আজকের দুই পুজো
রাখহরি
ব্রহ্মা ও সরস্বতী : বর্তমান সময়ের এক অস্তিত্ববাদী পাঠ
আজ ব্রহ্মা কোনো দেবতা নন।
তিনি রাষ্ট্র, তিনি প্রযুক্তি,
তিনি কর্পোরেশন, তিনি অ্যালগরিদম।
তাঁর হাতে আছে অসীম ক্ষমতা—
সৃষ্টি করার, বদলে দেওয়ার, মুছে দেওয়ার।
তিনি সৃষ্টি করছেন।
ডেটা, ড্রোন, সীমান্ত, বুলেট,
কনটেন্ট, ন্যারেটিভ, কৃত্রিম বুদ্ধি।
সবকিছু দ্রুত, নিখুঁত, কার্যকর।
কিন্তু প্রশ্ন নেই।
এইখানেই বিপদ।
কারণ সৃষ্টি যখন প্রশ্নহীন হয়,
তখন সে আর নিরপেক্ষ থাকে না—
সে সহিংস হয়ে ওঠে।
সরস্বতী আজও আছেন।
কিন্তু তাঁকে আর দেবী বলা হয় না।
আজ তাঁর নাম—
Ethics, Critical Thinking, Humanities,
স্বাধীন সংবাদ, সন্দেহ করার অধিকার।
তিনি প্রশ্ন করেন—
এই প্রযুক্তি কার জন্য?
এই যুদ্ধ কাদের নিরাপত্তা দেয়?
এই উন্নয়ন কার জীবন সহজ করে,
আর কাদের অদৃশ্য করে?
এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর।
তাই আধুনিক ব্রহ্মা
সরস্বতীকে প্রায়শই বাদ দেন।
বাজেট কাটেন, পাঠ্যক্রম বদলান,
বীণার তার ঢেকে দেন
ড্রামের শব্দে।
কিন্তু সরস্বতী নীরব নন।
তিনি সোশ্যাল মিডিয়ার এক কোণায়,
একজন কবির লাইনে,
একজন ছাত্রের প্রশ্নে,
একজন নাগরিকের বিবেকে ফিরে আসেন।
যখন ড্রোন উড়ে যায়
“নিরাপত্তা”র নামে,
তিনি জিজ্ঞেস করেন—
নিরাপত্তা কার?
যখন AI লেখা লেখে, ছবি আঁকে,
তিনি প্রশ্ন তোলেন—
এই সৃষ্টির দায় কে নেবে?
যখন রাষ্ট্র বলে—
“এটা প্রয়োজনীয় ”,
তিনি বলেন—
কার জন্য প্রয়োজনীয়?
এখানে ব্রহ্মার আসক্তি স্পষ্ট।
ক্ষমতায় নিজের প্রতিচ্ছবি তাকে মুগ্ধ করে।
দক্ষতা, গতি, নিয়ন্ত্রণ—
সবই আকর্ষণীয়।
কিন্তু যদি এই আসক্তি
সংযম ছাড়া চলে,
তবে সৃষ্টি পরিণত হয় ধ্বংসে।
এই সংযমই সরস্বতী।
এই মিলন আজও দরকার।
সৃষ্টি ও বুদ্ধির।
ক্ষমতা ও বিবেকের।
প্রযুক্তি ও মানবিকতার।
নইলে আমরা এমন এক জগৎ বানাব
যা নিখুঁতভাবে কাজ করবে,
কিন্তু কাউকে জিজ্ঞেস করবে না—
তুমি কেমন আছ?
