সত্যজিৎ পড়্যা
আমি কেন লিখি-----এই প্রশ্নটা অনেকবার নিজেকেই করেছি। প্রতিবারই মনে হয়েছে, উত্তরটা সরল নয়; বরং বহু স্তরে ছড়িয়ে থাকা এক গভীর অনুভব। আমি লিখি, কারণ আমার ভেতরে এক অদৃশ্য স্রোত বয়ে চলে—চিন্তার, অনুভূতির, প্রশ্নের, আর একাকিত্বের। সেই স্রোতকে শব্দে না ধরলে, যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলি। আমার কাছে লেখা কোনো বিলাসিতা নয়; এটা একধরনের প্রয়োজন। যদি বলি যেমন শ্বাস নেওয়া, তেমনই লিখে ফেলা। অনেক সময় এমন হয়, চারপাশে এত মানুষ, এত শব্দ, তবুও মনে হয় আমি একা। তখন কলমই আমার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী হয়ে ওঠে। সেই সময় আমি অনুভব করি, “The act of writing is the act of discovering what you believe.” --ডেভিড হেয়ার (David Hare)। সত্যিই, আমি লিখতে লিখতেই বুঝতে পারি, আমি কী ভাবছি, কী অনুভব করছি।আমি লিখি কারণ আমি ভাবি। আর আমি ভাবি বলেই লিখি। আমার চিন্তাগুলো কখনো সহজ নয়-ওগুলো জটিল, কখনো অস্পষ্ট, কখনো গভীর দুঃখে ভরা, আবার কখনো আশার আলোয় উজ্জ্বল। এই চিন্তাগুলো যদি শুধু মনের ভেতরই ঘুরপাক খায়, তবে তারা ভারী হয়ে ওঠে। তাই আমি সেগুলোকে শব্দে রূপ দিই, যেন মনটা একটু হালকা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক জায়গায় লিখেছিলেন, “লেখা মানে নিজের সঙ্গে নিজের আলাপ।” আমি এই কথাটাকে নিজের জীবনে গভীরভাবে অনুভব করি। যখন আমি লিখি, তখন আসলে আমি নিজের সঙ্গেই কথা বলি।আমার আনন্দ, আমার বেদনা, আমার প্রশ্ন-সবকিছুই যেন কাগজের ওপর নিজের ভাষা খুঁজে পায়।একজন লেখক কেন লেখেন---এর উত্তর হয়তো প্রত্যেকের কাছে আলাদা। কিন্তু আমার কাছে লেখার মধ্যে আছে একধরনের মুক্তি। আমি যখন লিখি, তখন আমি আমার ভেতরের চাপ, অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা-সবকিছু থেকে একটু দূরে সরে যেতে পারি। তখন মনে হয়, আমি আমার অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি, তাদের একটা আকার দিতে পারছি।ফ্রান্ৎস কাফকা বলেছিলেন, “A book must be the axe for the frozen sea within us.” আমার কাছে লেখাটাও ঠিক তেমনই-আমার ভেতরের জমে থাকা অনুভূতির বরফকে ভেঙে দেয়। আমি যখন লিখি, তখন আমি নিজের ভেতরের সেই নীরবতাকে ভাঙি, যেটা হয়তো অন্য কেউ কখনো বুঝতে পারবে না।আমি লিখি কারণ আমি দেখতে চাই-আমার দৃষ্টিভঙ্গি কতটা আলাদা, কতটা সাধারণ। আমি সমাজকে দেখি, মানুষের আচরণ দেখি, সময়ের পরিবর্তন দেখি। এসব কিছু আমাকে ভাবায়। আর সেই ভাবনাগুলোই ধীরে ধীরে লেখায় রূপ নেয়। আমি অনুভব করি, একজন লেখক শুধু নিজের জন্য লেখেন না; তিনি তার সময়েরও এক নীরব সাক্ষী।অনেক সময় আমার মনে হয়, আমি না লিখলে হয়তো আমার ভেতরের কথাগুলো হারিয়ে যাবে। শব্দই আমার স্মৃতির ধারক। আমার মতে আমরা আজ যা ভাবছি, কাল হয়তো তা ভুলে যাব-কিন্তু যদি লিখে রাখি, তবে তা রয়ে যাবে। এই ভাবনাটা আমাকে লিখতে আরও উৎসাহ দেয়। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেছিলেন, “There is nothing to writing. All you do is sit down at a typewriter and bleed.” এই কথাটা আমার কাছে খুব সত্যি মনে হয়।কারণ, লেখা কখনো সহজ নয়। অনেক সময় শব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না, বাক্য গঠন করা কঠিন হয়ে ওঠে, কিন্তু তবুও আমি লিখি। কারণ আমি জানি, এই কষ্টের মধ্যেই আছে একধরনের সত্যতা। আমি লিখি কারণ আমি অনুভব করি-আমার ভেতরের কথাগুলো শুধু আমার নয়, অনেকেরই হতে পারে। হয়তো আমার লেখা পড়ে কেউ তার নিজের অনুভূতির প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবে। এই সম্ভাবনাটাই আমাকে লিখতে প্রেরণা দেয়।সবশেষে, আমি বলতে পারি-আমি লিখি কারণ আমি বাঁচি, আর আমি বাঁচি কারণ আমি লিখতে পারি। আমার কাছে লেখা কোনো পেশা নয়, কোনো অভ্যাস নয়--এটা আমার অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি যতদিন ভাববো, ততদিন লিখবো। আর আমি লিখি, কারণ আমি এসব নিয়ে চিন্তা করি-আমার চিন্তাগুলোই আমার লেখার জন্ম দেয়।এইভাবেই, আমার লেখা আমার নিজেরই এক প্রতিচ্ছবি-নীরব, অথচ গভীরভাবে সত্য।
🍂
0 Comments