পর্ব ২
প্রীতম সেনগুপ্ত
( রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পরম পূজনীয় দশম সঙ্ঘগুরু স্বামী বীরেশ্বরানন্দ রচিত ‘BRAHMA SUTRAS’ গ্রন্থটি ভিত্তি করে এক সনিষ্ঠ অন্বেষণের উদ্দেশ্যে নিয়েই শুরু হয়েছে এই ধারাবাহিক। )
বেদ বিষয়ে বিবেকানন্দ আরও বলছেন, “শাস্ত্র শব্দে অনাদি অনন্ত ‘বেদ’ বুঝা যায়। ধর্মশাসনে এই বেদই একমাত্র সক্ষম। পুরাণাদি অন্যান্য পুস্তক স্মৃতি-শব্দবাচ্য; এবং তাহাদের প্রামাণ্য --- যে পর্যন্ত তাহারা শ্রুতিকে অনুসরণ করে, সেই পর্যন্ত।
‘সত্য’ দুই প্রকার। এক -- যাহা মানব-সাধারণের পঞ্চেন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও তদুপস্থাপিত অনুমানের দ্বারা গ্রাহ্য। দুই--যাহা অতীন্দ্রিয় সূক্ষ্ম যোগজ শক্তির গ্রাহ্য।
প্রথম উপায় দ্বারা সংকলিত জ্ঞানকে ‘বিজ্ঞান’ বলা যায়। দ্বিতীয় প্রকারের সংকলিত জ্ঞানকে ‘বেদ’ বলা যায়। ‘বেদ’- নামধেয় অনাদি অনন্ত অলৌকিক জ্ঞানরাশি সদা বিদ্যমান, সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং যাহার সহায়তায় এই জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় করিতেছেন।
এই অতীন্দ্রয় শক্তি যে পুরুষে আবির্ভূত হন তাহার নাম ঋষি, ও সেই শক্তির দ্বারা তিনি যে অলৌকিক সত্য উপলব্ধি করেন তাহার নাম ‘বেদ’।
এই ঋষিত্ব ও বেদদ্রষ্টৃত্ব লাভ করাই যথার্থ ধর্মানুভূতি। যতদিন ইহার উন্মেষ না হয়, ততদিন ‘ধর্ম’ কেবল ‘কথার কথা’ ও ধর্মরাজ্যের প্রথম সোপানেও পদস্থিতি হয় নাই, জানিতে হইবে।
সমস্ত দেশকালপাত্র ব্যাপিয়া বেদের শাসন অর্থাৎ বেদের প্রভাব দেশবিশেষে, কালবিশেষে বা পাত্রবিশেষে বদ্ধ নহে।
সার্বজনীন ধর্মের ব্যাখ্যাতা একমাত্র ‘বেদ’।’ ( স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, ষষ্ঠ খন্ড, ‘হিন্দুধর্ম ও শ্রীরামকৃষ্ণ’, পৃঃ৩ )
ভগবান শংকরের আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট
অথচ একসময় বৌদ্ধধর্মের সর্বগ্রাসী প্রভাবে বৈদিক ধর্মের বিপন্নতা প্রকট হয়ে ওঠে। এই এ বিষয়ে শ্রী ইন্দ্রদয়াল ভট্টাচার্য ( উত্তরকালে স্বামী প্রেমেশানন্দ ) তাঁর ‘শংকর চরিত’ গ্রন্থটিতে লিখছেন --‘ বৌদ্ধ ধর্মের সর্বগ্রাসী প্রভাব সত্ত্বেও কোন কোন স্থানে ব্রাহ্মণগণ বহু কষ্টে বেদপাঠ ও বৈদিক ধর্মের অনুষ্ঠান কিয়ৎ-পরিমাণে রক্ষা করিয়াছিলেন। দেশের এই দুর্দিনে, বৌদ্ধধর্মের এইরূপ ঘোর অবনতির সময়, তাঁহারা আবার বেদপ্রচারের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ক্রমে ক্রমে সেই আন্দোলন প্রবল হইয়া উঠিল। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে প্রয়াগের কুমারিল ভট্ট বেদপ্রচারের জন্য দ্বিগবিজয়ে বহির্গত হইলেন।
কুমারিল ভট্ট বেদাদি শাস্ত্রে মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত, অত্যন্ত তেজস্বী ও বৈদিক কর্মকাণ্ডে নিপুণ গৃহস্থ ব্রাহ্মণ। তিনি বৌদ্ধ-ব্যাভিচারে মানবের দুঃখ দেখিয়া আর শান্তিপ্রদ বৈদিকধর্ম প্রচারে কৃত-সংকল্প হন। বৌদ্ধগণ ছিলেন অত্যন্ত কূট-তার্কিক। ভট্ট দেখিলেন তাহাদের শাস্ত্র ভালরূপে না জানিলে তাদের সঙ্গে তর্ক করিয়া বেদধর্ম-স্থাপন অসম্ভব। তাই তিনি শিষ্য সাজিয়া বৌদ্ধ পণ্ডিতদের নিকট তাহাদের ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। সেই সময় একদিন বৌদ্ধগণ বেদের অত্যন্ত নিন্দা করিতে লাগিল। তাহাতে কুমারিলের এত কষ্ট হইল যে, তিনি অশ্রুসংবরণ করিতে পারিলেন না। তাঁহাকে কাঁদিতে দেখিয়া বৌদ্ধগণ চমকিত হইল। তিনিও আর মনের ভাব গোপন করিয়া রাখিতে পারিলেন না; বেদ সম্বন্ধে বৌদ্ধদের সঙ্গে তর্কে প্রবৃত্ত হইলেন। কূট-তার্কিক বৌদ্ধদের সঙ্গে তিনি তর্ক করিতে করিতে উত্তেজিত হইয়া কুমারিল এক কঠিন পণ করিলেন --- ‘তিনি একটি গিরিশৃঙ্গ হইতে ( কাহারও মতে উচ্চ প্রাসাদের উপরি হইতে ) লাফাইয়া পড়িবেন; যদি বেদ সত্য হয়, তবে তাহাতে তার জীবনহানি হইবে না।’ সত্য সত্যই তিনি পণ অনুসারে লাফাইয়া পড়িয়া জীবিত রহিলেন, কেবলমাত্র তাহার একটি চক্ষু নষ্ট হইয়া গেল। তিনি বলিলেন, ‘যদি সত্য হয়’ বেদ সম্বন্ধে এই সন্দেহজ্ঞাপক বাক্য বলাতে তাহার পাপ হইয়াছিল, তাই চক্ষু নষ্ট হইল। বেদের উপর তার এমনই অটল বিশ্বাস ছিল।
... তর্কযুদ্ধে দিগ্বিজয় ও বৈদিকধর্ম প্রচার করিতে করিতে কুমারিল ভারতের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। বৌদ্ধগণ প্রমাদ গণিল! তাহাদের ধর্ম-বিশ্বাস, ত্যাগ-তপস্যা, সঙ্ঘবদ্ধভাব আর নাই; কাজেই তাহারা কুমারিলকে দমন করিতে পারিল না, তাহারা তর্কতরঙ্গের স্রোতে তৃণের ন্যায় ভাসিয়া যাইতে লাগিল। তখন রেলগাড়ি বা ডাকের ব্যবস্থা ছিল না; কুমারিলের বিজয়কাহিনী কতরূপে রঞ্জিত অতিরঞ্জিত হইয়া ভারতময় প্রচারিত হইল। দেশে এক বিরাট ধর্মান্দোলন উপস্থিত হইল। বেদপাঠ যজ্ঞানুষ্ঠানে ভারতের অবৈদিক ভাব দূর হইতে লাগিল। ইহসর্বস্বতা হ্রাস হওয়াতে সনাতন ধর্মের পুনরুত্থান হইল।
যে-সব রাজা বৌদ্ধধর্ম ত্যাগ করিয়া বৈদিক ধর্ম গ্রহণ করেন, তাঁহাদের মধ্যে কর্ণাটের রাজা সুধন্বার নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। কুমারিলের বহু পণ্ডিত শিষ্য ছিলেন, তন্মধ্যে প্রভাকর ও মণ্ডন মিশ্র সর্বপ্রধান। মণ্ডনকে ভট্ট নিজ অপেক্ষা অধিক ধীমান বলিয়া মনে করিতেন।
কুমারিল বৌদ্ধদিগকে পরাজিত করিবার উদ্দেশ্যে কপট শিষ্য সাজিয়া বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। শিক্ষা শেষ হইলে ‘বিজেতার ধর্ম গ্রহণ করিতে হইবে, অথবা স্বেচ্ছায় প্রাণত্যাগ করিতে হইবে’--- এই পণ রাখিয়া তিনি বৌদ্ধদিগকে তর্কপ্রতিযোগিতায় আহ্বান করেন। পণ অনুসারে তাঁহার শিক্ষক আত্মহত্যা করিতে বাধ্য হন। সমগ্র ভারতে বৈদিকধর্ম প্রচারকার্য শেষ হইলে কুমারিল গুরুদ্রোহরূপ মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবার জন্য তুষানলে মৃত্যুবরণ করেন। সনাতন বৈদিকধর্মের আদর্শ এত উচ্চ!
কুমারিল বৌদ্ধ কদাচারের স্থলে বৈদিক সদাচার প্রবর্তন করেন। সদাচার ও উপাসনাতে মানুষের মন পবিত্র হয়। কিন্তু জ্ঞান না থাকলে ধর্মকর্মেও মানুষ মুক্তিলাভ করিতে পারে না। বৈদিক জ্ঞানযোগ সকল সদাচার ও সকল ধর্মের ভিত্তি এবং মুক্তির পথপ্রদর্শক। বৈদিক ধর্ম --- কর্মে আরম্ভ হয় এবং জ্ঞানে পূর্ণতালাভ করে। বৈদিক ধর্ম পূর্ণভাবে প্রকটিত করিবার জন্য কুমারিল ভট্টের পর পরমহংস পরিব্রাজকাচার্য ভগবান শঙ্কর আবির্ভূত হইয়াছিলেন।”
( ক্রমশ )
0 Comments