সোমদত্তা
অন্ধকারে অস্ত রবির লিপি লেখা,
আমারে তার অর্থ শেখা।
“আঁধার রাতে একলা পাগল যায় কেঁদে
বলে বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে...”
হয়তো এই বোঝার জন্য লিখি, অস্ত রবির লিপি উদ্ধারের জন্য লিখি। সেই মহাকবির সেই মহাপ্রাণের প্রতিটি অক্ষর বিন্যাস কে নিগুঢ় ভাবে দেখার জন্য লিখি। আর প্রতিবার আকারে আঁধারে নতুন করে কিছু খুঁজে পাই।
যখন খুব ছোট... ক্লাস টু বা থ্রি, মা পড়ে শুনিয়েছিল ‘পথের পাঁচলী’। দুর্গার মৃত্যুতে খুব কেঁদেছিলাম, হয়তো কিছু না বুঝে, প্রায় সমবয়সী কারোর কষ্টমৃত্যুতে। আজো কাঁদি — আজ আর দুর্গা শুধু ই কোন মানুষ নয়, কিশোরী মেয়ে নয়, সে একটা পরিস্থিতির শিকার, একটা বিশেষ সমাজ ব্যবস্থার প্রতিভূ। আমাদের অস্তিত্বের সঙ্কট। হয় দুর্গাই লেখায় হয়ে নামে কান্না, কলমের হতাশা।
"Fear no more the heat o' the sun,
Nor the furious winter's rages."
‘অতিথি’র তারাপদকে যখন দেখি পাগলাটে ছুট দিতে এখান থেকে ওখান, তখনি বোধহয় ঘর ছাড়ার নেশা পেয়ে বসে।
"I cannot rest from travel: I will drink
Life to the lees..."
মৃণাল মনে আসে বলেই, সাংসারিক অচলায়তনের বিরোধিতা করি।
নাইনে পড়তে হাতে পেলাম ‘পূর্ব পশ্চিম’, শিউরে উঠেছিলাম। এখন তাই বোধহয় প্রতিবাদের রসদ জোগায়।
🍂
কতকাল ধরে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে লাবন্য, তাই অনায়াসে উপেক্ষা করি শরীরী প্রেমকে। তাই লিখি ভাঁটার কবিতা, ভাসানের গান।
বৈচিত্র জ্ঞান হয়ে থেকে যে ব্রহ্মের সাথে মিলিত হতে চেয়েছি, যাঁকে পরম গুরু মেনেছি, যাঁর দেখানো পথে হেঁটেছি, তাই তো তাঁকে বলতে পেরেছি “আমার অন্ধকারে বাস /আমার দু চোখে সর্বনাশ, সাঁইজি।”
একজন সাহিত্যিক কবি লেখকের কলমের চলন সমাজের অলিতে গলিতে। অবক্ষয়ের কালিতে কলম চুবিয়ে ইতিহাসের ছবি আঁকা। সাহিত্য সমাজের দর্পণ। তাই ফিরে ফিরে আসে একই কথা, “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়।” যদিও পরিস্থিতি আমাদের অনেকের কলম মুঠো বন্দী করে, পুরস্কারের দীন প্রত্যাশায় হয়তো উমেদারি করে, তবু... তবু্ও কিছু মানুষ তো আছেন, যাঁদের দেখে এই গলিত পচন ধরা সমাজের ছবি অকপটে আঁকতে শিখেছি ... “পচনের তীব্র গন্ধ এক দীর্ঘ সরলরেখা বেয়ে / ঢুকে গেছে মস্তিষ্কের কোষে কোষে।”
পাঠকের সাথে সংযোগ স্থাপন লেখকের এক দায়বদ্ধতা। যদিও পাঠকের কোন মাথাব্যথা নেই আমার বা আমাদের লেখা পড়তে হবে, বা আমাদের বুঝতে হবে। কিন্তু এখনো বলা ভালো নতুন প্রজন্ম অনেক বেশি সাহিত্য পৃষ্ঠপোষক। সে মুখপত্রিকা ই হোক বা বিনিয়োগ পত্রিকাই (little mag)। তাই আমাদের পারিবারিক পরিধি ছোট হচ্ছে, পাশাপাশি ধান্দাবাজ স্বার্থন্বেষী বন্ধুর (বা আদপে বন্ধুই নয়) সংখ্যা বেড়ে চলেছে, তখন লেখাকে মাধ্যম করে কারোর কারোর সাথে মনের সখ্যতা গড়ে উঠছে। যা মস্তিষ্কের সঞ্চালন করছে। আমাদের একাকীত্ব দূর করছে, বহু আকাঙ্খিত একটা ভাললাগার শব্দ পাঠাচ্ছে।
লেখা — তা সে যে ক্ষেত্রেই বিচরণ করুক, তা ধরে রাখে অতীতকে, স্মৃতিকে — সে সুখস্মৃতি হোক বা দুঃসহ। যদিও আমার স্মৃতি জানতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। আজকাল লেখক কুলের অনেকেই ফেসবুকের কল্যাণে নিজের ভাললাগা মন্দলাগা অন্যকে ছ্যাঁকা দিতে বড় তৎপর। ব্যক্তিগত আত্মতুষ্টিতে ভোগেন — ওকে তো চরম দিলাম – গোছের আনন্দ। এটা হয়তো না পছন্দ, তাও ভালবাসার বন্ধুদের সাথে যদি কিছু সুখস্মৃতি ভাগ করে নিই, যদি তাদেরকে মুহুর্তের আনন্দ দেয় বা আমার ব্যাথায় তাদের চোখের কোণ ভিজে ওঠে — ক্ষতি কি ? কিছু তো আত্মজন রইল শূন্য এ পৃথিবীর বুকে।
কেন লিখি — বন্ধুত্ব পাতাতে, বন্ধুদের জানতে, অনুধাবন করতে, তাদের ভাবতে বা ভাবাতে — পূর্বসূরী, সমসাময়িক সাহিত্যিকদের জানতে, ইতিহাস, সমাজ, বাস্তব পরিস্থিতির গভীরে যেতে, মুখোমুখি দাঁড়াতে। এখনো বড় ভালবাসতে ইচ্ছা করে —তাই হয়তো লিখি...
"Two roads diverged in a wood, and I —
I took the one less traveled by."
ভাদরের আলসেতে কান্না শুকাতে দিয়েছিলাম,
“ভালবাসা না পাওয়া নদী যার বুকে
তার জলের মুক্তি কোথায় ? সেই নদীর পাঁচ চরাতেই আমার ঘর, সাঁইজি।”
কবিতা :
এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয় : নবারূন ভট্টাচার্য
আমার অন্ধকারে বাস,
পচনের তীব্র গন্ধ এক দীর্ঘ,
0 Comments