জ্বলদর্চি

কেন লিখি /স্বপন কুমার দে

      
কেন লিখি
    
স্বপন কুমার দে


'কেন লিখি' - এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অনেকটা ভেতরে যেতে হয়। এর শেকড় অনেক গভীরে, অনেক পুরানো। আজ যদি আমার ছেলেবেলা হত, তাহলে বলতাম, মনের আনন্দে লিখি, কথা সঙ্গে কথা মিলিয়ে লিখি, ছন্দের তালে তালে লিখি। যেন খেলার এক একটা কৌশল। সেখানে ' লেখা ' --' খেলা '। ফুটবলে পাশ বাড়ানোর মত এখানে শব্দের পাশ বাড়ানো একটা নেশার মত। কিন্তু আজ এই শেষ পঞ্চাশে এসে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে অনেক কিছুই পর্যালোচনা করতে হয়। জীবনপথের অনেক চড়াই উৎরাই পার হতে হতে অনেক অভিজ্ঞতা নিয়ে জটায়ুর জটাভারে আক্রান্ত। এখন লেখায় শুধু আনন্দই নেই, অবধারিত জীবনবোধ কলমের রাশ টেনে ধরে। ব্যক্তি মন, ব্যক্তি সত্তা, মানবসমাজ, সমাজের সংঘর্ষ, মনোজাগতিক প্রক্ষোভ, ভালোলাগা,মন্দলাগা-- কত বিচিত্র ভাবনা, বিপরীত মনস্কতা, প্রাপ্তি- অপ্রাপ্তিতে ভারাক্রান্ত অথবা ভার লাঘবের ষড়যন্ত্র! তার মাঝখানে হতভম্ব , আমি এক বেচারা মানুষ, একবার এদিক, একবার ওদিক চাই আর দিশাহারা হই। আমার ঐ অবস্থা।  আমি যে কী বলতে চাই, কী বলা উচিত সেই উচিত অনুচিত জ্ঞানটুকুও হারিয়ে ফেলি। এত সবের মধ্যেও লিখি অভাবে, যন্ত্রণায়, হতাশায় বিক্ষোভে অথবা অকারণ আনন্দে।

কোন্ মানুষটির মধ্যে প্রথম লিখবার ইচ্ছা জাগল, সেটা জানা নেই। কেন জাগল, তাও জানা নেই। প্রয়োজনই সবচেয়ে বড় আবিষ্কারক। খাদ্যের প্রয়োজনে শিকার, শরীরি সুখের প্রয়োজনে রমণ, - এ তো জন্মগত, তাই আবিষ্কার নয়। কিন্তু মানুষ যেদিন নিজের ভাবনা অপরকে জানানোর প্রয়োজন অনুভব করল, সেদিন থেকেই তার লিখে রাখবার বাসনা জাগল। আমারও হয়েছে তাই। আমার ভেতরে কিছু কিছু গরমিল আছে, যার জন্য অনেক সময় ভাবনায় একঘরে হয়ে যাই, তখন আমি চেষ্টা করে দেখি গরমিলগুলো অন্য কারও মধ্যে আছে কিনা। লেখাটা একটা মাধ্যম, একটা কৌশল।

একটি কথা বহু কথিত এবং বহু ব্যবহারে জীর্ণ, " সাহিত্য সমাজের দর্পণ "। কাজেই মানুষ যা লিখে সমাজ থেকেই লিখে এবং সমাজের মানুষকে জানানোর জন্যই লিখে। কিন্তু সেটাই কি একমাত্র সত্য? এছাড়া কি অন্য কিছু নেই? আমি যে ভাঙা টালির ঘরে বসে জ্যোৎস্নালোকের অমৃত মধুর সৌন্দর্য দর্শন করে জ্যোৎস্না সমুদ্রে পাড়ি দিই সেটার কী হবে? সেখানে কল্পজগৎটাই সত্য, টালির ঘর সেখানে বিবেচ্য নয়। এই চাঁদনি রাত, এই প্রিয়ানুষঙ্গ, এই কল্প অভিসার, সব তাহলে ফালতু বক্ বকানি? আমি মনেকরি, তেমন নয়। বাস্তবে আমরা যতই দুঃখ দারিদ্র্যের আগুনে পুড়ে মরি, মনের গভীরে ভাবের সাতমহলাকে যত্নে রাখি। সেখানে আর কারও প্রবেশ ঘটে না, আমার অনুমতি ছাড়া।

