জ্বলদর্চি

পুরাণকালের নারী: শিক্ষা-স্বাধীনতা, উপবীত ধারণ ও বেদ মন্ত্র পাঠের অধিকার /পি.শাশ্বতী

পুরাণকালের নারী: শিক্ষা-স্বাধীনতা, উপবীত ধারণ  ও বেদ মন্ত্র পাঠের অধিকার

পি.শাশ্বতী


সময়ের নিরিখে সেটা পুরাকালের কথা। ভারত নামে এই দেশের উত্তরাখণ্ডের একটি রাজ্য অযোধ্যার  কীর্তিমান রাজা দশরথ সিংহাসনে আসীন। তাঁর ধর্মাচরণ, দানশীলতা, দয়া পরায়ণ মন ও বীরত্বের  কীর্তিতে চারিদিক মুখরিত। কিন্তু এমন রাজার অদৃষ্টেই কিনা লেখা ছিল এক মর্মান্তিক পারিবারিক নিষ্ঠুর পরিহাস। সেটাও তাঁরই একটি দুর্বল মুহূর্তের দুর্বলতার কারণেই। নিজের তিন রানির এক রানি কৈকেয়ীর সেবায় তুষ্ট হয়ে তাকে কোনো বর দেবার ইচ্ছা পোষণ করলে বিবেচক রানি বলেছিলেন, পরে কোনো এক সময় তিনি তাঁর প্রয়োজনীয় বস্তুটি চেয়ে নেবেন। কিন্তু সেই কৈকেয়ীই তাঁর এক কুটিলা স্বভাবের প্রবীণা দাসীর কুমন্ত্রণায় বিকারগ্রস্ত হয়ে নিজের সন্তান ভরতকে রাজা করার প্রত্যাশায় সিংহাসনের প্রকৃত দাবিদার সতীনপুত্র রামচন্দ্রের রাজ্যাভিষেকের আগের দিন তাঁর চোদ্দ বছরের বনবাস দাবি করে বসলেন রাজা দশরথের কাছে। কিন্তু এমন এক অনৈতিক ও অধার্মিক কাজ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় বলে রানি তাঁকে তাঁর আগের সেই বাকসত্য রক্ষার কথা মনে করিয়ে দেন। ধার্মিক আদর্শবান দশরথ বাধ্য হয়ে রামচন্দ্রকে ব্যাথাতুর হৃদয়ে আদেশ দিলেন চোদ্দ বছরের জন্য। গোটা রাজ্য এক মুহূর্তে আনন্দ সাগর থেকে শোকের সাগরে নিমজ্জিত হল।

পিতৃসত্যরক্ষার্থে পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র বিনাবাক্যে  বিমাতা কৈকেয়ীর শর্তানুসারে বনবাসের যাবার জন্য পা বাড়ালেন। তার আগে নিজের মাতা কৌশল্যার কাছে বিদায় নিতে  তাঁর ঘরে গেলেন।

রামচন্দ্র দেখলেন, তাঁর মা কৌশল্যা পট্টবস্ত্র পরিধান করে রীতিমতো ব্রাহ্মণ পুরোহিতের অনুকরণে বেদ মন্ত্র উচ্চারণ করে যজ্ঞে আহুতি দিচ্ছেন। তাঁর চারপাশে সাজানো রয়েছে আহুতির জন্য নানা রকমের দ্রব্য। সম্ভবত জ্যেষ্ঠ সন্তানের বনবাসে যাবার সিদ্ধান্তের পরই তাঁর মঙ্গল কামনায় রানি কৌশল্যা এই যজ্ঞের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

তখন তিনি বেদমন্ত্র উচ্চারণ করে যজ্ঞাগ্নির শিখায় ঘি ও মধু আহুতি দিচ্ছিলেন—

"সা ক্ষৌমবসনা হৃষ্টা নিতাং ব্রতপরায়ণা। 

অগ্নিং জুহোতি স্ম তদা মন্ত্রবৎ কৃতমঙ্গলা।। ১৫

প্রবিশ্য তু তথা রামো মাতুরন্তঃপুরং শুভম্।

 দদর্শ মাতরং তত্র হাবয়ন্তীং হুতাশনম্।। ১৬।।

 দেবকার্যনিমিত্তং চ তত্রাপশ্যৎ সমুদ্যতম্। দধ্যক্ষতঘৃতং চৈব মোদকান্ হবিযস্তথা। ১৭।। 

