জ্বলদর্চি

কেন লিখি/স্বাগতা পাণ্ডে

কেন লিখি

স্বাগতা পাণ্ডে 

লেখার বিষয় হল 'কেন লিখি'। কেন লিখি বাক্যটি যদি প্রশ্ন হতো তাহলে উত্তরে বলা যেত , ইচ্ছে হয় তাই লিখি, কিন্তু এখানে এটা ঠিক প্রশ্ন উত্তর এর বিষয় নয়। এটা  খুব গভীর একটা বিষয় বা আত্ম বিশ্লেষণ এবং বলা যেতে পারে এটা একটা আত্ম জিজ্ঞাসা। সত্যিই তো, আমি কেন লিখি। প্রতিবার লেখার আগে, এর একটা জবাব যেমন নিজেকে দেবার দায় থাকে, তেমনি সমাজ কে তথা পাঠককুল কে ও দেবার দায় থাকে। আর সবার আগে দায় থাকে কাগজ কলম কে  তথা আধুনিক ল্যাপটপ কে জবাব দেবার। আমি আমার নিজের জীবনের সীমিত মূল্যবান মূহুর্ত গুলো ব্যয় করে, ভাবনার স্তরে উলট-পালট করে, শব্দ ও বাক্যের যে পাহাড় গড়ে তুলছি তাতে আমার নিজের কি উপকার করব এবং যারা এই বর্ণ ও শব্দ সম্ভার তাদের মূল্যবান সময় ব্যয় করে পড়বে তাদেরই বা কি ধরনের উপকারে আসবে বলা ভালো আদৌ আসবে কিনা। আমি কেন লিখছি? শুধু মাত্র আমি লিখি, আমি লেখক সমাজের মধ্যে পড়ি এই আত্মস্লাঘার কারণে  কুণ্ডু র সাথে মুন্ডু অন্তমিল দিয়ে পাঠকের চোখে ও মনে কিছু দৃষ্টি দূষণ বা বলা ভালো পাঠদূষণ ঘটানোর অধিকার কি আমার আছে?  

অন্য যাঁরা লেখেন তাঁদের কথা এখানে বলাটা  আমার পক্ষে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ধৃষ্টতার , তাই আমি কেন লিখি এই প্রসঙ্গেই আলোচনা করাই ভালো। 
প্রসঙ্গত বলি যে, প্রথম যখন লিখতে শুরু করেছিলাম, তখন সেটা ছিলো একান্তই যাকে বলে " ট্রেস কমানোর উপায় মাত্র" । সেই সময়কার জীবনের দেওয়া পাহাড় প্রমাণ চাপ, যন্ত্রনা, টেনশন, ভবিষ্যতের ভাবনা, একাকীত্ব, দায়বদ্ধতা  ইত্যাদির সঙ্গে লড়াই করার শক্তির প্রতিদিনের রিচার্জ সিস্টেম মাত্র। যা আমাকে রিলিফ দিত মনের  সবরকম নেতিবাচক প্রভাব থেকে। পরবর্তী কালে সেটা হয়ে দাঁড়ালো অভ্যাস। আর তার ও পরে ওটাই হয়ে উঠলো আমার নিজের কাছে নিজের একটা পরিচয়। যেহেতু আমি ভালো পাঠক, তাই শব্দ ও ভাবনা নিয়ে এই খেলা সৃষ্টি করছিল নতুন কিছু, যার মূল্য শুধুমাত্র আমার কাছেই সীমিত ছিল। আমার পঠিত বইগুলি, বিষয়গুলি আমার মধ্যে জীবনবোধ, স্বচ্ছ ভাবনা, ভালো-খারাপের মধ্যেকার সুস্পষ্ট সীমারেখা ইত্যাদি ধীরে ধীরে গড়ে তুলছিল।অনেক পরে বিশেষ বিশেষ কোনো বিষয় সমাজের অন্য দের জন্য ও গুছিয়ে রাখার প্রয়োজন পড়ছিল। যেমন - শিক্ষণীয় কোন বিষয়ের জগত, যা টুকরো টুকরো অবস্থায় ভেসে বেড়াচ্ছে। যাদের প্রয়োজন তারা অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে বার করে এনে শুধুমাত্র নিজের কাজ চালাচ্ছে এবং পরবর্তী সময়ে আবার তা এলোমেলো বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ভেসে বেড়াচ্ছে। সেই জটিল গুছিয়ে রাখার কাজটা করার জন্য আমি নিজেকেই এগিয়ে দিয়েছি অনেক সময়। জটিল কে সহজ করার চেষ্টায় লিখে গেছি। আবার কখনো কখনো শুধুই প্রাণের আনন্দে লিখেছি, নিজের জীবনের বোধ, দর্শন , অনুভূতি, ক্ষোভ, কষ্ট ইত্যাদি কে প্রকাশ করে নিজেকে যেমন হালকা করতে লিখেছি  তেমনি  মনের মধ্যে জমে থাকা না বলতে পারা  ভালোবাসার বা কষ্টের অনুভূতি গুলো ও লিখেছি। তবে কেন লিখি এই আত্মজিজ্ঞাসা প্রতিবার লেখার সময় এসেছে, যা লিখতে চলেছি তার মান, বিষয় ও গুরুত্ব যথাযথ থাকছে তো? 
 লেখা টা আমার কাছে আমার পরিচয়। আমার লেখার পাঠককুল আছে কিনা জানিনা, বলা ভালো এই ধৃষ্টতা কখনো দেখানোর কথা ভাবিনি। তবে কেন লিখি প্রশ্নে নিজের কাছে নিজের উত্তর  হয়, ভালো লাগে ভাবতে, ভাবনার জগতে ডুব দিতে। এ খনন পরিশ্রমের। তা সত্ত্বেও এ পরিশ্রম আনন্দের এবং আত্মিক উন্নতি ও বটে। কবির ভাষায় বলতে হয় " খননের শ্রম একই, কেউ মাটি কাটে কেউ কবিতা লেখে"। 
সবার শেষে তাই নিজের কাছে নিজে এই সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে, "আমি লিখি, কারণ আমি ভাবতে ভালবাসি। আমি লিখি, আমার নিজস্ব জানার ও বোঝার মানকে আরো উন্নত করতে এবং  বিপুল জ্ঞানের আলো আত্মস্থ করে নিজেকে তার সহজ সার সত্য টুকু বোঝানোর জন্য আমি লিখি। আমি নিজের সাথে কথা বলতে ভালোবাসি, তাই  আমি লিখতে ভালবাসি।
🍂

Post a Comment

2 Comments

  1. সোমনাথ মুখোপাধ্যায়July 10, 2026

    ঊর্ণনাভ যেমন জাল বুনে শিকার ধরার জন্য ফাঁদ পেতে অপেক্ষা করে, লেখকরাও ঠিক তেমন‌ই। কথার জাল বুনে বুনে লেখকরাও অপেক্ষা করেন কখন পাঠকরা সেই জালে ধরা পড়বেন। লেখাতো আসলে মন্থন দণ্ড। যত লেখা হবে তত‌ নিজের মনের জট খুলতে থাকবে। লেখা মানে হলো আত্মদর্শনের সর্বোত্তম উপায়।যে নিজের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা নিজেকে খুঁজে পেতে চায় সেই লিখে চলে নিশিদিন




    ReplyDelete
  2. AnonymousJuly 10, 2026

    শেষ কথাটাই আমার মনের কথা

    ReplyDelete