ড. রাকিবুল হাসান বিশ্বাস
কলেজ শিক্ষক,
শ্রীচৈতন্য কলেজ, হাবড়া
১৫ এপ্রিল, ২০২৬-এ প্রকাশিত ‘হৃদয় দিয়েছি খুলে’ গল্পগ্রন্থটি সালেহা খাতুনের পঞ্চম মৌলিক গ্রন্থ। গ্রন্থটিতে বিভিন্ন সময়কালে লেখা মোট ২৬টি গল্প স্থান পেয়েছে। গল্পগুলির বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে সমাজ, সম্প্রীতির কথা, বিভিন্ন বয়সী নারীদের মনস্তত্ত্ব, শিশু মনস্তত্ত্ব, রূপকথা এবং লেখকের বাস্তব জীবন অভিজ্ঞতার কথা।
অধিকাংশ গল্পই আত্মজৈবনিক ভঙ্গিতে লেখা। যেমন ‘হৃদয় দিয়েছি খুলে’ গল্পে লেখক নিজের পুরো জীবনে অজস্র মানুষকে ফিরিয়ে দিয়ে নিজেই জীবননান্দ দাশের 'বনলতা সেন'-এর মতো অধীর আগ্রহে কারও জন্য অপেক্ষা করছেন। রচনাটি মূলত জীবনের পঞ্চাশটি বসন্ত পেরিয়ে ফেলে আসা যৌবনের প্রেম, প্রত্যাখান, স্মৃতিকাতরতা এবং এক না-বলা গভীর অনুভূতির এক অপূর্ব আত্মজৈবনিক কথন।
লেখকের এম.এ. পড়াকালীন পত্রলেখাকে কেন্দ্র করে রসাত্মক একটি ঘটনা ‘পত্রলেখা’ গল্পের বিষয়। অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় লেখা এই গল্পে চিঠির মাধ্যমে বিয়ে ঠিক হওয়া বা অন্যের দ্বারা প্রেমপত্র লেখানোর যে পুরোনো নস্টালজিয়া, তা সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। স্বল্প পরিসরে চরিত্রের মনস্তত্ত্ব এবং বাঙালি সমাজের একাল-সেকালের একটা হালকা রসাত্মক মেলবন্ধন তৈরিতে গল্পটি পুরোপুরি সফল।
আবার 'পথে পথে পাথর ছড়ানো' গল্পটিতে লেখক চলে গেছেন একেবারে বাল্যকালে। করোনা কালে একুশের আইনে অবরুদ্ধ জীবনের পটভূমিকায় লেখা এই গল্পটিতে লেখক তাঁর ছোটবেলায় গ্রামীণ পরিবেশে স্কুলে যাওয়ার পথের নানা রোমাঞ্চকর, ভয় ও আনন্দের অভিজ্ঞতার ছবি অঙ্কন করেছেন। লেখক জানিয়েছেন যে, তিনি এখন শহরের পথে পথে চললেও তাঁর গ্রামীণ শৈশবের এই চঞ্চল ও রোমাঞ্চকর স্মৃতিগুলো বারবার তাঁর মনে হানা দেয়। সহজবোধ্য ভাষা ও চমৎকার বর্ণনশৈলীর কারণে গল্পটি যেকোনো পাঠককে নিজের ফেলে আসা শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
🍂
অতিমারী করোনা কালের আবহে লেখা লেখকের আরেকটি গল্প ‘আনন্দ নিকেতন’। লকডাউন এবং একটানা অনলাইন ক্লাসের যান্ত্রিকতায় যখন শিশুদের শৈশব চার দেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে পড়েছিল, সেই বাস্তব চিত্রটি এই গল্পে ফুটে উঠেছে। লেখক শেষ লাইনে একটি চমৎকার সত্য তুলে ধরেছেন—অনলাইন শিক্ষার চেয়েও মামার বাড়ির আনন্দময় দিনগুলো শিশুদের প্রাণশক্তি, ধারণাশক্তি এবং চিন্তাশক্তিকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে। যান্ত্রিক শিক্ষার পাশাপাশি যে শিশুদের জন্য মুক্ত হাওয়া ও মানসিক আনন্দ কতটা জরুরি, গল্পটি সার্থকভাবে সেই বার্তাই দেয়।
পারিবারিক নারী মনস্তত্ত্ব লেখকের অনেক গল্পে জায়গা করে নিয়েছে। ‘নিমন্ত্রণ’ গল্পে আমাদের মধ্যবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের সামাজিক মনস্তত্ত্ব এবং তথাকথিত আত্মীয়তার ভেতরের এক জটিল ও বাস্তব রূপকে তুলে ধরা হয়েছে। আবার মধ্যবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে সন্তানদের, বিশেষ করে মেয়েদের বিয়ে নিয়ে মা-বাবার যে মানসিক টানাপোড়েন ও সামাজিক মর্যাদার লড়াই চলে, তারই এক নিখুঁত দলিল হয়ে উঠেছে ‘বিয়ের কার্ড’ নামক গল্পটি। ‘স্যালারি’ গল্পটিতে রয়েছে নারীর শ্রমের অসম্মান এবং অধিকারহীনতার কথা। শিক্ষা বা