মধুবাবুর কোচিং
কমলিকা ভট্টাচার্য
ছেলে, বৌমা আর নাতি বিদেশে চলে যাওয়ার পর থেকেই কল্যাণী দেবী আর মধুবাবুর জীবনটা যেন একটু ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। আগে এই বাড়িটা যেন সবসময় শব্দে ভরা থাকত—নাতির হাসি, দৌড়ঝাঁপ, খেলনার ঠকঠক শব্দ। এখন সারাদিন বাড়ি জুড়ে একটা অদ্ভুত নীরবতা।
নাতিকে দু’জনেই ভীষণ মিস করেন। মাঝে মাঝে ভিডিও কলে কথা হয়, কিন্তু তাতে কি আর সেই আদর, সেই গায়ের গন্ধ পাওয়া যায়?
কল্যাণী দেবী পেশায় শিক্ষিকা ছিলেন। কিন্তু ছেলে ছোট থাকতে সংসার আর ছেলেকে মানুষ করার দায়িত্বেই তিনি অনেক আগে স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। ছেলে বিদেশে চলে যাওয়ার পর হঠাৎই সময়টা খুব ফাঁকা লাগতে শুরু করল। তখনই তিনি আবার বাড়িতে পড়ানো শুরু করেন।
বিকেল হলেই কয়েকজন বাচ্চা আসে। কেউ অঙ্কে দুর্বল, কেউ বাংলায়। কল্যাণী দেবী ধৈর্য ধরে বোঝান। বাচ্চারা ভুল করলে বকেনও, আবার আদরও করেন। পড়ার ফাঁকে গল্প, কৌতুক—সব মিলিয়ে ঘরটা জমজমাট হয়ে ওঠে। এইসবের মধ্যেই যেন তিনি আবার নিজের পুরোনো সত্তাটাকে ফিরে পেয়েছেন।
কিন্তু মধুবাবুর অবস্থা আলাদা।
কত আর টিভি দেখা যায়! নিউজ, সিরিয়াল, ক্রিকেট—সবই দেখে ফেলেন। মাঝে মাঝে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যান, কিন্তু সেটা তো রোজ নয়। সবাই এখন নিজের নিজের নাতি-নাতনি, ডাক্তারের রিপোর্ট আর সুগারের মাত্রা নিয়ে ব্যস্ত।
এই অ্যাপার্টমেন্টে এসেছেন প্রায় দশ বছর হলো। কিন্তু এখানে নানা বয়সের মানুষ—কারও সঙ্গে ঠিক মন মেলে না। তাছাড়া মধুবাবু আবার বন্ধু বাছার ব্যাপারে একটু বেশি খুঁতখুঁতে।
তাই বেশিরভাগ সময়টা তিনি কল্যাণী দেবীর সঙ্গেই গল্প করে কাটান।
তবে বিকেলে যখন কল্যাণী দেবী বাচ্চাদের পড়াতে ব্যস্ত থাকেন, তখন মধুবাবুর বেশ একা লাগে।
একদিন বলেই ফেললেন—
—শোনো কল্যাণী, তোমার এই বাচ্চাদের নিয়ে এত চেঁচামেচি আমার সহ্য হয় না।
কল্যাণী দেবী হেসে বললেন—
—তুমিও তো পড়াতে পারো।
মধুবাবু হাত তুলে বললেন—
একদিন দুপুরে কল্যাণী দেবী বসে বাচ্চাদের জন্য প্র্যাকটিস ওয়ার্কশিট বানাচ্ছিলেন। মধুবাবু পাশেই বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল তিনি আর কাগজ পড়ছেন না—একভাবে কল্যাণী দেবীর দিকে তাকিয়ে আছেন।
হঠাৎ বলেই ফেললেন—
—কল্যাণী, তোমার হাতের রংটা কি সুন্দর!
কল্যাণী দেবী কাজ থামিয়ে তাকালেন।
—তোমার শরীর ঠিক আছে তো?
—কেন?
—না, হঠাৎ পঁয়ত্রিশ বছর পর আমার হাতের রং দেখতে পেলে কিনা!
মধুবাবু একটু নরম গলায় বললেন—
—সত্যি বলছি, তুমি কিন্তু এখনও আগের মতোই সুন্দর আছো। বরং এখন তোমাকে আরও ভালো লাগে।
কল্যাণী দেবী ভুরু তুললেন—
—কি ব্যাপার? তোমার কিছু চাই নাকি?
—না তো!
—দেখো কিন্তু, এখনই বলে ফেলো। বাচ্চারা এসে গেলে আর হবে না। লেখাটা শেষ করে চা বানিয়ে আনছি।
মধুবাবু একটু বিরক্ত হয়ে বললেন—
—আমি কি চা চাইছি? বলছি তুমি সুন্দর!
কল্যাণী দেবী কানটা একটু চুলকে বললেন—
—মনে হয় আজকাল কানে একটু কম শুনছি। কি যেন বললে?
মধুবাবু হেসে বললেন—
—শুনেছ ঠিকই। আবার শুনতে চাইছ!
ঠিক তখনই কল্যাণী দেবীর ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে লেখা— Dr. Shekhar।
মধুবাবু সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন—
—ইনি আবার কে?
কল্যাণী দেবী ইশারায় চুপ করতে বললেন। ফোন নিয়ে বারান্দায় চলে গেলেন।
পাঁচ মিনিট পরে ফিরে এলেন, মুখে রহস্যময় হাসি। তারপর গুনগুন করতে করতে গাইতে লাগলেন—
“ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে…”
মধুবাবুর সন্দেহ হলো। রান্নাঘরে গিয়ে বললেন—
—ঘরে কোন ভ্রমর এল শুনি?
