অভিজিৎ হালদার
স্মৃতির মহাপ্রয়াণ
আজ হৃদয়ের সব কটা দরজায় আমি খিল এঁটেছি,
মায়ার এই বিষাক্ত খেলা সাঙ্গ হবে এবার।
যত গোলাপ ফুটেছিল ডায়েরির ভাঁজে ভাঁজে,
তাদের ঘাড় মটকে দেবো—আজ হোক শেষ বিচার।
আমি পৃথিবীর সমস্ত প্রেমিকাকে খুন করবো আজ,
না, কোনো ধারালো অস্ত্রে নয়, আমার এই নিঃশব্দ অবহেলায়।
তাদের হাসির মাদকতা, চোখের ওই সম্মোহনী মায়া—
সবটুকু কবর দেবো স্মৃতির অতল তলায়।
যারা বসন্তের দোহাই দিয়ে বুকের ভেতর হাহাকার বুনেছে,
যারা বৃষ্টির অজুহাতে চোখের জল চুরি করেছে বারবার;
তাদের প্রতিটি মিথ্যে প্রতিশ্রুতি আজ আমি পুড়িয়ে ছাই করবো,
ফুসফুসের ধার করা অক্সিজেন দিয়ে নেভাবো সব হাহাকার।
শকুনের ডানার রৌদ্রে শুকিয়ে নেবো তাদের প্রতিটি নাম,
মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষ থেকে মুছে দেবো তাদের ঘ্রাণ।
আলোকবর্ষ দূরের কোনো অন্ধকার নক্ষত্রে নির্বাসন দেবো—
সেইসব প্রেমিকাদের, যারা ভেঙেছে শত শত প্রাণ।
প্রেমিকার সেই মায়াবী মুখ আজ মৃত্যুর ছাই হয়ে উড়বে,
পাহাড়ের চূড়া থেকে আমি ছুড়ে ফেলবো সব মায়ার জাল।
মরুভূমির মরুফুল হয়ে আমি একাই দাঁড়িয়ে থাকবো একা—
বুকের পাঁজরে যেখানে আর ফিরে আসবে না কোনো কাল।
আজ থেকে কোনো প্রেমিক হবে না আর কেউ,
পৃথিবীটা হোক এক রুক্ষ, নির্জন পাথুরে মাটি।
প্রেমিকাদের খুনের দায়ে আমি নিজেকেই দেবো জেলখানায়,
যেখানে একাকীত্বই হবে আমার শেষ আশ্রয়, একমাত্র পরিপাটি।।
বসন্তহীন চব্বিশ বছর
প্রতিটি আঙ্গুলে সবুজের আবহে আমি চেয়েছিলাম একটা বন গড়তে,
চেয়েছিলাম অন্যের রুক্ষ মরুভূমিতে ছায়ার চাদর বিছিয়ে দিতে।
আমার হাতের তালুতে ছিল সজীবতার ঘ্রাণ আর বুকভরা মমতা,
কিন্তু কেউ দেখেনি সেই সবুজের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা একাকীত্ব ও নীরবতা।
দেখতে দেখতে কেটে গেছে চব্বিশটা বছর, তবুও বসন্ত আসেনি জীবনে—
আমার জানলার কার্নিশে কোনো কোকিল ডাকেনি কোনোদিন।
শুকনো পাতার মড়মড় শব্দে কেটেছে একেকটি দীর্ঘ রাত,
আমি কেবল গুনে গেছি দীর্ঘশ্বাসের খতিয়ান, আর বিষণ্ণ ঋণের ঋণ।
আমি হাত বাড়িয়েছিলাম মানুষের ক্ষত মুছিয়ে দেবো বলে,
নিজের রক্ত দিয়ে রাঙাতে চেয়েছি অন্যের ফ্যাকাশে ক্যানভাস।
অথচ প্রতিদানে সেই মানুষের উপকার করতে গিয়ে মানুষই আমাকে পুড়িয়ে—
উপহার দিয়েছে কেবল এক বুক পোড়া ছাই আর তীব্র দীর্ঘশ্বাস।
আজ আমি দগ্ধ এক মানচিত্র, আমার অস্তিত্ব জুড়ে কেবল ক্ষত,
আগুনের লেলিহান শিখায় তারা আমাকে বিদ্ধ করেছে প্রতিদিন।
সূর্যের চেয়েও তীব্র দহনে আমি পুড়ে খাক হয়ে গেছি ঠিকই,
তবুও আগলে রেখেছি সেই সবুজের স্বপ্ন—যা আজ বড়ই মলিন।
চব্বিশ বছর আগে যেখানে এক ফালি রোদের স্বপ্ন ছিল,
সেখানে আজ কেবল মধ্যাহ্নের নিষ্ঠুর খরতাপ আর হাহাকার।
উপকারী হাতগুলো এখন আগুনের ফুলকি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,
মানুষের দেওয়া সেই ক্ষত চিহ্নই আজ আমার জীবনের একমাত্র অলংকার।।
🍂
হেমন্তের চাঁদ ও তুমি
মাঠে মাঠে এখন পাকা ধানের ঘ্রাণ, হিমেল হাওয়ার গান,
কার্তিকের এই কুয়াশা চাদরে ঢাকা পড়েছে অভিমান।
গাছের ডাল থেকে হলুদ পাতাগুলো একে একে খসে পড়ে,
ঠিক যেমন করে তোমার স্মৃতিগুলো আমার এই বুকের ভেতর ঝরে।
হেমন্তের ওই রূপালি চাঁদটা আজ বড্ড একা দাঁড়িয়ে আছে আকাশে,
ঠিক যেন তোমার সেই মায়াবী মুখ, যা আমি খুঁজে ফিরি প্রতিটি নিঃশ্বাসে।
চাঁদের গায়ে আজ কোনো কলঙ্ক নেই, আছে শুধু একরাশ শীতল আলো,
যেমন করে তুমি দূর থেকে শিখিয়েছিলে—কেমন করে বাসতে হয় ভালো।
তুমি তো এখন পূর্ণিমার সেই চাঁদ, ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে তোমার বাস,
আর আমি শিশিরভেজা ঘাসের ডগা, যেখানে জমে থাকে রাতের দীর্ঘশ্বাস।
তোমার ওই শান্ত চোখের দিকে তাকালে আজো চব্বিশ বছর আগের কথা মনে পড়ে,
যখন হেমন্তের প্রথম কুয়াশা মেখে আমরা হাঁটতাম—হাত রেখে অপরের হাত ধরে।
এখন চাঁদটা যখন ছাদের কার্নিশে উঁকি দেয় মাঝরাতের নীরবতায়,
আমি তোমার দূরত্বের আলোকবর্ষ মাপি, চোখের কোণে জমা হওয়া এক ফোঁটা লোনা জলে।
হয়তো কোনো এক ঝরা পাতার শব্দে তুমি আজো আমায় ডাকো গোপনে,
আমি সেই ডাক শুনেই বেঁচে আছি, এই হেমন্তের নির্জন আয়োজনে।
প্রেমিকা থেকে তুমি আজ আকাশের চাঁদ হয়ে গেছ চিরকালের মতো,
আমি কেবল কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে আড়াল করি আমার হৃদয়ের সব কটা ক্ষত।
তুমি জ্যোৎস্না হয়ে ঝরো অন্য কারো জানালায়, অন্য কারো চেনা উঠোনে,
আর আমি হেমন্তের নিঝুম রাতে তোমায় খুঁজি—আমার এই একলা ঘরের কোণে।।
বেনামী মিছিলের রাত
সেদিনও ছিল রাত, ঠিক আজকের মতোই নিঝুম আর থমথমে,
আকাশের বুক চিরে ছিল এক অস্থির বিদায়ের ঘনঘটা।
মেঘের আড়ালে চাঁদটা মুখ লুকিয়েছিল অজানিত ভয়ে,
বাতাসে বইছিল এক প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ের অবিন্যস্ত ছটা।
চারিদিকে ছিল এক বিষণ্ণ প্রস্থান করার নিঃশব্দ মহড়া,
ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে যাওয়ার - আয়োজন;
ওরা হয়তো বুঝেছিল এই মাটির মায়া আজ বড়ই ঠুনকো,
তাই ডানায় ভর করে খুঁজছিল কোনো এক নিরাপদ পাহারার প্রয়োজন।
কোনো উৎসবে বা নিমন্ত্রণে নয়—
সে এক বিচিত্র উন্মাদনা জেগেছিল ওই অন্ধকার রাজপথে।
বেনামী অভ্যুত্থান মিছিলের দৌড় গড়ায় যেদিকে চোখ যায়,
