প্রাচীন ভারত, ইতিহাস ও বিজ্ঞান-২৩/অনিন্দ্যসুন্দর পাল

প্রাচীন ভারত, ইতিহাস ও বিজ্ঞান
(Ancient India, History & Science)
অনিন্দ্যসুন্দর পাল
অলংকরণ- শ্রেয়সী ভট্টাচার্য্য


"ত্রয়োবিংশ পর্ব- "সাহিত্য ১২"

এই সমস্ত পুস্তকে কেমন ধরনের উচ্চভাব ও কাব্যরস এবং অন্তর্নিহিত অর্থ বর্তমান তা কয়েকটি অনুবাদ ও আলোচনার মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা রাখছি-
১.
বুদ্ধং সরণং গচ্ছামি
ধম্মং সরণং গচ্ছামি
সঙ্ঘং সরণং গচ্ছামি ।

অনুবাদ, বুদ্ধের শরণ গ্রহণ করিতেছি
ধর্মের শরণ গ্রহণ করিতেছি
সঙ্ঘের শরণ গ্রহণ করিতেছি।

২.
দুতিযম্পি বুদ্ধং সরণং গচ্ছামি
দুতিযম্পি ধম্ম‍‌‍‌‌ং সরণং গচ্ছামি
দুতিযম্পি সঙ্ঘং সরণং গচ্ছামি।

অনুবাদ, দ্বিতীয় বারও বুদ্ধের শরণ গ্রহণ করিতেছি
দ্বিতীয় বারও ধর্মের শরণ গ্রহণ করিতেছি
দ্বিতীয় বারও সঙ্ঘের শরণ গ্রহণ করিতেছি


৩.
বিপুলো রাজগহিকানং গিরিসেট্ঠো পবুচ্চতি
সেতো হিমবতং সেট্ঠো আদিচ্ছো অখগামিনং,
সমুদ্দো উদধীনং সেট্ঠো নক্খত্তনঞ্চ চন্দ্রিমা
সদেবকস্স লোকস্স বুদ্ধো অগ্গো পবুচ্চতি।

সারসংক্ষেপ, গিরিরাশির মধ্যে রাজগৃহের বৈপুল‍্য পর্বত, বরফ ঢাকা শ্বেত- ধবল হিম পর্বতের মধ্যে হিমালয়, আকাশচারী দীপ্ত তেজশালী গ্রহের মধ্যে আদিত্য- সূর্য, জলধির মধ্যে সাগর-সমুদ্র, রাত্র স্নিগ্ধ শাখা কিরণদায়ী নক্ষত্র মন্ডলীর মধ্যে শশী-চন্দ্রিমা এবং ত্রিজগতের সর্বলোকের মধ্যে অন্তত জ্ঞানী দ্বিপদোত্তম চক্ষুষ্মান 'বুদ্ধ'ই অগ্র বা শ্রেষ্ঠ।

৪.
গমনেন ন পত্তব্বো লোকস্সন্তো কুদাচনং,
ন চ অপ্পত্বায় লোকন্তং দুক্খা অত্থি পমোচন‌ং
তস্মা হবে লোকবিদূ সুমেধো,
লোকন্তগূ বূসিতকব্রহ্মচরিযো
লোকস্স অন্তং সমিতাবিঞত্বা;
নাসীসতি লোকমিমং পরঞ্চাতি।।

সংক্ষেপে, পদব্রজে গমন করিয়া কখনও লোকের অন্ত করিতে পারে না, অর্থাৎ যেখানে সত্ত্বগণের জন্ম, জরা, মৃত্যু নাই, সেই জন্ম, জরা, মৃত্যু, উৎপত্তি রহিত নির্বাণলোক পদব্রজে যাইয়া জ্ঞাত হইতে, দর্শন করিতে, লাভ করিতে পারে না কিন্তু সংস্কার লোকের অবসানভূত নির্বাণ প্রাপ্ত না হইলে দুঃখ রাশির অবসানও হয় না। সেই হেতু, লোকবিদ, সুমেধ, লোকান্তগ, ব্রহ্মচর্যের পর্যবসান প্রাপ্ত লোকান্ত সম্যকরূপে অবগত হইয়া ইহলোক পরলোক আকাঙ্খা করেন না।

