো। কেউ ওকে কোনো গিফট দেবে না। ' যেই না বলা অমনি পুতুল দৌড়ে সেখান থেকে চলে গেল। বাকীরা সবাই বলল, ' আহা, ছেলেমানুষ, ওসবে না হাত দিতে চাইলে নাই দিল। মারলে কেন? দেখো দেখি, মেয়েটা কোথায় গেল। '
পুতুলের মা বলল, ' কোথায় আর যাবে, ঘরে খাটের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদছে দেখো গে। ' সবাই আসন ছেড়ে উঠে পড়ল। ওদের শোবার ঘরে পুতুল নেই। সব ঘর খোঁজা হল, বারান্দা, ছাদ -- কোথাও পুতুল নেই। এবার ওর মা ভয় পেয়ে গেল। কোথায় গেল মেয়েটা!
পুতুলের দাদা বিষয়টা শুনে বললেন, ' এই সামান্য বিষয়ের জন্য মেয়েটাকে মারলে বৌমা। আজ একটা শুভদিনে আমার দিদিসোনাকে কাঁদালে। ' পুতুলের মা'র এবার কান্না পেয়ে গেল। আঁচলে চোখ মুছে পুতুলের বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ' কোথায় যেতে পারে মেয়েটা, আমি তো কিছুতেই বুঝতে পারছি না। ' পুতুলের বাবাও ঘাবড়ে গেছে।
এমন সময় শোনা গেল কেউ বলছে, ' পেয়েছি, পুতুলরাণীকে পেয়েছি। ' দেখা গেল, পুতুলের দাদামণি ঠাকুরঘরে পুতুলকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই সেখানে পৌঁছতে সে বলল, ' এই টেবিলের তলায় পুতুল বসেছিল। টেবিলে ঢাকাটা যেহেতু মাটি অবধি, তাই দেখা যায়নি। চল, তোর গিফটটা দেখবি চল। ' সকলে মিলে পুতুলকে খুব আদর করে দিল। সুন্দর সুন্দর উপহার পেল পুতুল। তখনকার মতো সব ভুলে গিয়ে উপহারগুলো নিয়ে বসে পড়ল।
পুতুল যত বড় হতে লাগল, ততই নানারকম বাতিক তার স্বভাবে দেখা যেতে লাগল। নিজের তোয়ালে মেলতে সে পাঁচ মিনিট সময় নিচ্ছে। টানটান করে মেলার পর হয়তো হাওয়াতে বা হাত লেগে সামান্য বেঁকে গেলেই আবার সেটাকে একেবারে টান করতে লেগে পড়ে পুতুল। ওর মা যদি বলে, ' অ্যাই, কী করছিস এতক্ষণ ধরে? ' পুতুল হেসে চলে আসে। এখন বড় হয়েছে বলে আর কাঁদে না।
পুতুলের বাবার এই বিষয় গুলো এবার একটু সিরিয়াস মনে হয়। সে তার এক ডাক্তার বন্ধুকে বিষয়টা খুলে বলে। ছোটবেলা থেকে এখন অবধি যা যা করে পুতুল। তখন সেই ডাক্তার বন্ধু বলে, ' এটা একটা অসুখ বলতে পারিস। একে বলে ওসিডি অর্থাৎ অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার। যার এই রোগ আছে, যে কোনো কাজ যতক্ষণ না তার মনের মতো হচ্ছে ততক্ষণ সেটা করেই যাবে। সূচীবাইও হয় এরা। বার বার হাত ধুতে থাকে। এসব বাতিক ক্রমশ বাড়ে।'
চিন্তায় পড়ে যায় পুতুলের বাবা। বন্ধুকে জিগ্যেস করে, ' তাহলে কী করা যায়? আমি তো দুশ্চিন্তায় পড়ে যাচ্ছি রে। '
ডাক্তার বন্ধু বলে, ' অত ভাবার কিছু নেই। আর একটু বড় হলে ওকে বোঝাতে হবে যে এই অভ্যেসগুলো ঠিক নয়। বলতে বলতে খানিকটা ঠিক হবে। আর একন্তই যদি না হয় তাহলে কাউন্সেলিং করাতে হবে। পুরোটা না হলেও বেশিটাই ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করিস না। এ রোগ বহু বহু মানুষের আছে। '
পুতুলের বাবা বাড়ি ফিরে ওর মাকে সব বলে। ওরা দুজনে ঠিক করে, যখনই পুতুল এই কাজগুলো করবে, ওরা বোঝাবে যে এমন করা ভালো নয়। সেইমতোই চলতে লাগল। পুতুল বেশি হাত ধুতে থাকলে ওর মা বলে, ' তুই জানিস পুতুল, কত কত মানুষ পরিষ্কার জল পায় না। মাইলের পর মাইল তাদের যেতে হয় জল আনতে। আর কিছু বছরের মধ্যে আমরাও আর জল পাব না। মাটির তলার জলের ভান্ডার প্রচন্ড কমে গেছে। তুই যে এত জল নষ্ট করিস, এই জলে কতজনের প্রয়োজন মিতে যেতে পারে। এত জল নষ্ট করা কি উচিত?'