কল্যাণী দেবী হেসে বললেন—
—আরে উনি ড. শেখর। লন্ডন থেকে এসেছেন। এই ফ্লোরেই থাকেন।কদিন ধরে এটা সেটা চাইতে আসছেন,ব্যাচেলার মানুষ।
—ওই লম্বা লোকটা?
—হ্যাঁ।
—কি হ্যান্ডসাম বলো।
—হ্যাঁ,তবে বয়স পঞ্চাশের উপরেই।
মধুবাবু আবার বললেন তা আজ ফোন করলেন কেন ?
—বললেন ওনার সব রোগীরা বাংলায় বলে,তাই ওনার খুব প্রবলেম হচ্ছে রোগীদের সাথে কমিউনিকেট করতে,আমি ওনাকে বাংলা শেখাব কি না।
—তুমি কি বললে?
—বললাম আমি তো বাচ্চাদের পড়াই।
—তারপর?
—উনি বললেন, আমাকেও বাচ্চা ভেবে পড়ান!
মধুবাবুর ভুরু কুঁচকে গেল।
কল্যাণী দেবী হেসে বললেন—
—আমি বললাম পরে জানাব।
মধুবাবু একটু ভেবে বললেন—
—আমিও ভাবছি আবার পড়ানোটা শুরু করব। একটা কোচিং খুললে মন্দ হয় না।
কল্যাণী দেবী বললেন—
—আমিতো তোমায় কতদিন বলেছি পড়ানোর কথা!
—বাচ্চাদের নয়, বড়দের। অনেক মহিলাও তো পড়তে আসতে পারে। মহিলাদের পড়াটা খুবই জরুরি। বিশেষ করে অঙ্ক। মেয়েরা কেন যে অঙ্কে ভয় পায়! আমাদের সময় এমএসসি-তে একটাই মেয়ে ছিল।
কল্যাণী দেবী মুচকি হেসে বললেন—
—আচ্ছা, শুধু মহিলাদের কোচিং?
—না, সে কথা নয়।
—সামনেই তো মহিলা দিবস। সেদিন থেকেই লেগে পড়ো মহিলা উন্নয়নে। ফ্রি-তে পড়াবে?
মধুবাবু বললেন—
—তুমি কি ওনাকে বাংলা ফ্রি-তে পড়াবে? চা-চিনি ঠিক আছে, কিন্তু টাইম ইজ প্রেশাস।
কল্যাণী দেবী মজা করে বললেন—
—তুমিই পড়াও না ওনাকে। নাকি শুধু মহিলাদের পড়াবে? চোখে চোখ মেলার অঙ্ক?
মধুবাবু একটু গম্ভীর হয়ে বললেন—
—হ্যাঁ, ওনাকেও আমিই পড়াব। বাংলা আমারও কম জানা নয়।
কল্যাণী দেবী মুচকি হেসে বললেন—
—আচ্ছা ঠিক আছে।
তিনি ফোন করে ড. শেখরের সঙ্গে মধুবাবুর আলাপ করিয়ে দিলেন।
কিছুক্ষণ পরে ফোন রেখে মধুবাবু বললেন—
—লোকটা একটু হতাশই হয়েছে মনে হয়।
—কেন?
—ভাবছিল সুন্দর মহিলার কাছে বাংলা শিখবে। সেখানে জুটল এক খড়ুস বুড়ো!
কল্যাণী দেবী হেসে বললেন—
—তাহলে মানছো তুমি খড়ুস?
—তা কবে থেকে আসবে বললেন?
—আজ থেকেই।
ঠিক তখনই দরজার বেল বাজল।
ড. শেখর হাজির।
তিনি ঢুকেই বললেন—
—Hello! Good evening!
মধুবাবু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন—
—বাংলায় বলুন।
ড. শেখর একটু হকচকিয়ে বললেন—
—গুড… মানে… ভালো সন্ধ্যা?
কল্যাণী দেবী হেসে ফেললেন।
ড. শেখর আবার কল্যাণী দেবীর দিকে তাকিয়ে বললেন—
—Actually, I thought you will teach me…
মধুবাবু তৎক্ষণাৎ বললেন—
—আপনার বাংলা শেখা নিয়ে দরকারটা গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে শিক্ষক কে, সেটা বড় কথা নয়।
ড. শেখর একটু অপ্রস্তুত হলেন।
কল্যাণী দেবী হেসে বললেন—
—ডোন্ট মাইন্ড। আপনার টিচার একটু স্ট্রিক্ট। আপনারা পড়া করুন, আমি চা বানিয়ে আনছি।
চা বানিয়ে এনে তিনি চায়ে চিনির পরিমাণ নিয়েই ড. শেখরের সঙ্গে ইংরেজিতে গল্প শুরু করলেন।
মাস্টার মধুবাবু চুপ করে বসে শুনছেন। তিনি অঙ্কের ছাত্র, ভাষা বিষয়ে বরাবরই একটু দুর্বল।
তিনি মনে মনে ভাবলেন—
5 Comments
😀😀😀 হাসির হাত খুবই সুন্দর। হাসির হাট খুলে বসেছেন।
ReplyDeleteধন্যবাদ😊
Deleteমার্জিত হাসির গল্প। ভালো লাগল।
ReplyDeleteধন্যবাদ🙏
Deleteভালো লাগলো
ReplyDelete