মানুষের হাহাকার আর আর্তনাদ মিশে গিয়েছিল সময়ের রথে।
কেউ জানতো না এই মিছিলের গন্তব্য কোথায়,
কিংবা এই অভ্যুত্থান কাকে গদিচ্যুত করতে চায়।
শুধু চব্বিশটা বছর ধরে জমে থাকা একরাশ অবদমিত ক্রোধ—
আছড়ে পড়ছিল শহরের প্রতিটি ইটের পাঁজরে আর ছায়ায়।
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম জানালার ওপাশে একলা এবং নিঃসঙ্গ,
পাখিদের সেই উড়ে যাওয়া আর মিছিলের চিৎকার দেখছিলাম চুপচাপ।
আমার বুকের ভেতরেও তখন চলছিল এক বেনামী বিদ্রোহ—
তোমার স্মৃতিগুলো মুছিয়ে দিতে চেয়েছিলাম হৃদয়ের প্রতিটি ছাপ।
পাখিরা যেমন বন ছেড়ে যায়, তুমিও তো ঠিক তেমনি চলে গেছ,
মিছিলের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া কোনো এক চেনা মুখের মতো।
সেদিনের সেই রাতটা আজও আমার স্মৃতির পাতায় জীবন্ত—
যেখানে অভ্যুত্থানের আগুনেই পুড়েছিল আমার সবচেয়ে পুরনো ক্ষত।।
একটি বেনামী বিকেলের গল্প
স্মৃতির পাতায় ধুলো জমেছে, অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে আজ,
তবুও সেই রঙিন মলাটের দিনগুলো এখনো মনের কোণে জীবন্ত।
শহরের ব্যস্ত রাস্তায় যখন ভিড় বাড়ে, আমি পিছু ফিরে দেখি—
কোথায় যেন থমকে আছে আমাদের সেই অসমাপ্ত বসন্ত।
বসন্তের হলুদ প্রহরে আমার প্রিয় নীল রঙের মিছিলে,
আমি খুঁজেছিলাম এক জোড়া শান্ত চোখ আর এক চিলতে হাসি।
চারিদিকে তখন রঙের খেলা, কোলাহলের এক তীব্র উন্মাদনা—
আর আমি ছিলাম কেবল তোমার ওই মায়াবী চাহনির আদিম প্রবাসী।
স্মৃতিরা ভিড় করে যখন চব্বিশ বছরের সেই পুরনো ক্যালেন্ডার খুলি,
হয়তো সমাজ তাকে অসমীকরণ বলবে, কিংবা বলবে স্রেফ এক ভুল;
প্রেমিকার বয়স যখন তেইশ আমার তখন সবে সাড়ে উনিশ—
বুকের ভেতর তখন সবে ফুটতে শুরু করেছে নামহীন কোনো এক ফুল।
সেই ভিড়ের মাঝে, সেই কোলাহলে, তুমি ছিলে নিভৃতে নিতান্তই আপন কেউ,
ঠিক যেন শ্রাবণের দুপুরে হঠাৎ নেমে আসা এক পশলা বৃষ্টির স্নিগ্ধতা।
আমি তাকিয়ে ছিলাম মুগ্ধ হয়ে, হৃদস্পন্দনের গতি ছিল তখন পাহাড়ী নদীর মতো—
কিন্তু ঠোঁটের গোড়ায় এসেও আটকে গিয়েছিল সব কটা নীরব কথা।
সময় বয়ে গেছে তার আপন গতিতে, মিছিল শেষ হয়েছে অনেক আগেই,
বাকি রয়ে গেছে শুধু এক বুক হাহাকার আর কিছু অব্যক্ত অভিমান।
সবই তো হয়েছিল সেদিন, শুধু একটা শব্দের দূরত্বটুকু ঘোচানো হয়নি—
আমি পারিনি জানতে তোমার নাম, আজো তাই রয়ে গেলে এক বেনামী প্রেমিকা হয়ে।।
2 Comments
প্রেমিক কবি ভাই শব্দের ছুরিতে মেরো আর কবিতার রাজ্যে নির্বাসন দিও।
ReplyDeleteঅভিমান ভরা কবিতাগুলো ভালো লাগলো।
কবিতাগুলো ভালো কিন্তু কোথাও মনে হয়েছে আমার বাড়তি কথা হয়ে গেছে আরও কম্প্যাক্ট হতে পারত ভালো লেগেছে
ReplyDelete