বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১৩৫
আখগাছ
ভাস্করব্রত পতি
"শিয়াল পণ্ডিত আখ খেতে বড় ভালবাসে, তাই সে রোজ আখ ক্ষেতে যায়। একদিন সে আখের ক্ষেতে ঢুকে একটি ভিমরুলের চাক দেখতে পেল। ভিমরুলের চাক সে আগে কখনো দেখেনি, সে মনে করল ওটা বুঝি আখের ফল।
বিক্রির জন্য কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে সাজানো রয়েছে আখের বাণ্ডিল
শিয়াল কিনা পণ্ডিত মানুষ, তাই সে আখকে বলে ‘ইক্ষু’, ক্ষেতকে বলে ‘ক্ষেত্র’, লাঠিকে বলে ‘দণ্ড’।
ভিমরুলের চাক দেখে সে বললে, ‘আহা ইক্ষুর কি চমৎকার ফল! খেতে না জানি কতই মিষ্টি হবে?’ এই মনে করে যেই সে ভিমরুলের চাক খেতে গিয়েছে, অমনি সব ভিমরুল বেরিয়ে কি-মজাটাই তাকে দেখাতে লাগল! শিয়াল তো প্রাণের ভয়ে খালি ছোটে, আর বলে, ‘ইক্ষুর ক্ষেত্রে আর যাব না!’
খানিক বাদে ভিমরুলগুলো তাঁকে ছেড়ে গেল। তখন সে ভাবলে, ‘ক্ষেত্রে তো রোজই যাই, তাতে কিছু হয় না। ফল খেতে গিয়েই আমার বিপদ হল। তবে আর ক্ষেত্রে যাব না কেন? ফল না খেলেই হল।’ এই ভেবে সে বলতে লাগল, ‘যদি ইক্ষুর ক্ষেত্রে যাব, ইক্ষুর ফল আর না খাব!’ দুদিন সে খালি এ কথাই বলে।
আখ মাড়াই মেশিন
তারপর যখন বেদনা একটু কমে এল, তখন সে ভাবলে, ‘ঐ ফলটার ভিতর পোকা ছিল, তারাই আমাকে কামড়েছে। আগে যদি ফলটাতে নাড়া দিতুম, তবে পোকাগুলি বেরিয়ে যেত। তারপর ফল খেতে কোনো কষ্ট হত না! আহা, সে ফল খেতে না জানি কতই মিষ্টি। তবে আর ফল খাব না কেন? খাবার আগে পোকা তাড়িয়ে দিলেই হবে।’ এই ভেবে সে বলতে লাগল, ‘যদি ইক্ষুর ফল খাব, আগে দণ্ড দিয়ে নাড়া দিব!’ বলতে বলতে আখের ক্ষেতে গিয়ে সে তো লাঠি দিয়ে নাড়া দিয়েছে। অমনি আর যাবে কোথায়! ভিমরুলের দল এসে তাকে কামড়িয়ে আধমরা করে তবে ছাড়ল। সেই থেকে সে আর ইক্ষুর ফল খেত না।"
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর 'টুনটুনির বই'য়ের 'আখের ফল' গল্পের এই কাহিনি আমাদের সকলেরই চেনা। আখ তথা 'ইক্ষু' (ইষ্+ক্কস্) শব্দের অর্থ হ'লো 'অসিপত্র'। অর্থাৎ 'তলোয়ারের মতো পাতা'। যার প্রান্তভাগ বেশ ধারালো। একটু অসাবধানতা হলেই হাত কেটে যেতে সময় নেয়না। রাজশাহীতে বলে --
'লক্ষ লক্ষ ডাণ্ডা ছক ছক পাত
এহি এহি ডাণ্ডা সাড়ে ষোলো হাত'।
এই গাছটি তার তলোয়ারসম অসিপত্রের সাহায্যে আত্মরক্ষা করে। ধূর্ত শেয়ালের হাত থেকে বাঁচার জন্য আখগাছ একটু লম্বা হ'লেই এর শুকনো পাতাগুলি দিয়ে গাছের গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হয়। এই গাছটির পরিচিতি এর মিষ্টতার জন্য। তাই মেদিনীপুরের লোকজন ছড়া কেটে বলে --
'এখান থেকে মারলাম দৃষ্টি
ঐ গাছটা বড় মিস্টি'।
ঠিক এরকমই ছড়া রাজশাহীর লোকজনও বলে --
'এইখান থাইক্যা কোরলাম দৃষ্টি
ঐ গাছটা বড় মিস্টি'।
বাংলা প্রবাদেও থরে থরে সাজানো রয়েছে আখের কথা। কথা বলার সময় অনেকেই বলেন - 'আখ আর সরষে, না পিষলে রস কিসে', 'আখক্ষেত থাকতে সেলামালি নেই' (আলাইকুম সালাম), আখ দিতে পারে না, গুড়ের নাদা ধ'রসালাম', 'আখগাছটি দিয়ে মারলেও মিষ্টি লাগে না', 'আখ হোক মিষ্টি, শেকড় নয় ইষ্টি', 'আখগাছটির লোভে গুড়পেয়েটি গেল', 'আখ ছোঁচতে কুক্সিমের বাত' ইত্যাদি। প্রবাদের পাশাপাশি ধাঁধাতেও অসংখ্যবার উল্লেখ রয়েছে আখের। মুরিয়া উপজাতির লোকজন আখ নিয়ে একটি ধাঁধাতে বলে --
'Rough leaves, silver branches,
If You do not know this riddle,
বিজ্ঞানসম্মতভাবে আখচাষ
অথর্ববেদেও উল্লেখ করা হয়েছে আখের কথা। এখানে আখকে 'কান্তার' বলে ব্যক্ত করা হয়েছে --
'অয়ং স ইক্ষুর্যস্মিন্ সোমমিন্দ্রঃ সুতং দধে। কান্তারঃ সহস্রশ্রিয়ং কামধরণং শ্নয়ধ্বম্।।'
অর্থাৎ এটিই সেই কান্তার। ক হ'ল জল। আর তাতেই মধুর রস বা কান্ত। এককথায় মধুর রস যে দান করে। আর তা হল ইক্ষু।
'ইক্ষু' হল সংস্কৃত শব্দ। এছাড়াও সংস্কৃতে আখকে পুঞ্জ, কান্তার, কজ্জল, হিন্দিতে ইখ, উখ, উক, গন্না, গাঁড়া, ওড়িয়াতে আখু, তেলুগুতে চিরকু, মারাঠিতে উস, গুজরাটিতে শেরডী, কন্নড়ে কবু, কম্বিন মেরু, ফারসিতে নেশকর, অসমীয়াতে কমবুস শক্কর বলা হয়। আখের আরও অনেক নাম রয়েছে। আখকে বলা হয় কর্কটক, বংশ, সুকুমারক, অসিপত্র, মধুতৃণ, বৃষ্য, গুড়তৃণ ইত্যাদি।
চরকের সূত্রস্থানের ২৭ তম অধ্যায়ে আখের দুটি শ্রেণীবিভাগ করা হ'য়েছে। একটি পৌণ্ড্রক, এবং আর একটি বংশক। আবার সুশ্রুতের সূত্রস্থানের ৪৫ তম অধ্যায়ে এর ১২ টি শ্রেণী করা হয়েছে। এই ১২ টি আখের নাম হল -- কান্তার, তাপসেক্ষু, কাষ্ঠেক্ষু, সূচীপত্রক, কোশকৃৎ, নৈপালী, পৌণ্ড্রক, ভীরুক, বংশক, শতপোরক, দীর্ঘপত্র এবং নীলপোর। ষোড়শ শতকে প্রকাশিত আয়ুর্বেদিক গ্রন্থ ভাবপ্রকাশে এইসব আখের গুণের আলাদা আলাদা বিবরণ রয়েছে।
বাঁশ ও ঘাসের জাতভাই আখ হল Poaceae পরিবারের অন্তর্গত। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম --
Saccharum officinarum
Saccharum arundinaceum
Saccharum bengalense
Saccharum edule
Saccharum procerum
Saccharum ravennae
Saccharum robustum
Saccharum sinense
Saccharum spontaneum
এই বর্ষজীবী উদ্ভিদটির কান্ড ৬-১২ ফুট লম্বা হয়। মোটা গাঁটযুক্ত এবং নিরেট। গাঁট থেকেই শিকড় বের হয়। এটি লিকপিকে এবং সরু সরু গাছ। বীরভূমের লোকজন তাই বলে --
'লিক লিক গাছ চিক চিক পাতা
মালেক ডাণ্ডা সাড়ে ষোলো হাত
খেতে মধু ফেলতে কাপাস'।
আবার কোথাও কোথাও বলতে শোনা যায় --
'চিক চিক দাড়ি লিক লিক পাতা
খাইতে মধুর, ফেলাতে চোপা'।
লম্বা আকারের আখগাছ নিয়ে ময়মনসিংহের লোকজনকে বলতে শোনা যায় --
'এম্বু লেম্বু তেম্বুর গাছ
একটা লেম্বু বাইশ হাত'।
বিশ্বের ১১০ টি দেশে আখ চাষ হলেও সবচেয়ে বেশি আখ উৎপাদনকারী দেশ হল ব্রাজিল। তবে ব্রাজিল, থাইল্যান্ড ও ভারত হল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আখ রপ্তানিকারক দেশ। ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আখ চাষ হয় উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং কর্ণাটকে। দেশের ৮০% আখ মেলে এই তিন রাজ্য থেকে। চিনি উৎপাদনেও এই তিন রাজ্যই সেরা। উত্তরপ্রদেশকে বলা হয় 'ভারতের চিনির বাটি'। এছাড়াও তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, গুজরাট, বিহার, গোয়া, পাঞ্জাব, হরিয়ানাতেও ব্যাপক আখ চাষ হয়।
আখ নিয়ে নিরন্তর গবেষণার জন্য কোয়েম্বাটোরে ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় Sugarcane Breeding Institute (SBI)। উত্তরপ্রদেশের লক্ষ্ণৌতে ১৯৫২ এর ১৬ ই ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় ICAR (Indian Sugarcane Research Institute)। এইসব সংস্থার মাধ্যমে আখের অসংখ্য উচ্চফলনশীল প্রজাতি তৈরি হয়। এরপর থেকেই আখচাষে জোয়ার আসে ভারতে। বাড়ে চিনির উৎপাদন পরিমাণ। বেগুনি, হলুদ, সবুজ এবং লাল এই চার ধরনের আখ চাষ হচ্ছে ইদানিং। দেশী পুঁড়ী, কাজলা, কাজলী, কান্ডারী, খড়ী, শ্রেয়া, অতুল্য, শ্যামসাড়া, বোম্বাই, উপহার, পুন্নাগাই, সংকল্প, CO 18022 (কর্ণ ১৮), CO 213, CO 214, Co 281, Co 285, Co 290, Co 312, CO 313, Co 419, Co 453, Co 740, Co 997, Co 1148, Co 62175, Co 6304, Co 6806, HR 19, CoC 25, প্রজাতির আখগাছের চাষ হয় গ্রামবাংলায়।
মাড়াইয়ের অপেক্ষায়
আখের প্রতিটি পর্ব তথা গাঁট (একে চোখ বলে) থেকে শিকড় গজায়। তাই এই জাতীয় গাছকে বৃক্ষায়ুর্বেদে 'পর্ব যোনি' নামকরণ করা হয়েছে। ঐ পর্বগুলিকে মাঝখানে রেখে ২ ইঞ্চি মাপের টুকরো টুকরো ক'রে কেটে রোপণ করলে নতুন গাছ জন্মায়। সাধারণত চৈত্র বৈশাখ মাসে ক্ষেতে আখগাছের চারা লাগানো হয়। হিন্দু সংস্কৃতিতেও জড়িয়ে রয়েছে আখ। গোয়ালপূজার সময় বরণডালাতে শালুক ফুল, কাঁচা গোটা সুপারি, হলুদ তেলের সাথে কয়েক টুকরো আখ দিতে হয়। পূজার প্রসাদেও আখ ছাড়িয়ে কুচি কুচি করে দেওয়ার রেওয়াজ আছে। বিহারীদের ছট পূজার সময় আখের চাহিদা মারাত্মক বেড়ে যায়। মশা খেদানো উৎসবে আখের ডাণ্ডা দিয়েই কুলোর পিঠে ঘা মেরে শব্দ করা হয়। এখন তো রাস্তাঘাটে আখ মাড়াই মেশিনের ছড়াছড়ি। সকালে উঠে আখের রস খেতে এই দোকানদাররাই ভরসা।
আখের সবুজ রঙের কাণ্ডযুক্ত ছাল ছাড়িয়ে ভেতরের হালকা সাদা অংশকে পেষাই করলে সুমিষ্ট রস বের হয়। আখের বাইরের ছাল শক্ত। কিন্তু সেই শক্ত ছাল (ছিলকা) ছাড়ালে ভেতরে মেলে সুমিষ্ট রস। এই বিষয়টাই উঠে এসেছে অনেক লোককবির রচনায়। কুমিল্লায় শোনা যায় --
'আল্লার কি কুদরত
লাঠির ভিতর সরবত'।
তেমনি নেত্রকোনাতে বলতে শোনা যায় --
'আল্লাহর কি মেহেরবানী
লাঠির ভিতর মিঠাপানি'।
আখগাছের ডোগার দিকে রস বেরোয়না। বরং মাঝের অংশ থেকে গোড়ার দিকের অংশ মাড়াই করলে রস পাওয়া যায়। ধাঁধাতেও পাই সেই রসালাপ --
'আগায় খস খস গোড়াইয় মৌ
যে না বলতে পারবে সে পবন ঠাকুরের বৌ'।
আখের ডোগায় যে রস পাওয়া যায় না, এ তথ্য জানতো না বোকা কুমির। শেয়ালের কাছে তার নাকাল হওয়ার গল্প কিন্তু আখচাষের সেই বোকামির বিষয়ের ঘটনা নিয়েই। বোকা কুমির আর চালাক শেয়ালের গল্পটির লেখক ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। এই গল্পে আছে বিভিন্ন চাষের পাশাপাশি আখচাষের মাধ্যমে কুমিরকে নাকাল করার সুন্দর কাহিনি -- 'কুমির আর শিয়াল মিলে চাষ করতে গেল। কিসের চাষ করবে? আলুর চাষ। আলু হয় মাটির নীচে। তার গাছ থাকে মাটির উপরে, তা দিয়ে কোনো কাজ হয় না। বোকা কুমির সে কথা জানতো না। সে ভাবলে বুঝি আলু তার গাছের ফল।
তাই সে শিয়ালকে ঠকাবার জন্য বললে, ‘গাছের আগার দিক কিন্ত আমার, আর গোড়ার দিক তোমার।’
শুনে শিয়াল হেসে বললে, ‘আচ্ছা তাই হবে।’
তারপর যখন আলু হল, কুমির তখন সব গাছের আগা কেটে তার বাড়িতে নিয়ে এল। এনে দেখে, তাতে একটিও আলু নেই। তখন সে মাঠে গিয়ে দেখল, শিয়াল মাটি খুঁড়ে সব আলু তুলে নিয়ে গেছে। কুমির ভাবলে, ‘তাই তো। এবার বড্ড ঠকে গিয়েছি। আচ্ছা, আসছে বার দেখব!’
তার পরের বার হল ধানের চাষ। এবার কুমির মনে ভেবেছে, আর কিছুতেই ঠকতে যাবে না। তাই সে আগে থাকতেই শিয়ালকে বললে, ‘ভাই, এবারে কিন্ত আমি আগার দিক নেব না, এবার আমাকে গোড়ার দিক দিতে হবে।’
শুনে শিয়াল হেসে বললে, ‘আচ্ছা তাই হবে!’
তারপর যখন ধান হল, শিয়াল ধানসুদ্ধ গাছের আগা কেটে নিয়ে গেল। কুমির তো এবারে ভারি খুশি হয়ে আছে। ভেবেছে, মাটি খুঁড়ে সব ধান তুলে নেবে। ও কপাল! মাটি খুঁড়ে দেখে সেখানে কিছুই নেই। লাভের মধ্যে খড়গুলো পেলো।
তখন কুমির তো বড্ড চটেছে, আর বলছে, ‘দাঁড়াও শিয়ালের বাছা, তোমাকে দেখাচ্ছি; এবারে আর আমি তোমাকে আগা নিতে দেব না। সব আগা আমি নিয়ে আসব।’
আখের এই পর্ব বা গাঁট থেকেই নতুন গাছ জন্মায়
সেবার হল আখের চাষ।
কুমির তো আগেই বলেছে, এবার আর সে
আগা না নিয়ে ছাড়বে না। কাজেই শিয়াল তাকে আগাগুলো দিয়ে নিজে আখগুলো নিয়ে ঘরে বসে মজা করে খেতে লাগল।
কুমির আখের আগা ঘরে এনে চিবিয়ে দেখলে, খালি নোন্তা, তাতে একটুও মিষ্টি নেই। তখন সে রাগ করে আগাগুলো সব ফেলে দিয়ে শিয়ালকে বললে, ‘না ভাই, তোমার সঙ্গে আর আমি চাষ করতে যাব না, তুমি বড্ড ঠকাও!’
আখের রস পান করলে মত্ততা আসে। এই আখের রস থেকে যেমন চিনি, আখের গুড় তৈরি হয়, তেমনি মদও তৈরিও হয়। প্রোষ্টেট গ্লান্ডের বৃদ্ধিতে, রক্তপিত্ত, পাণ্ডুরোগ, কৃশতা, পুরোনো আমাশার নিরাময়ে আখের রস কার্যকরী। আর আখের রস মাড়াইয়ের পর পরিত্যক্ত শুকনো ছিবড়ে খুব ভালো জ্বালানি। আখের রসের সঙ্গে বাস্তব জীবনের রসায়ন বেশ রসালো। সেই বিষয়টাই মানিকগঞ্জের লোকজনের মুখে শোনা যায় -
'রস খাই যার
ছাল ফেলাই তার'।
0 Comments