জ্বলদর্চি

কেন লিখি / ভবেশ মাহাত


কেন লিখি 

 ভবেশ মাহাত 

মানুষের জীবনে ভাষা যেমন ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম, তেমনি লেখালেখি সেই ভাবকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায়। সভ্যতার ইতিহাসে মানুষের  জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও কল্পনা সংরক্ষিত হয়েছে লেখার মাধ্যমে। তাই প্রশ্ন ওঠে—কেন লিখি? এই প্রশ্নের উত্তর এক নয়; অনেক। ব্যক্তি, সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানবসভ্যতার প্রেক্ষাপটে লেখার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য বিভিন্ন রকম। কেউ লেখেন আত্মপ্রকাশের জন্য, কেউ সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নে, কেউবা নিছক আনন্দের তাগিদে। কিন্তু সব লেখার অন্তরালে থাকে মানুষের নিজের কথা অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক গভীর আকাঙ্ক্ষা।
প্রথমত, লেখালেখি আত্মপ্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। মানুষের মনের ভেতরে প্রতিনিয়ত হাজারো চিন্তা, অনুভূতি, স্বপ্ন ও স্মৃতির জন্ম নেয়। সব কথা মুখে বলা যায় না, সব অনুভূতি বলে বোঝানোও যায় না, আবার সব অনুভূতি প্রকাশের জন্য তেমন শ্রোতাও পাওয়া মুশকিল। তখন কলম হয়ে ওঠে মনের কাছে দাঁড়ানোর একমাত্র সঙ্গী। লেখক তাঁর আনন্দ, বেদনা, প্রেম, বিরহ, আশা কিংবা হতাশার কথা লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করেন। অনেক সময় যে অনুভূতি মুখে বলা কঠিন, তা লেখার মাধ্যমে সহজেই বলা যায়। তাই লেখালেখি এক অর্থে আত্মার ভাষা।

  দ্বিতীয়ত, লেখালেখি মানুষের চিন্তাশক্তিকে আরো বেশি ধারলো করে তোলে। যখন কেউ লিখতে বসেন, তখন তাঁকে ভাবতে হয়, বিশ্লেষণ করতে হয় এবং যুক্তির মাধ্যমে নিজের বক্তব্যকে সাজাতে হয়। এর ফলে চিন্তার গভীরতা বৃদ্ধি পায়। লেখার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভাবনাকে আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে শেখে। একজন লেখক শুধু অন্যকে কিছু জানান না; তিনি নিজেকেও নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। তাই লেখালেখি আত্মবিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

তৃতীয়ত, সাহিত্য সৃষ্টির অন্যতম কারণ হলো সৌন্দর্যকে খুঁজে পাওয়া। মানুষের মন সৌন্দর্য ভালোবাসে। প্রকৃতির রূপ, মানুষের জীবন, সম্পর্কের জটিলতা কিংবা কল্পনার জগৎ—এসবের মধ্যে যে সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে, লেখক তা ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করেন। কবি যখন কবিতা লেখেন, তখন তিনি শুধু কিছু শব্দ সাজান না; বরং শব্দের মধ্যে সৌন্দর্যের এক নতুন জগৎ সৃষ্টি করেন। গল্পকার বা ঔপন্যাসিকও তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে পাঠককে এক অন্য বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এই যে নতুন সৃষ্টির আনন্দ, তা অনেক লেখকের লেখার প্রধান প্রেরণা।