জন্মগতভাবে আমরা দাসত্ব বহন করে চলেছি, হয় পরম্পরাগত নয়তো প্রভাবিত হয়ে। ভাবনার দাসত্ব। এই দাসত্বকে আমরা সুখ মনেকরি, এই দাসত্বে আমাদের পূর্ণ অধিকার। নড়চড় করবার দরকার নেই। পরাশ্রয়ে, পরনির্ভরতায় নিজেকে নিশ্চিন্ত আরামের জায়গায় পৌঁছে দিয়ে সুখ খুঁজে মুখ গুঁজে দিয়েছি। এটা যদি নিয়ম হয় তবে বেনিয়মটাই লেখার রসদ। আমরা চাইলেই যেটা পাই, সেটা আমাদের নিত্য দিনের অভ্যাস; সেটাকে না চাওয়াতেই যে কষ্ট তাই লেখার বিষয়।

কবিরা সবক্ষেত্রে অকপট নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটা আড়াল খোঁজেন, ভাবের অথবা অ-ভাবের। কিন্তু প্রাবন্ধিকেরা অকপট হতেই পারেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা সোজা ব্যাটেই খেলেন। আমিও এই জায়গায়। আমি একজন নির্ভেজাল নিখাদ সংসারী মানুষ-- দায়িত্ব ও কর্তব্যের কঠিন বাঁধনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। সে বাঁধনে প্রায়শই হাঁসফাঁস করি। কিন্তু মন? তার কী হবে? মনটাকে বাঁধা হবে কী করে? বিখ্যাত বাউল গানটির কথা মনে পড়ে গেল, " আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি, / মন বান্ধিবি কেমনে?" ...কাজেই বাঁধনকে আলগা হতেই হয়।

বর্তমানে যে সমাজ, পরিবেশে আমরা বাস করছি, তাতে বারেবারেই মনের ভেতরটা মোচড় দিতে থাকে। অসহিষ্ণু মন ভাষা খোঁজে। হয়তো সবসময় গুছিয়ে লিখতে পারা যায় না , তবুও লিখতে হয়, না লিখলে বুকের ধড়পড়ানি কমে না। আবার এটাও ভাবনার বিষয়, বিষ আছে বলেই তো অমৃতের খোঁজ করতে হবে। যন্ত্রণা আছে,
" তাই বলে কি প্রেম দেবো না?" তাই কি হয়? সমাজ আছে ,সমাজের মানুষ আছে, মানুষের বেঁচে থাকার মন্ত্র আছে। অতএব, জয়দেব থেকে জয় গোস্বামীরা যা লিখে গেছেন তাই লিখে যাই।

আমার লেখালেখির শুরুটা হয়েছিল আমার ছাত্রজীবনে, হাইস্কুলে ম্যাগাজিনে দেওয়ার জন্য। শুরু করেছিলাম গল্প দিয়ে। পরের বছর একই ম্যাগাজিনে দুটো লেখা বেরিয়েছিল একটি স্বনামে, একটি বেনামে। একটি প্রবন্ধ, অন্যটি কৌতুকনাটক। তারপর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে করতে পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, লেখালেখির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। অনেক পরে চাকরি জীবনের শুরুর কিছুটা আগে থেকে আবার শুরু। বেশি লিখতে সময় পাই না। লেখা তো লেখা নয়, তার জন্য ভাবনার দরকার। কখনো কখনো ভাবতে হয় না বাইরের আঘাত এত প্রচণ্ড হয় যে আপনা আপনি ভেতরের ইঁট, কাঠ, পাথর শব্দের আকার নিয়ে আছড়ে পড়ে কাগজে। তখন কলমের ধার বেড়ে যায়। মনেহয়, ধারালো বঁটি। কেমন যেন লেখা হয়ে যায়।

