শ্রীতনু চৌধুরী
কেন লিখি ? সেটা বলার আগে বলে নেওয়া ভালো কী কী জন্য লিখি না! (এক) আমার লেখা থেকে কোন আন্দোলনের জন্ম হবে বা আমার লেখার দ্বারা কোন রাষ্ট্রবিপ্লব সংঘটিত হবে এই ভেবে কখনো কিছু লিখি না। (দুই) লিখে টু - পাইস ইনকাম হবে, লাইন দিয়ে লোকে আমার বই কিনবে, বই বিক্রির টাকায় গাড়ি বাড়ি হবে, বিদেশ ভ্রমণ করব - এই আকাশ কুসুম কল্পনা আমার মধ্যে নেই, এজন্য আমি লিখি না। (তিন) আমার লেখা থেকে কেউ ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হবে, আমার লেখা প্রেমের কবিতা পড়ে কারো মনে প্রেমের প্রথম কদম ফুল ফুটে উঠবে, আমার লেখা পড়ে কেউ তীব্র জেহাদি বা অতিবিপ্লবী হয়ে উঠবে বা হঠাৎ কারো জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হয়ে সে সবজান্তা হয়ে যাবে, একথা ভাবার ধৃষ্টতা আমার নেই- তাই এই ভাবনা থেকে লেখার প্রশ্নও নেই। (চার) আমার লেখা বই সরকারি- বেসরকারি বহু পুরস্কার অর্জন করবে এই ভেবে আমি লিখি না। (পাঁচ) লিখে কবি বা সাহিত্যিক হিসেবে আমি খুব সম্মানিত হব বা আমাকে সকাল বিকেল বিভিন্ন সংগঠন প্লাস্টিকের ফুল আর চাঁদমালা দিয়ে সংবর্ধিত করে পিঠ চাপড়াবে - সেই লোভে আমি লিখি না। (ছয়) আমার লেখায় মুগ্ধ হয়ে একদল হরিণী সারাক্ষণ আমাকে ঘিরে নেত্য করবে- সে আশাও আমি করি না, তাই তাদের জন্যও আমি লিখি না।
বস্তুত অর্থ, যশ, প্রতিপত্তি কোন কিছুর জন্যই আমি লিখি না। তাহলে কেন লিখি?
পাড়ার বখাটেদের বখাটে ছেলেটা, সারাক্ষণ যে কাঁধে একটা ব্যাট পকেটে একটা বল আর সাইকেলের ক্যারিয়ারে তিনটি উইকেট নিয়ে টো টো করে সারাদিন ঘুরে বেড়ায় তাকে হঠাৎ যদি তার কোন শুভানুধ্যায়ী প্রশ্ন করে ফেলে - কেন খেলিস? তার প্রত্যুত্তরে সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে শূন্য রানে আউট হয়ে ফেরা ব্যাটসম্যানের মত ফালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। দুরন্ত লেগকাটারটার মতো সে বুঝতেই পারেনা- এ প্রশ্নটার কী উত্তর হতে পারে, বা আদৌ কি এর কোন উত্তর আছে? ঘরে মা’র নীরব আর বাবার স্বরব ধাতানি খেতে খেতে ভাতের থালার সামনে বসে যখন সে প্রথম গ্রাসটা তুলতে যায় আর পেছন থেকে বাবা বলে উঠেন- লজ্জাও করে না কাঠবেকার হয়ে বয়স্ক বাবার পেনশনের টাকায় তিন বেলা গণ্ডেপিণ্ডে গিলতে! শুনেও ভাবলেশহীন অবলীলায় নাকে মুখে গুঁজে যে কারণে বেরিয়ে পড়ে সে টিংটং সাইকেলটা নিয়ে, প্রেমিকার তীব্র উপেক্ষাতে দগ্ধ হতে হতেও তার কোন প্রশ্নের উত্তর যার কাছে নেই, সেখানে আমি কোন হরিদাস পাল, যে এক কথায় বলে দেব - কেন লিখি? আসলে এ প্রশ্নের কোন