আমার শিক্ষক
সুগত মিত্র
আমার লেখা পড়ার তিনটি পর্ব। স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি। আমার স্কুল কলেজ নির্বাচন তিনটেই সঠিক ছিল । কারণ এই তিন জায়গাতেই পেয়েছিলাম সব প্রবাদ প্রতিম শিক্ষককে। হিন্দুস্কুলের ক্লাস নাইনে আমাদের ইংরিজি শেখানোর জন্য বীরেন.
.বাবু কি পরিশ্রমটাই যে করতেন বলার নয়। তখন আমাদের কোন ইংরিজি টেক্সট ছিলনা । উনি আমাদের ইংরিজির ভোকাবুলারি বাড়ানোর জন্য আমাদের একটা নোটবুক বানাতে বলেছিলেন। তিনি নিজের একটা নোট বুক বানিয়েছিলেন। তার থেকে আমাদের নতুন নতুন ইংরিজি শব্দ শিখিয়েছিলেন । anecdote , refuge , shelter শব্দ গুলো উনিই শিখিয়েছিলেন। বাংলার অন্তরাত্মাকে বুঝতে শিখিয়েছিলেন প্রফুল্ল সমাজদার। ইতিহাস , সংস্কৃত পড়তে গিয়ে পেয়েছিলাম অনেক অজানা বইয়ের খোঁজ। সংস্কৃতের কেষ্টবাবু বলেছিলেন আপ্তের বইয়ের সংস্কৃত অভিধানের কথা আমাদের সংস্কৃত ট্রানস্লেশন শেখানোর জন্য। সবাই সংস্কৃত থেকে অনুবাদ করত বাংলায়। সংস্কৃত ছিল তখন কম্পালসারি ইলেকটিভ সাবজেক্ট । কিন্ত কেষ্ট বাবুর ইচ্ছে ছিল তাঁর ছাত্ররা অনুবাদটা ইংরিজিতে করতে। কারণ ছাত্ররা তো হিন্দুর। তাই না ? কেষ্টবাবুকে।।।। নিয়ে অনেক মজার গল্প ছিল। ওনার গাঁট্টা যে একবার খেয়েছে সে জীবনে ভুলবেনা। যদি কখনও আমাদের খাতায় লেখা থাকত, ' See me after the class ' তখনই আমরা বুঝতে পারতাম , আমাদের কপালে আজ দুঃখ আছে ।
ঐতিহাসিক সুমিত সরকার
আমরা জানতাম , কেষ্টবাবু ছাতু খেতে খুব ভালবাসতেন। তাই যেদিন আমাদের পড়া তৈরি হতনা , সেদিন স্যারের জন্য আমরা ষোড়শপচারে ছাতুর থালা সাজিয়ে রাখতাম। আমরা নিজেরা চাঁদা তুলে আমাদের দারোয়ান রামব্রিজকে কে ছাতু আনতে দিতাম। স্কুলের পেছনের গেটে একজন ভুজাওয়ালা বসত। রামব্রিজ সেখান থেকে পেঁয়াজ , লঙ্কা , আচার দিয়ে পেতলের থালায় এনে টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখত। ব্যস। কেল্লা ফতে । সারাটা ক্লাস ঐ ছাতুর আলোচনায় সময় চলে যেত। আমাদের উদ্দেশ্যও সিদ্ধ।
🍂
বাংলা পড়াতেন প্রফুল্ল সমাজদার। তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদর্শী মানুষ। তিনি বাংলা পড়াতে পড়াতে এক স্বপ্নের জগত তৈরি করতেন। তিনি একবার আমাকে প্রাবন্ধিক রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদীর ওপর একটা নোট তৈরি করতে বলেছিলেন। আমি নোট তৈরি করে স্যারকে দেখিয়েছিলাম। স্যার খুব খুশি হয়েছিলেন। সকলকে ডেকে দেখিয়েছিলেন।
তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হত। আমি পরপর দু' বছর ফার্স্ট হয়েছিলাম । ক্লাস নাইনে লিখেছিলাম ' বর্ষার কবি রবীন্দ্রনাথ' আর ক্লাস টেন - এ ' বিসর্জনে'র রঘুপতি চরিত্র। কিন্ত ক্লাস ইলেভেন- এ আর পারলাম না। বিসর্জনের 'নক্ষত্র ' চরিত্র '। সেবার ফার্স্ট হল স্যারদের প্রিয় ছাত্র স্বপন মালাকার। বাংলাটা সত্যিই ভাল লিখত ও।
আর প্রি - টেস্টের বাংলা পরীক্ষায় দারুন প্রশ্ন এসেছিল । আমি চুটিয়ে লিখেছিলাম। মোহিতলাল মজুমদার -'এর কাল বৈশাখী কবিতার সৃষ্টি আর ধ্বংসের লীলা। কিন্ত তবু
রাধেশ্যাম বাবুর আমাকে ৬০ টা নম্বর দিতে হাত কেঁপেছিল বোধ হয়। তিনি দিলেন ৫৯।
এহ বাহ্য । আগে কহ আর। ওয়ার্ক এডুকেশনের পরীক্ষায় আমি পরীক্ষা দেওয়া সত্ত্বেও স্যার ভুল করে আমাকে ফেল দেখিয়ে দিলেন। কিন্ত এসব কিছু মনে রাখতে নেই। ছেঁড়া পাতার মত বাতাসে উড়িয়ে দিতে হয়।
কলেজে দেখেছি এই রকম আর এক জন
