সাথী
(দ্বিতীয় পর্ব)
সৌমেন রায়
চিত্র – কল্লোল মজুমদার
(প্রথম পর্বের শেষ অংশ -কয়েকদিনের ডিম রেখে দিল খড়ের বিছানায়। সুখী বসে দিত তা, পুকুরে যেত না। খিদে পেলে প্যাক প্যাক করে ডাকতো ঠাকুমাকে। খাবার ওকে দিতে হতো ওখানেই। কিছুদিন পর ফুটে ডিম বাচ্চা হলো বের । কি সুন্দর কুচু কুচু সব, সকাল বেলা সুখীর পিছনে পুকুরের দিকে যেত চলে। লাইন দিয়ে নামতো জলে। বসে পুকুর ঘাটে, দেখতো লালু তাদের খেলা অপলক নয়নে।)
তখন হতো ফুটবল খেলা গ্রামের সঙ্গে গ্রামের। নাম ছিল সব মজার মজার, ক্লাবের। সেভেন স্টার, ইলেভেন বুলেট, সবাই নানা রঙের। হেড়িয়ার গাঁওতা তেমনই এক , ধারও ছিল খেলায় তাদের। হেড়িয়ার মানে কচি পাতার উদগম, গাউতা মানে ক্লাব - জেনেছিল বুবাই সহপাঠী লক্ষণের কাছে। একবার পাশের গ্রাম বরডিহায় ছিল তাদের খেলা। দেখতে যাবে বুবাই, টুবাই - সঙ্গে কি আর লালু যাবেনা! দুটি গ্রামের মাঝে মাঠ ,মাঠের প্রান্তে পুকুর। সারি সারি তালগাছ পাড়ে ,এক কোনেতে শ্যাওড়া এবং পাকুড় । গা ছমছম করে ,দেখলে সেদিক পানে । ভর দুপুরে বাচ্চা ছেলের কান্না ঢোকে কানে। বুবাই- টুবাই পেরোচ্ছিল জপতে জপতে রাম নাম । হঠাৎ লালু গেল ছুটে শ্যাওড়া গাছের পানে। তাকিয়ে অনেকক্ষণ, করল চেঁচামেচি। কি দেখেছে কে জানে! খানিক পরে ফিরল লালু, মাঠের পানে চলল সবার সমুখ সমুখে। মাঠে গিয়ে আর দেখা নাই। ফেরার সময় অনেক খোঁজাখুঁজি, খারাপ করে মন বুবাইরা এলো ফিরে।আসার সময় পড়ন্ত রোদে শেওড়া গাছের আধো অন্ধকার তলা।মনে ভয় তবু বুবাই দেখে লালু আছে কিনা। হঠাৎ হল মনে কালোপানা ডিগডিগে এক লোক, সুড়ুৎ করে লাফালো যেন শেওড়া থেকে পাকুড় ! বন্ধ করে চোখ, দৌড় দৌড় - ভয়ের চোটে। মনে হচ্ছিল ছুটতে ছুটতে, করছে যেন পেছনে কেউ তাড়া। পড়ছে শ্বাস জোরে জোরে, পায়ের শব্দ আসছে পিছু পিছু। ছুটতে ছুটতে হঠাৎ করে সাহসে দিয়ে ভর ফিরে দাঁড়ায় তারা। কোথায় কি! কেউ তো নেই ! কাণ্ড দেখো অবাক পারা!
লালু ফিরলো অনেক রাতে। ঢুকেই গেল পড়ে, হুমড়ি খেয়ে। চক্ষু দুটি ঠিকরে যেন বাইরে আসে,ক্ষত অনেক গায়ে । কি হয়েছে লালুর?
‘নিশ্চয় করেছে লড়াই অন্য সবার সাথে’। বলল বাবা ।
জেঠু বলল,’ না ,না। কোন কারণে পেয়েছে ভয় খুব’।
মা দিল জল মুখে। জেঠিমা ক্ষতগুলি সব দিল ধুয়ে হালকা গরম জলে।
নানা জনে নানা কথা বলল সবে ,লালুকে নিয়ে। ফুপিয়ে কাঁদে বুবাই সোনা,মুখ খানি তার ঢাকা দিয়ে। কি বুঝলো সুগ্রীব, ভেতর থেকে ভাঁড়ির, প্যাক প্যাক করে সবাইকে করে তুললো অস্থির। খুলে দিতেই দরজা ভাঁড়ির, ছুটে এস , ঠোটটি দিয়ে ঠেলা দিল বন্ধুরে।
বলল যেনো ,’ বন্ধু তোমার হলো কি? আমায় বল’।
পরের দিন সকালে, সুখী আর বাচ্চাগুলোকে পুকুরে ছেড়ে, সুগ্রীব এল ফিরে। চুপটি করে বসলো গিয়ে বুবাই এর পাশটিতে। জেঠামশায় যায়নি অফিস সেদিন।বসে ছিল একটু দূরে। মাঝে মাঝে লালু তাকাচ্ছিল করুন দৃষ্টিতে। চেষ্টা করলেও জেঠু, গেলনা ডাক্তার পাওয়া। বিকেলের দিকে লালু চেষ্টা করলো পেতে সুগ্রীবের ছোঁয়া। পারল না। আসার আগেই আগেই সুগ্রীব চোখ দুটো তার বেরিয়ে এলো , মুখে একটা শব্দ করে, স্থির হয়ে গেল চিরতরে। রাস পূর্ণিমার নরম আলোয় বুবাইয়ের চোখ করে উঠলো চিক চিক । সুগ্রীব ডাকলো তীক্ষ্ণ স্বরে। বুক ফাটা সেই হাহাকারে উঠলো কেঁপে দিগ্বিদিক !
পেরিয়ে গেছে বছর অনেক গুলো । বুবাই এখন ছাত্র, প্রাণী চিকিৎসার। এখনই তার সুনাম বেশ।বলে সবাই বুবাই জানে জাদু । হাতটি দিয়ে গায়ে রুগীর বুঝতে পারে, কিসের কষ্টে কাবু। রাস পূর্ণিমা যেদিন আসে বুবাই গিয়ে মেরিনা বীচের নির্জন কোনে বসে। জেঠুর তোলা ছোট্ট ছবি বেরিয়ে আসে পকেট থেকে। চাঁদের আলোয় চিক চিক করে ঢেউয়ের মাথা, বুবাইয়ের চোখ।মনের মধ্যে উঠেছে গড়ে আশ্চর্য এক লোক।
1 Comments
ছোটদের জন্য ছয় গল্পের সিরিজ আজই শেষ হলো। যারা সঙ্গে থেকেছেন তাদের জানাই শ্রদ্ধা। ছোটরা যারা পড়েছো তাদের জন্য রইলো ভালোবাসা।
ReplyDeleteএই পর্বে একটি মৃত্যুর ঘটনা আছে।ছোটদের গল্পে মৃত্যু থাকা উচিত কিনা সে নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। মৃত্যুর সঙ্গে পরিচয় সচেতন ভাবেই ঘটিয়েছি ।সেই দুঃখ সহনশীল করার জন্যই গঠন কাঠামোতে কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি।। সকলকে ধন্যবাদ🙏