এত কিছু লেখালেখির পরেও আমার মনে প্রশ্ন জাগে, আমি কি সত্যিকারের লেখক হতে পেরেছি? না কি, শুধুমাত্র কাগজ কলম দিয়ে অর্থহীন শব্দের পাহাড় তৈরি করছি? তা কি কোনো পাঠকের মনকে তৃপ্ত করতে পারবে, নাকি অকারণ আবর্জনার মতো ছুঁড়ে ফেলা হবে? এখানে আরও একটি অব্যর্থ প্রশ্ন আসবে, তাহলে লিখি কেন? সংসারে তো অনেক কাজ আছে। পরিবারের,  সমাজের,  মানুষের  ভালো করবার কাজে মন দিলেই তো হয়। এই অকারণ সাহিত্য বিলাস কেন? এ ব্যাপারে মনের ভেতরেই একটা উত্তর আছে। যা লিখি তা যদি আমার প্রত্যক্ষ অনুভূতির সঙ্গে সত্য হয়, নিরপেক্ষ হয়, তাহলে নাইবা হল মনোগ্রাহী, রসগ্রাহী আমি তো আমার মনের যন্ত্রণাকে, হতাশাকে বা আনন্দকে প্রকাশ করে দিলাম। তাতে কার কী ক্ষতি? অনেক সময় গুছিয়ে বলার মধ্যে অতিরঞ্জন থাকে কিন্তু এলোমেলো অগোছালো কথাও তীরের ফলার মতো বুকের গভীরে আঘাত করে।

বন্ধু গো, যন্ত্রণা অনেক, যন্ত্রণার কারণ অনেক। আমরা সেসব যন্ত্রণা এড়াতে পারি না, বন্ধ করতে পারি না, কিন্তু বুকে যন্ত্রণার তীর গেঁথে আনন্দের গান শোনাতে পারি ,বিরহের দহন জ্বালায় জ্বলে ' মাহ ভাদরে শূন্য মন্দিরের' কথা বলে বেদনা জাগাতে পারি।

সংসারের মানুষের সংখ্যা যেমন অগন্য, তেমনই মানব প্রকৃতির বৈচিত্র্যও গবেষণার বিষয়। সমাজ তো সকলকে নিয়েই। কাজেই চাই বা না চাই, সবরকমের মানুষের সঙ্গেই আমাদের ওঠাবসা। সমস্যা সেখানে নয়, সমস্যা তৈরি হয় বিজাতীয় প্রকৃতির সঙ্গে মানসিক সংঘর্ষে এবং এই সংঘর্ষের ক্ষেত্রটি শুধুমাত্র বাইরের লোকের সঙ্গেই নয়, নিত্য নিয়মিত সংঘর্ষ চলেছে নিকট জনের মধ্যেও। স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, বাবা-ছেলে বা মেয়ে, এছাড়া প্রতিবেশীদের কথা না বললেও চলে। এই সংঘর্ষের বহিঃপ্রকাশ সবক্ষেত্রে একই রকম নয়। একই মানুষের ভিন্ন রূপ, ছদ্মবেশ, বিশ্বাসঘাতকতা, একের প্রতি অন্যের অবিশ্বাস আমাদের ভাবনার ভ্রান্তিবিলাস ঘটায়। একদিন যাদের সততার মহান মূর্তি হিসাবে গুরুজন বলে মানতাম, কালক্রমে তাদের অন্ধকার দিকটাও দেখতে পাই।

কবি নজরুলের মতো অতটা সাহস আর কার আছে? তাই তিনি অক্লেশে বলতে পারেন, " রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা,/ তাই লিখে যাই এ রক্তলেখা..." ইত্যাদি, ইত্যাদি। ভালোমন্দ, ন্যায় অন্যায়ের বোধ আমাদেরও আছে, তবু অনেক সময় নিজেকে যথাসম্ভব নিরাপদ জায়গায় রেখে প্রতিবাদ করি।

লিখে যাই, লিখব। যতদিন প্রাণশক্তি থাকবে, অনুভূতি শক্তি থাকবে সত্য মিথ্যা বোঝার ক্ষমতা থাকবে ততদিন নিজের তাগিদে লিখে যাবো।  

🍂

Post a Comment

0 Comments