দূর দেশের লোকগল্প
বুদ্ধি যার জিত তার
শ্রীলংকা (এশিয়া)
চিন্ময় দাশ
[মাউস ডিয়ার। ছোট্ট একটি নিশাচর জীব। গড়ন অনেকটা হরিণের মতো। কিন্তু উচ্চতা বড়জোর আট-দশ ইঞ্চি। দেখতে এক্কেবারে ইঁদুরের মতো। সেকারণেই, এর নাম হয়েছে মাউস ডিয়ার। গোটা বিশ্ব জুড়ে এই নামেই সে পরিচিত। পৃথিবী জুড়ে দেশে দেশে হাজারো গল্প আছে মাউস ডিয়ারকে নিয়ে। আমাদের আজকের এই গল্পটি শ্রীলংকা থেকে সংগৃহীত।]
বেশ বড় মাপের একটা জঙ্গল। সেই জঙ্গলে ছোট মতো একটা পাহাড়। একটা গুহা ছিল পাহাড়টাতে। একটা নেকড়ে দখল করেছে গুহাটাকে। বেশ আরামেই থাকা যায়।
একদিন সকাল সকাল বেরিয়ে গেছে নেকড়ে। একটা মাউস ডিয়ার ছিল সেই জঙ্গলে। বাচ্চা হবে তার। ভালো মতন একটা ডেরা খুঁজে বেড়াচ্ছিল সে। ঘুরতে ঘুরতে সেই গুহাটার কাছে এসে হাজির। উঁকি মেরে দেখল, একদম ফাঁকা। কেউ কোথাও নেই। জায়গাটাও বেশ ভালোই। পছন্দ হতে ভিতরে ঢুকে পড়েছে। খানিক বাদে দুটো বাচ্চাও হয়েছে তার।
সবে বিকেল হয়েছে। ঘরে ফিরে আসছে নেগড়ে। দূর থেকে নেকড়েটাকে আসতে দেখেছে মাউস ডিয়ার। হায় ভগবান। একেবারে সাক্ষাৎ যম এসে হাজির! এখন আমি কী করি। দু’দুটো ছোট্ট বাচ্চা। তাদের ফেলে কি পালানো যায়!
ভয়ে বুক দূর দূর করতে লাগল। কিন্তু মায়ের মন। বিপদের সময় বুদ্ধি হারাতে নেই। বাচ্চা দুটোকে বাঁচাতে হবে যেভাবেই হোক। সাথে সাথে একটা ফন্দি এসে গেল মাথায়। মাউস ডিয়ার করল কী, বাচ্চা দুটোকে খোঁচাতে লাগলো। আচমকা খোঁচা খেয়ে চেঁচাতে লাগল বাচ্চা দুটো।
অমনি মাউস ডিয়ার বলে উঠল— চেঁচাস কেন মিছিমিছি। শুকনো মাংস তো দেখছি ঘরেই আছে। আর, কাঁচা মাংস খেতে চাইলে, তার ব্যবস্থাও হয়ে যাবে। ঐ তো একটা নেকড়ে আসছে দেখছি। আর কোনও চিন্তা নাই।
কথাগুলো চেঁচিয়েই বলেছে মাউস ডিয়ার। নেকড়ে শুনেছে সব। থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে সে। কে ভেতরে ঢুকে বসে আছে আমার বাসায়? নিশ্চয়ই বড় কোনও জীব। ভয়ে বুক দূর দূর করতে লাগল নেকড়ের। তার মন বলল, আর এগুলো ঠিক হবে না। এখান থেকে সরে পড়াই ভালো।
পিছন ফিরে লম্বা দৌড় লাগিয়েছে। দৌড়তে দৌড়তে কতদূর গিয়েছে খেয়াল নাই। হঠাৎ দেখে, সামনে এক শেয়াল। সে দেখে বলল-- ব্যাপার কি হে? এমনভাবে দৌড়াচ্ছ কেন? চোখ মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে, ভয় পেয়েছো কোন কিছুতে। হয়েছেটা কী?
দৌড়ে দৌড়ে হাঁফ ধরে গিয়েছিল। খানিক দম নিল নেকড়ে। নিয়ে বলল-- আর বলো না, ভাই। ভয়াণক বিপদে পড়েছি। খুব বড় কেউ একটা আমার বাসায় ঢুকে বসে আছে।
শিয়ালের মাথায় কিছু ঢুকছে না। সে বলল-- কিছুই তো বুঝতে পারছি না। একটু খুলে বল তো, হয়েছেটা কী?
শেয়াল তাকে সব কথা খুলে বলল। শেষে বলল-- বাচ্চাকে আমার মাংস খাওয়াতে চায়। বুঝতে পারছ, কত শক্তিশালী সে।
একটু দম নিয়ে বলল-- এখন বিপদ হল, আমি থাকি কোথায়? এতদিনের বাসা। কিন্তু ওখানে তো আর থাকাই যাবে না। নতুন করে কোথায় বাসা খুঁজতে যাই এখন?
শেয়াল বলল-- কোথাও যেতে হবে না। চলো তো আমার সাথে, আমি দেখছি সে কত বড় বীর।
নেকড়ে কিন্তু অতো সহজে রাজি নয়-- বড় জোর বাঁচা গেছে। কোনও রকমে পালিয়ে এসেছি। আবার সেখানে ফিরে যাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে কি?
শেয়াল বলল-- তুমি তো একা যাচ্ছ না, ভায়া। আমি তো সাথে আছি। ভয় কিসের? চলো, চলো। ভয় পেলে বিপদকে জয় করা যায় না।।
শেষের কথাটা মনে ধরল নেকড়ের। নিমরাজী হয়ে বলল—চলো। তুমি সাথে আছো। তাই মনে একটু ভরসা পাচ্ছি।
খানিক দূর গিয়েছে, আবার বুক ঢিপ-ঢিপ করতে লাগলো নেকড়ের—না ভাই, আমি যাব না। সাহস থাকলে, তুমি একা গিয়ে দেখে এসো।
শেয়াল বলল-- আচ্ছা ভীতু তো। ঠিক আছে। দাঁড়াও। একটা ব্যবস্থা করছি আমি।
খুঁজে খুঁজে শক্ত দেখে একটা লতা এনে হাজির শেয়াল। প্রথমে নিজের গলায় ভালো করে গিঁট দিয়ে বাঁধলো লতাটাকে। তারপর লতার আর একটা মাথা শক্ত করে বেঁধে দিল নেকড়ের বুক বরাবর। বলল-- এবার ভরসা হলো তো? বিপদ হলে, তোমাকে ছেড়ে আমি পালাবো না। দুজনে মিলে মোকাবেলা করব।
আগে আগে চলেছে শেয়াল। একটু পেছনে নেকড়ে। দূর থেকে মাউস ডিয়ার দেখতে পেয়েছ দুজনকে। দুজনে যে একটা কোন কিছুতে বাঁধা আছে, সেটাও চোখ এড়ায়নি তার। সে হাঁক পেড়ে বলল—আরে, হতভাগা শেয়াল। এই তোর কাজের ছিরি? তোকে বললাম, সাতটা নেকড়ে ধরে আনতে। আর, তোর এই কাজ? সারাদিন কোথায় কাটিয়ে, বিকেল বেলা মাত্র একটা নেকড়ে ধরে এনেছিস? এতে কি আমার দুটো বাচ্চার পেট ভরবে? তোদের দুটোকে খেলেও তো …
আর এক মূহুর্তও নয়। সব গিয়েছে নেকড়ের কানেও। এ তল্লাটে আর আর এক মূহুর্তও নয়। সে পেছন ফিরে সেই যে দৌড়তে শুরু করেছে, দৌড় আর থামে না।
একই লতায় শেয়ালও যে বাঁধা আছে, সে কথা তখন মাথাতেই নাই নেকড়ের। নেকড়ে দৌড়চ্ছে, টানা হয়ে যাচ্ছে শেয়াল। গাছে গাছে ঠোকা খাচ্ছে।। পাথরে পাথরে ঠোকা খাচ্ছে। পরিত্রাহী অবস্থা। কিন্তু সে কথা তো নেকড়ের মাথাতেই নাই।
কতক্ষণ দৌড়ে, একটা নদীর পাড়ে এসে হাজির হয়েছে দেখে, দাঁড়িয়ে পড়ল নেকড়ে। দম নিয়ে কথা বলতে পারল যখন, শেয়ালের কথা মনে পড়লো। তার মন বলল, এই হতভাগার জন্যই আমার এত দুর্দশা। নির্ঘাৎ মারা পড়ছিলাম আর একটু হলে।
পেছন ঘুরে ধমক দিতে লাগলো শেয়ালকে-- এত ধূর্ত তুই। মনে মনে এই শয়তানি ছিল তোর। আরেকটু হলে তো মাথা পড়তাম রে। আগে বল, কেন এমন শত্রুতা করলি আমার সাথে।
প্রশ্নই করল শুধু। কোন উত্তরই পেল না। ধরা পড়ে গেছিস তো। তাই উত্তর দিচ্ছিস না তো হতভাগা। কথার জবাব দে আমার।
কিন্তু কে জবাব দেবে? শেয়াল কি আর বেঁচে আছে তখন? কখন মারা গেছে। গিয়েছিল নেকড়েকে বাঁচাতে। নিজেই মারা পড়েছে বেচারা।
0 Comments