বড় চাকরি পেলেও যে একজন নারী পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শৃঙ্খল থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেন না, এ গল্পের হেমলতা ও রুমার জীবন তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। এছাড়া অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে লেখা ‘জোলাপ’ গল্পটি মানুষের ভেতরের গোপন ঈর্ষা, সম্পর্কের তিক্ততা এবং এক ধরনের নীরব মানসিক হিংস্রতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। 'অবসেশন’ অত্যন্ত চমৎকার এবং জীবনমুখী একটি গল্প। সেখানে মানুষের অবদমিত আকাঙ্ক্ষা, মানসিক ট্রমা এবং তা থেকে তৈরি হওয়া এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক আসক্তির কথা বলা হয়েছে।
অতিমারী এবং মনস্তত্ত্বনির্ভর গল্প ছাড়াও লেখক এই গ্রন্থে এমন অনেক চরিত্রকেন্দ্রিক গল্প সংকলন করেছেন, যার চরিত্রগুলি পাঠকের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে। যেমন এচামন বিবি কিংবা বালা হিজড়ের মতো চরিত্র। এচামন বিবি একজন স্বাধীনচেতা, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এবং তীব্র ধর্মভীরু বৃদ্ধা নারী। তিনি অসহায় হতে পারেন, কিন্তু তিনি দুর্বল নন। দুই সন্তান তাঁকে ঘর থেকে বের করে দিলেও প্রতিবেশী মোস্তফার অনুগ্রহ তিনি বিনামূল্যে নিতে চাননি। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, তাঁর অংশের জমিটি তিনি মোস্তফাকেই লিখে দেবেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত তাঁর উচ্চ আত্মমর্যাদাবোধের পরিচয় দেয়। আবার ‘বালা হিজড়ে’ গল্পের বালা চরিত্রটি আমাদের চেনা ছকের বাইরের একজন মানুষ। তাঁর যেমন ছিল নিজ ধর্মের প্রতি গভীর নিষ্ঠা, অপর দিকে তিনি ছিলেন উদার মনের অধিকারী। তিনি শুধু নিজের জন্য বাঁচেন না। তিনি অসহায় অনাথদেরও দেখাশোনা করেন। তাই সফিউন্নেসার মতোই আমাদের কাছেও তিনি আদর্শ 'গুরুমা' হয়ে উঠেছেন। 'দাদার সাধনা' গল্পে নাজিম যেভাবে বোনের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য নিজের জীবনের সমস্ত সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছে তাতে পাঠকের চোখে সে আদর্শ দাদা হয়ে উঠেছে। গল্পটি আমাদের শেখায় যে, পারিবারিক বন্ধন এবং তীব্র ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো দারিদ্র্য ও সংকটকে জয় করা সম্ভব। নাজিম চরিত্রটি সমাজের সেইসব নিঃস্বার্থ মানুষের প্রতীক, যারা নিজেরা প্রদীপের মতো পুড়ে অন্যের জীবন আলোকিত করে।
নারী, পুরুষ, শিশু থেকে শুরু করে সমাজ ও পরিবারের প্রতিটি স্তরের মানুষের আখ্যান 'হৃদয় দিয়েছি খুলে' গল্পগ্রন্থের গল্পগুলি। লেখক সেইসব মানুষের জীবন যন্ত্রণাকে, তাদের কঠিন কথাকে সহজ করে স্বল্পাকারে বলার চেষ্টা করেছেন। ছোটো থেকেই লেখক অজস্র গল্প শুনেছেন, পড়েছেন, যা তাঁর গল্পকার সত্তাকে একটু একটু করে জাগিয়ে তুলেছে। আবার লেখকের জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক টুকরো টুকরো ছবি তাঁর সুদক্ষ কলমের আঁচড়ে গল্পে রূপলাভ করেছে। জটিল ও দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার কিংবা অতিকথনে লেখক অত্যন্ত সংযম দেখিয়েছেন। ফলে তাঁর প্রতিটি গল্প প্রাণবন্ত এক ন্যারেটিভে পরিণত হয়েছে।
গল্পগ্রন্থ : হৃদয় দিয়েছি খুলে
গল্পকার : সালেহা খাতুন
প্রকাশক : রবিপ্রকাশ
প্রথম প্রকাশ : এপ্রিল,২০২৬
0 Comments