জমিদারের চাকর
সংগ্ৰাহক- পূর্ণিমা দাস
কথক- চিত্তরঞ্জন দাস, গ্ৰাম- বেড়াজাল, থানা- নয়াগ্ৰাম, জেলা- ঝাড়গ্ৰাম
অনেকদিন আগে রামনগর নামে একটি গ্ৰামে রমানাথ নামে এক জমিদার বাস করত। সেই জমিদারের বাড়িতে সহদেব নামের এক লোক থাকত। সে ছিল জমিদার রমানাথের খাস চাকর।
তার বয়স যখন বারো - তেরো তখন থেকেই সে জমিদার বাড়িতে কাজ করে। আজ তার বয়স ষাটের কাছাকাছি। এতবছর ধরে সে জমিদারের খাস চাকর হয়ে একা হাতে সামলেছে বাড়ির সমস্ত কাজকর্ম। কিন্তু এখন তার বয়স বেড়েছে তাই সে আর আগের মতো কাজবাজ করতে পারে না। এরজন্য সে জমিদার রমানাথকে বলেছে যে সে এই শেষ বয়সটা তার নিজের গ্ৰামেই কাটতে চায়। জমিদার রমানাথও তার কথায় সায় দিয়েছে।
প্রতিদিনের মতো সহদেব রমানাথকে পান সেজে দিলে পান খেয়ে রমানাথ বলে-“বাঃ বাবা বাঃ। সহদেব পানটা খুব সুন্দর সেজেছিস তো।”
এই শুনে সহদেব বলল-“এই এতটুকু বয়স থেকেই তো সব করছি বাবু। সবই তো এখানে শিখেছি।”
জমিদার তখন হাসতে থাকে। তারপর বলে-“তা হ্যাঁ রে, আজ খাবারে মাংস আছে তো?”
তখন সহদেব বলে-“মোটেই না। কাঁচকলা আলুর ঝোল। কদিন ধরে তোমার শরীরটা ভালো নেই। কবিরাজ এসে যদি বলে ওইসব খেতে তাহলে খাবে তা না হলে না। আমি যতদিন আছি ততদিন তোমাকে কোনো উল্টো পাল্টা জিনিস খেতে দেব না। আমি চলে গেলে যা পার খাও। তার আগে না।”
জমিদার তখন বলে-“সে কপাল কী আর আমার আছে যে তুই তাড়াতাড়ি মরবি আর আমি শান্তি পাব।”
সহদেব তখন বলে-“ওমা, আমি মরতে যাব কোন দুঃখে?”
জমিদার বলে-“এই তো বললি আমি চলে গেলে তুমি যা খাওয়ার খেও।”
🍂
সহদেব বলে-“হা কপাল, আমি আমার নিজের বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা বলছি গো। আর দুদিন পর আমার চলে যাওয়ার কথা তা কী তুমি ভুলে গেছ? বয়স হচ্ছে এখন বাড়ি গিয়ে একটু আরাম করব।”
জমিদার বলে-“পরশু আমার কয়েকজন আত্মীয় আসবে। তুই না থাকলে কী করে সামলাব বল তো?”
সহদেব বলে-“বুঝেছি আবার নতুন বাহানা। আচ্ছা ঠিক আছে ঠিক আছে। তোমার আত্মীয়রা গেলেই না হয় আমি বাড়ি যাব।”
এই শুনে জমিদার বলে-“বেশ বেশ।”
এরপর জমিদারের কথামতো দুদিন পর জমিদারের আত্মীয়রা জমিদারের বাড়িতে আসে। সহদেব তাদের জল মিষ্টি খেতে দেয়। পান সেজে দেয়।
তখন জমিদার তার একজন অতিথিকে বলে-“বুঝলে কুশল, এ হল আমার খাস লোক। তোমাদের যখন যা দরকার হবে সব ওকে বলবে।”
তখন কুশল বলে-“ও তাই নাকি?”
এই শুনে কুশলের বউ মালা বলে-“তবে দাদা, আজকাল কিন্তু কাউকে বিশ্বাস করা যায় না।”
তখন সহদেব বলে-“মা, এইসব বলে বাবুকে আর ভয় না দেখিয়ে এই জল মিষ্টিগুলো খাও তো। আমি বরং তোমাদের দুপুরের পেটপুজার জোগাড় করি।”
এই শুনে জমিদার হাসতে হাসতে বলে-“হ্যাঁ হ্যাঁ, তুই যা। তুই বরং ওইদিকটা সামলা।”
এরপর সহদেব সেখান থেকে চলে যায়।
সহদেব চলে যেতে জমিদার অতিথিদের বলে-“ওর কথাবার্তা একটু ওরকম। কিন্তু মানুষটা ভালোই।”
সেইদিন সন্ধ্যেবেলা কুশল ও তার বউ মালা ঘরে বসে কথা বলছিল।
কুশল বলছিল-“জানো মালা, মনে হয় এখানে আর তেমন কিছু দেখার নেই?”
