জ্বলদর্চি

স্বপ্ন /মুকুল মুখার্জী

স্বপ্ন 
মুকুল মুখার্জী



যেটা বাস্তব নয় সেটাই স্বপ্ন। বাস্তব না হলেও স্বপ্ন দেখা যায়। বাস্তব কিছু দেখতে যেমন শরীরের চোখ লাগে, তেমনি স্বপ্ন দেখতে মনের চোখ লাগে। 

স্বপ্ন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সাহিত্য, ইতিহাস, মহাকাব্য, পুরাণ, লোককথা ইত্যাদি সবকিছুতে সব যুগেই স্বপ্নের উল্লেখ আছে। পৌরাণিক চরিত্ররা স্বপ্নাদেশ পেয়েছেন এ আমরা পড়েছি। বহু পূণ্য তীর্থস্থানে প্রচলিত লোককথায় কোনো ভক্তকে ঈশ্বর কর্তৃক স্বপ্নাদেশ দেওয়ার গল্প আমরা বহু জায়গায় শুনেছি। পৃথিবীতে এমন একজন ও মানুষ নেই যে কোনোদিন স্বপ্ন দেখেনি। স্বপ্ন হলো আমাদের অবচেতন মনে লুকিয়ে থাকা আবেগ আর অনুভূতির আয়না। সেইজন্য যেকোন স্বপ্নে যে স্বপ্ন দেখছে সে নিজে একটা চরিত্র হিসেবে সেখানে উপস্থিত থাকে। সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় দুভাবেই থাকতে পারে তার উপস্থিতি।

আমরা স্বপ্ন ঘুমিয়েও দেখি, আবার জেগেও দেখি। দুটোর মধ্যে মৌলিক ফারাক আছে। সাধারণভাবে আমরা ঘুমিয়ে যে স্বপ্নগুলো দেখি সেগুলোতে কল্পনা ও বাস্তব হাত ধরাধরি করে চলে। অর্থাৎ ঘুমিয়ে আমরা যে স্বপ্নগুলো দেখি সেগুলোর চরিত্রগুলো বাস্তব হলেও ঘটনাগুলো হয়তো অবাস্তব বা কাল্পনিক বা বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। স্বপ্নে দেখা ঘটনাটা যখন একটা চরম মুহূর্তে পৌঁছোয় ঠিক তখন আমাদের ঘুম টা ভেঙে যায়। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক: 
ধরা যাক আমার খুব ইচ্ছে অমিতাভ বচ্চন আমার বাড়িতে আসুন। খুব, ভীষণ জোরালো ইচ্ছে। এইরকম অনেকদিন জেগে জেগে ভাবার পর একদিন হয়তো ঘুমিয়ে স্বপ্নে দেখতে পেলাম যে সত্যি উনি আমার বাড়িতে এসেছেন। স্বপ্নে খুব গল্প হচ্ছে; কথাতেই আছে স্বপ্নের বিরিয়ানিতে অঢেল ঘি ঢালা যায়, কোনও সমস্যা নেই। তারপর গল্প করে ওনার বিদায় নেবার সময় যখন হ্যান্ডশেক বা জোড়হাত করে নমস্কার করতে গিয়ে ঘুমটা ভেঙে গেলো হয়তো। এটা কোনোদিন ই বাস্তবায়িত হবে না। চরিত্রগুলো বাস্তব হলেও ঘটনাটা ঘটার সম্ভাবনা নেই। 
অনেকসময় আমরা আমাদের খুব প্রিয় ও কাছের মৃত মানুষদের স্বপ্নে দেখি। এর একটা কারণ আমরা তাঁদের/তাদের কথা খুব বেশি করে ভাবি। যখনই আমরা অবসর পাই, তাদের কথা আমাদের মনে আসে। যেমন আমরা কোনোদিন আমাদের মৃত মা বাবাকে ভুলতে পারব না। কোন সন্তানহারা মা - বাবা তাঁদের সন্তানকে ভুলতে পারেন না, তাকে স্বপ্নে দেখেন প্রায়শই। নাতি - নাতনি তাদের প্রিয় দাদু - ঠাকুমাকে স্বপ্নে দেখে। মৃত দাদু ফিরে এসে নাতির সাথে গল্প করছেন, খেলা করছেন, আদর করছেন। মৃত সন্তান এসে মা এর কোলে শুয়ে আছে, মা এর কাছে এসে আবদার করে তার প্রিয় পদটা খেতে চাইছে। কিংবা আমার মৃত বাবা বা মা এর সাথে আমি কোথাও বেড়াতে গেছি, খুব আনন্দ করছি সেখানে। এই স্বপ্নগুলো আমরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখি। এগুলো বাস্তবায়িত হবার নয়। তাই যখন ঘুম ভেঙে যায়, তখন ভীষণ মন খারাপ হয়ে যায়; চোখে জল এসে যায়। কারণ ঠিক তখনই বাস্তব এসে তার কঠিন শীতল হাতটা আমাদের কাঁধে রাখে। 
ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখার আর একটা উদাহরণ হলো বয়ঃসন্ধিকালের স্বপ্নদোষ। বাল্যকাল থেকে যৌবনে যখন শরীরের নানাপ্রকার হরমোনের কারণে আস্তে আস্তে যৌন চাহিদার বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে তখন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নদোষের মাধ্যমে যৌন তৃষ্ণার নিবৃত্তি হয়ে থাকে, এ অভিজ্ঞতা আমাদের সকলের আছে।
ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখার আর একটা মজার ব্যাপার আছে। অনেক সময় বাস্তবে যে দুটো মানুষ একে অপরকে চেনে না, কিন্তু আমি দুজনকেই চিনি, সেরকম দুটো মানুষকেও কথা বলতে দেখি আমরা অনেকসময় স্বপ্নে। আমি তাদের মধ্যেকার যোগসূত্র। 