' হাত মুখ ধুচ্ছি তো মা। ভালো করে না ধুলে এঁটো লেগে থাকবে। '
' আয়না দেখে আয়, একদম পরিষ্কার হয়ে গেছে। বলেছি না, বেশি জল ঘাঁটলে হাতে হাজা হবে, তখন দেখবি কেমন কষ্ট। '
পুতুলের এখন পনেরো বছর বয়েস। ক্লাস টেনে পড়ে। ওর অসুখটা এখন আর নেই বললেই চলে। সামান্য যেটুকু আছে, তা ধরার মতো নয়। বাবা মায়ের ক্রমাগত সতর্ক করা এবং পুতুল নিজের চেষ্টায় ওই অসুখের বেড়াজাল থেকে বেরতে পেরেছে। এখন পুতুল খুব সুন্দর করে ভাইফোঁটা দেয়। নিজেই চন্দন বাটে, দই আর ঘি রেখে থালা সাজায়। দাদারা সবাই একমাত্র বোনের ফোঁটা পেয়ে খুব খুশি হয় আর চমৎকার সব উপহার দেয় পুতুলকে।
ইচ্ছে থাকলে মানুষ সব পারে। ইচ্ছেই শক্তি।
দিপালী সাহু
M. A Psychology ( Clinical ), MSW
working as a counsellor at a govt. hospital
Midnapur.
যোগাযোগ: 7001695687
যদি তোমাদের বয়স আঠারোর নিচে হয়ে থাকে, তবে আমাদের ভিতরে যে মন নামে এক জাদুর মায়াবী পৃথিবী আছে ,সেই বিচিত্র দুনিয়ায় স্বাগত জানাই। আর যদি আপনি একজন অভিভাবক/ অভিভাবিকা হন, তাহলে নিজেদের ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া পুরানো দিনের নস্টালজিক অনুভূতিকে আর একবার রোমন্থন করার আমন্ত্রণ জানাই । তবে আপনাদের অনুরোধ করব—আপনার সন্তানের মনের ভেতরে উঁকি দেওয়ার আগে নিজের ভেতরের জাজমেন্ট বা বিচারকের চশমাটা একটু খুলে রাখবেন । এই লেখা জোর করে পড়াবেন না বা মানতে বাধ্য করবেন না । বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারেন । আর একটা কথা, এই লেখা কোনো ভাবেই চিকিৎসা নির্দেশিকা নয় বা চিকিৎসার বিকল্প ও নয় । যদি লেখার সাথে আপনাদের সন্তানদের আচরণের মিল খুঁজে পান বা সমস্যা মনে হয় তাহলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে দ্বিধা করবেন না ।
এখানে কোনো সিলেবাসের পড়া হবে না , যেখানে তোমাকে মুখস্থ করে পরীক্ষা দিতে হবে। এখানে আমরা জানবো , চিনবো , আমাদের সবচেয়ে কাছের কিন্তু সবচেয়ে কম চেনা সঙ্গী আমাদের মনকে তোমার নিজের ভেতরের আয়নাকে ।
এখানে আমরা একসাথে মনকে চিনবো, জানবো, তার গল্প শুনবো , ভাববো ,প্রশ্ন করবো এবং বিজ্ঞানের ভাষায় বুঝতে চেষ্টা করবো।
আমরা জানি , আমাদের জীবনে এমন অনেক দিন আসে, যখন বুকের ভেতরটা কোনো এক অদ্ভুত কারণে হু হু করে ওঠে। কখনো ক্লাসের ফার্স্ট বয় বা ফার্স্ট গার্ল হতে হতে ক্লান্ত লাগে, কখনো মনে হয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে বড্ড কুৎসিত, কখনো নিজের ভাই বা বোনের সাথে প্রতিনিয়ত তুলনা হতে হতে নিজের ওপরই তীব্র রাগ আর ঘৃণা জন্মায়। আবার কখনো কোনো একলা রাতে বালিশে মুখ গুঁজে কেন কান্না পায়, তার উত্তর নিজের কাছেও থাকে না।
সবচেয়ে বড় কষ্টটা কোথায় হয়? এই কষ্টগুলো যখন চারপাশের কাউকে বুঝিয়ে বলা যায় না। বন্ধুদের বললে তারা হয়তো হাসাহাসি করবে, আর মা-বাবাকে বললে হয়তো বকা শুনতে হবে—"এই বয়সে কিসের এত বিষণ্ণতা? কিসের এত মন খারাপ? আমরা কি তোমাকে খেতে-পরতে দিচ্ছি না?"
ব্যস! এই একটা কথাতেই মনের দরজাটা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। তুমি একলা হয়ে যাও তোমার নীরব কষ্টের সাথে।
এখানে কোনো অনুভূতি খারাপ বা ভালো নয়. সব অনুভূতি আমাদের মনে থেকে তৈরী হয় এটার কিছু বিজ্ঞানসম্মত কারণ থাকে. আমাদের লক্ষ্য তাকে দমন করা নয়,. তাকে চেনা জানা তাকে স্বাস্থ্যকর ভাবে পরিচালিত করা।
এখানে মনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা হবে ,প্রতিটি বিষয়ে তুমি খুঁজে পাবে তোমার মতো কোনো এক তিন্নি, হৃদয় বা তূর্যর গল্প। তার সাথে থাকবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের একদম সহজ কিছু ব্যাখ্যা, যা পড়ে তোমার ভেতরের সব ধন্দ কর্পূরের মতো উড়ে যাবে।
এসো, আমরা সবাই মিলে আমাদের মনের সেই গোপন বারান্দাটার দরজা খুলি। চলো, ভালোবেসে নিজের ভেতরের জাদুকরকে চিনে নিই।
— অনেক ভালোবাসা ও শুভকামনা রইল তোমাদের এই নতুন যাত্রায়।
ডাঃ এ সামন্ত
এম ডি হোমিওপ্যাথি
কুইকোটা, মেদিনীপুর
বর্ষাকাল আমাদের খুবই প্রাণের কাল। কারণ বৃষ্টির জল সৃষ্টির ইঙ্গিত। বৃষ্টি ছাড়া সৃষ্টি হয় না এবং বৃষ্টি আমাদের খুবই প্রয়োজন। কিন্তু কোন কিছুই অতিরিক্ত খারাপ। বৃষ্টি কে কেন্দ্র করেই আমাদের বন্যা হয়। জল দূষণ হয় । বাতাসের আপেক্ষিক আদ্রতা বেড়ে যাওয়ায় জীবাণুদের আধিক্য দেখা যায় । ফলে রোগ সংক্রমণের হার ও বেড়ে যায় তাই বর্ষার সময়ে আমাদের সাধারণত ৫ ধরনের রোগ জ্বালা বৃদ্ধি পেতে পারে।
প্রথমতঃ জল বাহিত রোগ যা অপরিশোধিত জল থেকে হতে পারে। যেমন ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস এ এবং ই, কলেরা, আমাশয়, গ্যাসট্রো এন্টারাইসিস ইত্যাদি। অনেক সময়ে বর্ষাকালে নর্দমা বা রাস্তার দূষিত জল পানীয় জলের লাইনের সঙ্গে মিশে গিয়ে পানীয় জলকে দূষিত করে ফেলে। তাই ওই দূষিত জল পান করলে বা ব্যবহার করলে রোগ জ্বালাতো হবেই। তাই জল বাহিত রোগ থেকে বাঁচতে আমাদের অবশ্যই জল খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে তাকে ঠান্ডা করে বা অন্য কোন উপায়ে সম্পূর্ণরূপে জলকে জীবাণুমুক্ত করে তারপর পান করতে হবে। খাবার খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার দশ ধাপ মেনে খুব ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। ডায়রিয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষতঃ শিশু রা শুধু মাত্র ডায়রিয়া র জন্য মারা যায় না, জল শূণ্যতার জন্য মারা যায়। তাই ডায়রিয়া হলে প্রথম কাজ হলো শরীরের জলের ঘাটতি পূরণ করা। এক্ষেত্রে ORS খাওয়ানো খুব ই জরুরী । ORS কাছে না থাকলে নুন চিনি র জল ও লেবু মিশিয়ে সেই জল খাওয়া তে হবে। তাতে কাজ না হলে বা বমি হলে শিরার মাধ্যমে সেলাইন দিতে হবে, আগে ডিহাইড্রেশন নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে ।
দ্বিতীয়তঃ মশা বাহিত রোগ যেমন ম্যালেরিয়া ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়া ইত্যাদি। বর্ষাকালে আমাদের চারপাশে খানা ডোবা যেমন ভরে যায়, তেমনি আমাদের ঘরবাড়ির চারপাশে জমে থাকা আবর্জনায় , যেমন ডাবের খোলা, খালি বোতল, প্লাস্টিকের টুকরো, টায়ার ইত্যাদি তে আটকে থাকা অপরিষ্কার আবদ্ধ জলে মশা তার লার্ভা বিস্তার করে। মশার প্রাদুর্ভাব বেশি হলে মশা বাহিত রোগ বেশি হয় যেমন ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া