জ্বলদর্চি

বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ১০ই সেপ্টেম্বর, বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। প্রতি বছর আনুমানিক ২,০৮,০০০ মানুষের প্রাণহানির কারণে আত্মহত্যা আমাদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের একটি প্রধান সমস্যা। এটি মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে রয়ে গেছে, যা সকল বয়স, লিঙ্গ এবং প্রেক্ষাপটের মানুষকে প্রভাবিত করে।
জীবনের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারবদ্ধ এই দিনটি কেবল একটি স্মরণদিবস নয়, এটি মানুষের জীবন, মানসিক সুস্থতা এবং পারস্পরিক সহমর্মিতার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়। জীবনের কঠিন সময়ে একজন মানুষ যেন নিজেকে একা মনে না করেন এবং প্রয়োজনে যেন সময়মতো সহায়তা পান, এই সচেতনতাই দিবসটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
বর্তমান সমাজে আমরা শারীরিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে যতটা সচেতন, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে অনেক সময় ততটা নই। পড়াশোনা, কর্মজীবন, পারিবারিক সমস্যা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর্থিক চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা কিংবা একাকিত্ব,বিভিন্ন কারণে মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারেন, কিন্তু অনেকেই নিজের কষ্টের কথা প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন। কেউ হয়তো ভাবেন, অন্যরা তাঁকে দুর্বল মনে করবে, আবার কেউ মনে করেন, তাঁর সমস্যার সমাধান করার মতো কেউ নেই। এই নীরবতাই অনেক সময় সমস্যাকে আরও গভীর করে তুলতে পারে।
🍂

তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধের প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে মন দিয়ে শোনা। কাউকে তার সমস্যার কথা বলতে দেওয়া, বিচার না করে পাশে থাকা এবং তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় বড় কোনো সমাধান দেওয়ার চেয়ে একজন মানুষের কথা ধৈর্য ধরে শোনা এবং তাকে বোঝানো যে সে একা নয়, এটিই সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে।
বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস আমাদের আরও একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়, মানসিক অসুস্থতা বা গভীর মানসিক সংকট লজ্জার বিষয় নয়, যেমন শারীরিক অসুস্থতার জন্য চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া স্বাভাবিক, তেমনই মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রেও পরিবার, শিক্ষক, কাউন্সেলর, মনোবিজ্ঞানী বা চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতার পরিচয় নয়, বরং নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিচয়। পরিবারের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান বা পরিবারের কোনো সদস্য আচরণে পরিবর্তন আনলে, দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকলে, নিজেকে গুটিয়ে নিলে বা বারবার হতাশার কথা বললে বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়। কঠোর সমালোচনা, তুলনা বা “এগুলো কিছুই নয়” ধরনের মন্তব্যের পরিবর্তে সহানুভূতির সঙ্গে কথা বলা দরকার। একটি নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ মানুষকে নিজের কষ্ট প্রকাশ করার সুযোগ দেয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিরও বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা সাফল্যের দিক থেকে বিচার না করে তাদের মানসিক সুস্থতার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিদ্যালয় ও কলেজে কাউন্সেলিং, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা এবং সহপাঠীদের প্রতি সহমর্মিতার শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। কারও কষ্ট বা সংকটকে উপহাস না করে, সহায়তার দিকে উৎসাহিত করা উচিত। প্রতিরোধের কাজ শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সারা বছর পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ নিজের সমস্যার কথা বলতে নিরাপদ বোধ করেন। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা, সহজে সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা এবং মানুষের প্রতি মানবিক আচরণ এসবই একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
এই দিবসের মূল শিক্ষা তাই খুব সহজ, একটি জীবন অমূল্য, আর একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোও হতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি পরস্পরের কথা শুনি, বিচার না করে সহানুভূতি দেখাই এবং প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্যের দিকে এগিয়ে দিই, তাহলে অনেক সংকটের সময় মানুষকে একা থাকতে হবে না। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক,কষ্টকে ছোট করে দেখব না, সাহায্য চাওয়াকে দুর্বলতা মনে করব না এবং প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়াব। কারণ জীবনের কঠিন সময় স্থায়ী নয়, কিন্তু একজন মানুষের প্রতি আমাদের সহমর্মিতা তার জন্য আশার একটি দরজা খুলে দিতে পারে।
জীবনের প্রতি আস্থা, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং সময়মতো সহায়তা, এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে আত্মহত্যামুক্ত, আরও মানবিক একটি সমাজ।

Post a Comment

1 Comments

  1. সালেহা খাতুনSeptember 10, 2026

    পড়লাম। লেখক যে কতটা সহমর্মী তাঁর এই লেখার প্রতিটি শব্দে তা ধরা রয়েছে।🌹

    ReplyDelete