অনামিকা তেওয়ারী
মানুষ বিভিন্ন কারণে লেখার চর্চা করে থাকে। কেউ নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সৃজনশীলতার একটি মাধ্যম হিসেবে লেখাকে বেছে নেন, কেউ সমাজ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে লেখেন, কেউ লেখেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে আবার কেউ কেউ নিছকই মনের অনুভূতিগুলিকে প্রকাশ করেন লেখার দ্বারা। আমার মনে হয় এসবের বাইরেও অনেকের জীবনেই লেখার ভাবনা এসেছে একাকিত্ব থেকে। আশেপাশে কেউ না থাকলে মানুষ যেমন নিঃসঙ্গতা বোধ করে তেমনই ভিড়ের মধ্যেও অনেকেই নিজেকে একা বোধ করেন। কারণ তাদেরকে বোঝার মতো সঠিক মানুষ থাকেনা। এই একাকিত্বের অনুভূতি অনেকসময় মানুষের কাছে একটি বিশ্বস্ত বন্ধুর জোগান দেয়, সেই বন্ধুটি হলো লেখা ! মানুষ যে কথা কাউকে মুখে বলে বোঝাতে পারে না, তা অক্ষরের সাহায্যে সহজেই তুলে ধরতে পারে। লেখার সাথে মনের এই নিবিড় যোগসূত্রটি পাহাড়ের সাথে বা সমুদ্রের সাথে মানুষের যে সম্পর্ক, অনেকটা তেমনই। নিঃস্বার্থ,প্রত্যাশাহীন! অনেকসময়
মানুষ এমন একটা আশ্রয় খোঁজে যেখানে মনের মধ্যে জমিয়ে রাখা রাশি রাশি শব্দের মুক্তি ঘটবে। লেখার চেয়ে এমন নিবিড় আশ্রয়স্থল সে আর পায় কোথায়!
বিচ্ছেদ ভাবনা থেকেও তো মানুষ লেখে। না পাওয়ার যন্ত্রণা, পেয়েও হারিয়ে ফেলার কষ্ট কখনো গল্প, কবিতা, উপন্যাস বা গান হয়ে পাঠক-শ্রোতার মন জয় করে।
প্রশ্ন হচ্ছে আমি কেন লিখি! কেন লিখি তার যথাযত ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। মানে আজ অবধি আমি তা ভেবে পাইনি। লিখতে শুরু করেছিলাম স্কুলে যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছি তখন থেকে। খুবই কাঁচা ছিল সেই প্রকাশ। কিন্তু হ্যাঁ, ওই স্কুল জীবনেই লুকিয়েছিল লেখার অনুপ্রেরণা। আমাদের গড়বেতা উমাদেবী উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা স্বর্গীয়া লতিকা রায় খুব সুপরিচিত, স্বনামধন্য লেখিকা ছিলেন। তাঁর লেখা গল্প নিয়ে “স্মৃতিটুকু থাক” নামে একটি সিনেমাও হয়েছিল। সেই কথা দিদিমণিদের কাছে শুনতে শুনতে ভাবতাম কেমন করে লিখতে হয়, কী লিখতে হয়! ভাবতে ভাবতেই একদিন ডায়রি পেন নিয়ে লিখতে বসেছিলাম। মনের কথা উজাড় করে দিতাম সেইসব পৃষ্ঠায়। মান-অভিমান, ঝগড়া, প্রেমের অনুভূতি লিখতে লিখতে একদিন আবিষ্কার করে ফেললাম আমার কল্পনা শক্তি ট্রেনের চেয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে চলে। মাথায় ভিড় করে আসে প্রতিদিনকার কত ঘটনা, লোকজন, তাদের গল্প… সবাইকে তো সবটা বলা যায়না তাই লিখতে শুরু করলাম। গল্প! পাতার পর পাতা ভরে উঠতো কাল্পনিক চিন্তা ভাবনায়। তবে সব চরিত্র কাল্পনিক ছিল এমনটা নয়। পরিচিত বা স্বল্প পরিচিত পছন্দের বা অপছন্দের মানুষগুলোই অনেকসময় আমার গল্পে চরিত্রের অভাব পূরণ করতো। তাদেরকে বলতে না পারা কথাগুলো অনায়াসে গল্পের চরিত্রদের মুখে বসিয়ে দিতে পারতাম। ক্রমেই উপলব্ধি করলাম, মনের