তন্নিষ্ঠ অধ্যাপককে। তিনি আমাদের ইউরোপের ইতিহাস পড়াতেন । তিনি রবি বাবু । তিনি অসম্ভব বোর্ড ওয়ার্ক করতেন। বোর্ডের এ কোণা থেকে ও কোণা পর্যন্ত লিখে ভরিয়ে রাখতেন । এক ক্লাসে বোধহয় তিন চার বার বোর্ড মুছতে হত। যে কোন ইতিহাস মনে হয় তাঁর ঠোটস্থ ছিল। শুনেছিলাম ইউনিভার্সিটিতে ইসলামিক ইতিহাসের ছাত্র ছাত্রীদের তিনি পড়াতেন খলজীদের ইতিহাস। পড়ানোর মধ্যেই তিনি ছাত্রদের প্রশ্নের জবাব দিতেন ।
ইউনিভার্সিটির মাস্টারমশাইরা ছিলেন সবাই তারকা। অমলেশ ত্রিপাঠী, সুমিত সরকার , বরুণ দে , বিনয় চৌধুরী, নীলমণি মুখার্জী , নিশীথ রায় , হীরেন চক্রবর্তী - এঁদের সকলের কাছে যা শিখেছি , সোনার মত মূল্যবান। । যা শিখতে পারিনি , তা আমাদের ব্যর্থতা।
অমলেশ ত্রিপাঠী ছিলেন আমাদের হেড ডিভ। মানে বিভাগীয় প্রধান। সাহেবের মত চেহারা। শীতকালে উনি যখন নেভি ব্লু রঙের স্যুট আর লাল রঙের টাই পরে আসতেন তখন একে বারে পুরোদস্তুর সাহেব। আর যখন গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি পরতেন, তখন বাবু আমলের বাঙালি। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ট্রেড অ্যান্ড ফিনান্স অফ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি । কিন্ত যথেষ্ট তথ্য না মেলায় তিনি স্বদেশী আমলের ইতিহাসে মনোনিবেশ করেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর বিখ্যাত কাজ EXTREMIST CHALENGE. অমলেশ বাবুর মত এত জ্ঞানের গভীরতা খুব কম মানুষেরই দেখেছি।
ডঃ সুমিত সরকার ছিলেন আর একজন বিখ্যাত অধ্যাপক। তিনি কিছুদিন আগে প্রয়াত হয়েছেন। তিনি আমাদের পড়াতেন মিডল ইস্ট। তিনি ছিলেন একজন ঢিলেঢালা মানুষ । মাঝে মাঝেই তাঁর কোমর থেকে প্যান্ট নেমে যেত । আর সেটা তাড়াতাড়ি তুলে নিয়ে আবার শুরু করতেন ...... benefit of the clergy. তিনি পরে আমাদের সহপাঠিনী তনিকা কে বিয়ে করেছিলেন। খুব সম্ভবত এঁরা দু'জনেই জে এন ইউ মানে জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটিতে পড়াতেন। তিনি আমাদের সময়ে স্বদেশী আন্দোলন- এর উপর গবেষণা করে ডি লিট উপাধি পেয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত বই MODERN INDIA.
একই বছরে ডি লিট পেলেন ডঃ নীলমণি মুখোপাধ্যায়।উত্তরপাড়ার জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের উপর গবেষণা করে। তিনি ছিলেন সেই একই পরিবারের সন্তান। আমাদের HISTORY OF BENGAL পড়াতেন নিশীথ রায়। তাঁর ছেলে অভীক ছিল আমাদের সহপাঠী। পরে এম এ ডিসকনটিনিউ করে স্টেট ব্যাঙ্কের প্রবেশনারি অফিসার হয়ে যায় । ও খুব ভাল ক্রিকেট খেলত।
আমাদের ইস্কুলের বন্ধুদের কথা আগেই বলেছি। এর মধ্যে দুটো একটা কথা বলতে ইচ্ছে করতে ইচ্ছে করছে । যেমন , স্যার যখন ক্লাসে বসে লিখতে বলতেন,তখন সবাই যখন সামনের বেঞ্চে বসে লিখত, তখন সোমনাথ খাতা নিয়ে চলে যেত ,একদম পেছনের বেঞ্চে। এবং ওখানে বসে নিজের সই প্র্যাকটিস করত।যেন খুব মনোযোগ দিয়ে উত্তর লিখছে। এবং সবার আগে খাতা জমা দিত। সোমনাথ এর সুন্দর আর পরিচ্ছন্ন উত্তর দেখে অত্যন্ত ভাল মানুষ প্রফুল্ল বাবু সে সব কথা না বুঝেই গুড দিয়ে দিতেন। আমাদের খাতা দেখে স্যার হাজারটা কারেকশন করতেন। পরে স্যারের হাতের লেখা বোঝা যেতনা। আমাদের আর একজন বন্ধু, বিশ্বজিত রায় চৌধুরী ছিল বিশাল ধনী ঘরের সন্তান। ওদের একটা ওয়াইল্ড লাইফের এন জি ও ছিল। এখনও আছে । ও একদিন স্কুলের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে কল্পতরু পানের দোকান থেকে কিং সাইজের চারমিনার এনে খাইয়েছিল। তারপর নিউমার্কেটের পেছনে নিজামের দোকান থেকে বিফ রোল খাইয়েছিল। অবশ্য তাতে আমার কোন বিকার ছিল না । তারপর স্কুল হয়ে বাড়ি। কেউ ধরতেই পারেনি।
0 Comments