৫.
মুহুত্তং চিত্তপ্পসাদস্স ইদ্ধিং পস্স যসঞ্চ,
আনুভবং চ মে পস্স বণ্নং পস্স জুতিঞ্চ মে।
যে চ তে দীঘমদ্ধানং ধম্মং অস্সোসুং গৌতম,
পত্তা তে অচলং ঠানং যত্থ গন্ত্ব ন সোচরে।

সারসংক্ষেপ, হে সভাসদগণ! মুহূর্তকাল চিত্ত প্রসন্নতার ফলে আমার যে দিব্য ঋদ্ধি, দিব্য যশঃ, মহতী শক্তি ও কমনীয় বর্ণ লাভ হইয়াছে তাহা আপনারা দেখুন। হে ভগবান! যাহারা দীর্ঘকাল আপনার ধর্ম শ্রবণ করিয়াছেন, তাঁহারা যেখানে গেলে শোক করিতে হয় না, সে সচল স্থান লাভ করিয়াছেন।

৬.
বনপ্পগুম্বে যথা ফুস্সিতাগ্গে
গিম্হান মাসে পঠমস্মিং গিম্হে,
তথূপমং ধম্মবরং অদেসযী
নিব্বাণাগামিং পরমং হিতায়।

অনুবাদ, বন উপবন যথা বসন্ত প্রভায়
পত্র, ফুলে শোভাধরে শাখা-প্রশাখায়,
তদুপম সুদেশিত ধরম গম্ভীর
সাধিতে পরমহিত নির্বাণ- গামীর।

সারসংক্ষেপে, বসন্তের প্রারম্ভে যেমন বনভূমি গাছপালা লতাগুল্ম সবই নতুন কচি পল্লবে সজ্জিত সুশোভিত ও পরিশোভিত হয়, ডাল-পালায় নূতন জীবন লাভ করে, তেমন বুদ্ধ দেশিত ধর্মসমূহ আদি-মধ্য-অন্তে কল্যাণকর, অর্থ ব্যঞ্জন সম্পন্ন ব্রহ্মচর্য পরিপূরক। পাহাড়ে কন্দরে গুহায় গহ্বরে পতিত জলধারা যেমন সমুদ্রগামী, তেমনি বুদ্ধের দেশিত ধর্ম সমূহ নির্বাণগামী।

৭.
ত্রিলোক শরণ ধর্ম রেসেতে উত্তম
রত্ন মাঝে ধর্মরত্ন লোকে অনুপম;
ধর্ম করে ধ্রুব ভব দুঃখ বিনাশন
জাগ্রত জীবনে ধর্ম কর আচরণ ।

৮.
খেত্ত্পমা অহরন্তো দাযফা কস্সকপমা,
বীজপমং দেয‍্যধম্মং এত্থ নিব্বত্ততে ফলং।

সারসংক্ষেপে, উর্বর ক্ষেত্র তুল্য ভিক্ষুসঙ্ঘ, সুদক্ষ কৃষক তুল্য শ্রদ্ধাবান দায়ক ও পরিপুষ্ট বিজসদৃশঃ দানীয় বস্তু, এই ত্রিবিধ বস্তুর সংযোগের অপ্রমাণ পুণ্যফল উৎপন্ন হয়। তাই ভগবানের শ্রাবকসঙ্ঘ অনুত্তর-পুণ্য ক্ষেত্র।

৯.
সীহানং'ব নদন্তানং দাঠীনং গিরিগব্ভরে
সুনাথ ভাবিতত্তানং গাথা ণ অত্তুপনায়িকা।

অনুবাদ, দন্তধর সিংহ যেমন গিরি-গুহায় গর্জ্জন করিয়া থাকে, তেমন চারি মার্গধর, বিবেক-গুহায় অভীতনাদী ভাবিত চিত্ত স্থবির সিংহগণের স্বীয় ভাষিতা গাথা শ্রবণ করুন।

১০.
য়থা নামা য়থা গোত্তা য়থা ধম্মা বিহারিনো,
য়থাধিমূত্তা সপ্পঞা বিহারিংসু অতন্দিতা।

১১.
তত্থ তত্থ বিপপ্সিত্বা ফুসিত্বা অচ্চুতং পদং,
কতন্তং পচ্চবেব্খন্তা ইমমত্থং অভাসিংসু।