উত্তর হয় না। যদিও বা জোর করে কোন উত্তর সাজাতে হয় তাহলে ওই বখাটে ছেলেটা যে উত্তর দেবে- খেলতে ভাল্লাগে তাই খেলি, বা বলবে -অন্য কিছু পারি না তাই খেলি। ঠিক তেমনই আমিও বলব লিখতে ভাল্লাগে তাই লিখি, নাচ গান আবৃত্তি অভিনয় পেন্টিং কিচ্ছু পারি না - তাই লিখি। তার শুভানুধ্যায়ীদের মত আমার আত্মীয় বন্ধুরাও বলে - সারাক্ষণ কবতে না কপছে দুটো টিউশন তো করতে পারো! বাড়িতে খেতে বসলে গৃহকর্ত্রীর গজগজানি- সারাক্ষণ খাতায় মুখ গুঁজে পড়ে আছেন, কি করে যে সংসার চলছে তা কেবল ভগবানই জানে, খাটতে খাটতে এদিকে আমার হাড়মাস একেবারে কয়লা হয়ে গেল, কী যে ছাইপাঁশ লেখে? কেউ তো পড়ে বলে বাপের জন্মেও শুনিনি! আর প্রেমিকা, মানে কাব্যকন্যে - যেন অধরা মাধুরী। বাস্তব আর পরাবাস্তবের মধ্যে সেতুবন্ধ করতে করতে মনে হয় সে এক অচিন পাখি, যাকে ছুঁতেও পারি না ধরতেও পারি না। “তারে ধরি ধরি মনে করি, ধরতে গেলেম আর পেলেম না” - তার মনে আমার জন্য প্রেম প্রীতি প্রশ্রয় না ঘৃণা কি আছে তাই তো এখনও বুঝে উঠতে পারলাম না। তবুও তাকে ধরার প্রযত্নেই মনে হয় যাবতীয় এই কাব্যসাধনা সাহিত্যচর্চা। তার তীব্র কটাক্ষ, বিরহ বেদনাই শব্দ হয়ে খাতার পাতায় ফুটে ওঠে। তার কুহেলি স্বভাবের আহ্নিক গতি বার্ষিক গতির হিসাব রাখতে রাখতে কখনো খাতার পাতায় ফুল ফোটে, বর্ষা নামে, আবার কখনো প্রবল ভূমিধ্বসে মনে হয় ধ্বংস হয়ে গেছে সবকিছু। তাই সেই ছেলেটি যদি বখাটে হয় তাহলে আমিও ভীষণ বাউন্ডুলে। আমরা দুজনেই আসলে নিয়তি নিয়ন্ত্রিত ভাগ্য বিড়ম্বিত। আমরা সত্যিই জানি না- কেন খেলি বা কেন লিখি!
ওই যে বললাম লিখতে ভালো লাগে তাই লিখি, তা লিখতে ভালো লাগে কেন? কারণ ভাবতে ভালো লাগে!
কী?
তাকে!
সে কে?
“দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা” - সে আমার মনের মানুষ- সে রাধে। সে আমার, তাকে আমি চোখে হারাই! সত্যিই কি আমি তাকে দেখেছি ? তাকে দেখা যায়?এই দেখা আর না দেখার মাঝে অমৃত কুম্ভের সন্ধানে লেখা হয়ে যায় হাজার হাজার পংক্তি। তার রূপ রস প্রকৃতি বর্ণনায় যে বুঁদ হয়ে থাকে সে কি আমি? এই প্রেম এই প্রণতি এই বিরহ বিধুর শ্লোক আমি কি লিখতে পারি? এ যেন পূর্ব নির্ধারিত। এ যেন লেখা হয়ে আছে। আমার কলমের ডগায় বসে কে যেন যুগ যুগ ধরে আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছে। এ লেখা পূর্বেও ছিল, আগামীতেও লেখা হবে। আমিই লিখব সে কবিতা। আদি অন্তহীন অবিনশ্বর একটাই কবিতা। একই অক্ষরের উপর বারবার দাগা বুলিয়ে চলা একটা নেশাগ্রস্ত মানুষ যে নিজেই জানে না সে কে? কোথা থেকে এসেছে? কোথায় যাবে?
