জ্বলদর্চি

আন্তর্জাতিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

আন্তর্জাতিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিবস

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ৯ই সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিবস। যখন আমরা এই দিবসটি পালন করছি, তখন বুঝতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিভিন্ন ধরনের আক্রমণ ঘটে, এটা হওয়া কখনোই কাম্য নয়, কেন নয় এবং দিবসটির গুরুত্ব কি আসুন সবকিছু বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
শিক্ষা মানুষের জীবনের অন্যতম মৌলিক অধিকার। একটি বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ইট-পাথরের একটি ভবন নয়, এটি জ্ঞানচর্চা, মানবিকতা, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্থান। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ, সংঘাত ও সহিংসতার কারণে আজ বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি। এই বাস্তবতার প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ এবং শিক্ষার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানাতেই প্রতি বছর ৯ই সেপ্টেম্বর পালিত হয়, আন্তর্জাতিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০২০ সালে ৯ই সেপ্টেম্বরকে এই আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। UNESCO ও UNICEF দিবসটির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষা-সম্প্রদায়ের সুরক্ষায় সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি শিশুর কাছে বিদ্যালয় তার দ্বিতীয় বাড়ির মতো। সেখানে সে শুধু বই পড়ে না,  বন্ধুত্ব করতে শেখে, প্রশ্ন করতে শেখে, নিজের মত প্রকাশ করতে শেখে এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে, তাই কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন যুদ্ধ বা সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু হয়, তখন শুধু একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না,ক্ষতিগ্রস্ত হয় অসংখ্য শিশুর ভবিষ্যৎ। সংঘাতের কারণে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় দীর্ঘ বিরতি তৈরি হয়। অনেক শিশু আর বিদ্যালয়ে ফিরতে পারে না। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ভয়, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে। ফলে একটি প্রজন্মের শিক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। UNESCO-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে বিদ্যালয়ের ওপর ১,৬৮০টি হামলা জাতিসংঘের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি। 
🍂

যুদ্ধ বা সংকটের সময় শিক্ষা মানুষের জন্য আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। একটি শ্রেণিকক্ষ শিশুকে স্বাভাবিক জীবনের অনুভূতি দেয়। বই তাকে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে শেখায় এবং শিক্ষা তাকে সহিংসতার পরিবর্তে যুক্তি, সহমর্মিতা ও শান্তির পথ বেছে নেওয়ার শক্তি দেয়। এই কারণেই আন্তর্জাতিক মানবিক আইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বেসামরিক স্থাপনা হিসেবে সুরক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৬০১ নম্বর প্রস্তাবও সংঘাতের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি Safe Schools Declaration শিক্ষার পরিবেশকে নিরাপদ রাখা এবং সংকটের মধ্যেও শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে। শুধু ভবন নয়, মানুষকেও রক্ষা করতে হবে। শিক্ষা সুরক্ষার অর্থ শুধু বিদ্যালয়ের ভবন রক্ষা করা নয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষা-কর্মী এবং শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এর অন্তর্ভুক্ত। যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিস্থিতিতে শিশুদের বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়তে হয়। তাদের শিক্ষা বন্ধ হয়ে গেলে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগও কমে যায়। বিশেষ করে মেয়েশিশু, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষা থেকে কোনো শিশুকে বঞ্চিত করা মানে তার ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করা। আন্তর্জাতিক সমাজের দায়িত্ব
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা বন্ধ করার দায়িত্ব শুধু কোনো একটি দেশের নয়, এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব। রাষ্ট্রগুলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, সংঘাতের সময় শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের বার্তায়ও শিক্ষাকে প্রতিটি শিশু ও তরুণের মৌলিক অধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং সংঘাতের সময় বিদ্যালয়, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সুরক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশগুলোকে শিক্ষায় বিনিয়োগ এবং Safe Schools Declaration বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
আমাদের করণীয়
এই দিবসের তাৎপর্য শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনে আলোচনা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা, নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা-উপকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। যুদ্ধের কারণে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের পুনরায় শিক্ষার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও শান্তি, সহনশীলতা, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ে তুলবে আজকের শিক্ষার্থীরাই। একটি বিদ্যালয় ধ্বংস করা হয়তো কয়েক মুহূর্তের ঘটনা, কিন্তু একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া শিক্ষাজীবন ফিরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কখনোই সংঘাতের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বিদ্যালয় হবে নিরাপদ আশ্রয়, বিশ্ববিদ্যালয় হবে মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্র এবং শিক্ষা হবে শান্তির সেতু।
আন্তর্জাতিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষার অধিকার রক্ষা করা মানেই ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর হাতে বই থাকবে, তার সামনে থাকবে নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, আর তার মনে থাকবে স্বপ্ন, এই লক্ষ্যেই বিশ্বকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ যুদ্ধ যদি ভবিষ্যৎ কেড়ে নেয়, তবে শিক্ষা সেই ভবিষ্যৎকে আবার গড়ে তোলার শক্তি দেয়।

Post a Comment

0 Comments