নির্মাল্য মুখোপাধ্যায়
কবে প্রথম লিখতে শুরু করেছিলাম, তা আজ আর মনে নেই।কেন, কোথায়, কিভাবে সেই প্রথম লেখাটি এসেছিল তাও স্মরণে আনতে পারি না।কিন্তু সেইদিন থেকে আজ অবধি লেখার সঙ্গেই থাকতে পারছি,সে বড় সৌভাগ্যই বলতে হবে।
আমার কাছে, লেখার কারণ,মুখ্যত তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত।জীবন অভিজ্ঞতার বিচিত্র রূপকে বিচিত্র অনুভূতির ভিতর প্রকাশ।এবং বাকি দুই, এই প্রকাশে বিস্ময় এবং আনন্দের চির-উন্মীলন। হয়ত প্রত্যেক লেখকের কাছেই এই অনুভূতি পরম।অনির্বচনীয় এবং অমৃতময়।তাই একবার যে তারে পায়,হয়ত সে আর ফেরে না কিছুতেই।লেখা তাকে টানে,সে টানে লেখার রক্ত মাংস মজ্জা ও হৃদয়।
তবে মাঝে-মাঝে ভাবি,মনের সঙ্গে কলমের সংস্ক্রিয়া, সত্যিই সে এক আশ্চর্য আত্মীয়তা!রচনা-মুহূর্তে, কয়েক লক্ষ ভাগ আগের সময়েও জানা যায় না,এরপর ঠিক কোন শব্দ এসে, একটি-একটি করে ফুলের মতো গাঁথা হবে মালায়।মালা পূর্ণ হওয়ার পরে পড়ে থাকবে অসামান্য বিস্ময়। যা আমাকে ভাবতে বাধ্য করবে আমারই অপূর্ণতা।ভাবব, এই মালাই কি গাঁথতে চেয়েছিলাম আমি!নাকি হৃদয়ের বিভিন্ন রেখা আর রং ধরে অঙ্কিত ছবিটি আসলে অন্য পথের দিকে গেল—লেখকের ব্যর্থতার একটি উজ্জ্বল সাক্ষ্য হয়ে থেকে গেল লেখক এবং পাঠক, উভয়ের কাছে।সেই হিশেবে আমার সব লেখা-প্রচেষ্টা আসলে আমার ব্যর্থতার ইতিহাসই বহন করে চলেছে। মাথা নত, নিশ্চুপ বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই।বরং সলজ্জে স্বীকার করি,যা ধরতে চেয়েছি,তাকে কিছুতেই ধরে উঠতে পারিনি এখনও।হয়ত এ জীবনে পারব না,আগামী জন্মেও জারি থাকবে এই অক্ষমতার প্রয়াস।
তবে প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখা প্রয়োজন, মূলত কবিতাকে, কখনও কোনও দৈববস্তু বলে মনে হয়নি আমার।বরং খাওয়া-দাওয়া ঘুম ইত্যাদি ক্রিয়ার মতো যাপনের স্বাভাবিক অংশ হয়েই সে এসেছে।নিশ্চিতরূপে আগমন আকস্মিক এবং সেই আকস্মিক ঝলকই আমার কাছে স্বাভাবিক ! প্রথম কবিতা লেখার দিন থেকে তো এমনই হয়ে চলেছে বারবার। সে আসে আবার সে আসে না কিছুতেই।শুরুতে অস্থির হয়েছি।কিন্তু তারপর, বাসে যেতে-যেতে,বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে-মারতে,মাছের বাজারে অথবা একলা ঘরে সে এল রাজার মতোন,এবং সবকিছু থেকে আলাদা রেখে অধিকার করল আমারই সমগ্র সত্তা। বুঝতে পারি তার চেতনাপথ বহুধাবিভক্ত এবং বিচিত্রমুখী।চিন্তার ইতিহাসকেই একটু-একটু করে আসলে সে সঞ্চিত করতে চায়। এবং শুধু চিন্তার নয়,বরং এইমাত্র চলে যাওয়া সময়েরও ইতিহাসও ধারণ করতে চায় মানুষের সূক্ষ্মতম চেতনায়।
একটি উদাহরণ দিই।খুব ছোটবেলায় যে সবুজ অরণ্যের ভিতর বসে থাকতাম ,তারপর মেঘ কালো করে বৃষ্টি এলে,জঙ্গলের পাতায় পাতায় জল,ভিজতাম আমি। মনে হত,নির্ঘাত কোনও দেবতাকূল ওইসব গাছের উপর বসে আছেন,
তাঁদেরই ইশারায় বৃষ্টি হচ্ছে,অথবা রোদ উঠছে অফুরান।কিন্তু আজ মনে হয় সেই ঈশ্বর বা দেবতা, যে নামেই ডাকি,তারা আসলে আমারই পূর্বপুরুষ। মানব সভ্যতার একেবারে প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় পুরুষেরা পৌনঃপুনিকভাবে গাছের উপরে আশ্রয় নিতেন,এবং সেই স্মৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম প্রবাহিত হয়ে হয়ে বিশ শতকেও এই আমার মনেও এসে পড়ল,এবং বাধ্য করল তাকে লিখে রাখতে। আমি আনন্দ পেলাম,কিন্তু নিজেরই অগোচরে মানব ইতিহাসের একটি স্মৃতিও লিপিবদ্ধ করে রাখলাম আমি।
না লিখে থাকতে পারিনা,একথা যারা বলেন,হয়ত আমাদের সময়ের অতীত তাঁদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় এভাবেই। কিন্তু স্মৃতি রচনাই তো লেখার একমাত্র কারণ নয়,বরং লেখা সময়ের আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে আবিষ্কারের পথও খুলে দেয়। বিষাদে,অভিমানে,হিংসায়,ভালবাসায়,
নীরবতায়,সোচ্চারে,দ্বন্দ্বের আয়না দিয়ে, আরও কতভাবে, আমরা নিজেকে দেখতে পাই একটি সার্থক শিল্পের ভিতর।দেখা তখন লেখার ভিতর দর্শন হয়ে ওঠে।নিজস্ব শৈলী এসে সেই দূর বীক্ষণকে করে তোলে আরও শিল্পিত।মানুষ তার নিজের শিল্পায়াসে নিজেই বিম্বিত হয়। যে লেখে সে আমি নই,অথবা যে আমি লিখি,সেই সত্যিকারের আমি—এই দুদিক থেকেই কবিতা সত্যি হয়ে ওঠে।আর কে না জানে,যে লেখা সত্য,তা কিছুতেই মূল্যহীন নয়,অর্থহীন নয়।সময়ের খুব ক্ষুদ্র কোণেও তার অবস্থান জানান দেয়,আমি আছি আর আমার জন্য এই জগত রয়েছে।কলমের শ্রেষ্ঠ শিল্প দিয়ে তাই তাকে একটু-একটু অনুবাদ করে যাবো আমি।
🍂
0 Comments