অনুভূতি প্রকাশের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম এর থেকে ভালো আর কী-ই বা হতে পারে! ক্রমশই লেখার অদ্ভুত এক আনন্দ আর নেশা আমায় পেয়ে বসলো। নির্জন দুপুরে চিলে কোঠায় বসে, কখনো সাত সকালের খিড়কিতে বসে, কখনো বা ধুম বৃষ্টির সন্ধে বেলায় বারান্দায় বসে নিত্যনতুন কাল্পনায় ডায়রির পাতা ভরিয়ে তুলতাম। ডায়রিগুলোতে সেইসময়ের কথা লিপিবদ্ধ করা আছে যখন মুঠোফোন আবিষ্কৃত হয়নি।
লিখতে লিখতেই একদিন পড়তে শুরু করেছিলাম। গল্প, কবিতা। অনুভব করতে পেরেছিলাম একজন লেখকের সর্বপ্রথম পরিচয় হলো তিনি একজন পাঠক। ভালো শ্রোতা না হলে যেমন ভালো বক্তা হওয়া যায়না, তেমনই ভালো পাঠক না হলে ভালো লেখক হওয়াও যায়না। অন্যের লেখা পড়তে গিয়ে একসময় মনে হতো এই লেখাটা এইরকম হলে আরও ভালো হতো, এই গল্পের শেষটা এইরকম হলে বা কবিতার ভাষাটা আরেকটু সহজ হলে তা আরও বেশি সংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছতে পারতো। তাহলে নিজে লিখলে কেমন হয়। এটাও তো লেখার একটা অন্যতম উৎস বলে ধরা যেতেই পারে।
হ্যাঁ বলতে দ্বিধা নেই, একাকিত্বও একটা সময় আমার দোসর হয়েছিল। শতাব্দী প্রাচীন কোনো মন্দিরের গর্ভগৃহকে যেভাবে দখল করে নেয় অসংখ্য লতাপাতা, তেমনভাবেই আমার সমস্ত সুস্থ চেতনাকে গ্রাস করে নিয়েছিল হতাশা। তখনো ভাঙা খিলানের ন্যায় ভগ্ন শরীর আর মনের ফাঁক গলে একফালি আশার আলো হয়ে সেই জায়গাটা দখল করে নিয়েছিল লেখা! কখন যে সেই অন্ধকার সময়টা নতুন সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল বুঝতেই পারিনি। স্রেফ অনুভব করেছিলাম সেই নবতম জীবনের উত্তাপটুকু।
যখনই প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছি, কলম তুলে নিয়েছি। ওই একটি জায়গাতেই আক্ষরিক অর্থে স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছি। সামাজিক, পারিবারিক চাপমুক্ত এমন একটা উঠোন পেয়েছি, যেখানে অনায়াসে কিশোরীবেলার অভিমানী বিকেল থেকে, প্রাপ্তবয়স্ক মনের অসংখ্য দ্বন্দ্ব, সামাজিক, রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের ছবি এঁকেছি দিব্যি। এ এমন এক সাম্রাজ্য যার দাপুটে সম্রাজ্ঞী শুধুমাত্র একা আমি। কলমই যার একমাত্র হাতিয়ার। সেই সাম্রাজ্যে মাঝে মাঝে যে হানাদারের প্রবেশ ঘটেনা তা নয়, তবে সম্রাজ্ঞী তার নিপুণ যুদ্ধাস্ত্রে সেই হানাদারি রুখে দিয়ে স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
লেখাকে আমি উদযাপন করি এভাবেই। লেখার সাথে আমার সহাবস্থান এমনই দৃঢ় যে দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছেদের পরেও বোঝাপড়ায় টান পড়েনা একটুও। লেখক জীবন আমার জন্য এমন এক উন্মুক্ত জগতের সন্ধান দিয়েছে যেখানে যখন খুশি, যেভাবে খুশি ফিরে আসা যায়। তারজন্য কারুর কাছে কোনো জবাবদিহি করতে হয়না। যেখানে ফিনিক্স হয়ে ওঠার রহস্য খুঁজে পাওয়া যায়। তাই হয়তো যেদিন আমার লেখা থেমে যাবে, থেমে যাবো আমিও, চিরতরে।
🍂
0 Comments