সবুজ গালিচা প্রান্তে যেথায় মিশে গেছে দিকচক্র সেখানে পড়ন্ত গোধূলি-ই সূর্যের দিকে পিঠ রেখে প্রেমিকার ওষ্ঠ থেকে সমস্ত আগুন শুষে নিতে নিতে সে তার সারা শরীরে লিখে চলে অমোঘ সেই কবিতা। অবাক তাকিয়ে থাকে ঘরফেরতা বলাকার দল। তখন ঝুপ ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে। আরো নিবিড় আরো গভীর, বাঙ্ময় সে পদ্য লিখতে লিখতে মধ্যরাতে যখন দুই দেহ এক হয়ে অন্ধকারের অলিন্দে ছড়িয়ে পড়ে মন্দাক্রান্তা’র ছন্দ তখন ঘুম ভেঙে ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী প্রশ্ন করে- কেন লেখ সাঁই? তার মধ্যকার গভীর গুহা থেকে কে যেন তখন বলে ওঠে - আমি তো লিখি না কিছু, কেমন করে যেন লেখা হয়ে যায়। অন্ধকারেই তো যত রহস্য, অন্ধকারের গর্ভেই লুকিয়ে থাকে যাবতীয় সৃষ্টিবীজ। চুপ করো, কথা বলো না, প্রশ্ন করো না, শুয়ে আছে পরমা প্রকৃতি, জগতের আদি ও অনন্ত, তাকে দুচোখ ভরে দেখতে দাও, অনুভব করতে দাও, তলিয়ে যেতে দাও তার গহনে, তবেই তো আদি সেই শক্তিপীঠ থেকে জেগে উঠবে পরম ব্রহ্ম, যে ওঁঙ্কার স্বয়ং ঈশ্বর। আমাকে সেই ধনীর আরাধনা করতে দাও, আমাকে সেই শব্দের পূজা করতে দাও। সেখান থেকে কুড়িয়ে কুড়িয়ে ব্রহ্মবেদিতে আমাকে রাখতে দাও কিছু আনমোল রতন। ভোরবেলা না হলে কী সুরে গাইবে- রাই জাগো গো - - -
তা যদি মন্ত্র হয়, তা যদি কাব্য হয় তবে কায়মনোবাক্যে স্বীকার করছি সে শব্দব্রহ্ম কাগজে লেখার ক্ষমতা আমার নেই। তার একটা বাক্যও আমি লিখিনি। শুধু আমাদের আনন্দ দেবার জন্য সে নিজেই নিজেকে লেখে রোজ, নিজেকে ভাঙে-গড়ে নিজেকে সাজায়, আমি তো নিমিত্ত মাত্র।
ক্রীড়নক হয়ে যেমন অহরহ তার বন্দনা গান গেয়েছি তেমনি সময়ের শরশয্যায় কামদুনি, আর-জি-কর, হিন্দু-মুসলমানের ধর্মের নামে আস্ফালন, পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধের দামামা, অহংকারী শাসকের আস্ফালনে গণতন্ত্রের হত্যা ইত্যাদি তীব্র তীরগুলি যখন একে একে এসে বিদ্ধ করে সম্পন্ন মানব জমিন তখনই হাতে তুলে নিই সেই শব্দব্রহ্ম। অবশ্য তখনও আমি লিখি না। সে ভার বহন করার ক্ষমতা আমার নেই। আমার অন্তরে বসে তখনও আমার অজান্তেই আমাকে দিয়ে সে-ই প্রশ্ন করিয়ে নেয়- ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?’
1 Comments
অসাধারণ।অনেক অনেক শুভেচ্ছা।
ReplyDelete