  চতুর্থত, লেখালেখি সমাজের দর্পণ। সমাজের নানা সমস্যা, জটিলতা, অসঙ্গতি, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখক তাঁর কলম ধরেন এবং অবশ্যই সৌন্দর্যের অনুসন্ধান করতে। ইতিহাসে দেখা যায়, বহু লেখক তাঁদের লেখার মাধ্যমে সমাজে পরিবর্তনের সূচনা করেছেন। সাহিত্য মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলে। একজন লেখক যখন সমাজের অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরেন, তখন পাঠক নতুনভাবে ভাবতে পারেন। ফলে লেখালেখি শুধু বিনোদনের জন্য, এমনটা কিন্তু নয়; এর দ্বারা সামাজিক সচেতনতাও গড়ে ওঠে।
পঞ্চমত, লেখার মাধ্যমে আত্মপ্রচারও সম্ভব হয়। মানবসভ্যতার অগ্রগতির পেছনে লেখার অবদান অপরিসীম। বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, ধর্ম কিংবা সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই জ্ঞান পৌঁছেছে লেখার মাধ্যমে। যদি লেখার প্রচলন না থাকত, তবে মানুষের অর্জিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান হারিয়ে যেত। আজ আমরা প্রাচীন সভ্যতার কথা জানি, কারণ সেসব তথ্য লিখিত ছিল। তাই লেখালেখি মানবজাতির স্মৃতিকে অমর করে রাখে।
লেখার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো যোগাযোগ। একজন লেখক তাঁর চিন্তা ও অনুভূতির সঙ্গে পাঠকের অনুভূতির এক মেলবন্ধন তৈরি করেন। কখনও একজন পাঠক কোনো লেখা পড়ে অনুভব করেন যে লেখক যেন তাঁর নিজের মনের কথাই লিখেছেন। এই টান লেখক ও পাঠকের মধ্যে এক বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলে। ভাষা, সংস্কৃতি চিন্তাধারার মিল অনুভব করে। লেখালেখি মানুষের হৃদয়কে একসূত্রে বাঁধে।
অনেকেই লেখেন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। ইতিহাসে বহু আন্দোলন, বিপ্লব ও সামাজিক পরিবর্তনের পেছনে লেখকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাঁদের লেখা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস জুগিয়েছে। কলম অনেক সময় অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। কারণ অস্ত্র মানুষের শরীরকে আঘাত করতে পারে, কিন্তু লেখা মানুষের মনকে পরিবর্তন করতে পারে।
লেখালেখি মানসিক প্রশান্তিরও উৎস। অনেক সময় মানুষ দুঃখ, কষ্ট কিংবা একাকিত্ব থেকে মুক্তি পেতে লেখেন। ডায়েরি লেখা, কবিতা লেখা কিংবা গল্প রচনা—এসবের মাধ্যমে মানুষ নিজের অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করতে পারেন। মনোবিজ্ঞানীরাও মনে করেন, লেখালেখি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। তাই লেখার মধ্যে এক ধরনের আত্মশুদ্ধির ব্যাপার কাজ করে।
লেখকের আরেকটি দায়িত্ব হলো সময়কে ধরে রাখা। একটি যুগের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়। ফলে সাহিত্য কেবল কল্পনার সৃষ্টি নয়; এটি ইতিহাসেরও একটি দলিল। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোনো সময়কে জানতে চাইলে সেই সময়ের সাহিত্য তাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। এই কারণেও লেখালেখির গুরুত্ব অপরিসীম।
তবে লেখালেখি সবসময় কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে হয় না। অনেক সময় লেখক নিছক আনন্দের জন্য লেখেন। সৃষ্টির আনন্দ মানুষের অন্যতম বড় আনন্দ। একজন শিল্পী যেমন ছবি আঁকতে ভালোবাসেন, একজন সংগীতশিল্পী যেমন গান গাইতে ভালোবাসেন, তেমনি একজন লেখক লিখতে ভালোবাসেন। লেখার মধ্যেই তিনি নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পান।
বাংলা সাহিত্যের বহু সাহিত্যিক তাঁদের লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মত প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের মিলনের কথা বলেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ভাষা হিসেবে। জীবনানন্দ দাশ তাঁর নিঃসঙ্গ অনুভূতির জগৎকে ভাষায় রূপ দিয়েছেন। প্রত্যেকের লেখার কারণ আলাদা হলেও মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের জীবন ও অনুভূতিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা এবং তা প্রকাশ করা।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে লেখার মাধ্যম ও পরিসর অনেক বিস্তৃত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্লগ, অনলাইন পত্রিকা কিংবা ই-বুক—সবখানেই মানুষ লিখছেন। ফলে লেখালেখি আজ আর শুধু সাহিত্যিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সাধারণ মানুষও নিজের মতামত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে। সত্য, মানবতা ও নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে লেখা উচিত।
পরিশেষে বলা যায়, মানুষ লেখে নিজেকে জানার জন্য, অন্যকে জানাবার জন্য, সৌন্দর্য সৃষ্টি করার জন্য, সমাজকে বদলানোর জন্য এবং সময়কে ধরে রাখার জন্য। লেখালেখি মানুষের সৃজনশীলতার এক উজ্জ্বল প্রকাশ। এটি শুধু শব্দের সমাহার নয়; এটি অনুভূতি, চিন্তা, স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত রূপ। তাই “কেন লিখি” প্রশ্নের সবচেয়ে সহজ উত্তর হতে পারে—আমরা লিখি বেঁচে থাকার জন্য, নিজের অস্তিত্বকে অর্থপূর্ণ করে তোলার জন্য এবং মানুষ থেকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যাওয়ার জন্য।

🍂

Post a Comment

0 Comments