উপনিষদের “তত্ত্বমসি”
আজ আর আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা নয়।
এ এক রাজনৈতিক ও নৈতিক ঘোষণা—
তুমিই দায়ী।
তুমি ভোটে, নীরবতায়,
শেয়ারে, স্ক্রোলে, সম্মতিতে
এই জগৎ বানাচ্ছ।
সরস্বতী কোনো অতীতের দেবী নন।
তিনি আজকের জরুরি প্রয়োজন।
আর যদি তাঁকে আমরা আবার
সৃষ্টির কেন্দ্রে না ফিরিয়ে আনি,
তবে ব্রহ্মা থাকবে—
কিন্তু জগৎ থাকবে না।
🍂
নেতাজি — বর্তমানেও অস্বস্তিকরভাবে প্রাসঙ্গিক
আজ আমরা মালা দেব,
ফ্রেমে বাঁধা ছবির সামনে
শব্দে শব্দে শ্রদ্ধা সাজাব।
কিন্তু নেতাজি
কখনো ফ্রেমে থাকার মানুষ ছিলেন না।
তিনি ছিলেন
অনুমতি না চাওয়া আগুন,
সভ্যতার ঘরে উঠে দাঁড়ানো প্রশ্ন।
তিনি জানতেন—
স্বাধীনতা উপহার নয়,
স্বাধীনতা দায়িত্ব।
আজ দেশ স্বাধীন,
তবু কণ্ঠস্বর ভয় পায়।
সীমান্ত আছে,
মনগুলোতে তালা।
আমরা স্ক্রল করি,
অন্যায় পাশ কাটাই,
নীরবতাকে বলি—
নিরপেক্ষতা।
নেতাজি স্ক্রল করতেন না।
তিনি জিজ্ঞেস করতেন—
ক্ষমতা কেন প্রশ্ন ভয় পায়?
দেশপ্রেম কেন মানবিকতার চেয়ে
জোরে চেঁচায়?
কেন আনুগত্যকে
ঐক্যের নাম দেওয়া হয়?
তিনি মনে করিয়ে দিতেন—
দেশ মানে শাসক নয়,
দেশ মানে বিবেক।
যে সময়ে যুদ্ধ
বোতাম টিপে হয়,
যে সময়ে সত্য
কাটছাঁট হয়ে পরিবেশিত হয়,
যে সময়ে স্বস্তির দামে
স্বাধীনতা বিক্রি হয়—
সেই সময়ে নেতাজি
অস্বস্তিকরভাবে প্রাসঙ্গিক।
তিনি দরকার
ইউনিফর্মের ছবিতে নয়,
বরং অস্বস্তি হিসেবে।
আপস না করার সাহস হিসেবে।
যখন জাতীয়তাবাদ
মানুষকে ভুলে যায়,
নেতাজি বলেন—
দেশকে ভালোবাসা মানে
তাকে প্রশ্ন করার সাহস।
যখন তরুণদের বলা হয়—
স্বপ্ন ছোট করো,
লাইন মেনে চলো—
নেতাজি বলেন—
রক্ত দাও মানে
হিংসা নয়,
অঙ্গীকার।
নেতাজি আজও দরকার
কারণ অন্যায় এখনও আছে,
ভয় এখনও শাসন করে,
আর স্বাধীনতা
প্রতিদিন পরীক্ষায় বসে।
নেতাজি হারিয়ে যাননি।
তিনি বেঁচে আছেন
প্রতিটি অস্বস্তিকর সত্যে,
প্রতিটি একা দাঁড়ানো মানুষের মধ্যে,
প্রতিটি সেই সিদ্ধান্তে—
যেখানে নিরাপত্তার চেয়ে
ন্যায় বড় হয়ে ওঠে।
আজ তাঁর জন্মদিন।
কিন্তু আসল প্রশ্ন—
আমরা কি প্রস্তুত
নেতাজিকে
শুধু মালায় নয়,
আমাদের কাজে
6 Comments
সমসাময়িক কালে প্রশ্ন করা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে বিশেষত রাষ্ট্রের কাছে কারণ প্রশ্ন মানেই বিরুদ্ধ। সেই প্রেক্ষিতে দুটি কবিতাই সাহসের পরিচয় দেয়। ধন্যবাদ
ReplyDelete🙏
Deleteসাহসী কবিতা। মনন প্রশ্ন করবেই। তাই তাকে নিরাপদে রাখা রাষ্টের দায়িত্ব।
ReplyDelete🙏
Delete🙏🙏🙏
ReplyDelete🙏
Delete