জ্যোতিষী সব জানে
জার্মানি (ইউরোপ)
চিন্ময় দাশ
এক গ্রামে এক গরিব চাষী থাকত। সকাল হলেই গাড়িতে দুটো বলদ জুতে দিয়ে, শহরে যেত কাঠ বিক্রি করতে। এভাবেই তার সংসার চলে।
চাষী একদিন গিয়েছে এক জ্যোতিষীর বাড়িতে কাঠ নিয়ে। সব কাঠ কিনে নিয়ে, জ্যোতিষী তাকে ঘরে বসিয়েছে খাতির করে। দাম মিটিয়ে চা-বিস্কুট খেতে দিয়েছে। এ-কথা সে-কথা গল্প করতে করতে, জ্যোতিষী খেতে বসেছে।
চাষির চোখ গিয়েছে জ্যোতিষীর খাবারের থালার দিকে। কতসব মূল্যবান উপাদেয় খাদ্য। দামি পানীয়। মাথা ঘুরে গেল চাষীর। মনে ভাবল, আমি কি কোন দিনই এমন সব খাবার খেতে পাবো না?
নিজেকে সামলাতে না পেরে, চাষী বলেই ফেলল-- আচ্ছা মশাই, আমি একজন জ্যোতিষী হয়ে উঠতে পারি না?
জ্যোতিষীর মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল-- কেন পারো না? চাইলেই পারো।
চাষি তো আহ্লাদে আটখানা। বলল-- কী করতে হবে আমাকে?
জ্যোতিষী বলল-- চারটে কাজ করতে হবে তোমাকে। প্রথম-- তুমি একটা এবিসিডি শেখার বই কেনো। বইটার মলাটে দেখবে, একটা বড় মোরগের ছবি ছাপা আছে।
চাষি বলল--দ্বিতীয় কাজ?
জ্যোতিষী-- তোমার ওই হাড় জিরজিরে বলদ দুটো বিক্রি করে দাও। সেই পয়সায় ভালো কোট-প্যান্ট আর একটা ছক কিনে নাও।
চাষী-- তৃতীয় কাজ?
--ছোট্ট একটা সাইনবোর্ড বানাও। তাতে লেখা থাকবে-- আমি একজন সর্ব কর্ম বিশারদ জ্যোতিষী। এবার সাইনবোর্ডটা তোমার বাড়ির দরজার সামনে সেঁটে দাও। তার পর দ্যাখো, কাজ হয় কি না।
বাড়ি ফেরার পথে, গরুর গাড়ি আর বলদ দুটো বেচে দিল চাষী। সেই পয়সায় জ্যোতিষী যেমন বলে দিয়েছিল, জিনিসপত্র কিনে বাড়ি এসে হাজির।
পরদিন গ্রামের লোকেরা তার বাড়ির সামনে জ্যোতিষীর সাইনবোর্ড দেখে, অবাক হয়ে গেল। দিন দুয়েক গেল না। কিছু লোক আসতে লাগল তার কাছে। শুধু ভাগ্য গণনা নয়। নানাজনের নানান সব ছোটখাটো সমস্যাও মিটিয়ে দিতে লাগলো চাষী।। তাতে কিছু পয়সাও আসতে লাগল তার হাতে।।
সে সময় একদিন এক মাস্টারের বাড়িতে টাকা চুরি হয়েছে। মাস্টার মশাই চাষির বাড়ির সাইনবোর্ডটার কথা শুনেছিলেন। তিনি মাস্টারের বাড়িতে এসে হাজির হলেন। বললেন-- তুমি নাকি জ্যোতিষীর কাজে বেশ নাম করেছ?
চাষি একটুও ঘাবড়াল না। বলল—আপনাদের পাঁচজনের আশীর্বাদে একটু নাম-ডাক হয়েছে বটে। বলুন, আপনার কী সমস্যা?