ইত্যাদি। আবার পরিষ্কার জলে যেমন ফুলদানির জল , টবের ট্রের জল, ইত্যাদিতে থাকা জল এডিস মশার লার্ভা বিস্তারে সাহায্য করে যা ডেঙ্গি রোগের বাহক । তাই মশা বাহিত রোগ থেকে বাঁচতে আমাদের চারপাশের বালতি ড্রাম ট্যাঙ্ক সবসময় শক্ত ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখবে, ডোবা বা নর্দমায় জমে থাকা জলে ব্লিচিং পাউডার বা কেরোসিন বা তুলসী পাতার রস লাভিসাইট হিসাবে ব্যবহার করতে পারো। মশার কামড় থেকে বাঁচতে ফুলহাতা জামা ও ফুল প্যান্ট ব্যবহার, মশারি খাটিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস খুবই উপযোগী তাছাড়া সময় সময় রিপিলেন্ট বা মলম ব্যবহার করে মশার উপদ্রব থেকে বাঁচা সম্ভব ।
তৃতীয়তঃ বায়ু বাহিত রোগ স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের কারণে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া বর্ষাকালে বাতাসের আদ্রতা বেশি থাকায় দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং বায়ুবাহিত রোগ খুব তাড়াতাড়ি ছড়ায়। এদের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু, সাধারণ সর্দি কাশি, নিউমোনিয়া , হাঁপানি বা অ্যাজমা , চোখ ওঠা বা কনজাংটিভাইটিস, চোখের এলার্জি অন্যতম। বায়ুবাহিত রোগ থেকে বাঁচতে সব সময় মাস্ক ব্যবহার কর এবং হাঁচি কাশির সময়ে মুখ ঢেকে রাখা অত্যন্ত জরুরী । চতুর্থতঃ খাদ্য বাহিত রোগ, বর্ষাকালে উচ্চ আদ্রতা ও উষ্ণ তাপমাত্রা ই-কোলায় ও সালমোনেলার মতো ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। এবং পচনশীল খাদ্যের পচন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। তাছাড়া বর্ষাকালে মাছি ও পোকামাকড়ের আনাগোনা বাড়ে যেগুলো সহজেই আবর্জনা থেকে রোগ জীবাণু খোলা খাবারে ছড়িয়ে দিতে পারে। তাই রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফেলে না রেখে তাজা থাকতে থাকতেই খেয়ে ফেলো আর অবশিষ্ট খাবার দ্রুত ফ্রিজে রাখো ।
পঞ্চমত বর্ষাকালীন চর্মরোগ, গ্রীষ্ম এবং বর্ষাকালে আমাদের শরীরের ভাঁজে ভাঁজে, বিশেষ করে যেখানে অন্তর্বাস পরা হয় ঘাম জমে ছত্রাক ঘটিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। বৃষ্টির জলে পা ভিজে থাকলে আবার রাস্তাঘাটে চলার সময় রাস্তার জমা নোংরা জল গায়ে লাগে। তাই বাড়ি ফিরে খুব ভালো করে সাবান দিয়ে পা না ধুয়ে নিলে বা ক্রমাগত স্যাঁতসেঁতে চামড়ার জুতো পরার পরে সাবান দিয়ে পা না ধুলে ছত্রাক জনিত রোগ হয় সেটা ভয়ানক আকার ও ধারণ করতে পারে যা থেকে স্থায়ী চর্ম রোগের সৃষ্টি হয়। যাইহোক বর্ষাকালীন এইসব সমস্যার মধ্যে তোমরা কেউ পড়লে অবশ্যই অবহেলা না করে তাড়াতাড়ি চিকিৎসা করে নিও। সুস্থ থাকো, ভালো থাকো।
ক্যুইজ: ১১
১. পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য গাছ কি?
2. পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত পাহাড়ী শহর কোনটি?
৩. পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে কোন সমুদ্র আছে?
৪. পশ্চিমবঙ্গে কোন পর্বত মালা আছে?
৫. পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী কে ছিলেন?
গত সপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর:
১. আগমনী
2. ৫ টি। প্রেসিডেন্সি, বর্ধমান, মেদিনীপুর, মালদহ, জলপাইগুড়ি।
৩. মেছো বিড়াল
৪. সাদা গলা মাছরাঙা
5. শিউলি।
0 Comments