সেগুন-শালের অরণ্যগাথা
পর্ব ২
ভুতুড়ে গাছ আর বুনো ট্রেইল (মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের সীমানা বিভাজন)
ছবি ঋণ- অভিজ্ঞান ঘোষ
বুদ্ধদেব গুহ তাঁর “মাধুকরী” উপন্যাসে লিখেছিলেন - “পৃথিবীতে সব মানুষই মাধুকরী বৃত্তি করে। কেউ ভিক্ষে করে অন্নের, কেউ বা স্নেহের, কেউ ভালোবাসার, কেউ বা সহানুভূতির।"
আর আমার মাধুকরী শুধুই অসীমের।
“আমি চঞ্চল হে আমি সুদূরের পিয়াসী “-
মধ্যভারতের অরণ্যভূমি আমার পথিক সত্তাকে এক অদ্ভুত মোহময়তায় ছুঁয়ে যায় বারবার। বিস্তীর্ণ সবুজ বনভূমির বুকে যখন কুয়াশার চাদর সরিয়ে রাত্রিশেষের প্রথম আলো এসে পৌঁছয়, অথবা সায়াহ্নে অস্তমিত সূর্যের শেষ আলোটুকু চলে যেতে যেতে জড়িয়ে যায় সুদেহী সেগুনের ডাল, মনে হয় এই বুঝি প্রকৃত “আমি”। এই পরম সত্য, বাকি সব অনৃত।
আমার চোখে পেন্চের দুই পিঠ দুই ভিন্ন বীরত্বগাথার মতো ধরা দিয়েছে প্রতিবার। এর একটি বড় অংশ মধ্যপ্রদেশে, আর অন্যটি মহারাষ্ট্রে পড়ে। কিন্তু এ বিভাজন তো কেবলই মানচিত্রের। মানুষের তৈরি এই কৃত্রিম সীমানা বন্য প্রাণীকূলের অজানা। এই সীমানা বন্যপ্রাণের কাছে অর্থহীন। দু’পাশের বুক চিরে জেগে থাকা এই বিস্তৃত বনানী তাদের অবাধ চারণভূমি।
মধ্যপ্রদেশের ‘টুরিয়া গেট’ (Turia Gate) দিয়ে জঙ্গলে ঢুকে দেখতে পেলাম জঙ্গল এখানে বেশ উন্মুক্ত। ফাঁকা খোলামেলা হওয়ায় দেখা যাচ্ছিল বেশ ভালো। চোখে পড়লো বিরাট ঘাসজমি আর সুন্দর মেঠো পথ। আর পেলাম মাইলের পর মাইল বিস্তৃত মাঠ। ভোরের মিঠে রোদ এসে পড়েছে সবুজ গালিচায়। প্রসারিত প্রান্তর, সেখানে চরে বেড়াচ্ছে অজস্র চিতল হরিণ আর সম্বর। সে এক দৃশ্য বটে! এই খোলামেলা প্রান্তরই বাঘেদের শিকার করার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। টুরিয়ার এই ট্রেইলগুলোতেই বছরের পর বছর রাজত্ব করে গেছে কিংবদন্তি সব বাঘিনীরা। কলারবালি বা T-15 ও ল্যাংড়ি, এদের বীরত্বগাথা বহুল চর্চিত। গাইডদের মুখে শোনা যায় সেসব। সবথেকে আলোচিত নাম কলারবালি। বিশ্বের প্রথম বাঘিনী, যাকে ট্র্যাকিং এর জন্য রেডিও কলার পরানো হয়েছিল। তাই এই নামকরণ। জীবদ্দশায় ২৯টি বাচ্চার জন্ম দিয়ে এই জঙ্গলে বাঘের বংশ বৃদ্ধিতে অভাবনীয় অবদান রেখেছে। তাকে বলা হতো “সুপার মম'। বছর চারেক আগে বার্ধক্যজনিত কারণে তার মৃত্যু হলে বনকর্মীরা চোখের জলে তাকে বিদায় জানায়। তার সেই বিদায় ক্ষণের সাক্ষী ছিলাম আমিও। পড়ন্ত বিকেলে, পথের পাশেই পরিব্যাপ্ত ঘাসজমির ওপর শুয়ে ছিল সে। আসন্ন মৃত্যুর প্রস্তুতি তখন সম্পূর্ণ। রাণীর মত জীবন বেঁচেছে সে। মৃত্যুও এল ধীর লয়ে। সে দৃশ্য আজও বেদনা উদ্রেক করে।
এখানে সবচেয়ে উঁচু স্থানটির নাম কালাপাহাড। (প্রায় ৬৫০ মিটার বা ২,১০০ ফুট উঁচু)। পাহাড়ের চূড়ায় একটি ছোট শিব মন্দির আছে। জঙ্গলের হৃদয়মথিত দৃশ্য ধরা দেয় এই সুউচ্চ চূড়ায় দাঁড়ালে।
🍂