মাস্টার মশাই বললেন-- আমার কিছু টাকা চুরি গেছে। উদ্ধার করে দিতে পারবে? পারো যদি, চলো আমার বাড়িতে।
চাষি বলল-- অবশ্যই পারবো। তবে, একা যাব না। সাথে আমার বউ যাবে।
চাষী আর তার বউকে নিয়ে মাস্টার তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন।
বেলা তখন ঠিক দুপুর। খাবারের সময়। মাস্টার বললেন—এসো, তিন জন একসাথে আগে খাওয়া দাওয়া করে নিই।
মাস্টারমশাই বেশ ধনী লোক। খাওয়ার টেবিলে দেখেই, চাষি আর তার বউ চমকে গেছে। টেবিল যদি এত দামি হয়, তাহলে খাবার কত না উন্নত হবে। চাষি ফিসফিস করে, বউকে বলল— কতো রকম খাবার আসবে, দেখবি।
প্রথম একজন ওয়েটার এসে, তাদের সামনে প্লেট বসিয়ে দিয়ে গেল। চাষী তার বউকে বলল-- এই হোল এক নম্বর।
চাষীর কথা ওয়েটারের কানে যেতেই, বেমালুক ঘাবড়ে গিয়েছে লোকটা। জ্যোতিষী যে চোর ধরতে এসেছে,এ বাড়ির সবাই জানে। ওয়েটার ভাবল, লোকটা বলছে, এইটাই প্রথম চোর।
ভেতরে ঢুকেই ওয়েটার আরেকজন সহকর্মীকে বলল-- এই লোকটা সত্যিই সবজান্তা। ও কিন্তু চিনে ফেলেছে আমাকে। সবাই সাবধান।
দ্বিতীয় লোকটা ঢুকতে চাইছিল না। কিন্তু বাধ্য হয়ে আর একটা করে প্লেট নিয়ে তাকে আসতেই হলো। তাকে দেখে চাষী তার বউকে বলল-- বুঝলে বউ, এটা হলো দ্বিতীয়।
শুনে বেমালুম ঘাবড়ে গিয়েছে লোকটা। কোনও রকমে সরে পড়ল খাবার ঘর থেকে। এবার তিন নম্বর ওয়েটার এলো, আরো তিনটে প্লেট নিয়ে। সাথে সাথে চাষী তার বউকে বলছে—বউ, দেখলে তো। এই হলো তৃতীয়।
চতুর্থ জন এলো হাতে একটা বড় বোল নিয়ে। কাপড় ঢাকা দেওয়া। ভেতরের খাবার কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মাস্টারমশাই জিজ্ঞেস করলেন-- বলতে পারবে, এর মধ্যে কী রয়েছে?
এবার চাষির ঘাবড়ে যাবার পালা। বুক ধুক-ধুক করছে। তার সব কেরামতি শেষ। ঢাকা দেওয়া পাত্রে কী আছে, সেটা জানা তার পক্ষে কোনমতেই সম্ভব নয়। নিজের মনে বিড়বিড় করে , নিজেকেই বলল-- হায় কাঁকড়া, এবার তোমার কি হবে?
চাষির ডাকনাম যে কাঁকড়া, তা তো মাস্টারের জানা নাই। চাষির কথা শুনেই, মাস্টার মশাই চমকে গিয়েছেন। আসলে, এবারে সত্যি সত্যিই কাঁকড়ার একটি পদই এসেছে। ঢাকনা দেওয়া পাত্রের ভেতরে কাঁকড়াই আছে, এটা যে বলে দিতে পারে, সে লোক নিশ্চয়ই সর্ববিদ্যা বিশারদ।
মাস্টার মশাই লাফিয়ে উঠেছেন-- ঢাকা দেওয়া খাবারে কী আছে, সেটা যখন বলে দিতে পেরেছ, তুমি নিশ্চয়ই আমার টাকা উদ্ধার করে দিতে পারবে।
আসলে হয়েছে কী, মাস্টারের চারজন ওয়েটারই তাঁর টাকা চুরি করেছিল। চাষির কথা শুনে, তারা তো ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। কী করে রেহাই পাওয়া যায়, ভেবে পাচ্ছে না।
