জ্বলদর্চি

স্বপ্ন/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

স্বপ্ন
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আমার কাছে স্বপ্ন হলো, চোখের ভেতর আর চোখের বাইরের পৃথিবী।
স্বপ্নের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় কবে, তা মনে নেই। হয়তো তখন এতটাই ছোট ছিলাম যে পৃথিবী আর কল্পনার মধ্যে কোনো সীমানা ছিল না। শুধু মনে আছে, শৈশবের এক বর্ষার রাতে ঘুম ভেঙে মাকে বলেছিলাম, আমি নাকি আকাশে উড়ছিলাম। মা হেসে বলেছিলেন, "স্বপ্নে সবই হয়"।সেই কথার অর্থ তখন বুঝিনি। আজ এতদিন পরে মনে হয়, সত্যিই তো স্বপ্নেই সব হয়। যা বাস্তবে সম্ভব নয়, যা ভাষায় বলা যায় না, যা হৃদয় লুকিয়ে রাখে, সবকিছুই স্বপ্নের কাছে নির্ভয়ে আত্মসমর্পণ করে।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে, সঙ্গে বুঝেছি, স্বপ্ন শুধু রাতের অন্ধকারে আসে না। দিনের আলোতেও স্বপ্ন জন্মায়, বরং দিনের স্বপ্নই মানুষকে সবচেয়ে বেশি বদলে দেয়। ঘুমের স্বপ্ন আমাদের কাছে আসে, জেগে থাকা স্বপ্নকে আমাদেরই খুঁজে নিতে হয়। একটি আমাদের অবচেতন মনে লেখা হয়, আরেকটি আমাদের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে লিখতে হয়।
🍂
আমার ছোটবেলার বাড়ির উঠোনে একটি শিউলি গাছ ছিল। শরতের ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখতাম, সাদা ফুলে মাটি ভরে গেছে। তখন মনে হতো, রাতের অন্ধকারে কেউ নিশ্চয়ই এসে নীরবে ফুলগুলো বিছিয়ে রেখে গেছে। পরে জেনেছি, প্রকৃতির নিজের নিয়মেই ফুল ঝরে পড়ে। তবু আজও সেই শিশুমনের কল্পনাটাই আমার কাছে বেশি সত্যি মনে হয়। কারণ স্বপ্নেরও তো এমনই স্বভাব সে যুক্তির চেয়ে অনুভূতির কাছে বেশি বিশ্বস্ত।
আমরা প্রায়ই ভাবি, স্বপ্ন মানে ভবিষ্যতের কোনো ছবি, কিন্তু আমার মনে হয়, স্বপ্ন অনেক সময় অতীতেরও আশ্রয়। যাদের হারিয়েছি, তারা মাঝে মধ্যে স্বপ্নে ফিরে আসে। কোনো কথা বলে না, শুধু পাশে বসে থাকে। ঘুম ভাঙার পর মনে হয়, কিছুক্ষণ আগে যেন সত্যিই তাদের স্পর্শ করেছি। বিজ্ঞান বলবে, এগুলো স্মৃতির পুনর্গঠন, মনোবিজ্ঞান বলবে, অপূর্ণ আবেগের প্রকাশ, কিন্তু হৃদয়ের কি কোনো বৈজ্ঞানিক অভিধান আছে? মানুষের অনুভূতির সব ব্যাখ্যা কি পরীক্ষাগারে মেলে?
স্বপ্ন নিয়ে বহু তত্ত্ব আছে। সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলেছিলেন, স্বপ্ন হলো, অবদমিত ইচ্ছার প্রতীকী ভাষা। কার্ল ইয়ুং মনে করতেন, স্বপ্ন মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বাইরে এক বৃহত্তর সামষ্টিক অবচেতনের সঙ্গেও যুক্ত। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান জানায়, ঘুমের REM পর্যায়ে মস্তিষ্ক স্মৃতি, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে সাজায়,সেই প্রক্রিয়ারই এক প্রকাশ স্বপ্ন, কিন্তু এসব জানার পরও স্বপ্নের রহস্য কমে না। বরং মনে হয়, মানুষ যত জানে, অজানার বিস্তার ততই বড় হয়ে ওঠে।
আমার কাছে সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে, মানুষ কখন স্বপ্ন দেখে? ঘুমিয়ে, না জেগে? পরীক্ষার আগের রাতে ছাত্র যে স্বপ্ন দেখে, আর পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত যে অস্থিরতা নিয়ে অপেক্ষা করে দুটোই কি আলাদা? একজন কৃষক যখন অনাবৃষ্টির মাঠে বীজ বোনেন, তিনি কি কেবল কৃষিকাজ করেন, না তিনি ভবিষ্যতের একটি সবুজ স্বপ্ন রোপণ করেন? একজন মা যখন সন্তানের জন্য শেষ রুটিটুকু রেখে দেন, সেটাও কি এক ধরনের স্বপ্ন নয়, সন্তান যেন তার চেয়ে ভালো জীবন পায়?
