ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি
পর্ব ২৭
প্রীতম সেনগুপ্ত
জ্ঞান ও বিজ্ঞান বিচারে --- ব্রহ্মদর্শন । শ্রীরামকৃষ্ণ ডাক্তার মহেন্দ্র লাল সরকারকে বলছেন ---“লজ্জা ত্যাগ কর, ঈশ্বরের নাম করবে, তাতে আবার লজ্জা কি? লজ্জা, ঘৃণা, ভয় --- তিন থাকতে নয়। ‘আমি এত বড় লোক, আমি ‘হরি হরি’ বলে নাচব? বড় বড় লোক এ-কথা শুনলে আমায় কি বলবে? যদি বলে, ওহে ডাক্তারটা ‘হরি হরি’ বলে নেচেছে। লজ্জার কথা!’ এ-সব ভাব ত্যাগ কর। ”( শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত, অখণ্ড সংস্করণ ) তিনি আরও বলছেন --- “দেখ, জ্ঞান অজ্ঞানের পার হও, তবে তাঁকে জানতে পারা যায়। নানা জ্ঞানের নাম অজ্ঞান। পাণ্ডিত্যের অহংকারও অজ্ঞান। এক ঈশ্বর সর্বভূতে আছেন, এই নিশ্চয় বুদ্ধির নাম জ্ঞান। তাঁকে বিশেষ রূপে জানার নাম বিজ্ঞান। যেমন পায়ে কাঁটা বিঁধেছে , সে কাঁটাটা তোলবার জন্য আর-একটি কাঁটার প্রয়োজন। কাঁটাটা তোলবার পর দুটি কাঁটাই ফেলে দেয়। প্রথমে অজ্ঞান কাঁটা দূর করবার জন্য জ্ঞান কাঁটাটি আনতে হয়। তারপর জ্ঞান-অজ্ঞান দুইটিই ফেলে দিতে হয়। তিনি যে জ্ঞান-অজ্ঞানের পার। লক্ষ্মণ বলেছিলেন, ‘রাম! এ কি আশ্চর্য! এত বড় জ্ঞানী স্বয়ং বশিষ্ঠদেব পুত্রশোকে অধীর হয়ে কেঁদেছিলেন।’ রাম বললেন, ‘ভাই, যার জ্ঞান আছে, তার অজ্ঞানও আছে, যার এক জ্ঞান আছে, তার অনেক জ্ঞানও আছে। যার আলোবোধ আছে ,তার অন্ধকারবোধও আছে। ব্রহ্ম জ্ঞান অজ্ঞানের পার, পাপ-পুণ্যের পার, ধর্মাধর্মের পার, শুচি-অশুচির পার।“
এরপর শ্যাম বসু প্রশ্ন করলেন -- দুই কাঁটা ফেলে দেওয়ার পর কি থাকবে?
শ্রীরামকৃষ্ণ এর উত্তরে বললেন --- “ নিত্যশুদ্ধবোধরূপম্। তা তোমায় কেমন করে বুঝাব? যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে, ‘ঘি কেমন খেলে?’ তাকে এখন কি করে বুঝাবে? হদ্দ বলতে পার, ‘কেমন ঘি না যেমন ঘি।’একটি মেয়েকে তার একটি সঙ্গী জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তোর স্বামী এসেছে, আচ্ছা ভাই স্বামী এলে কিরূপ আনন্দ হয়?’ মেয়েটি বললে, ‘ভাই, তোর স্বামী হলে তুই জানবি; এখন তোরে এই কেমন করে বুঝাব।’ পুরাণে আছে ভগবতী যখন হিমালয়ের ঘরে জন্মালেন, তখন তাকে মা নানারূপে দর্শন দিলেন। গিরিরাজ সব রূপ দর্শন করে শেষে ভগবতীকে বললেন, মা, বেদে যে ব্রহ্মের কথা আছে, এইবার আমার যেন ব্রহ্ম দর্শন হয়। তখন ভগবতী বললেন, বাবা, ব্রহ্মদর্শন যদি করতে চাও, তবে সাধুসঙ্গ কর।
“ব্রহ্ম কি জিনিস --- মুখে বলা যায় না। একজন বলেছিল --- সব উচ্ছিষ্ট হয়েছে, কেবল ব্রহ্ম উচ্ছিষ্ট হন নাই। এর মানে এই যে, বেদ, পুরাণ, তন্ত্র, আর সব শাস্ত্র, মুখে উচ্চারণ হওয়াতে উচ্ছিষ্ট হয়েছে বলা যেতে পারে; কিন্তু ব্রহ্ম কি বস্তু, কেউ এ-পর্যন্ত মুখে বলতে পারে নাই। তাই ব্রহ্ম এ পর্যন্ত উচ্ছিষ্ট হন নাই! আর সচ্চিদানন্দের সঙ্গে ক্রীড়া, রমণ --- যে কি আনন্দের তা মুখে বলা যায় না। যার হয়েছে সে জানে।”
কথামৃতর এই অংশটিতে আমরা যেটা বিশেষভাবে পেয়েছি, তা হল, যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ একদিকে যেমন বিচারধারা কীরকম হতে পারে তার একটা দিকনির্দেশ দিয়েছেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সেই বিচারজাত উপলব্ধি ---‘ কেবল ব্রহ্ম উচ্ছিষ্ট হন নাই’ কীভাবে অর্জিত হয়েছে তার একটা রূপরেখা আমরা পাচ্ছি। অবতারের জীবন অনুসারী বহু জ্ঞান প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত হয়ে চলেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সবচেয়ে বড় কথা এই প্রজ্জ্বলনের ধারা সনাতন ধর্মের এক শাশ্বত পথ।
0 Comments