সারা জীবনে এত ভালো খাবার কখনো খায়নি চাষি আর তার বউ। পেট ভরে অনেকক্ষণ ধরে খেয়েছে। এবার হাত মুখ ধোয়ার জন্য ভেতরে যেতেই, চারজন ওয়েটার চেপে ধরেছে তাকে-- গরিব মানুষ আমরা। লোভের বশে করে ফেলেছি। আমাদের বাঁচাও তুমি। সব টাকা ফেরত দিয়ে দেবো আমরা। তোমাকেও দেবো অনেক টাকা। এক্টাই অনুরোধ, আমাদের নাম মুখে আনবে না তুমি। তাহলে, মালিক জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে আমাদের। দোহাই তোমার, আমাদের বাঁচাও।
চাষী নিজেও গরিব মানুষ। লোকগুলোর বিপদের কথা শুনে, সে রাজি হয়ে গেল। বলল-- টাকাগুলো কোথায় রেখেছো, সেটা আমাকে বল।
তারা তাড়াতাড়ি বলে দিল, ভাঁড়ারঘরে একটা সবজি ঝুড়ির পিছনে টাকাগুলো রাখা আছে।
চাষী আর তার বউ হাত-মুখ ধুয়ে, ভেতরে এসে বসেছে। মাস্টার বলল-- তাহলে দেরি কেন? তোমার কেরামতি দেখাও। উদ্ধার করে দাও আমার টাকাগুলো। অনেক পুরস্কার দেবো তোমাকে আমি।
চাষি চোখ দুটো বন্ধ করে, কী সব বিড়বিড় করল। তার পর বলল—টাকাগুলো তো আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। অনেক দূরে চলে গিয়েছিল। ভাববেন না কিছু। টাকা আমি আপনার ঘরেই আনিয়ে নিচ্ছি। আপনি বসুন। আমি টাকা উদ্ধার করে আনছি।
ভেতরে গিয়ে ভাঁড়ারঘরে ঢুকলো চাষী। সত্যি সত্যিই একটা ঝুড়ি রয়েছে সে ঘরে। সেটার পিছন থেকে টাকার একটা থলে তুলে আনল।
থলে ভরা টাকা। প্রচুর টাকা রয়েছে তাতে। মাস্টার যেন হাতে স্বর্গ ফিরে পেয়েছেন। আনন্দে আটখানা। জড়িয়ে ধরলেন চাষীকে-- সত্যিই তুমি সর্ববিদ্যা বিশারদ। মানতে আমার কোন আপত্তি নেই।।
অনেক টাকা দিয়ে চাষি ও তার বউকে বিদায় করলেন মাস্টার।
সেই দিনই আবার এক ঘটনা। তখন মাঝরাত। দরজায় কেউ কড়া নাড়ছে। চাষী আর বউ শব্দ শুনে ঘাবড়ে গিয়েছে। বউ বলল-- নিশ্চয়ই আমাদের ঘরে ডাকাত পড়েছে। পুরষ্কারের অতগুলো টাকা এনেছি আমরা। নিশ্চয় জানাজানি হয়ে গেছে। সেগুলো নিতেই এসেছে ডাকাতের দল।
কড়ার শব্দ থামছেই না। দরজা না খুলে কতক্ষণ আর বসে থাকা যায়। বাধ্য হয়ে দরজা খুলতে গেল চাষি, খুলেই অবাক। কোথায় ডাকাত? দরজার বাইরে সেই চারজন ওয়েটার দাঁড়িয়ে আছে। চাষিকে দেখেই, পায়ের উপর আছড়ে পড়ল চারজন-- তুমি একেবারে সাক্ষাৎ ভগবান। জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছ আমাদের। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।
চারজনে ছোট ছোট চারটা থলি নামিয়ে দিল তার পায়ের কাছে। এর বেশি কিছু দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নাই। সারা জীবনের সঞ্চয় আমাদের। এইটা তুমি নাও।
চাষির বউ ছিল পেছনে। সে ফিসফিস করে চাষীর কানে কানে কিছু বলল। শুনে, চাষিও হাসল একটু। ৪টা থলি তুলে, চারজনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, বলল-- রেখে দাও এগুলো তোমরা। আমাকে দিতে হবে না। অনেক টাকা পুরষ্কার পেয়ে গেছি আমরা। তবে, একটা কথা দিয়ে যাও। জীবনে কখনো অন্যের টাকায় হাত দেবে না।
চারজন ওয়েটার তাকে কথা দিয়ে, খুশি মনে ঘরে ফিরে গেল।
0 Comments