এই এলাকার কাছেই জুনেওয়ানি ওয়াটারহোল নামে যে জলাশয়টি আছে তা বন্যপশুপাখিদের জল খাওয়ার অতি উত্তম জায়গা। কিন্তু জঙ্গল তো আর শুধু রৌদ্রকরোজ্বল বিস্তীর্ণ প্রান্তর নয়; তার একটা গম্ভীর, রহস্যময় রূপও আছে। সেই রূপটার খোঁজ পেতে পার হতে হল মহারাষ্ট্র রাজ্য সীমান্তে সিলারি গেটে। এগোতেই দেখলাম অরণ্যের চরিত্র ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। জঙ্গল এখানে ঘন, নিবিড় ও আদিম। চওড়া ঘাসজমি তেমন চোখে পড়লোনা। তার জায়গায় দেখা গেল আকাশছোঁয়া সেগুন গাছের নিরেট অন্ধকার। সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছায় না।সেই ঘন অন্ধকার, কুহকিনীর মায়াজাল বিছিয়ে পাহাড়া দিচ্ছে নিঃসঙ্গ এই বনভূমি। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে পাথুরে ট্রেইল। কিছুদূর এগোতেই চোখে পড়ল ধবধবে সাদা ও মসৃণ কাণ্ডবিশিষ্ট একটা গাছ। নাম জানা গেল ইন্ডিয়ান ঘোস্ট ট্রি (Sterculia urens)। ধূসর অরণ্যের মাঝে এই গাছগুলো কেমন চকচক করছিল। কল্পনা করার চেষ্টা করলাম চাঁদেলা রাতের আলোয় গাছগুলো কেমন ভূতুরে দেখাবে! নিশুতি রাতে আদিম ও গভীর এই অরণ্যের ওপর এসে পড়া চাঁদের আলোয় নির্ঘাত শুরু হয় এক অন্য জগৎ। মজার বিষয় হলো সেই মহারণ্যের নৃপতি কোন মাতঙ্গ নয়, বরং মার্জার গোত্রীয় শিকারিরাই এখানে নীরব শাসক।
যে কোনো মহারণ্যর মতই এই জঙ্গলও কোর জোন এবং বাফার জোনে বিভক্ত। পর্যটকদের জন্য এখানে জিপ সাফারির ব্যবস্থা রয়েছে। মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন গেট (যেমন: টুরিয়া গেট, কর্মাঝিরি গেট, সিল্লারি গেট) দিয়ে এই জঙ্গলে প্রবেশ করা যায়। এছাড়াও জামতারা, রুক্কড়, তেলিয়া, খোলাসা বিভিন্ন প্রবেশ পথ রয়েছে।
অক্টোবর থেকে জুন মাস পর্যন্ত এখানকার কোর জোনে সাফারি করা যায়। প্রকৃতি এই সময় অতি মনোমুগ্ধকর।
কলকাতা থেকে পেনচ জঙ্গলে যাওয়ার সহজ উপায় হলো মহারাষ্ট্রের নাগপুর হয়ে যাওয়া। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া নিলে ঘন্টা দেরেকের রাস্তা।
"জঙ্গল মানে শুধু গাছপালা আর পাতার মর্মর ধ্বনি নয়, জঙ্গল একটা জীবন্ত সত্তা, যার নিজস্ব নিঃশ্বাস আর হৃদস্পন্দন আছে”। জঙ্গলে এলে বুদ্ধদেব গুহ বারবার ফিরে আসে মনে।
পেন্চের এই দুই পিঠ মানুষের মনের দুই ভিন্ন রূপ বলে মনে হয়— একটি দ্যুতিময় প্রান্তর, আর অন্যটি দুর্বোধ্য, গূঢ় রহস্যে ঘেরা গভীর, গহন। জিপসি গাড়ি তখন জঙ্গলের আরও গভীরে ঢুকছে, হঠাৎ সামনের একটা বাঁকে এসে থমকে দাঁড়াল। সম্বর হরিণের ঘনঘন তীক্ষ্ণ, আতঙ্কিত চিৎকারে বনের নিরেট স্তব্ধতা ভেঙে গেল — ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করায় জানা গেল , অ্যালার্ম কল! মহালের সম্রাজ্ঞী বা সম্রাট কোথাও আশেপাশেই আছে নিশ্চয়ই ... (ক্রমশ...)
2 Comments
অসাধারণ লেখা আর ছবি । খুব ভালো লাগলো l
ReplyDeleteঅসংখ্য ধন্যবাদ।
Delete