আমি দেখেছি, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার স্বপ্ন। সম্পদ, ক্ষমতা, পরিচিতি সবকিছু সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, কিন্তু মানুষ কী স্বপ্ন দেখে, সেটিই তাকে আলাদা করে। যে শিশু আকাশের দিকে তাকিয়ে পাখি হতে চায়, যে তরুণ ব্যর্থতার পরও আবার শুরু করে, যে বৃদ্ধ শেষ বয়সেও নতুন গাছ লাগান তাঁদের সবার ভেতরে একই আগুন জ্বলে। সেই আগুনের নাম স্বপ্ন।
তবে, স্বপ্ন সব সময় কোমল নয়। কখনও সে নিষ্ঠুর। ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের শব্দ বাইরে শোনা যায় না, কিন্তু ভেতরে তার প্রতিধ্বনি দীর্ঘদিন বেজে চলে। জীবনের অনেক ইচ্ছে পূরণ হয় না। কিছু মানুষ মাঝপথে হারিয়ে যায়, কিছু সম্পর্ক সময়ের কাছে পরাজিত হয়, কিছু দরজা চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে যায়। তখন মনে হয়, স্বপ্ন দেখা বুঝি ভুল ছিল। কিন্তু পরে বুঝেছি, ভেঙে যাওয়া স্বপ্নও মানুষকে শিক্ষা দেয়। যে হৃদয় একবার ভেঙেছে, সে অন্যের কান্না আরও গভীরভাবে বুঝতে শেখে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, "বিশ্বাস করো, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।" আমি কখনও কখনও মনে করি, স্বপ্নের প্রতিও বিশ্বাস হারানো তেমনি এক ধরনের আত্মপরাজয়। কারণ মানুষ বেঁচে থাকে শুধু শ্বাস নিয়ে নয়, সে বেঁচে থাকে অপেক্ষা নিয়ে। আগামীকাল আজকের চেয়ে একটু ভালো হবে এই বিশ্বাসই মানুষকে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে তোলে। সেই বিশ্বাসের আরেক নাম স্বপ্ন।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ অনেক বাস্তববাদী হয়েছে। প্রযুক্তি আমাদের দ্রুত করেছে, তথ্য আমাদের সচেতন করেছে, কিন্তু হয়তো একটু ক্লান্তও করেছে। আমরা সবকিছুর হিসাব চাই, সবকিছুর প্রমাণ চাই। অথচ জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঘটনাগুলোর কোনো গাণিতিক সূত্র নেই। ভালোবাসা, মমতা, সৃষ্টি, ক্ষমা এসবের মতো স্বপ্নও যুক্তির চেয়ে অনুভূতির বিষয়। যে মানুষ কেবল লাভ-ক্ষতির অঙ্ক জানে, সে হয়তো সফল হতে পারে, কিন্তু স্বপ্নহীন সাফল্য অনেক সময় নিঃশব্দ মরুভূমির মতো।
আমার মনে হয়, স্বপ্নের সবচেয়ে বড় কাজ ভবিষ্যৎ বলে দেওয়া নয়, মানুষকে বদলে দেওয়া। যে মানুষ একটি সত্যিকারের স্বপ্ন দেখে, সে আর আগের মানুষ থাকে না। তার হাঁটার ভঙ্গি বদলে যায়, তার চোখের দৃষ্টি বদলে যায়, এমনকি ব্যর্থতার সংজ্ঞাও বদলে যায়। তখন পরাজয় আর শেষ নয়, বরং আরেকটি শুরু। অনেকেই বলেন, স্বপ্ন ভেঙে গেলে মানুষ কষ্ট পায়। আমি বলি, স্বপ্ন না থাকলে মানুষ বাঁচতেই পারে না। কারণ স্বপ্নই মানুষের ভেতরে আশা জন্মায়। নদী যেমন সমুদ্রের দিকে চলে, তেমনি মানুষও তার স্বপ্নের দিকে এগোয়। কেউ পৌঁছায়, কেউ পৌঁছায় না; কিন্তু পথ চলাটাই তাকে মানুষ করে তোলে।
এখনও মাঝেমধ্যে ভোরের দিকে ঘুম ভেঙে যায়। জানালার বাইরে আলো ফোটে, পাখির ডাক শোনা যায়। তখন মনে হয়, প্রতিটি সকাল যেন একটি নতুন স্বপ্নের শুরু। গতকালের ব্যর্থতা, অভিমান, ক্লান্তি সবকিছু পেছনে ফেলে আবার নতুন করে বিশ্বাস করার সুযোগ। হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্চর্য মানুষ অসংখ্যবার ভেঙে পড়েও আবার স্বপ্ন দেখতে শেখে।
তাই আমার কাছে স্বপ্ন কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়,এটি মানুষের অস্তিত্বের গভীরতম ভাষা। স্বপ্ন আমাদের শেখায়, অসম্ভব শব্দটি চিরস্থায়ী নয়, অন্ধকার মানেই শেষ নয়, আর প্রতিটি মানুষের ভেতরেই এমন একটি আকাশ আছে, যেখানে সে অন্তত একবার ডানা মেলে উড়তে চায়। চোখ বন্ধ করলে সেই আকাশ দেখা যায়, আবার চোখ খুললেও দেখা যায়। পার্থক্য শুধু এতটুকু একটি আকাশে আমরা উড়ে বেড়াই, আর অন্য আকাশে উড়তে শেখার সাহস সঞ্চয় করি। সেই সাহসের নামই, আমার কাছে, স্বপ্ন।

Post a Comment

0 Comments