বর্ণনায়(১০ এবং ১১ একত্রে), যেই যেই নাম গোত্রে পরিচিত, ধ্যানশীল রত, শ্রদ্ধা-প্রজ্ঞা-বিমুক্তিজ্ঞান প্রাপ্ত, বীর্য্য পরায়ণ, সপ্রজ্ঞ, অরণ্য-বৃক্ষমূল-শূন্যগারে নাম-রূপ ভাবনানলে বিশুদ্ধ সম্পাদন পূর্ববক নির্ব্বাণ লাভ করিয়া যেই স্থবিরগণ অবস্থান করিয়াছেন, সেই নির্ব্বাণদর্শী স্থবিরের। এই লৌকিয় লোকোত্তর অর্থ সংযুক্ত স্থবির গাথা ভাষণ করিয়াছেন।

১২.
উপসন্তো উপরতো মন্তভাণী অনুদ্ধতো
ধুনাতি পাপকে ধম্মে দুমপত্তং'ব মালুতো।

বর্ণনায়, আমার ষরেন্দ্রিয় ও ত্রিবিধ কায়-দুশ্চরিত উপশান্ত, সমস্ত পাপ ও ত্রিবিধ মনোদুশ্চরিত উপরত, ত্রিবিধ বাক্য-দুশ্চরিত ত্যাগ করিয়া আমি মিতভাষী ও জাত্যভিমানাদি ত্যাগ করিয়া অনুদ্ধত হইয়াছি। যেমন বৃক্ষের হরিদ্বর্ণ পত্র বায়ু তাড়িত হইয়া পড়িয়া যায়, তেমন আমার পাপ-ধর্ম সমূহ ধূনিত বা সমূলে ধ্বংস হইয়াছে।

১৩.
অহং খো বেলুগুম্বস্মিং, ভুত্বান মধু পায়াসং
পদব্খিণং সম্মসন্তো খদ্ধানং উদয়ব্বয়ং,
সানুং পটিগমিসামি বিবেকমনুব্রূহয়ন্তি।
গোসালো থেরো।

বর্ণনায়, আমি বাঁশতলার ছায়ায় মাতৃ-প্রদত্ত মধু পায়েস ভোজন করিয়া বুদ্ধের উপদেশে দৃঢ়তা উৎপাদন করি এবং পঞ্চ উপাদান স্কন্ধের উদয়-ব্যয় বা উৎপত্তি ধ্বংস দর্শন করত ফল সমাপ্তিতে কায়-বিবেক অনুষ্ঠান হেতু পর্বত সানুতে গমন করিব।

১৪.
আবাধো মে সমুপ্পন্নো, সতি মে উপপজ্জথ,
আবাধো মে সমুপ্পন্নো, কালো মে নপ্পমজ্জিতুন্তি।
উত্তিয়ো থেরো।
তক্রদানং
নিগ্রোধ চিত্তকো থেরো গোসালথেরো সুগন্ধো,
নন্দিয়ো অভয়ো থেরো থেরো লোমস্কঙ্গিয়ো,
জম্বু গামিকপুত্তো চ হারিতো উত্তিয়ো ইসী'তি।

বর্ণনায়, দৃঢ়বীর্য্য সহকারে সাধনা করিতে করিতে আমার রোগোৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিও জাগ্রত হইল, এখন আমার রোগ হইয়াছে, আর প্রমাদিত হইবার সময় আমার নাই, রোগের শ্রীবৃদ্ধি না হইতেই মার্গফল লাভ করা উচিত।

ইত্যাদি, এমন উদাহরণ দিতে থাকলে পুরো আলোচনাটাই কম হয়ে পড়বে, তাই এইটুকু উল্লেখ থেকেই বোঝা যাচ্ছে পালি সাহিত্যের গোলাপী বই যেমন যথেষ্ট আছে, সেইরকম বাক্যগঠন শব্দচয়ন এইসবের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে সরসতাও পরিপূর্ণ। পূর্বেই উল্লেখ ছিল- সবটাই জাতকের গল্পের ভান্ডার। এতদপরেও দুঃখের বিষয় এই যে, সাধারণ সাহিত্য হিসাবে পালি সাহিত্য বলে তেমন কিছুই গড়ে ওঠে নি।

(ক্রমশ....….....)
পেজ-এ লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি