পূর্বমেদিনীপুর জেলার মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের কথ্যভাষা/ বিমল মণ্ডল

Spoken language of the fishing community of East-Medinipur district / Bimal Mondal
পূর্বমেদিনীপুর জেলার মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের কথ্যভাষা
পর্ব-২৪

চতুর্থ অধ্যায় /বাক্যতত্ত্ব (Syntax) 

৬.বাক্যের শ্রেণিবিভাগঃ

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মৎস্যজীবীদের কথ্যভাষাতে চলিত বাংলার  মতোই সরল, জটিল এবং  যৌগিক বাক্য — এই তিন প্রকার  বাক্যের প্রচলন এবং ব্যবহার  দেখা  যায়। যেমন —

৬.১. সরল বাক্য (Simple Sentence):

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মৎস্যজীবীদের কথ্যভাষাতে সরল বাক্যের প্রচলন বেশি  দেখা যায়।বিশেষ করে খেজুরী, রামনগর, কাঁথি,নন্দীগ্রাম প্রভৃতি মৎস্যজীবী  অঞ্চল গুলোতে
সরল বাক্যের  ব্যবহার  দেখা  যায়। এগুলি আকারে সংক্ষিপ্ত। যেমন—

১. বোট কা রঙ কালা। ( নৌকার  রঙ কালো।) 
২.মাইঝিওরা জালো দি কি মাছো ধরুছি।( মেয়েরা জাল দিয়ে মাছ ধরছে।) 
৩.সে জাঁএ।(সে জানে।) 
৪.বরপ লি কি যাউছি।( বরফ নিয়ে যাচ্ছে।) 
৫.লুকো আইলা। ( লোক এল।)
৬.আমি কথা কইবা। ( আমি কথা বলবো।) 
৭.মুই ঘর যাইটি।( আমি ঘর যাচ্ছি।)
৮.লোক কইথলা।( লোক বলেছিল।)
৯.টকাটা হাঁটিয়া হাঁটিয়া ইসকুলে যাথলা। ( ছেলেটা  হেঁটে  হেঁটে  স্কুলে  গিয়েছিল।) 
১০.তুই এঠিটা আসবু।(তুই এখানে  আসবি।)
১১.দোরিয়া খারাপ হউচি।( নদী  খারাপ  হয়েছে।) 
১২.আমো দেখিছু।(আমরা দেখছি।) 
১৩.জালো ঝাঁড়া হবো। ( জাল ঝাড়া হবে।) 
১৪.নৌকা বুসিয়ালা। ( নৌকা  বসে গেল।)
১৫.আমাকে একটা পিরান দাও।( আমাকে একটা  জামা দাও।)
১৬.আমি পরে কইবা। ( আমি পরে বলব।)
১৭.তুমাকে আমি ডাকিটি।(তোমাকে আমি ডাকছি।)
১৮.মুই পাখাল খাবা।( আমি পান্তাভাত  খাব।)
১৯.তুমানকের ভাষা শিখিটি।(তোমাদের ভাষা শিখছি।)
২০.আমারো ঘরে মাচ ঢাকাঁয়া হইবো। ( আমার ঘরে মাছ ঢাকানো হবে। 

এই জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের  মৎস্যজীবীদের কথ্যভাষায় প্রায়শই  অসমাপিকা ক্রিয়াযুক্ত সরলবাক্যের ব্যবহার  দেখা  যায়। যেমন-
১.মাইটকাটা আইজকে ঘরে বুসিয়া ভঁকে রাঁধা শিকায়।(মেয়েটা  আজকে  ঘরে বসে বোনকে রান্ন শিখাচ্ছে।) 
২.টকাটা আসিকি জালো ফ্যালাটে।( ছেলেটা  এসে জাল ফেলাচ্ছে।)
৩.গেড়িয়া কদগা মাচ ছাড়থিলি আর কটা মাচ উটছে।( পুকুরে কতগুলো  মাছ ছেড়ে ছিলাম আর কয়েকটি  মাছ উঠেছে।) 
৪.টকাটা পড়া বন্ধ করিয়া পালিলো। ( ছেলেটা পড়া বন্ধ করে পালিয়ে গেল।) 
৫.তার বাপের জানে আর তার পড়া হইলো নি।(তার বাবার জন্য  আর তার পড়া হলো  না।) 
৬.ফাগুন মাসে  কু পাকলে আমানে ঘরে খাই।
( ফাল্গুন মাসে কুল পাকলে আমরা সবাই  খাই।)