লাজান্ মাল্যানি শুক্লানি পায়সং কৃসরং তথা। 

সমিধঃ পূর্ণকুন্তাংশ্চ দদর্শ রঘুনন্দনঃ।। ১৮।।

তাং শুরুক্ষৌমসংবীতাং ব্রতযোগেন কর্শিতাম্। তপর্যয়ন্তীং দদর্শান্তির্দেবতাং বরমণিনীম্।। ১৯।।

[বাল্মিকী রামায়ণম্-অযোধ্যাকাণ্ড-সর্গ-২০]


এতক্ষণ যা বর্ণনা করা হল, সেটা রামচন্দ্রের বনবাসে যাবার কাহিনির কোনো গৌরচন্দ্রিকা নয়। এর উদ্দেশ্য হল এটি বোধগম্য হওয়ার যে, তাহলে কি সেই পুরাকালে নারীরা যজ্ঞোপবীত বা পৈতা ধারণ করতেন? পুরুষ ব্রাহ্মণের মতোই তাঁরা বেদমন্ত্র অধ্যয়ন করে সেই মন্ত্র উচ্চারণ করে যজ্ঞ করতেন? আজকের আধুনিক সমাজে নারী স্বাধীনতার পূর্ণ জোয়ারের মধ্যেও এমন ঘটনা কেবল বিস্মিত হতে হয় বই-কি! 

শাস্ত্রীয় পুরাণ অনুযায়ী তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, সেকালের নারীদের মধ্যে শিক্ষা নিশ্চয়ই ছিল, তা নাহলে তাঁদের পক্ষে এই ধরনের শাস্ত্রীয় আচার-আচরণ পালন করা সম্ভব হত না। শুধু তাই নয়, বেদমন্ত্র উচ্চারণ করে যজ্ঞের মতো একটি নিখুঁত আচরণীয় প্রথা পালনের জন্য শাস্ত্র মতেই তাঁকে উপবীত বা পৈতা ধারণ করতেই হবে। ফলে সেকালের নারীরা যে পৈতা ধারণ করতেন, এবিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। 

সামবেদীয় কৌথুমী  শাখার স্রষ্টা মহর্ষি আচার্য গোভিল বৈদিককালে সামবেদীয় বিয়ের যে বিধিবিধান লিখেছিলেন, সেখানেও তিনি নারীদের সম্পর্কে এই সত্যটিই লিখে রেখে গেছেন।

সেখানে তিনি এক জায়গায় একটি শ্লোকে লিখেছেন— "প্রাবৃতাং যজ্ঞোপবীতিনীমত্যুদানয়ন্ত্রণেৎ সোমোহ দদগন্ধর্ব্বায়েতি পশ্চাদয়েঃ সংবেষ্টিতং কটমেবং জাতীয়ং বাংল্লৎ পদা প্রবর্তয়ন্তীং বাচয়েৎ প্র মে পতিযানঃ পন্থাঃ কল্পতামিতি স্বয়ং জপেৎ।”

 [গোভিল গৃহ্যসূত্রম্ :২|১|১৯-২১

অর্থাৎ—  বিবাহ বাসরে বরের সামনে বস্ত্রাবৃতা এবং যজ্ঞোপবীতিনী কন্যাকে  আনার পর  "সোমহদদ গন্ধর্ব্বার" ইত্যাদি মন্ত্র পাঠ করবেন।

এখানে স্পষ্ট করেই কন্যা বা নারীর অঙ্গে পৈতার উল্লেখ করা হয়েছে। মহর্ষি গোভিলের অন্য কিছু শ্লোকে এটাও প্রমাণিত হয় যে, সেই সময়ে নারীর উপনয়ন সংস্কার হত। তিনি আরও বলছেন, "কন্যারা শুধু উপনয়ন সংস্কার বা পৈতা পড়বে তা নয় বরং বিবাহিত নারীরা সকাল সন্ধ্যায় হোম-যজ্ঞ ও করবে।”

আর একজন বিশিষ্ট ভাষ্যকার পণ্ডিত ব্রাহ্মণ মাধবাচার্যও তাঁর ‘পরাশর সংহিতা’র ভাষ্যে নারীদের উপনয়ন বিষয়ে এই একই কথা বলেছেন, কিন্তু কিছুটা সংস্কার করে—

"দ্বিবিধা স্ত্রীয়ো ব্রহ্মবাদিন্যাঃ, সদ্যো বধ্বশ্চঃ।।

 তত্র ব্রহ্মবাদি- নীনাং উপনয়নং অগ্নীন্ধনং

 বেদাধ্যয়নং স্বগৃহে ভিক্ষ। ইতি।।”

অর্থাৎ— স্ত্রীজাতি বা নারী দুই ধরনের।  একদল হলেন ব্রহ্মবাদিনী, আর-একদল হলেন সদ্যবধূ।  ব্রহ্মবাদিনী নারীদের অবশ্যই উপনয়ন সংস্কার করতে হবে। তাঁরা যজ্ঞ করবেন, বেদ পাঠ করবেন এবং করাবেন। আর যাঁরা সদ্যবধূ হবেন তাঁরা উপনয়ন গ্রহণ করবেন না। কিন্তু এখানে মাধবাচার্য স্পষ্ট করেননি, সদ্যবধূরা ইচ্ছা করলে পৈতা ধারণ করতে পারেন, নাকি একেবারেই করতে পারবেন না!

আধুনিক পণ্ডিতদের কারও কারও মতে— মাধবাচার্য বলতে চেয়েছেন,  যে মেয়েরা পড়ালেখা করতে চায় তাঁরা লেখাপড়া করুক, উপনয়ন সংস্কারের মাধ্যমে পৈতা ধারণ করুক এবং প্রয়োজনে বেদপাঠও করুক। কিন্তু যাঁদের ওসব লেখাপড়ায় মন নেই, তাঁরা বিয়েসাদি করে মন দিয়ে সংসারধর্ম পালন করুক।

এক্ষেত্রে মহর্ষি হরীত কিন্তু  নারীদের উপনয়নের বিষয়ে অন্য কথা বলছেন— "দেখো কন্যা, বিয়ে না হয় করলে ঠিক আছে, তার পরেও তুমি কিন্তু নারীই। নারীরও একটা ধর্মীয় সংস্কার আছে। ফলে উপনয়ন ধারণ করো এবং অবশ্যই বেদ বেদ পাঠ করো।”

তথৈব য প্রথমাত উপনয়নাং ক্রুত্ব সদ্য ইব 

“বিবাহম ততঃ বেদমধিতে স সদ্যবধুঃ।।” 

[হরীত ধর্মসূত্র ৩০.২১-২২]

কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, নারীদের এই উপনয়ন সংস্কার করে পৈতা ধারণ এবং বেদ পাঠ করার বৈদিক রীতি মনুপরবর্তী যুগ থেকে ধীরে ধীরে বিলীন হতে শুরু করে। স্মৃতিশাস্ত্র যুগের পর মহর্ষি মনু নারীদের আচার-আচরণের উপর এমন কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করতে শুরু করলেন যে, সেখানে কখনও তিনি উদার, কখনও তিনি অতি রক্ষণশীল হয়ে উঠেছেন। ফল স্বরূপ দেশে পুরুষতান্ত্রিকতা ও পৌরুষ স্বার্থের বেড়াজাল বিস্তার করতে থাকে। তাই দেখা যায় স্মৃতিশাস্ত্র ও পুরাণের যুগে এসে নারীদের উপনয়ন, বেদমন্ত্র উচ্চারণ এমনকি ‘ওঁ’-কার উচ্চারণের উপর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।  

তথ্যসূত্র:

১| শতপথ ব্রাহ্মণ-রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন।

২| হারীত ধর্মসূত্র-নির্ণয়সাগর প্রেস।

৩| গোভিল গৃহ্যসূত্র-সংস্কৃত পুস্তকভান্ডার।


Post a Comment

1 Comments

  1. অসাধারণ সুন্দর আর বলিষ্ঠ মতবাদের বাহক লেখাটি

    ReplyDelete