মননের দর্পণে জীবনের কিছু টুকরো কথা
সপ্তম পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
"স্বাবলম্বী" কথাটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। ছোটবেলা থেকে এইসব কথা আমরা প্রায়শই শুনে শুনে বড় হই যে, সাবলম্বী হতে হবে- স্বাবলম্বী না হলে জীবনে বাঁচার মতো বাঁচা যায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। এই অর্থে "স্বাবলম্বী" বলতে বিশেষতঃ গুরুত্ব দেওয়া হয়- অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এবং কিছুটা নিজ নিজ কর্মের দিক দিয়ে সাবলম্বী হবার ব্যাপারে।
কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাস্তব পরিস্থিতি, সামাজিক ক্ষেত্র অভিজ্ঞতা প্রদান করে যে- অর্থনৈতিক দিক থেকে সাবলম্বী হওয়া যেমন জরুরি,তেমনি আবেগগত তথা মানসিক ও শারীরিক দিক থেকেও স্বাবলম্বী হওয়া উচিত, অন্ততঃ যতটা সম্ভব স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
উপদেশাকত্মক কথায় আমরা শুনি, কারো কাছে কিছু আশা করা উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবে কর্মজীবনে এই নীতিটির প্রয়োগ ততটা সহজ কথা কিন্তু নয়। আবেগজনিত কিছু প্রত্যাশা মনের মধ্যে- অবচেতন মনে হলেও কাজ করে। আমরা আমাদের জীবনে আশা করে ফেলি এবং তার অনুরূপ ঘটনা না ঘটলে, মন হতাশাগ্রস্ত হয়- দুঃখ পায়। অনেক সময় এই হতাশা এতটাই বেড়ে যায় বা এমন পর্যায়ে যায়, যেখানে ফলস্বরূপ ব্যক্তির আচরণ কখনো অত্যন্ত আক্রোশাত্মক হয়ে যায় আবার কখনো বা অত্যন্ত অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
🍂
শারীরিক প্রকৃতিগত অক্ষমতার ক্ষেত্রে ব্যক্তি অসহায়। কিন্তু যে ক্ষেত্রে "ঘোড়া দেখে খোঁড়া" হওয়ার অভ্যাস হয়ে যায়- সমস্যাটা হলো সেই ক্ষেত্রে। এই মানসিকতাও কিন্তু জীবনে দুঃখ আনয়ন করে। পরনির্ভরতা তা শারীরিক বা মানসিক যা-ই হোক না কেন, পরিণামে তা দুঃখই উৎপন্ন করে।
প্রত্যেক সচেতন জীবের সব দিনের জীবনচর্যা একইভাবে চলে না।ব্যক্তি তো সচেতন জীব- প্রাক্ষোভিক বিভিন্ন দিকগুলোর প্রভাবও ব্যক্তির মানসিক ক্ষেত্রে বদল আনে। শরীরের উপর মানসিক অবস্থার প্রভাবও কিন্তু অনেকটাই। অন্যান্য দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে ব্যক্তির নিজের উপরেও কিছু দায়িত্ব থাকে। অন্যভাবে বলা যায়, সবার মানসিকতাও সমান নয়। ফলে আজ যে পরিস্থিতিতে, ব্যক্তির যে আচরণ করছে- পরবর্তী সম পরিস্থিতি বা অন্য পরিস্থিতিতে সম আচরণ করবে তা কিন্তু নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না। তাই মানসিক দিক দিয়ে সাবলম্বী হওয়াটা খুব জরুরি। পরিস্থিতি বা পরিবেশ যা-ই হোক না কেন, তার প্রভাব সঠিকভাবে পরিচালনা করার ক্ষমতা যেন ব্যক্তির নিজের মধ্যে থাকে সেই ক্ষমতাও অর্জন করা উচিত। কারোর সাহায্যে মনের পরিস্থিতি বদলে যাবে বা কেউ সবকিছু ঠিক করে দেবে এই সব আশা মনের মধ্যে পোষণ না করে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের দায়িত্বে নিজে ঠিক থাকতে হবে এটা বোঝা দরকার।
শারীরিক সক্ষমতার ব্যাপারে স্বাবলম্বী হওয়ার কথা বলার কারণ হলো- শারীরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অলসতাবশতঃ অন্যের উপরে নির্ভরশীল হয়ে তার দ্বারা নিজের কার্যসিদ্ধি বা কাউকে কখনো কোনো সাহায্য করে তার প্রতিদানে তার কাছ থেকে সাহায্য আশা করা- এগুলো পরোক্ষে নিজের ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি করে। ব্যক্তি কখন কোন পরিস্থিতিতে কি করবে তা নিশ্চিত করে কেউ কখনো বলতে পারে না। আর অভ্যাসগত প্রত্যাশা মানুষকে মানসিকভাবে পঙ্গু বানিয়ে দেয়। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তি কর্মে অনীহা বোধ করে। এই পরনির্ভরশীলতা পরিণামে দুঃখপ্রদায়ী হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়,আমরা আমাদের বাড়িতে যে সব দৈনন্দিন কাজে সাহায্যকারী বা সাহায্যকারীণী মানুষদের নিযুক্ত করি, তাদের ওপরে নির্ভরশীলতা যখন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায়, তখন তাদের কোন কারণবশতঃ অনুপস্থিতি নিজেদের দৈনন্দিন কার্যসম্পাদনের ক্ষেত্রে দৈহিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদেরও মানসিকভাবে পঙ্গু বানিয়ে ফেলে। কষ্টের চেয়ে মানসিকভাবে অক্ষমতার ধারণাটা এক্ষেত্রে অসহ্য এক মানসিকতা সৃষ্টি করে। তাই সময় সুযোগ থাকলে অন্তত নিজেদের কাজ যতটা সম্ভব নিজে সেরে নেওয়া- অন্যের বোঝা না হওয়ার চিন্তাভাবনা মনের মধ্যে পোষন করা উচিত। এটা অন্যের থেকেও নিজের ক্ষেত্রে অনেক বেশি শান্তি প্রদায়ী অনুভূতি।
নিজের স্বপ্ন, নিজের মানসিক প্রশান্তি, সক্ষম হলে নিজের কাজ-এসব বিষয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার মানসিকতা গঠন করা প্রয়োজন। না হলে যতই সম্পত্তি- অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বা স্বনির্ভরতা অর্জন করা যাক্ না কেন, জীবনে শান্তি লাভ করা খুব একটা সহজ ব্যাপার হবে না বা প্রকৃত অর্থে স্বাবলম্বীও বলা যাবে না।।
0 Comments