এই কথা শুনে সহদেব বলে-“কে বলল আর কিছু নেই, আছে তো। কর্তাবাবুদের কুলদেবীর মন্দির। মা সোনাময়ীর মন্দির।”
কুশল তখন বলে-“সোনাময়ীর মন্দির! তা এইরকম নাম কেন?”
সহদেব বলে-“আসলে মায়ের সারা শরীর সোনার গয়না দিয়ে সাজানো। তাই ওইরকম নাম।”
এই শুনে কুশল বলে-“তাহলে সেখানে হয়তো অনেক পাহারাদারও আছে?”
সহদেব বলে-“না না, কোনো পাহারাদার থাকে না। পুজো হয়ে গেলে পুরোহিত মন্দিরে তালা লাগিয়ে চলে যায়। কিন্তু এত কিছু জেনে তোমার কাজ কী?”
কুশল তখন থতমত খেয়ে বলে-“আরে না না, আমাদের আবার কী কাজ। এমনিই জানতে চেয়েছিলাম। আচ্ছা তুমি এবার যাও।”
তখন সহদেব সেখান থেকে চলে যায়।
সেইদিন রাতে খাবারের সময় কুশল ও তার বউ মালা সোনাময়ীর মন্দির দেখতে যাওয়ার কথা বলে জমিদার রমানাথকে। ঠিক হয় যে পরের দিন সকালে সহদেব তাদের মন্দির দেখাতে নিয়ে যাবে।
জমিদারের কথামতো পরের দিন সকালে সহদেব কুশল ও মালাকে নিয়ে সোনাময়ী মায়ের মন্দিরে যায়। গিয়ে দেখে পুরোহিত মায়ের পুজো করছে।
এদিকে কুশল ও তার বউ সোনায় মোড়া মাকে দেখে হতবাক হয়ে যায়।
মালা তখন কুশলকে বলে-“এই দেখ দেখ, কত সোনা! এত সোনা তো আমি আগে কোনোদিনও দেখিনি। জানো আমার না হাত কেমন নিসফিস নিসফিস করছে। এই সোনা যদি একবার সরানো যায় না তাহলে আর আমাদের দেখতে হবে না। সারাজীবন পায়ের উপর পা তুলে থাকতে পারব।”
কুশল বলে-“তা যা বলেছ।”
মালা তখন বলে-“আরে দাঁড়াও দাঁড়াও, আগে জানতে হবে এই মন্দিরের চাবি মন্দিরের পুরোহিত ছাড়া আর কার কাছে থাকে?”
তখন কুশল বলে-“এই চুপ চুপ সবাই শুনতে পাবে।”
এরপর পুজো শেষ করে পুরোহিত মন্দিরে তালা দিয়ে চলে যায়।
পুরোহিত চলে যেতে মালা বলে-“এ মা, যা একদম ভুলে গেলাম। ছিঃ ছিঃ ছিঃ, এবার আমি কী করব? আমার কপালটাই খারাপ। এ্যাঁ এ্যাঁ এ্যাঁ।”
তখন সহদেব বলে-“কী হল মা, তোমার আবার কী হল? তুমি কাঁদছ কেন?”
মালা বলে-“আসলে আমি ভেবেছিলাম মায়ের পায়ের ফুল নেব। কিন্তু তখন পুরোহিতের কাছে থেকে নিতে ভুলে গেছি। আর পুরোহিত চলে যেতে এখন আমার মনে পড়ল। এবার কী হবে, আমি মনে হয় আর ফুল পাব না?”
সহদেব বলে-“ওওও এই কথা। তুমি চিন্তা করো না। আমার কাছে মন্দিরের আর একটি চাবি আছে। আমি এখুনি মন্দিরের দরজা খুলে দিচ্ছি।”
তখন মালা মনে মনে বলে-“কেমন কথাটা বের করে ফেললাম। হা হা হা।”
এরপর ওইদিন রাত্রিবেলা খেতে বসে মালা জমিদারকে বলে-“সত্যি দাদা, সহদেব কিন্তু ভারী কাজের লোক।”
জমিদার তখন বলে-“কিন্তু ওর তো কাজের থেকে ছুটি হয়ে গেছে। শুধু তোমরা আসবে বলে কদিন থেকে গেছে। তোমরা চলে গেলে সেও চলে যাবে।”
তখন মালা বলে-“ও মা তাই নাকি? কিন্তু দাদা আমরা তো কাল চলে যাব। আর একটা কথা দাদা, আমরা তো কাল ভোর ভোর বেরিয়ে যাব। তাই আজ যদি সহদেব আমাদের পাশের ঘরে ঘুমায় তাহলে ভালো হত। সকাল সকাল আর আপনাকে বিরক্ত করতে চাই না।”
জমিদার তখন বলে-“আচ্ছা ঠিক আছে। এই সহদেব, তুই আজ ওদের পাশের ঘরে ঘুমাবি কেমন?”
সহদেব বলে-“আচ্ছা ঠিক আছে।”
এরপর সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। সহদেবও ঘুমিয়ে পড়ে। সহদেব ঘুমিয়ে পড়লে কুশল ও মালা লুকিয়ে সহদেবের কাছ থেকে মন্দিরের চাবিটা নিয়ে নেয়। আর ভোর হতে না হতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে মন্দিরে চলে যায়।
এদিকে সহদেবের ঘুম ভাঙতেই সে বলে-“এ বাবা, সকাল হয়ে গেছে। অনেক দেরি হয়ে গেল মনে হয়। ওরা কী বেরিয়ে গেল নাকি? কিন্তু যাবে কী করে চাবি তো আমার কাছে আছে।”
এই বলে সে যখন চাবির গোছাটা খুঁজে, তখন সে দেখে বালিশের নীচে চাবির গোছাটা নেই।
এই দেখে সে বলে-“এ কী, এ কী চাবিগুলো গেল কোথায়? তার মানে কী ওরা…..”
আর এদিকে কুশল ও মালা মন্দিরে পৌঁছে মন্দিরের তালা খুলতে থাকে।
মালা কুশলকে বলে-“তাড়াতাড়ি খোলো। একবার যদি চাকরটার ঘুম ভেঙে যায় তা হলে হয়ে গেছে।”
কুশল বলে-“এই তো এই তো হয়ে গেছে। চলো এবার আমরা ভিতরে গিয়ে সব সোনা নিয়ে আসি।”
মালা বলে-“শোনো, আমি ভিতরে গিয়ে সোনাগুলো নিয়ে আসছি। তুমি বাইরেটা দেখ।”
কুশল বলে-“আচ্ছা ঠিক আছে।”
এরপর মালা ভিতরে গিয়ে সব সোনা নিয়ে আসে। আর তারপর সব সোনা নিয়ে যেই না বেরোতে যাবে ঠিক তখনই তাদের সামনে সহদেব চলে আসে।
সহদেব কে দেখে তারা বলে-“এ কী তুমি! তুমি এখানে কী করছ? মানে তুমি তো ঘুমাচ্ছিলে?”
সহদেব তখন বলে-“হ্যাঁ আমি ঘুমাচ্ছিলাম আর তোমরা আমার কাছ থেকে চাবি চুরি করে এনে মায়ের সোনা চুরি করছিলে তাই না?”
মালা বলে-“কী সব আজেবাজে কথা বলছো? আমরা তো মাকে প্রণাম করতে এসেছিলাম।”
সহদেব বলে-“ও তাই বুঝি, তাই তো তোমাদের থলির ভিতর থেকে সোনাগুলোকেও কেমন দেখা দিচ্ছে।”
তখন মালা সহদেবকে বলে-“সহদেব শোনো না, তুমি কাউকে কিছু বলো না। আমরা এর থেকে কিছু সোনা তোমাকেও দিয়ে যাব। এখন তুমি আমাদের যেতে দাও।”
সহদেব বলে-“কী! কী বললি তোরা। এতদিন এ বাড়ির নুন খেয়েছি। আর তাদের সঙ্গে বেইমানি করব। না তা হতে পারে না। তাই যাওয়ার আগে তার দাম চুকিয়ে দিয়ে যাব।”
কুশল তখন বলে-“তবে রে, দাঁড়া। তোর এত সাহস এখনই তোর মজা দেখাচ্ছি।”
এই বলে কুশল একটা লাঠি দিয়ে সহদেবের মাথা ফাটিয়ে দেয়। আর সহদেব সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায়।
এরপর কুশল ও মালা সোনা নিয়ে সেখান থেকে যেই না বেরোতে যাবে ঠিক তখনই সেখানে জমিদার রমানাথ রাজপেয়াদা নিয়ে চলে আসে। আর তাদের রাজপেয়াদাদের হাতে তুলে দেয়।
এরপর জমিদার সহদেবকে বাড়ি নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে সহদেবের জ্ঞান ফিরে আসে। জ্ঞান ফিরতেই জমিদার সহদেবকে বলে-“এখন তুই ঠিক আছিস তো সহদেব?”
সহদেব বলে-“হ্যাঁ, এখন ভালো লাগছে।”
জমিদার তখন বলে-“তুই যে আজ আমাকে কত বড়ো বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়েছিস তা কেবল আমিই জানি। আজ তুই আমার চোখ খুলে দিয়েছিস। আজ থেকে তুই আমার চাকর নয় আমার ভাই হয়ে আমার বাড়িতে থাকবি। আর তোর পরিবারও আজ থেকে এখানেই থাকবে। এই আমি বলে দিলাম। তোকে আমি কোথাও যেতে দেব না কোথাও না।”
এই বলে জমিদার সহদেবকে জড়িয়ে ধরে।
0 Comments