এছাড়া  পূর্ব মেদিনীপুর  জেলার মৎস্যজীবীদের থানা ভিত্তিক সরল বাক্যের উদাহরণ —

১. রামনগর  থানা

ক.পরিশ্রমো বেশি করিকি মাছো ধরি।( পরিশ্রম  বেশি করে মাছ ধরি।)
খ. আমানকোর মাছোরো দু,তিনট্যা ব্যবসা অছে।( আমাদের  মাছের দু- তিনটা  ব্যবসা আছে।) 
গ.শংকরপুর সে বহুত মছলি উঠতা হ্যা।( শংকরপুরে ভালো  মাছ ওঠে।) (মুসলমানদের  ভাষা)
ঘ.মাইঝিওরা মাছো শুকোয়ছি।)
ঙ.নউকা লিকি যায়।( নৌকা  নিয়ে যায়।)

২.খেজুরী থানা

ক.আমি মুক্ ডাল খাবা। ( আমি মুগডাল খাব)
খ.মাচ বিছি দিয়া শুক্না করি।( মাছ বিছিয়ে শুকনো  করছি।)
গ.তুই উমানু আইলু।(তুই ঐদিক থেকে এলি।)
ঘ.তানে মাচ কাটথালা। ( তারা মাছ কাটছিল।) 
ঙ.চেরা পোঁয়া কম ছাড়থিলি।( চারা পোনা কম ছাড়ছিলাম।) 

৩.কাঁথি থানা

ক.ওটকে আইসো ত।(এখানে  এসো।)
খ. পটকি কও । (তাড়াতাড়ি বলো।) 
গ.আমি লয়া কাপড় পরুচি।( আমি নতুন কাপড় পরেছি।
ঘ.তোরমনে  পটকি খাইলে।( তোরা তাড়াতাড়ি  খেয়ে নে।)
ঙ.ঘোর মে লে আকে।( ঘরে নিয়ে আসে।) ( মুসলমানদের ভাষা) 
চ. খ্যারাপ হোতা হ্যা। ( খারাপ হয়।)

৪. মহিষাদল  থানা 

ক.মোনকের কুনো খেতি নেই।( আমাদের কোন ক্ষতি নেই।)
খ.মুই সে কথা কইটি নি। (আমি সে কথা বলছি না।) 
গ. দুচামচ চিনি খায়া লিছি।(দুচামচ চিনি খেয়ে নিয়েছি।)
ঘ.চেসমা দেগেছে। ( চশমা  দিয়ে গেছে।)( মুসলমানদের  ভাষা) 
ঙ.তেমি খেমা চাইলিবি।(তুমি ক্ষমা চেয়ে নেবে।) 

৫.নন্দীগ্রাম থানা

ক. আউভাজা দিয়া পানতা খাইথিলি।( আলুভাজা দিয়ে পান্তা খেয়েছিলাম।)
খ.মাছে টুকু নু মাখি দে।( মাছে একটুখানি  লবণ  মাখিয়ে দে।) 
গ.আমাহারে হউদ গাচ হইছে।( আমার ঘরে হলুদ গাছ হয়েছে।)
ঘ.টকাটা গা ধুয়া ইসকুলে যাবে।( ছেলেটা স্নান করে স্কুলে যাবে।) 
ঙ.তোনে দেড়িয়া কি দেকথুলু? ( তোরা দাঁড়িয়ে  কি দেখেছিলি?)

৬.সুতাহাটা থানা

ক. তুই  সকাল নু যাউনু? (তুই সকাল থেকে  যাসনি?)
খ.মোর এক বন্ধু ডাকেরে।( আমার এক বন্ধু ডাকছে।)
গ.মন্নে যাবো চ এক জেইগায়।( আমরা যাব চল এক জায়গায়।) 
ঙ. তুমানে কাই যাবো? ( তোমরা কোথায় যাবে?)
চ.তান্নে আসবে নি।( তারা আসবে না।)

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মৎস্যজীবীদের কথ্যভাষায়  সরল বাক্যের  ব্যবহার  যেমন চোখে পড়ে, তেমনি জটিল ও যৌগিক বাক্যের ব্যবহারও দেখা যায় এখানকার  অধিবাসীদের মধ্যে। সেই ব্যবহারগুলো  এখানকার  অঞ্চলভেদে  পরবর্তী  পর্বে  আলোচিত হবে।

পেজ-এ লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি