মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২২০
ড. গোবিন্দ প্রসাদ কর (অধ্যাপক, লোকগবেষক, পাঁশকুড়া)
ভাস্করব্রত পতি
"এক অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ স্কুল শিক্ষকের 'স্বপ্ন'কে সফল করতে পাশে দাঁড়ালেন আর এক কলেজ শিক্ষক। সংগ্রহশালা এবং গবেষণাগার গড়তে দান করলেন জমি।" - ঠিক এভাবেই তাঁকে নিয়ে মূল্যায়ণ করেছিল সংবাদমাধ্যম। আসলে তিনি ইতিহাস ভালোবাসেন। ইতিহাস বাঁচানোর জন্য সংগ্রাম করেন। ইতিহাসকে জনসমক্ষে তুলে ধরতে কলম ধরেন। পৃথিবীর ইতিহাস নয়, যেখানে তিনি বসবাস করেন, বেঁচেবর্তে থাকার অনুপ্রেরণা পান, সেই বসতভিটার ইতিহাস। সেই এলাকার ইতিহাস। সেই অঞ্চলের ইতিহাস। ইতিহাসের অধ্যাপক হয়ে এই কাজগুলি করতে তাঁর প্রাণপণ উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো।
তিনি গোবিন্দ প্রসাদ কর। বর্তমানে বাজকুল মিলনী মহাবিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান (ইউজি ও পিজি) পদে কর্মরত। তিনি যাঁর স্বপ্ন কে সফল করতে এগিয়ে এসেছিলেন, তিনি ময়নার রামচন্দ্রপুর রাইসুদ্দিন হাইস্কুলের প্রাক্তন সহশিক্ষক ড. সুকুমার মাইতি। যিনি একসময় (১৯৭০) নিজের গ্রাম তিলখোজাতে নিজের বাড়িতে গড়ে তুলেছিলেন একটি সংগ্রহশালা এবং গবেষণাকেন্দ্র। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে সরকারি রেজিস্ট্রেশন পায় এই সংগ্রহশালা। ১৯৯৫ সালে ড. সুকুমার মাইতি ময়না ছেড়ে খড়গপুরে পাড়ি দেন। তাঁর লালন পালনে পরিপুষ্ট বিজন পঞ্চানন সংগ্রহশালা ও গবেষণা কেন্দ্রটির জন্য আলাদা ভবন তৈরির জমির খোঁজ শুরু করেন। আর তখনই এগিয়ে আসেন এই অধ্যাপক।
বাজকুল মিলনী মহাবিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক (২০০৮ এর ৩০ শে জুন থেকে এখানে কর্মরত) তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার মাইলস্টোনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন এম.এ., এম.ফিল., বি.এড. এবং পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি।তবে এই মুহূর্তে তিনি একাডেমিক দায়িত্ব হিসেবে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচ.ডি. ওয়ার্ক এবং সহ গবেষণা নির্দেশক (Co Supervisor) পদে আসীন।
তাম্রলিপ্ত রাজবাড়িতে এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তব্য রাখছেন ড. গোবিন্দ প্রসাদ কর
১৯৭৪ এর ১৬ ই জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন পাঁশকুড়া থানার চকরাধাবনের প্রত্যন্ত কালই গ্রামে। বাবা মতিলাল কর। বাঁশঝাড়ে ঘেরা গ্রাম থেকে তাঁর উত্তরণ অনেক চড়াই উৎরাই পথ পেরিয়ে। অনেক বাধা বিপত্তি ঠেলে সরিয়ে। অনেক উপেক্ষা আর অবজ্ঞা গায়ে না মেখে আজও নিরবচ্ছিন্নভাবে করে যাচ্ছেন নিরন্তর গবেষণা। তাঁর লেখনীতে উঠে আসছে অসংখ্য অজানা ব্যক্তিত্ব, ঐতিহাসিক ঘটনা, যুগান্তকারী সংগ্রামের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। যা কিনা প্রাতিষ্ঠানিক গবেষকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় সহায়ক তথ্য ভাণ্ডার হয়ে উঠেছে।
সম্পাদিত ম্যাগাজিন 'মুকুলিকা'
তিনি তাঁর মেধার গুণে সরকারি কলেজের অধ্যাপনায় নিযুক্ত হয়ে আরাম আয়েশে কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সে পথ মাড়াননি। এই তরুণ গবেষকের মন সেখানেই থেমে থাকেনি। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর অনুসন্ধিৎসু এবং সৃজনশীল মন দিয়ে বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রছাত্রী, গবেষকদের আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষণার পথ দেখাতে। দিনের শেষে একাজে তিনি সফল। এই সফলতাকে পাথেয় করেই তাঁর পথচলা। তাঁর টিকে থাকা। তাঁর এগিয়ে যাওয়া।
প্রত্যেক মানুষেরই কর্মজীবনে ক্ষেত্রে একজন 'আইডল' থাকে। তেমনি মেদিনীপুরের এই ক্ষেত্রীয় গবেষকের কর্মজীবন ও অদম্য কর্মানুপ্রেরণার মূলে উৎস হিসেবে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ, মহাত্মা গান্ধী এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর ভাবাদর্শকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এঁদের অনুসরণ করেই কাজের গতিলাভ করেন। ২০০৩ - ২০০৮ পর্যন্ত পাঁশকুড়া বনমালী কলেজে ইতিহাস সাম্মানিক বিভাগের অতিথি অধ্যাপক রূপে অধ্যাপনা করেছেন। পরে স্থায়ীভাবে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হন বাজকুল মিলনী মহাবিদ্যালয়ে। তিনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কারজয়ী নির্মলচন্দ্র মাইতির প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধিনাথ মহাবিদ্যালয়ের ডোনার মেম্বার রয়েছেন ২০১৩ থেকে। আর ২০০৯ থেকে রয়েছেন নিজের কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য।
গবেষণাধর্মী কাজ ও নিরন্তর সাহিত্যচর্চার প্রয়োজনে তিনি সদস্য হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ, ঢাকা ইতিহাস আকাডেমি, বাংলাদেশ কবিতা সংসদ (পাবনা) , মেদিনীপুর ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র, তাম্রলিপ্ত সংস্কৃতি সভা, পূর্ব মেদিনীপুর হেরিটেজ কমিটি, পূর্ব মেদিনীপুর রঘুনাথবাড়ি নদী গবেষণা কেন্দ্র, বিদ্যাসাগর মানব বিকাশ সংস্থা, Bengal Progressive Farmers & Flowers Scientific Association, Panskura, ইতিকথা, মেদিনীপুর সমন্বয় সংস্থা, Indian Institute of Mother & Child Welfare, Kolkata, বঙ্গবন্ধু রিসার্চ অ্যান্ড কালচারাল ফাউন্ডেশন (ঢাকা) এবং বাজকুল মনীষী চর্চা কেন্দ্রের সাথে। 'কাজের মানুষ' হয়ে থাকতে চান সবসময়। তাই তাঁর কাজের পরিসীমায় স্থান পায় মেদিনীপুরের আত্মীয় স্বজন। যাঁদের দিনকাল জড়িয়ে ছিল মেদিনীপুরের আত্মার করিডোরে।
অঙ্গাঙ্গীভাবে সেই জড়িয়ে থাকার সুবাদে ড. গোবিন্দ প্রসাদ কর লিখেছেন অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বই। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে চল্লিশটিরও বেশি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। যেগুলি যথেষ্ট চিন্তার খোরাক দেয় গবেষকদের। 'মুকুলিকা' নামে একটি ম্যাগাজিনেরও সম্পাদনা করেন তিনি। তাঁর লেখা গবেষণাধর্মী সেই বইগুলি হল 'দুই দিশারী' (A Bioghraphical Sektch of Gobardhan Pramanik & Rajanikanta Pramanik, 21 January 2012), 'যুগপুরুষ বিদ্যাসাগর' (1 July 2020), শিক্ষাদরদী মরমী হৃদয় বলাই চরণ মণ্ডল (29th September 2018), 'মেদিনীপুরে নেতাজী : আঞ্চলিক ভাবনা' (26th December 2023), 'তমলুকের স্বাধীনতা আন্দোলনে কর্মযোগী রজনীকান্ত' (Biography of Rajanikanta Pramanik as Freedom Fighter & Social Worker, 9th May 2013), 'মিলনের স্মৃতি সুধায় আভা' (12th April 2023), 'Women in History, Women Make History (1947AD - 2025AD) : A Post Independence Evaluation', (1st May 2026), 'প্রনম্য আভা' (22nd April 2025), 'Jungle Mahal: A Post Independence Evaluation 1947-2020', (November 2025), 'তুমি রবে নীরবে' (5th September 2022), 'অনন্য জাতীয় শিক্ষক নির্মলচন্দ্র মাইতি' (19th November 2016), 'প্রবাসী সূচী ও ইতিহাস প্রবাহ' (1st July 2018), 'নির্মল আলোকে' (1 July 2018) বইগুলি। এছাড়াও তাঁর লেখা 'অনন্য সুচিকিৎসক ডা. পশুপতি মাইতি' (২০১৩), 'ডেবরার ইতিহাসে মহাত্মার ভাবযুক্ত সৈনিক নগেন্দ্রনাথ সেন' (২০২২), 'তুমি রবে নীরবে' ( ৫ ই সেপ্টেম্বর ২০২২), 'শ্রীশ্রীনবীনানন্দ জীউর মাহাত্ম্যের ইতিবৃত্ত' (২০২৩), 'ডেবরার নকশাল আন্দোলন' (২০২৩), 'Mogalmari Sakhisena Pathshala : A Fairy Tale' (09.09.2020), 'The History of Pendra Zamindari in Chattisgarh (2022), 'Unique National Teacher & His Dream Siddhinath Mahavidayalaya (2021), রামায়ণ গানের আধুনিক রূপকার অনাথবন্ধু দাস অধিকারী (২০২৫), 'পিংলা থানার স্বাধীনতা আন্দোলন' (২০২৬), 'প্রশ্নোত্তরে হিন্দুধর্ম' (২০২৬) ইত্যাদি বই।
সামাজিক কাজেও জড়িয়ে থাকেন বছরভর
গবেষণাধর্মী কাজ ও নিরন্তর সাহিত্যচর্চার প্রয়োজনে তাঁকে জড়িয়ে থাকতে হয়েছে দেশ বিদেশের বহু সংগঠনের সাথে। ক্ষেত্রগবেষক ও আঞ্চলিক ইতিহাসকারদের কাছে এ এক বড় পাওয়া। তিনি সদস্য হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ, ঢাকা ইতিহাস আকাডেমি, বাংলাদেশ কবিতা সংসদ (পাবনা), মেদিনীপুর ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র, তাম্রলিপ্ত সংস্কৃতি সভা, পূর্ব মেদিনীপুর হেরিটেজ কমিটি, পূর্ব মেদিনীপুর রঘুনাথবাড়ি নদী গবেষণা কেন্দ্র, বিদ্যাসাগর মানব বিকাশ সংস্থা, Bengal Progressive Farmers & Flowers Scientific Association, (Panskura), ইতিকথা, মেদিনীপুর সমন্বয় সংস্থা, Indian Institute of Mother & Child Welfare (Kolkata), বঙ্গবন্ধু রিসার্চ অ্যান্ড কালচারাল ফাউন্ডেশন (ঢাকা) এবং বাজকুল মনীষী চর্চা কেন্দ্রের।
নিবিড় গবেষণা ও ইতিহাস পরিচর্যার প্রাপ্তি হিসেবে ড. গোবিন্দ প্রসাদ কর পেয়েছেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্মান। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য Honorium Certificate from Dakshin Asia Sahittya Sanskriti Parisad (Dhaka, Bangladesh, February, 2016), Honorium Gold Medal from Sinsa (Pabna, Bangladesh, February, 2016), Honorium Certificate from Chittagong History Research Centre (CHRC, Chittagong, Bangladesh, February, 2016), Honorium Certificate from Mahabanga Sahitya Prisad & Mother Publishing (Kolkata, 2nd May, 2018), Honorium Certificate from Palash Som Sandhya (Katwa, Burdwan, 2018), Honorium Certificate from Indian Institute of Mother and Child Welfare (Kolkata, 31st March, 2019), Honorium Certificate from Rajsahi University (Rajsahi, Bangladesh, September, 2019) এবং Honorium Certificate from Uttaran Sahitya Asar (Pabna, Bangladesh, September, 2019)।
শুধু ইতিহাস চর্চা নয়। শুধু নিবিড় গবেষণা নয়। শুধু অ্যাকাডেমিক কার্যপ্রনালী নয়। ড. গোবিন্দ প্রসাদ কর নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন সমাজসেবামূলক কাজেও। আসলে তিনি মানেন, সমাজের অভাবী মানুষগুলো বাঁচলে পুরো সমাজটাই বাঁচবে। তাঁর কথায়, নিজেও বাঁচো, অন্যদেরও বাঁচাও।
🍂
5 Comments
Congratulations 🎉.
ReplyDeleteVery good description. Please send your email ID so that we can also send Discovery For online news.
ReplyDeleteAbove comment by Kanak Chandra Sarkar Email kanaksarkarju@gmail.com
ReplyDeleteবাজকুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা জানে বাস্তবে তিনি কেমন🙂🙃
ReplyDeleteCharacter?
ReplyDelete