এবার আসা যাক জেগে জেগে আমরা যেসব স্বপ্ন দেখি সেগুলোর কথায়। হ্যাঁ, এটাও সত্যি আমরা অনেক সময় জেগে জেগেও স্বপ্ন দেখি। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত এইকারনে যে সেইসময় আমাদের শরীরের চোখ খোলা থাকে। কিন্তু শরীরের চোখ খোলা থাকলেও সে ওই সময় কিছু দেখে না, মস্তিষ্কে সে কিছু লিপিবদ্ধ করে না। সেই সময় আমাদের মনের চোখ বড় বড় করে খোলা থাকে। খুব নিবিড়ভাবে আমরা যদি একটা শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে কিছু চিন্তা করি, সেটা একটা স্বপ্নের পর্যায়ে যেতে পারে। সেটার বিষয়বস্তু যা কিছু হতে পারে; যেমন আমার ভবিষ্যতের বাড়ি - গাড়ি, আমার বিদেশে গিয়ে সেটেল করা, কোন বিশেষ কাছের মানুষকে ভালোবাসার কথা বললে তার কিরকম প্রতিক্রিয়া হতে পারে, কিংবা অবসরপ্রাপ্ত জীবনের অনিশ্চয়তা। সাধারণভাবে এই স্বপ্নগুলোতে আমরা মৃত মানুষদের দেখি না। আর এই স্বপ্নগুলো ঘুমের মধ্যে দেখা স্বপ্নের চেয়ে বেশি বাস্তব হয় এবং এখানেই দুইধরণের স্বপ্নের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য। ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্নগুলো সাধারণভাবে কল্পনা ও বাস্তবের সংমিশ্রণ; কিন্তু জেগে দেখা স্বপ্নগুলো সাধারণত সম্ভাবনাময় বাস্তব। এই স্বপ্নগুলো অনেক সময় বাস্তবায়িত হলেও হতে পারে। এবং হয় ও অনেক ক্ষেত্রে। আমাদের অবচেতন মনে থাকা সুপ্ত বাসনা, আসক্তি কিংবা দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম থেকে এই গভীর চিন্তা গুলোর জন্ম হয় যেগুলো নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করলে সেটা স্বপ্নের পর্যায়ে যেতে পারে। এমনকি তখন ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও এইরকম স্বপ্ন দেখা অস্বাভাবিক নয়। 
🍂
স্বপ্ন কখনো কখনো খুব ভয়ঙ্কর হতে পারে। দুঃস্বপ্নকে আমরা সকলে ভয় পাই। অনেক সময় ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে আমরা বিপদের মুখোমুখি হই; হয় গভীর জঙ্গলে হিংস্র জন্তুর মুখোমুখি, বা বিশাল উঁচু জায়গা থেকে পড়ে যাওয়া। সেই সময় আবার ঘুম ভাঙার পর বাস্তব এসে আমাদের কাঁধে স্বস্তির হাত রেখে মৃদু হেসে বলে “ আরে ওটা স্বপ্ন! “
অনেক সময় প্রিয় জীবিত মানুষের মৃত্যুর স্বপ্ন দেখাটাও বাস্তব। হয়তো তিনি খুব ভুগছেন। তখন ঘুম ভাঙার পর অজানা আশঙ্কায় মনটা কেঁপে ওঠে। তখন আমরা ঈশ্বর কে বলি প্রিয় মানুষটাকে রক্ষা করতে।

ওপরে যা বললাম সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। তবে সবকিছুর ই ব্যতিক্রম আছে, এটারও আছে। মনোবিদরা স্বপ্ন বিশ্লেষণ করে অনেক জটিল মানসিক সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করেন, অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য ও পান। আজকের এই সাংঘাতিক স্ট্রেসফুল জীবনে যেখানে অবসাদ (ডিপ্রেশন) এর করাল গ্রাসে বহু মানুষ আক্রান্ত, সেখানে একজন অবসাদগ্রস্ত রোগীকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে গেলে স্বপ্নের ভূমিকাকে অস্বীকার করা চলে না।

আসলে মানুষ আবেগপ্রবণ জীব। সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এই প্রাণীটির মস্তিষ্ক নামক অঙ্গটি অতীব জটিল। এই মস্তিষ্কই মানুষকে অন্য প্রাণীর থেকে আলাদা করেছে। তাই সে চিন্তা করতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে।তার মনের গঠন ও খুব জটিল। সেই মনের পাত্রে রিপু, মায়া, বিবেক ও অন্যান্য অনুভূতির জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া তেই স্বপ্নের জন্ম। তাই যতদিন পৃথিবীতে মানুষ থাকবে, কালের মন্দিরায় স্বপ্নের ঝংকার পৃথিবীকে নানা রঙে রঙিন করে তুলবে।

Post a Comment

0 Comments